× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রফিক আজাদ : তাঁর কবিতাপাঠের ভূমিকা

মাসুদুজ্জামান

প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৫ ১৪:১৪ পিএম

রফিক আজাদ : তাঁর কবিতাপাঠের ভূমিকা

বাংলাদেশের কবিতার বরপুত্র তিনি। জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন। বাংলা কবিতা তাঁরই হাতে হয়ে উঠেছিল উজ্জ্বল, অনন্য। খুব কাছে থেকে দেখেছি তাঁকে। কিন্তু সে-দেখা কেমন দেখা? শরীরময় চাক্ষুষ দর্শন শুধু নয়, তাঁরই রচিত কবিতার মধ্য দিয়েও তাঁকে দেখেছি। আবহমান বাংলাদেশ উঠে আসে তাঁর উচ্চারণে। মাঝে মাঝে বিভ্রম জাগে। ব্যক্তি রফিক আজাদকে কি দেখছি কবিতায়, নাকি দেখছি সেই মানুষটিকেÑ কবিতায় যিনি বাংলাদেশের ব্রাত্য মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন? মানবিকতার কথা বলেন?

রফিক আজাদের কবিতার এটাই প্রধান বৈশিষ্ট্য। একা তিনি, কিন্তু সম্মিলিত স্বরায়নে ঝনঝন করে ওঠে তাঁর কবিতার পঙ্‌ক্তিমালা। কখনও ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কর্কশ শোনায় তাঁর কথাগুলো। আবার একেকবার দেখি আত্মকথনের মৃদু শীতল গহনতা। রফিক আজাদের কবিতা বুঝতে হলে তাঁর আবির্ভাবের সময়টা বুঝে নেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়ে।

তুমুল সেই সময়। রুদ্ধ, বিক্ষুব্ধ, তরঙ্গিত। ষাটের দশক। বাংলাদেশের কবিদের সংবেদনের জায়গাটা আমূল বদলে যেতে থাকল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাল। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে তখন জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণ ঘটতে শুরু করেছে। শুরু হয়ে গেছে সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। স্বাধীনতার স্বপ্নবীজ কবি লেখক শিল্পী আর সংবেদনশীল মানুষের মধ্যে এভাবেই রোপিত হয়ে যায়। এরই অন্তিম পরিণাম আমরা দেখি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে।

ষাটের দশক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক দিক থেকে মূলত দুটি কালখণ্ডে বিভক্ত ছিল : ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ এবং ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল। প্রথম সময়পর্বটি আইয়ুবি ‘কালো দশক’ এবং পরবর্তী সময়টি ‘গণআন্দোলন’-এর কাল বলে চিহ্নিত হয়ে আছে। অবরুদ্ধ এই সময়ে স্বাভাবিকভাবেই কবি-শিল্পীরা বিপন্ন বোধ করেছেন। হতাশা ব্যক্তিমানুষের মতো কবিদেরও ঘিরে ধরেছিল। ষাটের নতুন কবিদের মনে হলো, পশ্চিমের অবক্ষয়ী ভাবনাই হতে পারে নতুনভাবে কবিতা লেখার উৎস। তাঁরা বিশুদ্ধ নান্দনিকতারও উৎস ভেবেছিলেন পশ্চিমা কবিতাকে : ‘পঞ্চাশের সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের আরও একটি বড় পার্থক্য ছিল। পঞ্চাশের ধারা মূলত জেগে উঠেছিল বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রেরণা থেকে। ফলে এর মধ্যে ছিল যুগযুগান্তের দেশজ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ আবহমান বাঙালিত্বের চেতনা, মাটির গন্ধ এবং এ জাতিসত্তার ভবিষ্যতের জন্য উৎকণ্ঠা ও স্বপ্ন। আমরা এই জাতীয় চেতনাসমৃদ্ধ ধারা থেকে অনেকখানিই দূরে সরে এসেছিলাম; নিমগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম আধুনিক পাশ্চাত্য সাহিত্যের অবক্ষয়ী মূল্যবোধে, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতায় এবং প্রকরণগত পরীক্ষানিরীক্ষাগুলোর শানিত নিপুণ কলাকৈবল্যের জগতে (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ভালোবাসার সাম্পান)।’ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জবানিতে যে সময়ের কথা উঠে এসেছে, সে সময়টি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক সংবেদনা আর সৃষ্টিশীলতা, উভয় দিক থেকেই আলাদা, অনন্য।

চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের কবিদের সঙ্গে আরও একটি দিক থেকে ষাটের কবিরা আলাদা হয়ে পড়েছিলেন। তাদের মনে হয়েছিল এ পৃথিবীর আত্মপরিচয়হীন বাসিন্দা তারা। সে সময়ের বাংলাদেশে ষাটের নন্দনশিক্ষক ও লেখকদের অঘোষিত নেতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘যৌবনে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা আবিষ্কার করেছিলাম : নিজ দেশে আমরা বহিরাগত। একটা অনিকেত উন্মুল পৃথিবীর আত্মপরিচয়হীন বাসিন্দা। উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের ব্যক্তিগত একাকিত্বের মধ্যে অপচিত। পশ্চিম ইউরোপ আর আমেরিকার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যসর্বস্ব, রুগ্ন ও অবক্ষয়ী সংস্কৃতি-ধারার খুবই কাছাকাছি। এ কারণেই ওইসব সাহিত্যের ঘুণেধরা ও বিকারগ্রস্ত প্রবণতাগুলো এত তাড়াতাড়ি আমাদের অন্তরঙ্গ হয়ে উঠেছিল।... সবচেয়ে সর্বাত্মক ও গভীর ছিল উনবিশংশ শতাব্দীর ফরাসি কবি বোদলেয়ারের প্রভাব।’

তবে শুধু বুদ্ধদেববাহিত বোদলেয়ার নন, পশ্চিম বাংলায় ঠিক এ সময়ই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-আন্দোলন হয়েছিল যার দ্বারা এ ভূখণ্ডের কবি-লেখকরা, বিশেষ করে ষাটের নতুন কবিরা প্রভাবিত হয়েছিলেন। একদিকে ‘কৃত্তিবাস’, অন্যদিকে ‘হাংরি জেনারেশন’ Ñ দুইয়েরই অভিঘাত তাদের জীবনভাবনা ও শিল্পভাবনা আচ্ছন্ন করে ফেলে। নান্দনিক এ ভাবনার পাশাপাশি সমকালের বাংলাদেশ ভিন্ন এক রাজনৈতিক বোধে জেগে উঠেছিল। জাতীয়তাবাদী প্রেরণায় লেখকদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল স্বাধিকারের বোধ। প্রবল জাতীয়তাবাদী উত্থানের হাত ধরে মানুষ ও মৃত্তিকালগ্নতা এবং মাতৃভূমির বিষয়গুলো আবার ফিরে আসে।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা শিল্পকে নিরক্ত করে তোলে, অর্থাৎ শিল্পের জায়গায় যদি অবিরল কথা বলার ঝোঁক প্রাধান্য পেতে থাকে তাহলে অতিকথনে আবিল হয়ে পড়ে শিল্প, নান্দনিক শুদ্ধতা আর রক্ষিত হয় না। ষাটের কবিকুল, সে সময়ে যার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রফিক আজাদ, নিরন্তর পরিশীলনের মাধ্যমে সাহিত্যকে নান্দনিক শুদ্ধতা দেবার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন, আর সেটা করেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। প্রথমে এ কবিরা প্রকাশ করলেন ‘বক্তব্য’ নামে একটা লিটল ম্যাগাজিন, পরে ‘দ্য স্যাড জেনারেশন’ নামে সূচনা ঘটালেন একটা সাহিত্য আন্দোলনের। স্যাড জেনারেশন মূলত আবর্তিত হয়েছিল রফিক আজাদের নেতৃত্বে। স্যাড জেনারেশন প্রকাশ করেছিল একটা দ্বিভাষিক (ইংরেজি-বাংলা) বুলেটিন। প্রথম সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় ছিল রফিক আজাদের ইংরেজিতে লেখা ইশতেহারÑ ‘দ্য স্যাড জেনারেশন’, শেষ পৃষ্ঠায় প্রশান্ত ঘোষালের ‘চম্পাবতী : আ ক্যাথারসিস অব পেন্ট আপ প্যাশনস’।

