× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দ্রোহে বিরহে অভিষিক্ত কবি

ফারুক মাহমুদ

প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩৩ এএম

হেলাল হাফিজ, ৭ অক্টোবর ১৯৪৮Ñ৩ ডিসেম্বর ২০২৪। প্রতিকৃতি : জয়ন্ত সরকার

হেলাল হাফিজ, ৭ অক্টোবর ১৯৪৮Ñ৩ ডিসেম্বর ২০২৪। প্রতিকৃতি : জয়ন্ত সরকার

শিল্প সৃষ্টির প্রবণতা দুই রকমের হয়। একটি বিপুলপ্রজ, অন্যটি বিরলপ্রজ। সাহিত্য তথা কবিতার বেলায়ও একই কথা খাটে। অনেক কবি আছেন বিপুলপ্রজ। আবার কেউ কেউ আছেন কালেভদ্রে লেখেন।

আমাদের চিরায়ত বাংলা কবিতাধারায় বিপুল এবং বিরলপ্রজ দুই ধারার কবির ভূরিভূরি উদাহরণ রয়েছে। বিরল তো বিরল, এমন গুরুত্বপূর্ণ কবির কথা আমাদের জানা আছে, যিনি সাকল্যে একশর মতো কবিতা লিখেছেন। আবার এমন স্মরণীয় কবি অঢেল আছেন, যাদের কবিতার সংখ্যা বিপুল। আসলে প্রশ্নটি বিপুল বা বিরলপ্রজ নিয়ে নয়, বিষয়টি কবিতার গ্রাহ্যতা নিয়ে। কবিতার সংখ্যা বিবেচনায় নেওয়ার দরকার নেই, গুরুত্ব পাবে ভালো কবিতা।

কবি হেলাল হাফিজকে আমরা চোখ বুজে অল্পপ্রজ কবির দলে রাখতে পারি। তার জন্ম ১৯৪৮ সালে। প্রয়াত হলেন ২০২৪ সালে। আয়ু বিবেচনায় এ কবির বেঁচে থাকাটা মোটামুটি দীর্ঘই ছিল। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তিনি যাপন করেছেন কবিতার সঙ্গে। কবিতার সংখ্যা বিপুল নয়। তার প্রথম কাব্য ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ বেরিয়েছে ১৯৮৬ সালে। এ কবির প্রকাশিত কাব্যের সংখ্যা তিনটি ‘যে জলে আগুন জ্বলে’, ‘কবিতা একাত্তর’ (২০১২), ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ (২০১৯)। বলা যায়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কাব্য দুটি প্রথম কাব্যেরই পরিবর্তিত বর্ধিত সংস্করণ। হেলাল হাফিজের ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ সমকালের এক বিস্ময়কর কাব্য। প্রকাশের পর থেকে পাঠকপ্রিয়তা থাকায় প্রতি বছর কাব্যটির নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে।

একটি রচনা কেন ‘কবিতা’, এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিস্তৃতভাবে দেওয়া যেতে পারে। সব রীতি মেনে কবিতা লিখলে তা যে সব পাঠকের গ্রাহ্যতা পাবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। কেউ সন্তুষ্ট হবেন, আবার কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করে জানাবেন নিজের অসন্তুষ্টির কারণ।

যখন থেকে কবিতা এলো, সঙ্গে এলো ‘কবিতা কী’ এ তৃষ্ণামুখর প্রশ্নটিও। সমাধান মেলেনি, স্থাপিত হয়নি কোনো ঐকমত্য। একসময় তুলাধুনা হয়েছে এমন ‘অকবিতা’, সংলগ্ন সময়েই পেয়েছে প্রশংসার পঞ্চমুখ। একটা বিষয়, যার কাছে আকাঙ্ক্ষা বেশি, তার কবিতার নিখুঁতত্ব খোঁজার প্রবণতাও বহুমুখী।

সব শিল্প উত্তরাধিকারজাত। কবিতাও। উৎস, মোহনা এসবও তো নদীজীবনের অংশ। শিল্পেও এমনটি থাকে। চিরকালীনতার সঙ্গে সমকালীনতার মেশামেশিতেই উন্মুক্ত হয় নতুন শিল্পসরণি। বর্তমান বাংলা কবিতায় যারা উত্তরাধিকারজাত হয়েও সমকালীন; এদের তালিকায় হেলাল হাফিজের নামটি যুক্ত করা যায়। তার কবিতায় সমকালীন-মানস আছে, আছে চিরায়ত ধারাসংযুক্তিও।

গত শতাব্দীর ষাটের দশক বৈশ্বিক এবং দেশি প্রেক্ষাপটে নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। দুটি বিশ্বযুদ্ধ মানবসভ্যতা কিছু যৌক্তিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এত জটিল, এত প্যাঁচানো বিষয়, ঠিক উত্তর বের করা সহজ নয়। উত্তর খোঁজা চলতে থাকে দশকের পর দশক। পূর্ব বাংলা এসব প্রশ্নের অভিঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রশ্নের সমাধান পাওয়া দিনদিনই জটিল হয়ে উঠছিল। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছে। এ চেতনাস্রোত গন্তব্য পৌঁছার পথরেখা খুঁজেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক চেতনা। এ দেশের সংস্কৃতিজন, রাজনীতিককে দাঁড়াতে হয়েছে এক মোহনায়। ষাটের দশকে এ দেশের কাব্যাঙ্গনে দ্যুতি পেয়েছিল নতুন চেতনালোক। তরুণ্য থাকে সব চেতনার শীর্ষস্থানে। তখনকার তরুণ লেখক সম্প্রদায়ের একজন হেলাল হাফিজ। লেখা হচ্ছে প্রতিবাদের, নিপীড়নবিরোধী কবিতা। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ এ কবির বহুলপঠিত, জনপ্রিয় একটি কবিতা। এটির রচনাকাল ০১.০২.১৯৬৯। সে সময় কবিতাটি কোনো পত্রিকা ছাপতে সাহস করেনি। লেখক আহমদ ছফা, কবি হুমায়ুন কবীর কবিতাটির দুটি পঙ্‌ক্তি ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ সেঁটে দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে। আগুন যেমন ছাইচাপা থাকে না, হেলাল হাফিজের সেই কবিতাও অপ্রকাশিত থাকেনি। দেয়ালে দেয়ালে, প্ল্যাকার্ডে, পোস্টারে ছড়িয়ে পড়ে। কবি হেলাল হাফিজের সমার্থক হয়ে ওঠে ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি।

অনেক কবির লেখায় প্রেম ও দ্রোহ-এ দুই সত্তার মিশেল চিহ্নিত করা যায়। হেলাল হাফিজ ছিলেন এ দুই সত্তার নিরেট ধারক। এক কলমেই লিখেছেন আগুনকবিতা,  লিখেছেন প্রেম-বিরহের দ্যুতিময় পঙ্‌ক্তিমালা 

বিপুল জনপ্রিয় কবি হেলাল হাফিজের কর্মজীবন কেটেছে সংবাদপত্রে। আমি ছিলাম তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী। একটি জাতীয় দৈনিকে তিনি ছিলেন সাহিত্য সম্পাদক। আমি সে পত্রিকার শিশুকিশোর পাতা সম্পাদনা করতাম। কবিতা লেখার সুবাদে সহকর্মীর সম্পর্ক ছাড়িয়ে তার বিশেষ পাত্তা পেতাম। কি যত্নে, কি মনোযোগে যে সাহিত্যপাতাটি সাজাতেন! এমন পরিশীলিত, ধ্যানী, নিবিষ্ট, নির্মোহ মানুষ খুব দেখা যায় না।

আমাদের সংবাদপত্রের পরিবেশটা বড় অনিশ্চিত। আজ চাকরি আছে তো কাল বেকার। হেলাল হাফিজের ভাগ্যেও এমনটা অনেকবার ঘটেছ। চাকরি হারিয়ে আমরা যেমনটা হই, হেলাল ভাইকে কখনও বিচলিত হতে দেখিনি। জীবনের সকল পর্যায় সমানভাবে গ্রহণ করার আশ্চর্য কুশলতা ছিল তার সহজ আয়ত্তে। জাতীয় প্রেস ক্লাব ছিল হেলাল ভাইয়ের প্রধান ঠিকানা। আমারা যখন ক্লাবে তুমুল আড্ডায় ব্যস্ত, হেলাল ভাই কোনার এক টেবিলে কেমন ধ্যানমগ্ন, একা।

অনেক কবির লেখায় প্রেম এবং দ্রোহ এ দুই সত্তার মিশেল চিহ্নিত করা যায়। হেলাল হাফিজ ছিলেন এ দুই সত্তার নিরেট ধারক। এক কলমেই লিখেছেন আগুনকবিতা,  লিখেছেন প্রেম-বিরহের দ্যুতিময় পঙ্‌ক্তিমালা। ‘একটি পতাকা পেলে/আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা’ হেলাল হাফিজের একটি উজ্জ্বল পঙ্‌ক্তি। একাত্তরে এ দেশের মুক্তিপাগল মানুষ যৌবনের জয়গান গাইতে গাইতে লাল-সবুজের পতাকা এনেছে। কিন্তু হেলাল হাফিজ তো (আরও অনেকে) শান্ত-সৌম্য জীবন স্থাপন করতে পারেননি। হয়ে থেকেছেন কষ্টের চিরফেরিওয়ালা। তার একটি কবিতাংশ ‘কষ্ট নেবে কষ্ট/হরেক রকম কষ্ট/কষ্ট নেবে কষ্ট/লাল কষ্ট নীল কষ্ট, কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট/আলোর মাঝ কালোর কষ্ট/পাথরচাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট/‘মাল্টিকালার’ কষ্ট আছে/কষ্ট নেবে কষ্ট।’

প্রেমের নিবেদন কত সরল নিষ্ঠ হতে পারে, এর ভূরিভূরি উদাহরণ আছে হেলাল হাফিজের কবতায়। দুটি উদ্ধৃতি : ক. ‘একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতটা কাঙাল’ খ. যদি যেতে চাও, যাও/আমি পথ হবো চরণের তলে/না ছুঁয়ে তোমাকে ছোঁব/ফেরাব না, পোড়াবোই হিমেল অনলে।’

মহাজনরা বলে থাকেন, বিরহেই প্রেমের পূর্ণতা। হতে পারে! বিরহযাপনেই প্রেমযাপন চলতে থাকে। প্রেম হারানোর হাহাকার আছে তার কবিতায় কবিতায়। একটি উদাহরণ : ইচ্ছে ছিল তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো/ইচ্ছে ছিল তোমাকেই সুখের পতাকা করে/শান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবো/... আজ দেখি রাজা আছে/রাজ্য আছে/ইচ্ছে আছে/শুধু তুমি অন্য ঘরে।’

কবিতার সঙ্গেই ছিল হেলাল হাফিজের ঘরগেরস্থালি। বেঁচে থাকা ছিল কবিতার জন্য, মরে যাওয়াও ছিল কবিতার জন্য। নিজের কবিতাসংসারটি সাজিয়েছিলেন আগুনের তলায়, বিরহ-মাঠের ঘাসের ওপর।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা