পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠ
হাসনাত আবদুল হাই
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:২৬ পিএম
চীনদেশে কয়েকবার লেখক : হাসনাত আবদুল হাই ধরন : ভ্রমণ কাহিনী প্রকাশক : আগামী প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
চীনদেশে ১৯৭৯
হংকং, ৭ আগস্ট
বেলা আড়াইটায় হংকং এয়ারপোর্টে পৌঁছে ট্যাক্সি নিয়ে সরাসরি কাউলুন রেলস্টেশনে গিয়ে জানা গেল ক্যান্টনের শেষ ট্রেন চলে গেছে। এরপর চীনদেশের বর্ডারে যাওয়ার অন্য ট্রেন আছে, কিন্তু বর্ডার স্টেশন থেকে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ক্যান্টনে যাওয়ার জন্য কোনো ট্রেন নেই। বর্ডারে গিয়ে আমাদের শুধু ক্যান্টনের ট্রেন ধরতে হবে না, সেখানেই ইমিগ্রেশনে চীনে প্রবেশের সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে নিতে হবে। হংকং এখনও ব্রিটেনের ক্রাউন কলোনি, সেখানে চীনের কোনো ইমিগ্রেশন অফিস নেই। হংকং থেকে চীনের ভূখণ্ড ক্যান্টনে যাওয়ার একমাত্র উপায় ট্রেন। হংকং থেকে অবশ্য প্লেনে সরাসরি পিকিং যাওয়া যায়। কিন্তু আমরা এখনই পিকিং যাচ্ছি না। আমাদের জন্য ক্যান্টন এবং নিকটবর্তী স্থানে কয়েক দিনের প্রোগ্রাম করা হয়েছে। এজন্য আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ক্যান্টন।
আমাদের আগেই বলা হয়েছে কাউলুন স্টেশনে চায়নিজ ট্রাভেল এজেন্সির অফিস আছে। আমরা ব্যাগেজ নিয়ে সে অফিস খুঁজতে বের হই। দু-তিন জনকে জিজ্ঞেস করে ট্রাভেল এজেন্সির অফিসে পৌঁছে যাই কিছুক্ষণ পর। সৌভাগ্যক্রমে শেষ ট্রেন চলে গেলেও এ অফিস এখনও খোলা। না থাকলে বেশ ঝামেলায় পড়তে হতো আমাদের। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভেতরে ঢুকে দেখি কয়েকজন পুরুষ আর মেয়ে মুখ নিচু করে কাজ করছে। সবাই নির্বাক, টাইপরাইটারের যান্ত্রিক শব্দ ছড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। সামনে যে মেয়েটিকে দেখা গেল তার সামনে গিয়ে আমাদের সমস্যা অবগত করে জানতে চাই এরপর আমাদের কী করণীয়। স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মতো মেয়েটি নড়েচড়ে সপ্রতিভ হয়ে বলল, গো টু নাথান রোড। সেখানে অনেক ধরনের হোটেল আছে, ফাইভ স্টার, মিডল, অর্ডিনারি। তোমাদের পছন্দ অনুযায়ী একটায় উঠে রাত কাটাও। হোটেল থেকেই ক্যান্টনের টিকিট কেটে কাল সকালে যেতে পারবে।
মেইনল্যান্ডের চায়নিজ মেয়েটি চমৎকার ইংরেজি বলে। আর যতক্ষণ কথা বলল তার মুখের হাসি বন্ধ হয়নি। আলটপকা এসে কাজে বাধা দেওয়ায় একটুও বিরক্ত হলো না সে। শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার পর বিলম্বে আসা ক্যান্টন যাত্রীদের দেখে এমন সহাস্য ব্যবহার আমাদের ট্রেন মিস করার হতাশা দূর করে দেয়। অন্যদিকে হংকংয়ে রাত কাটানোর জন্য হোটেলের খরচ নিজেদেরই দিতে হবে দেখে আমার সহযাত্রীদের কেউ কেউ উশখুশ করতে থাকেন। ট্রাভেল এজেন্সি হোটেলের ভাড়া দেবে কি না তারা জানতে চান।
আমি বলি, ইউএন এসক্যাপ থেকে আমাদের ডেইলি অ্যালাউন্স দেওয়া হয়েছে। প্রতিদিনের হোটেলে থাকা-খাওয়ার খরচ তার মধ্যেই ধরা আছে।
শুনে একজন আফসোস করে বলেন, যদি আমাদের নিয়ে আসা হতভাগা থাই ফ্লাইটের প্লেন লেট না করত, তাহলে আমরা ঠিক সময় ক্যান্টনে পৌঁছে যেতাম। নিজেদের পকেট থেকে হংকং হোটেলে থাকার খরচ করতে হতো না।
আমি বললাম, ক্যান্টনে আজ পৌঁছালে সেখানেও থাকার জন্য খরচ করতে হতো।
যিনি আফসোস করে কথাটা বলেছিলেন তিনি বললেন, সে আর কতই বা খরচ হতো? শুনেছি চীনদেশে থাকা-খাওয়া খুব সস্তা। হংকং ট্যুরিস্টদের শহর। খুব এক্সপেনসিভ।
আমি বললাম, শুনলেন না মেয়েটি কী বলল? নাথান রোডে সব ধরনের হোটেল আছে। আমরা মাঝারি ধরনের হোটেলে উঠব। খুব খরচ হবে না।
দলের সবাই ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স থেকে খরচ হওয়ার চিন্তায় হংকংয়ে রাতযাপনকে অপছন্দ করছেন না। তাদের একজন বললেন, ভালোই হলো। বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছু কেনাকাটা করা যাবে।
আমরা ঢাকা থেকে চীনদেশের কমিউন দেখার জন্য তিনজন ব্যাংকক হয়ে হংকং এসেছি। একজন সরকারি কর্মকর্তা, দুজন সমবায় ফেডারেশনের সদস্য। আমাদের সঙ্গে যোগ দেবে ফিলিপাইন এবং মালয়েশিয়ার আরও চারজন। আমাদের এ সফর আয়োজন করেছে ব্যাংককের জাতিসংঘ আঞ্চলিক অফিস এসক্যাপ। আমরা ক্যান্টনসহ কোয়ান্টাং প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে চার দিন কমিউন দেখার পর দুই দিন পিকিং থাকব কৃষি মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ের জন্য। অবশ্য এ ব্রিফিং সফরের প্রথম পর্বে হলেই ভালো হতো। তাহলে আমাদের সফরসূচি এমন হতো যে প্রথমে পিকিং গিয়ে মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং শেষে আমরা ক্যান্টন আসতাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কমিউন দেখার জন্য ক্যান্টনেই আসতে হবে কেন? এ দেশে সব জায়গাতেই কমিউন আছে। পিকিংয়ের ধারে কাছে নিশ্চয় তার অভাব নেই। যা হোক, এসব ভেবে লাভ নেই। সরকারিভাবে যখন সফরসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে এর পেছনে নিশ্চয় কারণ আছে। গণচীন বিদেশিদের তাদের দেশে আসার, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে দেখার জন্য আগ্রহী হয়েছে খুব সম্প্রতি। শুনেছি এখনও বিদেশিরা ইচ্ছেমতো যেখানে সেখানে যেতে পারে না। মনে হচ্ছে আমাদের জন্য কন্ডাক্টেড ট্যুরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর জন্য মনে করা হয়েছে ক্যান্টনই উত্তম। যে কমিউনের কথা এত শুনেছি, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এত কৌতূহল আর রটনা, তার কিছুটা সরেজমিনে দেখতে পারব, এটাই বা কম কী? হোক না কন্ডাক্টেড ট্যুর, দেখা তো হবে। গত বছর যখন রাশিয়া গিয়েছিলাম, সেটাও ছিল কন্ডাক্টেড ট্যুর। বিপ্লবের পঞ্চান্ন বছর পর যদি রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ কন্ডাক্টেড ট্যুরের আয়োজন করে তাহলে চীন কমিউনিজম কায়েম হওয়ার আটাশ বছর পর সে ব্যবস্থা করছে দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
আমাদের ট্যাক্সি হংকংয়ের অপরিসর রাস্তা দিয়ে থেমে থেমে যাচ্ছে। একটু পরপর ট্রাফিকের বাতি লাল চোখ বের করে ধমকে গতি রুদ্ধ করে দিচ্ছে। রাস্তায় গাড়ি আর বাসে তিলধারণের স্থান নেই। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে প্রায় সব বয়সের মেয়ে-পুরুষ। বেশিরভাগের পোশাক সনাতন ধরনের চায়নিজ, পাশাপাশি আধুনিক কেতাদুরস্ত পোশাকও রয়েছে। অতীত আর বর্তমান গলাগলি করে হাঁটছে চীনদেশের প্রবেশদ্বার এ বহু গল্পের শহরে। অবশ্য গাড়ির ভেতর যারা বসে আছে তারা সবাই পাশ্চাত্যের বেশভূষায় সজ্জিত। যানবাহন আর রাস্তাজুড়ে এমন ভিড় যে জমাটবাঁধা মনে হয়, কোথাও ফাঁকা দেখা যায় না। তবে ভিড় স্থির থাকছে না, এমনভাবে সচল যে ক্ষণিকের বিরতিতেও রয়েছে গতির আভাস। সবকিছুই ছুটছে ঊর্ধ্বশ্বাসে, মানুষ থেকে গাড়ি, বাস। দুই দিকে কংক্রিট, স্টিল আর গ্লাসের বহুতল ভবন। ক্বচিৎ দুয়েকটি গাছ মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফুটপাতে, ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে, কালিঝুলি মেখে। রাস্তার দুই দিকে ভবনের সামনে বিভিন্ন উচ্চতায় নানা সাইজের নিয়ন সাইন এবং বিজ্ঞাপন। বেশ বোঝা যায় রাতের বেলা বিচিত্র রঙের উৎসব শুরু হয় রাস্তাজুড়ে। গতি আছে, আধুনিকতার ছাপও স্পষ্ট, কিন্তু হংকংয়ের চেহারা দেখে মনে হলো সেখানে মার্জিত রুচির বড়ই অভাব। বাণিজ্যিকীকরণ আর ভোক্তাবাদ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তার চাপ স্নায়ুর জন্য কঠোর। ট্যাক্সির ভেতরে বসে দেখতে দেখতে আমি হাঁপিয়ে উঠি...