ওই বুলেটিনে রফিক আজাদের লেখাটির বিচ্ছিন্ন কিছু অংশ ছিল এ রকম : We are poising us consciously. We are bearing dynamites in our blood. We have no other alternative except SELF-DESTRUCTION. এই ছিল সে সময়ের নতুন অবক্ষয়ী চেতনার মূল কথা। রিরংসার উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা আর যৌনশুচিতা ভেঙে ফেলার প্রবণতা থেকেই ষাটের কবিদের কবিতায় ঘটেছিল দ্রোহের সূচনা, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেদিনের ছোট্ট মফস্বল শহর নেত্রকোণা থেকে উঠে আসা কৈশোর-উত্তীর্ণ যুবক রফিক আজাদ, যিনি নিজেকে প্রায়ই কোনো এক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রান্তিক মানুষ বলে উল্লেখ করতেন।

কবিজীবনের প্রাথমিক পর্বে যে-অবক্ষয়ের ঘোষণা শোনা গিয়েছিল তাঁর কণ্ঠে, পরবর্তী কালে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবার পর তা থেকে সরে এসেছিলেন তিনি। বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ ব্রাত্য নিম্নবর্গীয় প্রান্তিক জনমানুষের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। একই সঙ্গে ছিলেন তীব্র অহম আর আত্মসচেতন একজন লেখক। বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্য পঠনপাঠনের সূত্রে এভাবেই তিনি সমকালের দৈশিক ও বৈশ্বিক ভাবধারায় প্রাণিত হতে পেরেছিলেন সহজেই। সমকালীন বিশ্ব, বাংলাদেশ রাষ্ট্র আর এ সমাজের পচন, অবক্ষয় তাকে যেমন ক্ষুব্ধ-তাড়িত-বেদনাহত করত, তেমন জীবন ইতিবাচকভাবে দেখার দৃষ্টিও অর্জন করেছিলেন তিনি।

শঙ্খ ঘোষই একবার বলেছিলেন, আধুনিকতার দুটি অভিমুখ আছে। এর একটা দিক অবক্ষয় ও নেতির দিকে ফেরানো, অন্য দিকটি হলো ইতিবাচক। রফিক আজাদও সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থায় ও বিশ্বে তিনি যে ক্লেদ ও কলুষতার মুখোমুখি হয়েছিলেন, দ্রোহটা ছিল সে-সবের বিরুদ্ধে। কিন্তু তাঁর তীব্র মমত্ববোধ ছিল মানুষের প্রতি। মানুষ তাই রফিক আজাদের কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। তাঁর কবিতার আরেকটি বহুচর্চিত বিষয় হচ্ছে প্রেম। এ প্রেমও আবার এমনভাবে তাঁর গভীর অস্তিত্ববোধের উচ্চারণ হয়ে উঠেছে যে, ওই কবিতাগুলোকে মানবিকতারই আত্মঘোষণা বলে শনাক্ত করা যায় সহজেই।

