× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠ

শ্যামলতার মৃত্যুশিথান

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:২২ পিএম

শ্যামলতার মৃত্যুশিথান
লেখক : ইমতিয়ার শামীম
ধরন : গল্পগ্রন্থ
প্রকাশক : প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স
প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

শ্যামলতার মৃত্যুশিথান লেখক : ইমতিয়ার শামীম ধরন : গল্পগ্রন্থ প্রকাশক : প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স প্রচ্ছদ : নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

নির্মাণের প্রাকপর্ব

ঠান্ডার ঠান্ডা বরফঘুম দিতে দিতে বার্মা থেকে আসা পাঙ্গাশ মাছের পেটি বাপে মেঘনার পাঙ্গাশ ভেবে গোগ্রাসে খাচ্ছে দেখে আলমের মনেই হয় না কাল দুপুরে এই লোকটা বলেছিল, অ আলম, আমাক পাটিত নয় টুলেত বইসপার দিস। তোগারে এইসব চেয়ারমেয়ারে বইসা জুতমতো খাইবার পারি না। বইসলেই মনে কয় পাছাডো ভাসান দিয়া উইঠবো। বলতে বলতে চেয়ারে বসা বাপ নড়েচড়ে বসেছিল। বাম হাত দিয়ে কাতলা আর শিমআলুর তরকারির বাটি এমনভাবে টেনে নিয়েছিল যে মনে হচ্ছিল এ পদটার প্রতি তার কোনো আগ্রহ নাই

তবে না খেলে কাতলা বাবাজি আবার মনে করতে পারে যে, দেখো, পাঙ্গাশ পেয়ে আমার দিকে চোখই পড়ে না আর, তাই খাচ্ছে আর মুখে তুলছে দয়া করে। বুড়া বাপের কথাবার্তার ঢকডিল দেখে মনে মনে তেলেবেগুনে ফস করে উঠেছিল আলম, চারকালের সাড়ে তিনকাল যাওয়া এই বুড়া কি জানে সেগুন কাঠের এইরকম চেয়ারটেবিল কিনতে পকেট থেকে কত টাকার জীবন খসে যায়? এইরকম একটা চেয়ারের পায়ার যা দাম, ও দিয়ে তার বুড়া বাপের সংসারের এক মাসের বাজারখরচ হবে। নামডাক আছে এমন জায়গার ফেলনা দোকানেও তো লাখ টাকা পকেটে তুলে এই চেয়ারটেবিল আর খাটবাট বানাতে যেতে হয়। ওরকম মিস্তিরি কি আর গাঁয়েগঞ্জে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাবে যে বাড়ির কোনাকাঞ্চিতে ফালতু-ফালতু গজিয়ে ওঠা শাল, কাঁঠালের গাছ কেটেই ঘরের দরজা, জানালা, বাটাম কিংবা চেয়ারটেবিল বানানোর কাঠ জড়ো করতে না করতেই আশেপাশে মিস্তিরিরা লৌড়ালৌড়ি শুরু করবে? এরকম ঝিলিকমারা খাটটেবিল বানাতে গেলে সেইরকম মিস্তিরি দরকার। আর সেইরকম সব মিস্তিরি অনেক আগেই হাঁটা দিয়েছে টাউনের দিকে। দোকান দিতে না পারুক, কোনো না কোনো দোকানে ঢুকে পড়ে সকালসন্ধ্যা কাজ করে মাসের শেষে একগাদা মাইনে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। সেই মিস্তিরিরা এখন হার্ডবোর্ডের খাতায় পলিথিনের রিফিলের মধ্যে চেয়ারটেবিল, খাট-জানালার নকশা করে রাখে। ভাগ্য ভালো থাকলে মিস্তিরিদের হাতের কাছে অন্য কারও অর্ডার দেওয়া মাল দেখে খোলা চোখে বুঝে নেওয়া যায় জিনিসটা দেখতে কেমন হবে। না হলে নকশা দেখেই তুষ্ট থাকতে হয়, নকশা দেখেই অর্ডার দিতে হয় মিস্তিরির কাছে; আবার মিস্তিরি সেসব বানানোর পর বাসায় নিয়ে আসতে হয় ভ্যান কিংবা ট্রাকে চড়িয়ে গাঁটের পয়সা খরচ করে। আনতে আনতে তার মতো আলম প্রামাণিকের মাথায় এটাও রাখতে হয়, সনাতনপুরের চাঁড়াল-নমঃশূদ্রমার্কা রাস্তা দিয়ে সহজে যাতায়াত করা যায় না, এখানকার কাঁচা রাস্তায় বাসগাড়ি চলে না, এমনকি মোটরসাইকেলও চোখে পড়ে না। মাঝেমধ্যে মাস্টারজাতীয় কিংবা উচ্চুঙ্গা বয়সের ‘আমি কী হনু রে’ ভাবসাবের দুচারটা পোলাপানের বাইসাইকেল চোখে পড়তে না পড়তেই অদৃশ্য হয়ে যায় উড়াল দেওয়া একরাশ ধুলার ভেতর। এ রকম একটা সড়ক দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত জিনিসপত্র নিয়ে আসতে তাকে ট্রাকভাড়ার জন্য যতগুলো টাকা দিতে হয়েছে ততগুলো টাকা কি এই বুড়া কোনো দিন একসঙ্গে হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখেছে? মুখে সামান্য একটু ঘামের মতো ভাপ জমেছে কি জমে নাই, সেই ভাপ ঘাড়ের গামছায় মুছে সেই গামছারই বাতাস খেতে খেতে ধানের ভাগ টান দেওয়ার জন্য হেঁটে বেড়ালে কি আর অত টাকা হাতে গোনা যায়? এতই সহজ অত টাকা নাড়াচাড়া করা? টাকা কি আর গাছের গোটা? বাপ কি তা এখনও টের পায় না? জমিজমার বারো আনাই তো বেচেবুচে খেয়েছে, অথচ চেয়ারটেবিলে বসে ভাত খেতে গেলে ওনার পাছা ওপরে উঠতে থাকে! আহ্লাদ আর কাকে বলে! নিজে কিনলে বুঝত টাকার কত দাম। এই টাকার জন্য সে নিজে সৌাদি আরবে টানা সাত বছর মেহনত করেছেÑ যখনই একটা টাকা খরচ করতে যায় তখনই তার মনে পড়ে সেই মেহনতের কথা। আর মনে পড়ে বলেই আলম চায় বাকি সবাইও এই মেহনতের ঠ্যালা বুঝুক। তবে সৌদি আরব তো এখান থেকে হাজার মাইল দূরের ব্যাপার, সেখানকার মেহনতও অনেক অনেক দূরের ব্যাপার, সনাতনপুরের প্রামাণিকবাড়ির এই কাঁঠাল আর আমগাছের নিচে বসে সারা দিনরাত ঝিমুতে থাকা বাপে সেই মেহনত বুঝবে কেমন করে? এই সড়ক দিয়ে চেয়ারটেবিল খাটবাট নিয়ে আসতে আসতে এক-আধটা গর্তের মধ্যে ট্রাকের একটা চাকা বসে গেলে লেবারদের সঙ্গে ঘাড়-কাঁধের কোনা লাগিয়ে তাকে যে ঘামটুকু ফেলতে হয়েছে তাই তো তার এই বাপ গোটা জন্মে ঝরায় নাই। এই মানুষ কি টের পাবে মেহনত কাকে বলে! আর এখন তো সাড়ে তিনকাল চলেই গেছে, গতর খাটানোর মতো তার কোনো অবস্থাও নাই।

দাদায় জমিজিরাত রেখে গিয়েছিল, নগদ টাকাপয়সাও নাকি ছিল খানিক। বাপ তাই পারল এইরকম ঠাঁট দেখাতে। সারা জীবন ধরে খালি জমি বেচার দলিলে টিপ মারল আর টাকা নিয়ে বাপদাদার রেখে যাওয়া জমিজমা আরেকজনের হাতে তুলে দিল। সাধে কি চৌধুরীবাড়ির লোকজন মশকরা করে তার বাপকে দেখে বলে, টিপ দিলিই ট্যাকা, না কি কন চাচা? নিজের বাপের নিন্দা করতে নাই, কিন্তু এটাও তো সত্যি যে আজ পর্যন্ত আলম এরকম আলসে লোক আর একটাও দেখে নাই। বাড়িতে কামলা রেখে চাষ করতে হলেও খানিকটা বুদ্ধিশুদ্ধি খরচ করতে হয় বলে এই লোকটা জমিজমা সব বর্গা দেওয়ার জন্য লৌড়ালৌড়ি করে বেড়াত। তা ছাড়া জমিজমা যতই থাকুক, ও দিয়ে কি আর এখন তেমন কিছু হয়? বীজ, সার, ওষুধ, পানি আর কামলা কিনতেই তো পাছার সুতা বেরিয়ে যায়। এই যে সে এত কিছু করল, জমির ভরসায় বসে থাকলে কি সম্ভব হতো তার কোনো একটা করা? তা হলে কী দরকার ওই জমির পেছনে এইভাবে ছুটে বেড়ানোর? প্রামাণিকবাড়ির মানসম্মান কি আর এমনি-এমনি গেছে? মানসম্মান যাওয়ার জন্য তো এরকম একটা অপদার্থই যথেষ্ট। কোথায় বাড়ির সামনে চেয়ার পেতে আরাম করে বসে থাকবে আর বর্গা পাওয়ার জন্য বর্গাদাররা এসে চেটেপুটে পায়ের ঘা, দাদ, বিখাউজ সব পরিষ্কার করে ফেলবে,Ñ তা না ‘ও বাবা, আমার ওই জমিডো খারাপ কিয়ের? বর্গা নে না এই বছর! চিন্তা করিস না, বীজ আর সারের ট্যাকা আমি দিমুনি’ বলে ঘুরতে ঘুরতে নিজেই পায়ে ঘা বাধিয়ে বসে থাকত। ভাগ্য ভালো দাদি বেঁচে ছিল, আর তার মা-ও একেবারে কম যায় না; দুইজনে মিলে লোকটাকে সবসময় টাইট দিয়ে খানিকটা জাতে তুলেছিল। দিনে মায়ের ঝাড়ি, রাতে বিছানায় বউয়ের ঝাড়ি, তার পরও লোকটা কী করে কোন কায়দায় ঠিকই দৈনিক দুপুরের পর ঘুমাতে যেত আর সকালে ঘুম থেকে উঠত বেলা নয়টায়। অথচ সেই অকম্মা বাপটাই কি না বলে, চেয়ারটেবিল ভালো লাগে না। কেন, আরামে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে থাকো, হাতটা বাড়িয়ে আস্তে আস্তে থালা থেকে দুই-এক লোকমা নিয়ে মুখে চালান করো, অসুবিধা কোথায়? এই সোজা কাজ...

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা