পাপড়ি রহমান
প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:১৯ এএম
আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১১:৪৬ এএম
প্রচ্ছদ : কাইয়ুম চৌধুরী
অষ্টাদশ বৎসর অতিক্রমণ কালে নিউমার্কেটে একটা পোস্টারে আটকে ছিলাম। ওই যে আজিমপুর যাওয়ার দিকে নিউমার্কেটের যে গেট, গেটের সামনে রাজ্যির ফলপাকুড়, আমলকী, আমসত্ত্ব, বেতফলের ঝোপা। আর ছোট্ট দুইখানা বইয়ের দোকান।
দোকানের
রশিতে ঝুলন্ত পোস্টার। আমাদের বিনোদন বলতে তো ওই পোস্টার, ভিউকার্ড, সংগীত আর
গোগ্রাসে বই পড়া। নায়িকা রেখার সিডাকটিভ ছবি। নাগিন শ্রীদেবী। শ্যামল পদ্মিনী
কোলাপুরী। অ্যারিস্টোক্রেট সুবর্ণা মুস্তাফা, অঞ্জনা, নূতন বা সেক্সবম্ব অলিভিয়ার
দেহবল্লরি। আন্তর্জাতিক ববিতা। জনগণের শাবানা। টিডিকে
ক্যাসেটের ফিতায় ১২০ বা ১৮০ মিনিটে ‘বেদনা মধুর হয়ে যায়, তুমি যদি দাও’। কিংবা
‘তুমি আজ কতদূরে, আঁখির আড়ালে চলে গেছ, তবু রয়েছ হৃদয় জুড়ে’ । বাপ্পী লাহিড়ীর
‘আমার খবর আজ রাখো কি না রাখো কে জানে? আমারই এ পথ আজো চেয়ে
থাকো কি না থাকো কে জানে?’ হাতিসড়কের ‘গীতালি’ আর ‘গানের ডালি’। বড় রেজিস্টার খাতা
খুলে গান বাছাই করে লিস্টি করা। কিন্তু একটা পোস্টারে আমি আটকে গেলাম... একজোড়া
মানবমানবী ত্রস্ত পায়ে কোথায় যেন ছুটে যাচ্ছে। মানবীর পরনে শ্বেত-স্বচ্ছ শাড়ি। হয়তো ভেজা, নয়তো নয়। কিন্তু দেহের বিভঙ্গ বড় স্পষ্ট।
ম্লানমুখ, পৃথিবীর সমস্ত রাঙা রাজকন্যার মুখ ম্লানই হয়। হয় নাকি? ওরা কই বা
কেন যাচ্ছে সেসবের কিচ্ছু আভাস-ইঙ্গিত নাই। তবে ওদের পা জোড়া খালি। জুতা বা স্যান্ডেলে
ঢাকা পড়ে নাই দেবীপ্রতিম পদযুগল। ছুটছে ওরা। নির্দিষ্ট গন্তব্যে বা গন্তব্যহীন কোনো
পথে। ছেলেটি শক্ত করে বাঁ হাতে ধরে রেখেছে মেয়েটির ডান হাত। ত্রস্ত ও ম্লানমুখের রাজকন্যা
ওতেই হয়তো ভরসা করেছে। আমি ওইরকম দীপ্ত পদক্ষেপের যুগল আর কোথাও দেখি নাই এ জীবনে।
বহুকাল পর টাইটানিকের যুগে যেন ওই মেয়েটির অবয়ব দেখলাম বিদ্যুৎ চমকের মতোÑ কেট উইন্সলেট।
আমি ওকে রোজ বলেই জানি।
পোস্টারের সেই শুভ্র বসনাকে বিস্মৃত হওয়া গেল না। এবং তার ম্লানমুখ।
‘পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চ’লে গেছে রূপ নিয়ে দূরে,
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!’
কিন্তু উপায় তো নেই হে!
যত দূরে, দূরে, দূরে যাবে বন্ধু/একই যন্ত্রণা পাবে, একই ব্যথা ডেকে যাবে/নেভা নেভা আলো যতবার জ্বালো/ঝোড়ো হাওয়া লেগে তার শিখা নিভে যাবে।/কিছু কিছু কথা আছে যার মানে,/বুঝি নি এখনো তবু সন্ধানে/কাটে সকাল বিকেল/যেন নেহাত-ই স্বভাবে/এবং ইহাই চিরকালীন, অমর প্রেমের সারস্বত। ইহাই, বেদনা মধুর হয়ে যায়, তুমি যদি দাও…
Love is an untamed force. When we try to control it, it destroys us. When we try to imprison it, it enslaves us. When we try to understand it, it leaves us feeling lost and confused. – Paulo Coelho
প্রেম কী বা কাহাকে বলে? প্রেম হইলো শরীর, শরীর, শরীর!