মানবিকতার এই যে কথাগুলো এখানে বলা হলো, এরই প্রেক্ষাপটে সহজেই আরেকটি প্রশ্ন পাঠকের মনে ঘনিয়ে উঠতে পারে। আর তা হলো, কীভাবে কবি এ মানবিকতা উদ্‌যাপন করবেন তাঁর কবিতায়? একটা দিক তো ছিল মানুষের উল্লেখ আর প্রেমে বিজড়িত অনুভূতির প্রগাঢ় উপস্থাপন। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা দেখি ঐতিহ্যে, বিশেষ করে ব্যক্তিমানুষের শেকড় উপলব্ধির আত্ম-অভিযানের পর্ব। রফিক আজাদ এভাবে ফিরে গেছেন চুনিয়ার কাছে, চুনিয়া আমার আর্কেডিয়াÑ এ উচ্চারণ তাই খুব সহজেই উঠে আসে তাঁর কবিতায়। আসলে মানবিক প্রতিটি অনুষঙ্গ, যা সমকালকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছে, হতে পারে তা রাজনৈতিক, সামাজিক, বৈশ্বিক এবং একেবারেই ব্যক্তিক, রফিক আজাদের কবিতায় আছে সেসব বিষয়াশয়ের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুকম্পন। তবে বিষয়ই তো কবিতা নয়, কবিতা হয়ে ওঠার শর্ত পূরণ না করলে তা কখনই কবিতা পদবাচ্য হয় না। রফিক আজাদের কবিতাবলি কবিতা হয়ে ওঠার যাবতীয় শর্ত পূরণ করে এভাবেই পাঠকনন্দিত হতে পেরেছিল। ছন্দে তিনি ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী ও সচেতন। উপমা উৎপ্রেক্ষা বা চিত্রকল্প নির্মাণেও অভিনিবিষ্ট, তবে প্রথানুগ পথেই প্রবর্তনা ছিল তাঁর। বাংলা কবিতার ঐতিহ্যবাহিত পথেই উৎকর্ষের শীর্ষে পৌঁছে ছিলেন। 

সব মিলিয়ে এই হচ্ছেন ব্যক্তি রফিক আজাদ আর এই হচ্ছে তাঁর কবিতাপাঠের পটভূমি। তীব্র অনুভূতিপ্রবণ সংবেদনশীল এ কবি, সহজেই বোঝা যায়, সমকালের নানা ঘটনার দ্বারা যে আন্দোলিত হবেন, সন্তের মতো তাঁর কবিতা যে হয়ে উঠবে মানবতার সংহত, সুন্দর বাণীরূপ, সে কথা বলাই বাহুল্য।

তিরিশের দশকে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার সূচনা ঘটে, ষাটের দশকে বাঁক পরিবর্তনের মুহূর্তে সে কবিতা হয়ে ওঠে অনেকটাই আত্মজৈবনিক, স্বীকারোক্তিমূলক। অর্থাৎ, কবিরা এ সময়ে পরিপার্শ্বের দ্বারা আত্মগতভাবে আন্দোলিত হয়েছেন, দূরের দর্শক হিসেবে কবিতা রচনা করেননি। ঘটনার কেন্দ্রে নিজেকে স্থাপন করে ঘটনার অভিঘাতগুলো কবিতার শব্দ-প্রতীকে ধারণ করেছেন। নিজেই হয়ে উঠেছেন কবিতার বিষয়াশয়। ষাটের দশকে এই যে আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার আবির্ভাব ঘটল, পশ্চিমে যাকে বলা হচ্ছিল কনফেশনাল পোয়েট্রি, সে ধরনের কবিতা রচনায় রফিক আজাদেরও ভূমিকা ছিল এই বঙ্গে, এই বাংলাদেশে। ফলে তাঁর কবিতা ব্যক্তিগত হয়েও সমকালের কথা বলে, ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে সর্বজনীন। দেশের মানুষের কথা হয়ে ওঠে বিশ্বমানবের কথা।

কবির কাজ শুধু সরলভাবে যা অনুভব করছেন তার বিবরণ দেওয়া নয়, তাঁর বলবার ভঙ্গিটিও নিজস্ব হওয়া চাই। কবির ভাষা, যতদূর সম্ভব, নিজের হওয়া দরকার। রফিক আজাদ তাঁর কবিতায় এ আত্মমুদ্রা খচিত করে দিয়েছিলেন। তাঁর কবিতার পঠনপাঠন সূত্রেই বোঝা যায়, এ ভাষা বা প্রকাশভঙ্গিটা রফিক আজাদেরই। খুব যে অভিনব, নতুন, তা নয়; বরং তিনি তিরিশেরই অনুবর্তীÑ মান্যও করতেন সে কথা। খুব সহজেই তাঁর কবিতার যে বৈশিষ্ট্য আমার চোখে পড়েছে তা হলো এক ধরনের ক্লাসিক্যাল দার্ঢ্য। নিজেই একে বলতেন ‘পদ্যপ্রবন্ধ’, অর্থাৎ তাঁর কবিতায় এক ধরনের সূচনা আছে, আছে মধ্যপর্ব এবং উপসংহার।

আমাদের চারপাশের চলমান বিষয়াশয়ই তাঁর কবিতার বিষয়াশয়। কিন্তু যেখানে তিনি অনন্য এবং নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য, সেটা হচ্ছে তাঁর তীব্র মানবিক বোধ। খুব সহজেই তাঁর কবিতার শ্রেণিবিন্যাস করা যায় এইভাবেÑ প্রেমের কবিতা, আত্মানুভবের কবিতা, দেশের কবিতা, ঘটনালিপ্ত কবিতা; কিন্তু সব ধরনের কবিতাতেই তাঁর হৃদয়ানুভূতির যে অনুকম্পন আমরা লক্ষ করি, সে অনুভববেদ্যতার কারণেই তাঁর কবিতা অন্যদের তুলনায় হয়ে উঠেছে অনন্য। প্রকরণে চমক না থাকা সত্ত্বেও তাই তাঁর কবিতা আমাদের ভাবায়, প্রাণিত করে, তাড়িত করে। একজন রফিক আজাদের কথা হয়ে ওঠে অনেকের কথা, কবি-মহামানবের কথা।

কবি কে? কী তার ভূমিকা? কীভাবে তিনি চারপাশের দেখা পরিপার্শ্ব আত্মানুভবের সঙ্গে সমীকৃত করেন? প্রথম কবিতাগ্রন্থেই ‘কবি’ শিরোনামে যে কবিতাটি লিখেছিলেন রফিক আজাদ, তাতেই আছে কবির কথা : ‘আনন্দিত পাপে অধঃপাতে যায় রূপসী শব্দের যাদুকর।’

কিন্তু কী ভূমিকা হবে কবির? শিল্পী হিসেবে কবিতাই লিখবেন তিনি। কিন্তু স্বপ্নকল্পলোকে তিনি কৃষক, চাষা, এ রকমই ভেবেছেন রফিক আজাদ। তিনি নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘বহিরঙ্গে নাগরিকÑ অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক।’

রফিক আজাদের ভাবনার গতিমুখ আবার আত্মভাবনা থেকে ঘুরে যায় মানুষের দিকে। তাঁর মনে হয়, ‘মানুষ বড় ভয়াবহ প্রাণী।’ তাঁর অসংখ্য কবিতায় দেশবন্দনাও আছে। তিনি তাঁর অতৃপ্ত আত্মা সমর্পণ করেন প্রেমে। প্রেমই মুক্তি দেয় তাকে। প্রেম আসলে নির্বিশেষ বিমূর্ত ধারণা। প্রেম আকার পায় পাত্রপাত্রীর সম্পর্কের সূত্রে। কবি জীবনাভিজ্ঞতা থেকে আহরণ করেন প্রেমের উপকরণ। প্রেম যেহেতু মানব-মানবীর আধারেই মূর্ত হয়, ফলে কল্পিত হোক, কিংবা বাস্তবের কোনো নারী, যদি কবি হন পুরুষ, তাহলে ভালোবাসার সঙ্গে বিজড়িত যে মানবিক বোধ, সে বোধে কবিরা উদ্দীপ্ত বোধ করেন। বাস্তবের প্রেমানুষঙ্গ ছাড়িয়ে তা হয়ে ওঠে সর্বমানবিক। প্রতিদিনের জীবনযাপন ছাড়িয়ে প্রেম এভাবেই ঊর্ধ্বায়িত কোনো সত্তায় সংহত হয়। রফিক আজাদ, প্রখরভাবেই সমাজসচেতন কবি। একদিকে তিনি সহানুভূতির চোখে তাকিয়েছেন বিপন্ন মানুষের দিকে, আরেক দিকে যারা মানুষের জীবন বিপন্ন করে, তাদের নির্মমভাবে সমালোচনা করেছেন। তাঁর প্রেমের কবিতার মধ্যে তাই লক্ষ করা যাবে মানবিক বোধের উৎসার। কবির সবটুকু অপেক্ষা প্রেমিকার জন্য : ‘অস্তিত্বের দূরতম দ্বীপে এই দুঃসহ নির্জনে/কেবল তোমার জন্যে ব’সে আছি উন্মুখ আগ্রহে।’ প্রথম দিকে এই ছিল তাঁর সামান্য আকুতি। কিন্তু পরে তিনি আসঙ্গলিপ্সু হয়ে বলেছেন, ‘শরীর ও আত্মাসহ তোমাকেই কাছে পেতে চাই।’

