× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কাছের আশয় দূরের বিষয় : পুরান ঢাকার রূপান্তরের চিত্র

মুহিন তপু

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:০৩ পিএম

কাছের আশয় দূরের বিষয় : পুরান ঢাকার রূপান্তরের চিত্র

‘স্মৃতিচারণা যতই ব্যক্তিগত হোক, তা যখন নির্দিষ্ট সময় ও সংস্কৃতির প্রতিচিত্র হয়ে ওঠে, তখন সেটি কেবল এক ব্যক্তির গল্প থাকে না; বরং হয়ে ওঠে একটি যুগের ইতিহাস।’ অমিতাভ চক্রবর্তীর লেখা ‘কাছের আশয় দূরের বিষয়’ এমনই এক বই। এখানে উঠে এসেছে ষাটের দশকের পুরান ঢাকা, তার জীবনযাত্রা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, খেলাধুলা, খাবার, পোশাক, পরিবহন, তৈজসপত্রসহ সে সময়কার সমাজচিত্র। ১৯৫৩ সালে পুরান ঢাকার সিংটোলায় জন্ম এ লেখকের। বইবাড়ি বাংলাবাজার কাছে হওয়ায় এ মানুষটি শৈশব থেকে বইয়ের ঘ্রাণ নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। নিজে হয়েছেন একজন গ্রন্থপাগল। ব্যক্তিগত জীবনে এ মানুষটি শুধু সংগ্রহ করেছেন বই। তার আত্মস্মৃতি তো একটু ভিন্ন ধরনেরই হবে।

লেখক তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেননি, বরং পুরান ঢাকার সিংটোলা লেন, মোহিনী মোহন দাস লেন, ফরাসগঞ্জ, লক্ষ্মীবাজার, শাঁখারীবাজার, বাংলাবাজার, সদরঘাটসহ বিভিন্ন এলাকার ঐতিহ্য ও বিশেষত্বও তুলে ধরেছেন। বইটিতে ঢাকার গোড়াপত্তনের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। আনুমানিক ৭০০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার গোড়াপত্তন হলেও শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ১৬০৮ সালে। মুঘল শাসনামলে ঢাকা একটি সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে বিস্তৃতি লাভ করলেও ব্রিটিশ আমলে কাঠামোগতভাবে বিকশিত হয়। তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকা কীভাবে তার গৌরব একটু একটু হারাতে শুরু করে, লেখক কাছের আশয় দূরের বিষয় বইটিতে সেই বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরেছেন। প্রশাসনিক বৈষম্য ও নগর পরিকল্পনার অভাবে ঢাকা শহরের ঐতিহ্য কীভাবে বদলে গেছে, লেখক তা দেখিয়েছেন সে সময়কার স্মৃতিকথা, তথ্য-উপাত্ত ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে। পুরান ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে লেখকের বেড়ে ওঠার সময়ে ঢাকার স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও সমাজবোধের প্রতিফলন কী ছিল তা জানতে পারি বইটির মাধ্যমে। যারা ঢাকার ঐতিহ্য, পুরান ঢাকার সংস্কৃতি এবং ষাটের দশকের সামাজিক প্রেক্ষাপট জানতে চান, তাদের জন্য ‘কাছের আশয় দূরের বিষয়’ অবশ্যপাঠ্য একটি বই বলে আমার মনে হয়েছে। লেখক তৎকালীন পুরান ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলের স্মৃতিচারণা করেছেন তথ্য-উপাত্ত ও নিজের বাস্তবিক অভিজ্ঞতার আলোকে। সিংটোলা লেন ও মোহিনী মোহন দাস লেনের মহল্লাবাসীর সম্প্রীতি কেমন ছিল, ফরাসগঞ্জের ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আবাসস্থল, ব্যবসাবাণিজ্য, ফরাসি ও আর্মেনীয় বণিকদের প্রভাব, লক্ষ্মীবাজারের তখনকার ব্যবসা ও সংস্কৃতি হিন্দু-মুসলিম উভয়ের সহাবস্থান ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে লেখক তুলে ধরেছেন সে সময়কার সমাজবাস্তবতা। বইটি পড়ার সময় পাঠক লেখকের বর্ণনায় উঠে আসা শাঁখারীবাজারের ঐতিহ্য, শাঁখা ও সোনার গহনার কারিগরদের জীবনযাপনের চিত্র, কীর্তন, নাটক, পালাগানের আসরসহ তৎসময়ের শিল্পসংস্কৃতির চর্চার নানা দিক জানতে পারবেন।

পুরান ঢাকার খাবার এক স্বতন্ত্র ঐতিহ্য। লেখক তার স্মৃতিচারণায় বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন কিছু খাবারের নামÑ বাকরখানি, নিমকি, শিঙাড়া এগুলো তখনকার অন্যতম জনপ্রিয় নাশতা ছিল। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জন্য কম দামে খাবারের অন্যতম মাধ্যম ছিল পাইস হোটেল। মুড়িমাখা ও চায়ের কাপের সঙ্গে আড্ডা তখনও ছিল এখানকার মানুষজনের অনিবার্য অনুষঙ্গ।

কাছের আশয় দূরের বিষয় বইটিকে একদিকে যেমন স্মৃতিকথার বই বলা যায়, আবার বলা যায় মলাটবদ্ধ ষাটের দশকের পুরান ঢাকার একটি প্রমাণ্যচিত্র। ষাটের দশকের পুরান ঢাকা ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র। লেখক বইতে তখনকার সাহিত্যচর্চা, নাটক, গান ও সিনেমার প্রভাব তুলে ধরেছেন। পুরান ঢাকার অলিগলিতে বসত সাহিত্য আসর, যেখানে কবিতা, গল্প ও উপন্যাস নিয়ে আলোচনা চলত। জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ হতো। তখনকার থিয়েটার দলগুলোর মধ্যে ‘ঢাকা নাট্যচক্র’ এবং ‘নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়’ বেশ জনপ্রিয় ছিল। বইটি পাঠের মাধ্যমে জানতে পারি রূপমহল, বলাকা, গুলিস্তান সিনেমা হল, পুরান ঢাকার রেডিও এবং গ্রামোফোনের দোকান এবং সে সময়ের জনপ্রিয় শিল্পীদের গান সম্পর্কে। এ বইটির মাধ্যমে জানতে পারি ষাটের দশকে পুরান ঢাকার বিনোদনের মাধ্যম সম্পর্কে। গলি ক্রিকেট ও ফুটবল, লাটিম খেলা ও ঘুড়ি ওড়ানো, কবিগান, পুঁথিপাঠ ও বায়োস্কোপ সম্পর্কে। জানতে পারি কেমন ছিল সে সময়কার পরিবহনব্যবস্থা। সে সময় যোগাযোগের জন্য রিকশা ছিল প্রধান বাহন। রিকশার বডিতে শিল্পীদের চিত্র আঁকা থাকত। ট্রামলাইন ছিল, যা পরে উঠে যায়। ঘোড়ার গাড়ি ও গরুর গাড়ি ব্যবহার হতো বিয়ে বা উৎসবে।

বইটি পাঠের মাধ্যমে আরও জানতে পারি তখনকার পুরান ঢাকার পোশাক ও জীবনধারা সম্পর্কে। পুরুষের পোশাকের মধ্যে পাঞ্জাবি-পাজামা, ধুতি ও শার্ট-প্যান্ট। নারীর পোশাকের মধ্যে তাঁত, কাতান ও সিল্কের শাড়ির প্রচলন ছিল। বইতে উঠে এসেছে তখনকার দৈনন্দিন ব্যবহৃত তৈজসপত্রের কথা। যেমন পিতলের হাঁড়ি-পাতিল ও কাঁসার বাসন, মাটির কলসি ও কুঁজো (যাতে পানি রাখা হতো), তামার পাত্র ও কাঁসার থালা, হুঁকা ও কেরোসিন ল্যাম্প (যা আড্ডায় ব্যবহৃত হতো), রেডিও ও গ্রামোফোন (সংগীত শোনার মাধ্যম)।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে বইটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এ বইতে পুরান ঢাকার রূপান্তরের চিত্র উঠে এসেছে। ফলে আমার মনে হয়েছে সে সময়কার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবনধারার পরিবর্তন বুঝতে চাইলে এ বইটি সহায়ক হবে।

তথ্যবহুল উপস্থাপনা : বইটিতে খাবার, পোশাক, যানবাহন, তৈজসপত্রসহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনবাস্তবতার নানাবিধ বিষয়াশয় তথ্য-উপাত্তসহ বিশদ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। ফলে কেউ যদি পুরান ঢাকা সম্পর্কে জানতে চান এ বইটি অবশ্যপাঠ্য।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা