দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ
হাসনাদ আবদুল হাই
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩৬ এএম
আননে, আচরণে রাজসিক, পাশাপাশি স্বল্পবাক স্থিতধী মানুষটির উপস্থিতি সন্ত পুরুষের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। সংসারের মলিনতার বাতাবরণ ত্যাগ করে আশ্রয় খুঁজেছেন আমৃত্যু নির্ভানা লাভের আশায়। পিছুটানের গ্লানি তাকে পথভ্রষ্ট করেনি, কিন্তু অতীত থেকে থেকেই মনের ভেতর তুলেছে এলোমেলো করে দেওয়া ঝড়; যা অর্জন করতে পারতেন সেসব অধরা থেকে যাওয়ার, নিজের যা দেওয়ার সেই পরিণতি অসম্পূর্ণ থাকার অনুতাপে দগ্ধ হয়েছেন অবসরের দুর্বল মুহূর্তে। শেষ পর্যন্তব নিদারুণ অতৃপ্তি নিয়েই চলে গেলেন কবিতার আরও এক রাজকুমার।
প্রিয়জন হারানোর শোক আর বিরহের বেদনা সঙ্গী করে জীবনের পথচলা শুরু করেন হেলাল হাফিজ। এর জন্য তার মনে কোনো অভিযোগ ছিল না, কেননা তিনি জানতেন কবিতা তার নিয়তি যা দুঃখের হোমানলে শুদ্ধ হয়। কৈশোরে মাকে হারিয়ে যে শূন্যতা, তা পূরণে নেত্রকোণার সাবিত্রী দেবী এসেছিলেন গানের প্রশান্তি নিয়ে। রূপসী তিনিই কবির তরুণ বয়সে অজান্তে হয়ে যান প্রিয়তমা। মিথের অদিপিউসের মতো তিনি নারীর জননী এবং জায়ার দ্বৈত রূপে বেপথু থাকেন আমৃত্যু। সাধারণের সংসারজীবন তার হয় না, তিনি সংসার সীমান্তে থেকে কখনও দ্রোহের উত্তেজনায় আহ্বান জানান উদাত্ত স্বরে : এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। এ দুই পঙ্ক্তি কবিতার জগতে যে তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে তা তার জানা ছিল না। ক্রোধ নয়, হিংসা বা বিদ্বেষ নয়, পঙ্ক্তির কথা কটি ধারণ করেছে এক শান্ত এবং গভীর অভিজ্ঞান। তিনি আক্ষরিক অর্থে নতুন প্রজন্মকে মিছিলে বা যুদ্ধে যেতে বলেননি। তিনি তাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যৌবন জিজ্ঞাসা করার, জ্ঞানের অভিজ্ঞতা অর্জনের, স্বপ্ন দেখার এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সময়। তার কাছে যৌবন সৃষ্টির সোনালি সময় যখন প্রতি মুহূর্ত ডাক দিয়ে যায় সব সামর্থ্য নিয়ে সাড়া দেওয়ার।
যে কবি যৌবনের জয়গান গেয়েছেন সন্ত পুরুষের বরাভয় নিয়ে, খুব নির্লিপ্ত হয়ে নিজের ব্যর্থতা ভুলে কামনা করেছেন অন্যের প্রাপ্তির, তাকে স্মরণীয় হওয়ার জন্য অজস্র কবিতা লিখতে হয় না। বরং বেশি লিখলেই যেন খুব সাধারণ হয়ে যেতেন। হেলাল হাফিজ সাধারণ হননিÑ না জীবনে, না মৃত্যুতে
কবি সৃষ্টির দ্রোহ থেকে উৎক্ষিপ্ত হয়েছিলেন প্রেম এবং ভালোবাসার দ্রোহে, যে ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু না। কবি হওয়া মানেই প্রেমিকের রোমান্টিক জগতে প্রবেশ এবং বসবাস, যেখানে প্রকৃতি, ঈশ্বর, মানবীÑ সবই প্রেমাস্পদ। এ প্রেমেই কবিতার পূর্ণতা প্রাপ্তির সম্ভাবনা নিহিত। কিন্তু হেলাল হাফিজ যে প্রেমের সঙ্গে পরিচিত হলেন তা তাকে কেবল দগ্ধই করে গেল, আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে তাকে মুক্তি দিল না। ফলে তার যে প্রতিশ্রুত অর্জন তা অনেকটা অধরাই থেকে গেল তার কাছে। এর জন্য তার অনুতাপের শেষ নেই। গ্লানির ভারে তিনি গভীর দুঃখে লেখেন :
হলো না, হলো না
দিবস হলো না, রজনীও না।
সংসার হলো না, সন্ন্যাসও হলো না, কার যেন
এসবও হলো না, ওসব আরো না।
এ পর্যন্ত লিখলে খুব আন্তরিক একটা কনফেশন হয়ে কবির জন্য সহানুভূতি নিয়ে আসতে পারত। কিন্তু তিনি কারও সহানুভূতি পাওয়ার জন্য কবিতা লেখেননি, বরং অন্যদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তার কবিতা শেষ হয়েছে এভাবে :
হলো না, না হোক
আমি কি এমন লোক
আমার হলো না তাতে কি হয়েছে?
তোমাদের হোক।
যে কবি যৌবনের জয়গান গেয়েছেন সন্ত পুরুষের বরাভয় নিয়ে, খুব নির্লিপ্ত হয়ে নিজের ব্যর্থতা ভুলে কামনা করেছেন অন্যের প্রাপ্তির তাকে স্মরণীয় হওয়র জন্য অজস্র কবিতা লিখতে হয় না। বরং বেশি লিখলেই যেন খুব সাধারণ হয়ে যেতেন। হেলাল হাফিজ সাধারণ হননিÑ না জীবনে, না মৃত্যুতে।