প্রেম যৌনতা ও রিরংসার দিকে ঝুঁকে পড়ছেন তিনি সহজেই : ‘ঊরু ও জঙ্ঘাতে/নারীর প্রতীক-দেহে বাস্তবিক নেই কোনো সিঁড়ি।’ প্রথম দিকে প্রেমের যে নম্র নিবেদন ছিল তাঁর উচ্চারণে, ধীরে ধীরে তা যৌন অনুষঙ্গে উন্মুক্ত হয়ে যায়। কখনও কখনও তাঁর উচ্চারণকে মনে হয় পুরুষতান্ত্রিক : ‘আমাতে তেমন আস্থা স্থাপনেই তোমার উদ্ধার।’ পুরুষই উদ্ধারকর্তা, যেভাবে এ ভাবটি উচ্চারিত হলো এ কবিতায়, তাতে বোঝা যায় প্রেমেও পুরুষের আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত ছিলেন না রফিক আজাদ। রফিক আজাদের কবিতার মানবিক বোধ শুধু নারীর প্রেমে নয়, তাঁর নির্ভেজাল ক্রোধেও প্রকাশ পেয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্পর্কে তাঁর ছিল তীব্র বিবমিষা। এরাই পরান্নভোজী, সত্যিকার বিশ্বাসঘাতক। তাই ‘কেন লিখি’Ñ এ আত্মপ্রশ্নের জবাব দেন এভাবে : ‘কেন লিখি?Ñ নির্বিবেক মধ্যবিত্ত পাঠকের পরম্পরাময়/মাংসল পাছায় খুব কষে লাথি-মারা সম্ভব হয় না বলে/লাথির বিকল্পে লেখা।’ এর পরই প্রচণ্ড ঘৃণা আর ক্রোধের সঙ্গে উচ্চারণ করেন, ‘মানুষ’ শব্দটি লিখে আমি তাতে মুতে দিতে চাই। একদিন নারী ছিল উদ্দীপনার উৎস, সেই নারী আর সংসারকে ঘিরে কবিজীবনের অন্তিম পর্বে রফিক আজাদের ভাবনায় জেঁকে বসেছে নিদারুণ হতাশা : ‘কী পুড়ছে এখানে, রফিক?/Ñ কেন, আমার হৃদয়।’ জীবনান্তিকে তাই মনে হয়, ‘বিচ্ছেদ যে নরক-যন্ত্রণা, অনন্তেরÑ/সেটিই তোমার প্রাপ্য নয় কি, রফিক?’ এর পরই শেষ কাব্যগ্রন্থে তিনি নিজেকে নিয়তির কাছে সমর্পণ করেন এভাবে : ‘অনেক হয়েছে প্রভু, আর নয়, আর কেন এই/ছিন্নভিন্ন খিন্ন ঘৃণ্য জীবনের দড়া টেনে যাওয়াÑ/অবসান করো এই তুচ্ছ ম্লেচ্ছ দেহটি আমার!’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা