সাকিরা পারভীন
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৩০ এএম
হেলাল হাফিজ, ৭ অক্টোবর ১৯৪৮Ñ৩ ডিসেম্বর ২০২৪। প্রতিকৃতি : জয়ন্ত সরকার
এমন একটা খাবার যে হুট করে গিলে ফেলার কোনো সুযোগ নেই। ধীরেসুস্থে চিবিয়ে চিবিয়েই খেতে হবে। হৃদয়ে ঠিকঠাক প্রেম থাকলে ঠোঁট লাল হবে। নুনগ্রস্ত হলে জিব পুড়ে ছারখার। চমন বাহার বেশি হলে তোলপাড় হবে চরাচর। কাঁচা সুপারির ঘায়ে দুরদুর করে ঘেমে উঠবে তুমি। তবু পানের অক্ষয় রূপরসগন্ধ সহজে ছাড়বে না তোমাকে। তুমিও না। তেমন নেশাগ্রস্ত হলে পুনরায় ঘুরঘুর করবে বাটা-বরজের ধারে। একই রূপ একই রস একই স্বাদ তবু তা-ই চাইবে অধরে চুম্বনে আড্ডায় এবং সংগ্রামে; তোমার কবিতা যেমন। কবিতার মতোন মনে হচ্ছে কেন? এমন করে ভাবিনি কোনো দিন। কিন্তু ভাবনা আসছে। ঠেকাতে পারছি না। স্মৃতিখনির মুখে অশ্রুঝলমল আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত...
যেনÑ
‘খুঁজে পাচ্ছি না পান
বাটার ভেতরে গোছানো রয়েছে
বরজের আনচান
ভোঁতা ধারে যাতি পাড়া
কুচিকুচি কাটা সুপারি কথনে
ঝিনুক ছন্নছাড়া
যতি চিহ্নটা কই
চমন বাহারে বিরহ আহারে
লবঙ্গ থৈ থৈ
কোথায় তোমাকে পাব
কস্তুরি ঘ্রাণ হাকিমপুরিতে
আগুন লাগাতে যাব
ঠোঁটে ঠোঁটে সাদা চুন
তোকে খুঁজে পেতে চরকা ঘোরাব
প্রিয়তম প্রিয় খুন....’
যদিও পান তিনিও খেতেন না। তিনি কি জানতেন তার অন্তহীন বেদনার মুজরায় এক খিলি পান গুনগুন করে গেয়ে উঠবে শৃঙ্গার; এমনকি তার বিদায়ের পরও... সহস্র মানুষের বুকের ভেতরে চোখের মণিকোঠায় আটকে থাকবেন তিনি চিরতরে।
কবি হেলাল হাফিজের কথা বলছি। বারো বছর আগের কথা। যতদূর জানি তখনও তাকে নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো ভিডিও নির্মাণ হয়নি। সম্ভবত তিনি এসবে আসতে চাইতেন না বলেই। আমাকেও বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি বানাতে গিয়ে। খুব কাছাকাছি সময়ে সময় টেলিভিশনে সামিয়া জামান কবিকে নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন আরেকটি অসাধারণ প্রযোজনা।
কবির চলে যাওয়ার পর তাকে খুঁজে বের করলাম ভিডিওতে। তার মুখনিঃসৃত একটি কবিতা পোস্ট করলাম সমাজমাধ্যমে। নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, ক্রেডিট নিচ্ছিস না তো? কবিকে বিক্রি করছিস না তো? হৃদয় বলল, না। তুমি তাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছ। অতএব পোস্ট করা যায়। মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া কবিকে মানুষ খুব করে দেখল। শুনল। কাঁদল। কেন জানি আমিও দেখলাম অনেক বার।
শোনো কবি
‘এখন তুমি কোথায় আছ,
কেমন আছ পত্র দিও...’
জানি তুমি ভালোই থাকবে। আজ দেখলাম, কবি সঞ্জীব পুরোহিত গিয়েছিল বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে তোমার কবরের কাছে। হয়তো আরও অনেকেই যাবে যাচ্ছে যেতে থাকবে অনন্তকাল; যতদিন বাংলা ভাষায় গান গাইবে দোয়েল-কোকিল। যতদিন উজ্জীবিত হবে মানুষ একটি পঙ্ক্তিতেÑ
‘এখন যৌবন যার
মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়
এখন যৌবন যার
যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়...’
জানি তুমি অবাক হবে না একদম, খুব মিষ্টি প্রেমময় অনিন্দ্য হাসিতে বলবে, ‘আমার সতীন কেমন আছে? তাকে আমার ভালোবাসা দিও। তোদের দুজনকেই আমি খুব ভালোবাসি।’
শোনো কবি তুমি কিন্তু ভাইরাল হয়ে যাচ্ছ। অবশ্য সেসব তো তুমি অনেক আগেই হয়েছিলে। এইমাত্র দেখতে পেলাম তোমার পাঠ করা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি দুই শত পঞ্চাশ শেয়ার আর অর্ধলক্ষ ভিউ। আমি কী যে করব বুঝতে পারছি না। করারই বা কী আছে... বারবার তোমার পানটুকটুকে লাল ঠোটের দিকে, উপড়ে যাওয়া দাতের ফোকরের দিকে, তোমার চোখের দিকে, তোমার প্রক্ষেপণের দিকে তাকিয়ে থাকছে সাকিরার শ্রুতি-দর্শনের অন্তর-বাহির। আহা-উহু করে লাভ নেই। তবু এত দুর্দান্ত তিনি যে ছেড়ে যাওয়ারও উপায় কম। সেইটুকু বলতে গিয়েই ভূমিকার প্রস্তর বিলাপ।
তো সেই টিভি অনুষ্ঠানে তার পান খাওয়া ঠোটের কবিতার সম্মোহন তোমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিই চলো। যারা তোমাকে ভালোবেসেছেন অবহেলা করেছেন তারা সবাই জানেন শুধু ভালোবাসা অথবা ভালোবাসবার জন্যই তুমি কাটিয়ে দিয়েছ এক মোহনীয় জীবন। তুমি হলে ম্যান অব স্টাইল। জিজ্ঞেস করিনি তোমাকে কেন পান খেয়েছিলে তুমি সেদিন? সাধারণত তো খেতে না। কিন্তু সেদিন খেয়েছিলে কারণ তুমি জানতে লাইট ক্যামেরা অ্যাকশনের ঘনঘোরের ভেতর তোমার পান খাওয়া গালে চুমু খেতে এলেও আসতে পারে কেউ কেউ। সে রকম কিছু? নাকি অন্য কোনো কারণ, বলো তো কবি? তুমি জানতে নিশ্চয়ই। বলোনি কেন?
অনুষ্ঠানে তোমার জীবনের অল্প কিছু স্মৃতি-ভাব-দর্শন সংযুক্ত করতে পেরেছিলাম তোমারই অমিয় বাক্যবর্ণনায়, তোমারই কবিতার আবৃত্তিতে। আর কি আশ্চর্য তোমার ফোকলা দাতের ফাঁক দিয়ে অক্ষরের অভ্রকণা ছুটে যেতে পারেনি কোথাও। কী করে সম্ভব এতটা গুছিয়ে নেওয়া পাঠ ও কবিতার সমীকরণ। যে কারওর পক্ষে এটা সম্ভব নয়। আচ্ছা কবি তুমি বাচিকশিল্পী হলে না কেন? হা-হা-হা, অবশ্য সর্বাঙ্গসুন্দরের কোনো সীমানা হয় না তা আর কে জানে বেশি তুমি ছাড়া। কিছু না হলেও তো হয়। হতেই হবে কেন কি ছু একটার বোঝা... কে দিয়েছে এসব দিব্যি বলো তো...।
যে বা যারা বাচিকশিল্পী হতে চান অথবা হয়েছেন অল্পস্বল্প তারা পরখ করে দেখে নিতে পারেন কবির বাচিক উপস্থাপনা কত বিস্ময়কর সুন্দর হতে পারে। ছেদ, যতি, জোর, আবেগ, উৎপ্রেক্ষা... সমস্তর দুর্দান্ত সংযোগ তোমার অভিনয়। কবির মুখে কবিতা এমনিতেই ভালো লাগে আর তুমি তো কেবল কবি নও। তার চেয়ে বেশি কিছু। যে বা যারা তোমাকে আজও বিবিধ সংজ্ঞায় ফেলে আধুনিক গুরুত্বপূর্ণ কবির তকমায় চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন সে দায় তাদের। তোমার নয় কিছুমাত্র। সুযোগ পেলে বাহাস করব একদিন, না কারও সঙ্গে নয়; নিজেকেই উত্তর লিখব কষে; বুঝিয়ে দেব কত শক্তিমান তুমি ও তোমার কবিতা।
হাতে দু-তিনটি ব্রেসলেট, গলায় একটি/দুটি রুদ্রাক্ষ অথবা পুঁতির মালা তোমাকেই মানাত ভীষণ। শার্টের বাটন লাগাতে না খুব একটা। জিন্সরঙা শার্টের তলায় পরা মেরুন টি-শার্টে আবৃত তোমার প্রসারিত বুক উন্মুখ হয়ে থাকত বুঝি প্রেমালিঙ্গনের তীব্র ঝঞ্ঝাটে। শরতের রঙে নাকি বর্ষার ঢঙে কীরকম প্যান্ট/ট্রাউজারে মানাতে পারে তোমাকে তা-ও তো...। আর তা না হলে নীল পাঞ্জাবির বুকে ঝলমলে দিনের আলোয় এত তারা ওঠে? বলো...। আর সহস্র মানুষের নিতান্ত প্রশ্নের উত্তর হাসিমুখে তুমিই তো দিয়েছিলে,
‘কে বলে সংসার করিনি, করেছি তো’
না। অর্ধাঙ্গিনী নয়, জীবনসঙ্গী নয়; কবিতাকে বানিয়েছিলে তোমার শ্রেষ্ঠাঙ্গিনী কেবল তুমিই।
আজ শেষ করছি। পত্রমারফত তোমাকে পাঠানো অবহেলা ক্ষমাভরে নিও। ইতি...