পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠ
নাসরীন জাহান
প্রকাশ : ২৫ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:১৮ পিএম
পালকের চিহ্নগুলো লেখক : নাসরীন জাহান ধরণ : আত্মজৈবনিক প্রকাশক : বেঙ্গল বুকস প্রচ্ছদ : আজহার ফরহাদ
পৃথিবীর মানুষ কেমন, দেখতে হলে শিশুর চোখ দিয়ে দেখো,
আমরা চক্ষুলজ্জার জন্য অনেক সময় বড়দের সামনে যা করি না, শিশুর সামনে নির্দ্বিধায় তা করি।
আমি শৈশবে যেসব আত্মীয় পরিচিতের কাছ থেকে অনেক অবহেলা পেয়েছি, বড় হওয়ার পর তাদের আবেগ আপ্যায়ন ভেতর থেকে আমাকে তাদের কাছে নিতে পারেনি।
আমার বড় ফুপুর মেয়ে সম্ভবত পাঁচজন। এক ছেলে।
যখনই তাদের বাড়ি কালেভদ্রে আব্বার কারণে যাওয়া পড়েছে, তারা যে এলিট, এই অনুভব প্রকাশ করে আমাকে কুঁকড়ে দিয়েছে।
ছোট ফুপু নিজের জীবনযুদ্ধ নিয়ে অস্থির ছিলেন।
তাঁকেও ভয় পেতাম। কিন্তু সেই বয়সে তার ওখানে যাওয়ার সাহস হয়নি কারণ ক্লাস ফোরে ফুপুর বাড়ি থেকে ভালো রেজাল্ট করে ময়মনসিংহ ফিরে বাসায় বলেছিলাম, আমাকে দিয়ে ফুপু বাথরুম পরিষ্কার করায়।
মফস্বলে তখন বাথরুম পরিষ্কার করানো একটা নিকৃষ্ট কাজ ছিল।
এটা না বললে আমাকে ফের ঢাকায় ফিরতে হতো। ফলে ছোট ফুপুর বাড়ি কীভাবে যাই? তার কন্যা শিলা তখন মায়ের ভয়ে ভীতু। কিন্তু তার সঙ্গে শৈশব থেকে এখনও সম্পর্ক অসাধারণ। ভালো নাম শবনম জাহান। সে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর শ্বশুরবাড়ির কাছের আত্মীয়। সে এমপি, এবং আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সাধারণ সম্পাদক।
আমরা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েই এখন অবধি জড়িয়ে আছি।
এর বাইরে একটা পর্যায়ে সেও আমাকে ডাকে না, আমিও যাই না।
নইলে আমি রুবীর খালা, রুবীর মামার বাড়ি গিয়ে উঠি?
ফলে আমার দুই ফুপু ঢাকায় থাকলেও ভয়ে আমরা স্কুল জীবনে এসে তাদের বাসায় থেকে সাহিত্য অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া, পত্রিকা অফিসে ঢুঁ দেওয়া এসবের জন্য ওঠার কথা কল্পনা করতে পারতাম না।
আমরা এসে উঠতাম মনিপুরী এলাকায় রুবীর ছোট এবং বড় খালার বাসায়, খালাতো ভাইবোন হারু ভাই, মণি আপার বাসায়। মণি আপা অসাধারণ মানুষ। হারু ভাই সাপ্তাহিক রোববারের ডাকসাইটে সাংবাদিক।
হারু ভাই তখন যেমন আমাকে ভালোবাসতেন। এখনও তেমন।
সবচেয়ে বেশি উঠতাম রুবীর ছোট মামা কথাসাহিত্যিক রাহাত খানের বাসায়। সেখানে স্নিগ্ধনারী নীনা মামির আপ্যায়ন ছিল অপূর্ব!
তাদের চার সন্তান অপু নিপু শুভ্র কান্তা।
কান্তা শিল্পী এব্যার ভক্ত ছিল, শুরু বনিএম। ওদের বাড়িতেই ইংরেজি গান শুনে প্রথম মুগ্ধ হই। সারা দিন কোলাহল পরে যেই মামার ফেরার শব্দটুকু হতো, সবাই যার যার পড়ার টেবিলে। আমি আর রুবী ভয়ে যে কোথায় কোথায় লুকাতাম। কেবল মামির ধীর সঞ্চালন।
এর মধ্যে রাত হতো। দেখতাম একটা ঘরে অনেক রাত অবধি বাতি জ্বলছে। জানতাম, নিজের স্টাডি রুমে রাত জেগে লিখছেন রাহাত খান।
পুরো আবহের গভীর প্রভাব পড়েছিল আমার ওপর। মনে হতো, বড় হয়ে রাহাত খান হতে হবে। নিজের একটা এমন স্টাডি রুমে বসে লিখতে না পারলে কীসের লেখক জীবন?
মামির আপ্যায়ন অসাধারণ! একবার আমরা যখন ময়মনসিংহ ফিরে আসছি মামি রুবী আর আমাকে একরকম জামা দিয়েছিলেন। আমার চোখ জলে ভরে গিয়েছিল।
এরপর রুবীর বড় খালার মেয়ে অসাধারণ সরল মণি আপার বিয়ে হচ্ছিল রাহাত মামার বাড়ি থেকে। আব্বা আমাদের নামিয়ে দিয়ে ফুপুর বাসায় চলে যান।
আমাদের এক সপ্তাহের প্ল্যান। গানবাজনা হচ্ছে। হঠাৎ লক্ষ করি, একটা চশমা পরা ফরসা ছেলে এদিক-ওদিক থেকে আমার ছবি তুলেই যাচ্ছে। সচেতন হতেই বাড়ির ভেতর চলে যাই।
শুরু হয়ে যায়। যখন যেখানে যাই, ভিড়ের মধ্যে দিব্যি এসে হাজির। সুযোগ পেলেই ছবি তোলে।
আমাকে আর রুবীকে উল্টো কথা বলতে শুনে বারবার সেও উল্টো বলতে শুরু করে, মিতু বখু টইসু।
এই কথাটা বলে বলে কান ঝালাপালা করে গেছে সারাক্ষণ। কখনও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে ইশারায় আমার সৌন্দর্যের, আমার এড়িয়ে চলার নানা রকম বিবরণ দিতে থাকে। অবশ্য বিয়ের মধ্যে এমন এক-আধটা টাংকি মারতে মন্দ লাগার কথা না। কিন্তু আমার প্রকৃতিটাই ছিল এমন, ভেতরে মজা পেলে, ভালো লাগলেও ওপরে নির্বিকার চেহারা দেখাতে ভালো লাগত।
কিন্তু এই ছেলে তো ব্রত গ্রহণ করেছে পুরো বিয়ের অনুষ্ঠান আমার পেছনে ঘুরে কাটিয়ে দেবে!
বরযাত্রী যাওয়া-আসায় সাঁই করে সেই ছেলে একই গাড়িতে উঠে যায়। উদ্দেশ্যমূলক গান ছেড়ে দেয়। একসময় আমি টের পাই, মামাদের পাশের বাসাটাই তাদের। একমাত্র ছেলে, নাম জ্যোতি। গায়েহলুদ, বিয়ে, পরদিন বউভাত।
এর মধ্যে আমরা রোজ বাড়ির সামনে ব্যাডমিন্টন খেলতাম।
ওপাশের দোতলা থেকে জ্যোতি আমাকে সাপোর্ট করে যেত।
অনুভব করলাম, আমার ভেতর বুদবুদ উঠছে। ভালো লাগা কাজ করছে। রুবী জ্যোতিকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এ নিয়ে চাপা ফিসফাস উঠছিল। পরদিন জ্যোতি সবার সঙ্গে ফাইনাল করল উত্তম-সুচিত্রার ছবি দেখতে যাবে। আমাকে বারবার ইশারা করলে আমিও মাথা নাড়ালাম।
কিন্তু আব্বা পরদিন সকালে আমার খোঁজ নিতে এলে আমি হুট করে কাপড়চোপড় গুছিয়ে মণি আপা, মামি, রুবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ময়মনসিংহ চলে আসি। জ্যোতি টুঁশব্দটিও জানতে পারে না।
ময়মনসিংহ ফিরে ঘুমুতে গিয়ে অনুভব করি, বুক ধড়ফড় করছে। জ্যোতি টাংকি মারছিল না, অল্প সময়ের মধ্যেই মহা সিরিয়াস হয়ে উঠছিল। আমি অনুভব করেই ছবি দেখা, বউভাত সব জম্পেশ প্রোগ্রাম ফেলে চলে এসেছি!
বারবার মনে হচ্ছিল, যখন সে টের পাবে, তখন কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে তার? কত সব আনন্দময় প্রোগ্রাম ছেড়ে হুট করে চলে এলাম? পরক্ষণেই মনে হলো, যা হয়েছে ভালো হয়েছে।
এসব বিষয় এগোতে না দেওয়াই ভালো। এ ছাড়া রাহাত মামা, হারু ভাই, তাদের একটা প্রেস্টিজ আছে না? আমার জন্য কেন নষ্ট হতে দেব?
ঘুমিয়ে পড়ি। রুবী ঢাকায়। পরদিন সকালে রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে গিয়ে বাঁকে দাঁড়িয়ে চমকে যাই। আতা কাকাদের বাসার সামনে জ্যোতি দাঁড়িয়ে আছে! অবিশ্বাস্য! কীভাবে?
আমি কিছুক্ষণ স্থবির থেকে ইউটার্ন নিয়ে বাসার দরজায় ধাক্কা দিতেই আমার পেছন পেছন সে এসে আমাদের ড্রয়িং রুমে ঢুকে পড়ে। আম্মা হতবাক।
ধীরে ধীরে জানতে পারি আতা কাকা তাদের নানাবাড়িসূত্রে আত্মীয় হয়। সে আমাকে পরদিন না দেখে যেভাবে হোক রুবীর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে এখানে এসেছে।
অন্যান্য ভাইবোন আসে।
বলে সামনে তোমাদের লম্বা জীবন পড়ে আছে। এখন এসব কী?
জ্যোতি বলে, তাহলে ও প্রমিজ করুক, সামনের লম্বা জীবনে অন্য কারও সঙ্গে জড়াবে না।
আমি পাসটাস করেই তাকে বিয়ে করব।
কী অবস্থা!
এর মধ্যে আতা কাকাদের পরিবার যুক্ত হয়ে যায়। ময়মনসিংহের কোথায় তাদের আলিশান নানাবাড়ি, তার দাদা কত বড় বাদশাহ, এসবের চর্চা যখন এসে ঠেকে এই জায়গায়, ধনী, ইঞ্জিনিয়ার ছেলে তাই বিউটি ফাঁদ পেতে জ্যোতিকে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ অবধি টেনে এনেছে। আমি জ্যোতিকে রীতিমতো ঘর থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিই।
এটাই কাল হয়।
জ্যোতি মরিয়া হয়ে ওঠে।
আর আমি এ জায়গায় পুরোপুরি ম্যাচুরিটি দেখাতে পারিনি। আমার মনে হচ্ছিল, এদের চৌদ্দগোষ্ঠীকে জানানো দরকার, দেখানো দরকার, আমি কারও বাড়ির রাজপুত্রকে টেনে আনার মানুষ না।
বরং তাদের ছেলে উল্টো কীভাবে হন্যে হয়ে আমার পেছন ঘুরছে, এটা প্রমাণ না করা পর্যন্ত আমার শান্তি হচ্ছিল না।
জ্যোতি সেটা জানতে পেরে আতা কাকাসহ ময়মনসিংহ আর তার যা গোষ্ঠী সবাইকে ত্যাগ করে আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়।
এর মধ্যে আমার স্কুল আমার চাঁদের হাট, ফ্যামিলি ক্রাইসিসের সঙ্গে নিজেকে ক্রমাগত যুক্ত রাখা, এসব বেশ চলছিল।
সে যখন সব ছেড়ে আমাদের দরজা নক করে, আমি বাড়িতে বলে দিই, কিছুতেই যেন সে কপাট ক্রস করতে না পারে।
সে কদিন পরপর চলে আসে। আমাকে না পেয়ে রুবীকে কনভিন্স করার চেষ্টা করতে থাকে। মানুষ নিজেকে খুব ভালোবাসে। ফলে তাকে কেউ প্রচণ্ডভাবে চাইলে ভালোবাসা তৈরি হয়। শুরুর দিকে আমারও জন্ম নিচ্ছিল।
এটাই টের পেয়ে গিয়েছিল সে, যতই আমি তাকে অগ্রাহ্য করি, তাকে অপছন্দ করি না। কিন্তু তার এই মাত্রাতিরিক্ত আসা-যাওয়া, সে ভেবেছিল, আমি সারেন্ডার করব।
কিন্তু তার এ বেপরোয়া আচরণ আমাকে ক্রমে অসহিষ্ণু করে তুলতে থাকে। কারণ আমি জানতে পারি, তাদের ময়মনসিংহের আত্মীয়দের মাধ্যমে ঢাকায় তার বাড়িতেও এ খবর পৌঁছে গেছে, ময়মনসিংহের একটা গরিব মেয়ের প্রলোভনে পড়েছে তাদের ছেলে।
এ কথা আমি ঢাকায় ছোট ফুপুর বাসায় গিয়ে জানতে পারি।
আমার ক্রোধ ক্রমে বাড়তে থাকে...