গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৭:৫৭ পিএম
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম রম্যরচয়িতা ও জীবনবোধের নানামুখী অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ একজন সাহিত্যিক ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী। বহুভাষাবিদ এ পণ্ডিত বিবিধ ভাষার শ্লোক ও রূপক ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। বাংলা সাহিত্যে বিশিষ্ট ‘রম্য’ লেখক হিসেবে সুপরিচিত তিনি। এসব পরিচয়ের বাইরে তিনি বাঙালি শিশু-কিশোরদের কাছে বেশি জনপ্রিয় ভ্রমণ কাহিনীর জনক হিসেবে। আফগানিস্তান, কাবুল, পাগমানের বরফাচ্ছাদিত শ্বেতশুভ্র পাহাড় কিংবা দূরদেশের খাদ্য-সংস্কৃতির নিরেট বর্ণনা সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো আর কেউই দিতে পারেননি।
এবার সৈয়দ মুজতবা আলীর ২০ জনকে লেখা ৩৭টি দুর্লভ অপ্রকাশিত চিঠি একত্র হলো এক সংকলনে। মুহিত হাসানের সংকলন ও সম্পাদনায় বইটিতে সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা ৩৭টি দুর্লভ অপ্রকাশিত চিঠি পাঠক পড়তে পারবেন।
বহু বিখ্যাত বাঙালি ব্যক্তিত্বকেই মুজতবা আলী নিজে নিয়মিত চিঠি লিখতেন, পৃথিবীর নানা প্রান্তে থাকা তার ভক্ত-পাঠককে পাঠানো চিঠির জবাবও পত্রাকারে দিতে কার্পণ্য করতেন না। মওলানা ভাসানী, আবু সয়ীদ আইয়ুব, কামরুদ্দীন আহমদ, আবদুল কাদির, পরিমল গোস্বামী, শামসুর রাহমান কি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো সুপরিচিত মানুষের কাছে লেখা তার চিঠি এ সংকলনে মিলবে। সঙ্গে আছে কিছু পারিবারিক চিঠিপত্র। স্পষ্টভাষী সুরসিক মুজতবা আলীর মানসজগৎ ও সাহিত্য-সমাজচিন্তা সম্পর্কে জানার জন্য এ চিঠিগুলো অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বলে বিবেচিত হবে। পাওয়া যাবে তার জীবনের কতিপয় অজানা কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায়ের সন্ধানও। সংকলিত পত্রগুচ্ছে রয়েছে ছোট বোন সৈয়দা জেবুন্নেসা খাতুনকে লেখা মুজতবা আলীর একটি সংক্ষিপ্ত চিঠি। অপ্রকাশিত এ চিঠিটি লেখা হয়েছিল ১৯৫১ সালে, মুজতবা তখন দিল্লির ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব কালচারাল রিলেশন্স’ বা আইসিসিআর-এ কর্মরত; ছোট বোনকে নিজের লেখা পড়ানোর আকুলতা থেকে ‘দেশ’ পত্রিকা পাঠানোর আয়োজনের প্রসঙ্গ ছাড়াও এ চিঠিতে নিজের দাম্পত্যজীবন নিয়ে মুজতবার সরস মন্তব্য নজর কাড়ে। এ চিঠিটি পাওয়া গেছে জেবুন্নেসার মেয়ে নুর রুখসার চৌধুরীর সৌজন্যে।
কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর পৌত্রী সুনন্দা বাগচীকে লেখা চারটি অপ্রকাশিত চিঠি আর অভিনেতা বিকাশ রায়ের পুত্রবধূ বীথি রায়কে লেখা একটি অপ্রকাশিত চিঠি পাওয়া গেছে যথাক্রমে ঈশিতা ভাদুড়ী ও সুমিত রায়ের সৌজন্যে।
ছান্দসিক-কবি আবদুল কাদির ও মুজতবা আলীর ভ্রাতুষ্পুত্র সৈয়দ ইরতিজা আলী রুমানকে লেখা অপ্রকাশিত চিঠি দুটি পাওয়া গেছে প্রখ্যাত গবেষক আবুল আহসান চৌধুরীর সংগ্রহ থেকে।
বইটি থেকে আমরা জানতে পারি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে লেখা চিঠিটি নেওয়া হয়েছে সৈয়দ ইরফানুল বারীর বই ভাসানী সমীপে নিবেদন ইতি : মওলানা ভাসানীকে লেখা চিঠিপত্র ১৯৬৯-১৯৭৬ (ঢাকা : প্যাপিরাস, ২০১৮) থেকে।
কবি কালিদাস রায়কে লেখা মুজতবার দুটি চিঠি প্ৰথম প্ৰকাশ পায় কোরক সাহিত্য পত্রিকার বিশেষ চিঠিপত্র সংখ্যায় (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০০৪)। উল্লেখ্য, কালিদাস রায় কবিতা লেখার পাশাপাশি স্কুল-পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সংকলনের কাজও করতেন, তাই মুজতবা আলীর ‘দেশে বিদেশে’র কোনো অংশ পাঠ্য হওয়ার উপযুক্ত কি না সে প্রসঙ্গও চিঠিতে উঠে এসেছে।
মুজতবা আলীর আজীবনের সখা প্রাবন্ধিক-অধ্যাপক আবু সয়ীদ আইয়ুবকে লেখা দুটি চিঠি দেশ পত্রিকার ৮২ বর্ষ ২৩ সংখ্যায় (১৫ আশ্বিন ১৪২২) প্রথম মুদ্রিত, আইয়ুবের পুত্র-কন্যা চম্পাকলি ও পূষণ আইয়ুবের সৌজন্যে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে লেখা বলেই মনে হয় এখানে সমসাময়িক প্রসঙ্গ ও অনেক সাহিত্যিকের সম্বন্ধে মুজতবার মন্তব্য রীতিমতো চাঁছাছোলা ও দুঃসাহসী। উল্লেখ্য, আইয়ুবপত্নী গৌরী আইয়ুবকে লেখা চিঠিটিও একই সঙ্গে ছাপা হয়।
এ সংকলনে পাঠক চিঠির মাধ্যমে তার মনোজগতের অজানা অধ্যায়ে প্রবেশ করবেন নিঃসন্দেহে এটা বলাই যায়।