× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইতিহাসের পোকা

শওকত আলী

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:১৫ পিএম

ইতিহাসের পোকা

তেভাগা আন্দোলনের বন্দি আদিবাসী ও পলিয়াদের সাথে মিশে ও কথাবার্তা বলে আমার মধ্যে ইতিহাসের পোকাটা ভালোভাবে ঢুকে গেল। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নৃ-তত্ত্ব এসব বিষয় আমার মধ্যে ভালোভাবে কাজ করতে থাকল। আমি জেল থেকে ছাড়া পেলাম ঠিকই, কিন্তু এসবের পোকা আমার মাথার ভেতর কিলবিল করতে থাকল।

তাদের অনেকেই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন কিছুদিন পরই। তারা কেউ আমার সাথে সাক্ষাৎ করত, কেউ ছাড়া পেয়েছে এরকম খবর শুনলে আমি গিয়ে তাদের সাথে দেখা করতাম। এভাবে আমি তাদের মধ্যে বেশ পরিচিত হয়ে উঠি। তাদের কৃষক আন্দোলনে আমি বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতে থাকি। পরিচিত ও শুভানুধ্যায়ীদের থেকে অর্থ সংগ্রহ করে দিতাম।

আমার বাবা তেভাগার আন্দোলনে সরাসরি জড়িত না থাকলেও তিনি তাদের নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তাদের কোনো রোগী বাবার কাছে নিয়ে এলে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করে দিতেন, কখনো নিজে রোগীর বাড়িতে ছুটে যেতেন। শুনেছি বাবা তাদের বেশ কিছু চাঁদাও সংগ্রহ করে দিয়েছিলেন। তখনকার দিনে যা প্রায় নয়শ' টাকা।

’৫৫ সালে বিএ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়ে একটা ঝামেলায় পড়ে গেলাম। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে একটা নিয়ম ছিলÑযে বিষয়ে ভর্তি হতে ইচ্ছুক, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীর ২০০ নম্বর থাকতে হবে। আমি ৯ মাস জেল খেটে এসে বিএ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছিলাম। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য যে নম্বর পাওয়ার কথা সে নম্বর পাইনি। আমি ভর্তি হতে এসে ভর্তি হতে না পেরে মন খারাপ হলো। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন নামকরা শিক্ষক আবদুল হাই। তিনি আমার বিএ’র থার্ড ক্লাসের সার্টিফিকেট দেখে আমাকে সরাসরি না করে দিলেন। এক সময় আমি মন খারাপ করে বের হয়ে ফিরে আসছিলাম; এমন সময় দেখা হয়ে গেল অধ্যাপক গোবিন্দ্র চন্দ্র দেব আর মুনীর চৌধুরীর সাথে। মনমরা দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? তখন আমি তাঁদের সব বলি। সব শুনে গোবিন্দ চন্দ্র দেব মুনির চৌধুরীকে বললেন, এমন একটা ভালো ছেলে, গল্প-কবিতাও লেখে আর আবদুল হাই সাহেব তাকে না করে দিলেন! তখন মুনীর চৌধুরী বললেন, কোথায় কোথায় তোমার গল্প-কবিতা ছাপা হয়েছে? আমি বললাম ‘নতুন সাহিত্য’ পত্রিকায়। আমার কথা শুনে তারা দুজন নিয়ে গেলেন আমাকে অধ্যাপক আবদুল হাইয়ের কাছে। অবশেষে অধ্যাপক হাই আমাকে ভর্তি করে নিলেন।

এমএ পড়ার সময় আমি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গল্প, কবিতা লিখতাম। তখন আমার সঙ্গে পরিচয় হয় কবি হাসান হাফিজুর রহমান, সিকান্‌দার আবু জাফরসহ আরো বেশ কয়েকজনের সাথে। তারা আমাকে লেখালেখিতে উৎসাহ জোগাতেন। এমএ ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে আমি আবার দিনাজপুর চলে যাই।

দিনাজপুরে কৃষক আন্দোলনের সাথে জড়িত বহু লোকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তারা আমাকে ডেকে নিয়ে একটি হাই স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে নিয়োগের ব্যবস্থা করে দিলেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, তাই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বটা আমাকেই পালন করতে হয়েছিল। সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে আমাকে বেতন দেয়া হতো ৪০০ টাকা আর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের জন্য দেয়া হতো আরো ২০০ টাকা। মোট ৬০০ টাকা বেতন দেওয়া হতো। সেই স্কুলটার নাম ছিল বীরগঞ্জ হাইস্কুল।