তোমার কি মন নাই, কুসুম?
যদি প্রেম শরীরই হয়, তাহলে মানিক বাড়ুজ্যে কেন যে মন খুঁজে বেড়ান?
মন কী? মস্তিষ্ক। তোমার চিন্তাভাবনায় আছড়ে পড়ে যে অনঙ্গ রূপের ঢেউ, উহাই প্রেম। উহাই প্রণয়। প্রেমের উলটা পিঠেই লেপ্টে থাকে ভালোবাসা। একেবারে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
আমাদের যৌবনে ‘প্রেম’ উচ্চারণে ভারি কুণ্ঠিত হতাম। আমার প্রথম প্রেমিক বলেছিল, কেমন সস্তা আর বস্তি বস্তি শোনায় এই প্রেম শব্দটা, তাই না! (আমাদের কিশোরকাল তখন, আমরা তখনও কমিউনিজম শিখিনি। তাই ভেদাভেদে মুখর ছিলাম। ক্ষমা করবেন প্রিয় পাঠকসমাজ)
আর আমি বলি কি… প্রেম হলো তোমাতে আমার মুগ্ধতা যেন কোনোকালেই শেষ না হয়।
কে যেন বলেছিল? সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘শবনম’। নাকি আমার দ্বিতীয় প্রেমিক? ওই যে ছিল মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্র। একদম গোলমেলে করে ফেলেছি। আদতে আমার দ্বিতীয় প্রেমিক ‘শবনম’ থেকেই ধার নিয়ে বলেছিল। কী করা? ধারদেনাতেই চলছে এ দুনিয়া। কপিপেস্টের যুগে কে অত মগজ খাটায় হে? সো কপি এবং পেস্ট চালাও দেদার। যেমন চলে প্রেমের গাড়ির গতি ইদানীং। মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপের বাড়িঘর কপি আর পেস্টেই জব্বর জমে আছে। হে পাঠক! বেভুলো হয়ে ভেবে বসবেন না যেন, আমি ‘জব্বরের বলিখেলা’র খেলা’র কথা বলছি!
‘বলিতে’ প্রেম ধরা দেয় না কখনও যতটা ‘বালিতে’ ধরতে পারবেন। বালি… ঝুরঝুরিয়ে ঝরে পড়বে জেনেও ধরা দেবে প্রেম।
বলি, খুন, হত্যা, জখম, ভাঙচুরের অবশেষ কী?
অস্ট্রেলিয়ায় বুমেরাং নামক এক ধরনের কাঠের অস্ত্র আছে; যা বাতাস কেটে কেটে ফিরে এসে আপনাকেই আঘাত হানতে পারে।
Once I filled my hand with mist.
Then I opened it and lo, the mist was a worm.
And I closed and opened my hand again, and behold there was a bird.
And again I closed and opened my hand, and in its hollow stood a man with a sad
face, turned upward.
And again I closed my hand, and when I opened it there was naught but mist.
But I heard a song of exceeding sweetness. (Kahlil Gibran)
বসন্তের প্রথম দিনটিতেও ঘিরে থাকা কুয়াশায় আপনি বা আমি ঠিকই টের পাই, একদা আমাদের ভুবনে শীত ঋতু ছিল। আমাদের ত্বক মলিন ও বুড়োটে করে দিয়ে সে যাই যাই করছে। কিন্তু আজ অবধি চলে যায় নাই। চলে গেলেও ফের সে ফিরে আসবে। নববসন্তে এমন মহাসমারোহে ফুল্লকুসুম হৃদয়ের পাপড়ি মেলিতে চাহিতেছেন, উহাও ম্লান হইল বইল্যা। কারণ, ঋতুর ধর্মই হইল বদল হওয়া। একবার ভাবুন তো, এ বদলটুকু না ঘটিলে কীরকম মনোটোনিক হয়ে উঠত এ বিপুলা ধরা! আমাদের সাধের জীবনখানি?
বাঙালির প্রণয় মানেই আমি বুঝি ফাল্গুন। কোনো এক ফাল্গুনেই আমরা পেয়েছিলাম বাংলা ভাষার কথা কহিবার অধিকার। গ্যান্দাফুলের ভেষজ-সুঘ্রাণে আমরা গেয়ে উঠেছিলাম…
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?
যারা প্রেমের জন্য আঁকুপাঁকু করছেন, প্রেমে পড়ার জন্য মরার ভান করে পড়ে আছেন, তারা নিশ্চয়ই জানেন, বড় প্রেমের ধর্মাধর্ম কী?
‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়’।
শচীনকর্তা কি আর খামাখাই ঝিমঝিমানো গলায় মদিরা ছড়িয়ে গেয়ে গেছেন…
বিরহ বড় ভালো লাগে/বিরহের সোহাগিনী রহে মনের ঘরেতে/দাহিকা-রূপেতে বঁধু এ পরাণ মাঝে/নিতুই গাহে, নিতুই নাচে নব নব সাজে/বিচ্ছেদ হবে এত মধুর, জানিতাম না আগেতে/বিরহ বড় ভালো লাগে/বেদনা সাজায় মোরে গেরুয়া রঙ দিয়ে/সে রঙেরে ছোপাই আমি বাসন্তি রঙ দিয়ে/ব্যথার শাসন নাহি মানি, রাঙাই ব্যথা রঙেতে/বিরহ বড় ভালো লাগে/
এবং এজন্যই বুঝি বসন্তের আগমন ঘটে? বিরহকে ভালো লাগার জন্য। আর এত যে রঙÑ গেরুয়া, হলদেটে, বাসন্তী সবই আমার বা আপনার অন্তর্দাহ আড়াল করার জন্য নিছক ছল মাত্র। দখিন হাওয়ায় হলুদাভ-আঁচল উড়িয়ে যাওয়া তরুণীটির লেপ্টে যাওয়া চোখের কাজলেও রয়েছে বিরহের চিহ্ন। বা যে তরুণ হেঁটে যাচ্ছে আনমনা, তার হৃদয়েও আছে বিরহের বিরাট ক্ষতচিহ্ন।
জানি, তরুণতুর্কিরা এখনই তেড়েমেরে আসবেন। বলবেন, হুহ, আইছে উনি জ্ঞান দিতে! যত্তসব আজাইরা প্যাঁচাল!
আরে বারণ তো নাই কোনো কিছুতেই। ভাই ও বহিনেরা, আপনারা ভালোবাসুন। মনপ্রাণ উজাড় করেই ভালোবাসুন। জীবন তো একটাই। ফুরিয়ে যাওয়ার আগে দিল্লি ঘুরে লাড্ডু খেয়ে আসুন। অতঃপর যা-ই ঘটুক সেজন্য তৈরি থাকুন। আমি শুধু ইহাই বলতে চাই।
শুধু খেয়াল রাখুন, যে আপনাকে সহি ভালোবাসে, সে মানুষটি যেন অপমানিত না হয়। যেন বেদনার্ত না হয়। যেন যে অপমানে মরোমরো না হয়ে ওঠে। যদি সেটা ঘটেই যায়, আপনার খেয়াল বা বেখেয়ালে, তাহলে ইয়াদ রাইখেন… বুমেরাং!
ইহা একটি মারাত্মক অস্ত্র!
বাতাস কেটে কেটে ঠিকই একদিন ফেরে আপনার দিকেই।
দেখুন, একটা ছোট্ট পাখিও কত স্বাধীন! কী মহানন্দে কাটায় সে তার জীবন!
এ ডালে ও ডালে গিয়ে বিশ্রাম নেয়। পুচ্ছ নাচায়। এদিক-ওদিক তাকায় ত্রস্ত নয়নে।
শিকারির গুলি ছুটে আসছে কি না তাকে লক্ষ করে? অতঃপর আছে তার গৃহ। আছে উড়িবার বিশাল আকাশ। আছে আনন্দ অবিরাম।
মানুষকে নিজের স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে দিন। কীসের জন্য এত জোরজুলুম আর দখল? মানুষের কাছে গিয়ে চুপটি করে বসুন। শুনুন, কী কথা আছে তাহার? কোন সে কথা নাকি অযুতনিযুত ব্যথা?
জানি, আপনাদের মনে পড়ে যাচ্ছে… কী কথা তাহার সাথে? Ñ তার সাথে?
সুরঞ্জনা, ঐখানে যেয়োনাকো তুমি,
বোলোনাকো কথা অই যুবকের সাথে;
ফিরে এসো সুরঞ্জনা:
নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
এত কীসের দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব? ঝটপট বলে দিন…
For God's sake,
Hold your tongue
And let me love...
দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর,/ভালোবাসিরে দে
আমারে অবসর!
বিলম্ব ঘটালে ম্লান হয়ে যেতে পারে কোনো রাঙা রাজকন্যার মুখ। কিংবা রাজপুত্রের বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা রাঙা রঙটি বিবর্ণ হয়ে যেতে পারে। তাই ছুট লাগান। জান বাজি রেখে দৌড় দিন। কারণ,
মধুর বসন্ত এসেছে, মধুর মিলন ঘটাতে/আমাদের মধুর মিলন ঘটাতে/মধুর বসন্ত এসেছে/মধুর মলয় সমীরে মধুর মিলন রটাতে...!
আকথাকুকথা যদি কিছু রটেই যায়, ক্ষতি কী এমন তাতে?
ভালোবাসিবার অধিকার কিন্তু আপনার। একান্ত আপনারই…