এখানে একটি ঘটনা বলতে ভুলে গেলাম। আমি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বিএ ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারব কি না জানতে একদিন দিনাজপুর কলেজের প্রিন্সিপাল স্যারের বাসায় গেলাম। তখন সন্ধ্যা হয়নি। শেষ বেলার আলো স্যারের ওপর পড়ায় কেমন যেন সুন্দর লাগছিল। স্যারের বাসার সামনে, বামে-ডানে কতগুলো ফলগাছ ছিল। হঠাৎ দেখি একটি গাছে অনেক ফল ঝুলে রয়েছে, দেখতে আমের মতো। আমার পায়চারি দেখে স্যার বের হয়ে এলেন এবং আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কখন ছাড়া পেলাম বা কেন এলাম। হাতের ভেতর ফলটি তিনি দেখতে পেলেন। আমার কাছে কেমন যেন লজ্জা লাগছিল না বলে ফল ছিঁড়ে ফেলার জন্যে। যা হোক, স্যার আমার কথা শুনলেন এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বললেন। আসার সময় জানালেন, আমার হাতের ফলটা কিনা বিশেষ এক জাতের আম, মালদহ থেকে গাছটার বীজ এনে লাগানো হয়েছিল। কারণ এ-জাতীয় আম মালদহের দিকেই পাওয়া যায়। আশ্বিন-কার্তিক মাসে এ জাতের আম গাছে মুকুল ধরে। তারপর তিনি বললেন, তুমি গাছে উঠতে পার? আমি বললাম, হ্যাঁ, পারি স্যার। তারপর আমাকে গাছে উঠে ছয়-সাতটা আম পাড়তে বললেন। গাছটা খুব বেশি বড় ছিল না। আমি বড় দেখে আট-নয়টি আম পাড়লাম। তিনি দুটি আম রাখলেন, বাকি আমগুলো আমাকে দিয়ে দিলেন। ঘর থেকে একটা ঠোঙ্গাও এনে দিয়েছিলেন তিনি। অবশ্য আমার কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল আমগুলো আনতে। কিন্তু স্যারের পীড়াপীড়িতে আনতে বাধ্য হয়েছিলাম। এরকম মহান দয়ালু শিক্ষক এখন কয়জন আছেন?

যা হোক, আমি বীরগঞ্জ হাইস্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে আবার ঢাকায় এসে ঘোরাঘুরি করতে লাগলাম। বীরগঞ্জ হাইস্কুলের শিক্ষকতা ছেড়ে দেয়ার কারণ ছিলÑপুলিশ তখনো আমার পিছু ছাড়ছিল না। নানাভাবে খোঁজ-খবর নিচ্ছিল। পূর্ব বাংলা (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তানের অংশ হলেও পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ভূখণ্ডের দিক দিয়ে শুধু দূরেই ছিল নাÑসাংস্কৃতিক, ঐতিহ্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়েও ছিল আলাদা। যদিও মুসলমান জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে পূর্বাংশে বেশি ছিল। দেশভাগের আগের এক আদমশুমারীতে দেখা গেল পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ৫২ জন। আর মুসলমান জনসংখ্যার হিসাবকে সামনে রেখে মুসলিম লীগের নেতারা বলেছিলেন, পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের সাথে থাকবে অর্থাৎ ভারতের এই অংশ নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হবে। তখন গান্ধী বলেছিলেন, বাংলার মুসলমানরা জিন্নাহর এই দাবি সমর্থন করে না। গান্ধীর এই কথায় তখন রেফারেন্ডাম হলো; তাতে দেখা গেল পাকিস্তানের মুসলমানরা শতকরা ৬০ ভাগ আলাদা হতে চায়।

ছোটবেলা থেকেই আমি পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতাম। আমার চারপাশের মানুষদের কার্যকলাপ, কথাবার্তা ও চালচলন, পোশাক-আশাক, উৎসব, খাবার-দাবার সবকিছু লক্ষ্য করতাম। মনে মনে ভাবতাম, আমি মুসলমান হলেও শুধু ধর্মের কিছু বিষয় ছাড়া আর সবকিছুর সাথে আমার সঙ্গে হিন্দুদের যথেষ্ট মিল রয়েছে। তারাও বাঙালি, আমিও বাঙালি; আমাদের ভাষা এক। এই ব্যাপারটা আমার মনে তখন থেকেই একটা আবহ তৈরি করে দিয়েছিল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা