হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:২৬ এএম
তখন পড়ন্ত বিকাল। হোটেল ইলিশিয়ামের বাইরের সিঁড়িতে পা রেখে একা দাঁড়িয়ে আছেন সেলিম সাহেব। তিনি হাঁটার পোশাকে নিচে নেমে আরেকজন সহকর্মীর জন্য অপেক্ষমাণ। তিনি এসে গেলেই একসঙ্গে হাঁটতে বের হবেন। হাঁটা সকাল, বিকাল বা রাত যা-ই হোক, সঙ্গে একজন সঙ্গীর দরকার লাগে। এতে গল্পের ছলেই শারীরিক কসরত করে নেওয়া যায়, আবার সময়ও পার করা যায়। হঠাৎ সেলিম সাহেব দেখলেন ওসমান আলী নামের তার এক সিনিয়র সহকর্মী হেলেদুলে বাইর থেকে ভেতরে আসছেন। তার হাতে পলিথিনে মোড়ানো দুটি মিষ্টি, যা বাইরে থেকে সহজেই দৃশ্যমান।
সেলিম সাহেব বললেন,
Ñকী ভাই, মানুষ চারজন মিষ্টি দুটি, মানে কী?
Ñওসমান আলী বলেন, বাসায় কেউ নেই। আমি একাই আছি, তাই।
Ñতাহলে তো এক পিস হলেই চলত।
ওসমান আলী বিরক্ত। এসব কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা তৃতীয় তলায় তার নিজের কক্ষে চলে যান।
সেলিম সাহেব মনে মনে বললেন, আহা! লোকটা এখন আর স্বাভাবিক পর্যায়ে নেই। একদম শেষ হয়ে গেছে।
আর এর জন্য তার পরিবারের অসহযোগিতা অনেকাংশেই দায়ী।
দুই.
ওসমান আলী এক ঔদাসীন্যে ভরা ভাবুকহৃদয় মানুষ। ছাত্রজীবন থেকেই প্রচণ্ড স্মৃতিশক্তির অধিকারী। রাজশাহীতে বড় হলেও পূর্বপুরুষ ভারতের মালদা অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। উচ্চশিক্ষিত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। বাবা-মা উভয়েই স্নাতক ডিগ্রিধারী ছিলেন। রাজশাহী শহরের স্কুল-কলেজে পড়াশোনার সময় ওসমান আলী নিজেও একজন অসাধারণ মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বরাবর ভালো রেজাল্ট করায় পাড়াপড়শিতেও তার ব্যাপক নামযশ ছিল। যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়া তার কাছে নিতান্তই মামুলি বিষয় ছিল। মুখস্থ করার অপরিসীম ক্ষমতা তাকে তখন স্থানীয়ভাবে জনশ্রুতিতে পরিণত করে তুলেছিল। তার কলেজ শিক্ষকরা তাকে নাম দিয়েছিলেন ‘ওসমান ভ্রাম্যমাণ অভিধান’। এমনকি এমএ পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই তাকে কলেজের অস্থায়ী শিক্ষকের পদে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। সত্তরের দশকের শেষ দিকে কলেজের শিক্ষকতা করতে করতে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেন ওসমান আলী। এবং সবাইকে চমকে দেওয়ার মতো রেজাল্ট করেন। মেধা তালিকার শীর্ষ পর্যায়ে তার অবস্থান। ক্যাডার সার্ভিস। চাকরি হয়ে যায় সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কার্যালয় ইডেন ভবনের সচিবালয়ে। চাকরির সুবাদেই ঢাকা এবং সচিবালয়ে তার প্রথম আসা এবং সেখানেই তিনি জীবনের শেষাবধি কাটিয়ে যান।
তিন.
ওসমান আলীর জীবনে বহুমাত্রিক এবং বহুরৈখিক সমস্যা দেখা দেয় মূলত বিয়ে করার পর। এর আগে তার মধ্যে বাস করা অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ার মতো ছিল না। তার প্রাপ্ত এমন লোভনীয় চাকরির কারণে কিছুদিনের ব্যবধানে ঢাকায় বসবাসকারী এক সুন্দরী বিদুষী রমণীর প্রেমে পড়ে যান তিনি। সে সুন্দরীর নাম শম্পা চৌধুরী। পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে তাদের বাসা। মূলত ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। বিহারি অরজিন হলেও শম্পা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। মালদা অঞ্চলের মানুষ হওয়ায় ওসমান আলীর কথা, বাচনভঙ্গি, চেহারা দেখে বোঝার সুযোগ নেই যে, তার ভেতরে বাস করে এক উদাসীন কবির বাউলা জীবন। নারীরা জানে, বিয়ের জন্য এসব কোনো বড় প্রতিবন্ধকতা নয়। যেখানে তার এমন গুরুত্বপূর্ণ চাকরি রয়েছে। সংসার হলে পুরুষ মানুষের সব কবিত্বকলা পালিয়ে যায়। অতএব সেই শিক্ষিত সুন্দরী ললনা ওসমান আলীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করে নিলেন। বিয়ের কিছুদিন যেতেই দেখা যায়, তার সহকর্মীরা একে একে সবাই পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাদের বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। কিন্তু ওসমান আলীর কিছু হয়নি। তিনি ক্রমাগত ব্যাচের পেছনে পড়ে যাচ্ছেন। প্রথম প্রথম স্ত্রী এসব নিয়ে মাথা না ঘামালেও পরে নিজেই স্বামীর সহকর্মী বন্ধুদের কাছ থেকে খোঁজখবর নিতে থাকেন। জানতে পারেন ওসমান বিভাগীয় পরীক্ষা পাস করেন না বিধায় তার পদোন্নতি হয় না। এ বিষয়ে স্ত্রীর কোনো প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া হলো তার কৌশল। ইতোমধ্যে ওসমান আলী এক কন্যাসন্তানের জনক হলেন। মেয়েশিশুটি যেন দেবশিশুরূপে পৃথিবীতে আগমন করল। ইতোমধ্যে স্ত্রী তার গতিবিধি আমলে নিয়ে নিজেই একটা কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন। দুজনে মিলে সংসার চালাবার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু ওসমান দিনদিন অমনোযোগী আর অগোছালো জীবনের পথে হাঁটছেন। তাকে ফেরানো দায়। যেন রাস্তাচ্যুত এক অন্যমনস্ক বোহেমিয়ান তিনি। বছর দেড়েক বাদে তাদের কোলে দ্বিতীয় কন্যাসন্তান চলে আসে। সংসার বড় হচ্ছে। ওসমানের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে পরীক্ষা দিতে যান, তবে খাতায় উত্তর না লিখেই বেরিয়ে আসেন। বলেন, তার নাকি বইয়ের পড়া একেবারেই মনে থাকে না।
ওসমান আলীর বিভাগীয় পরীক্ষা চলাকালে বা সে যুগে বাংলাদেশ টেলিভিশন দেশব্যাপী এক মজার কুইজ প্রতিযোগিতা চালু করেছিল। প্রতিযোগীরা সরাসরি টিভি সেটে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এতে অংশ নেয়। দেশে তখন টেলিভিশন বলতে সেই বিটিভি। এ-জাতীয় অনুষ্ঠান শিশু-বৃদ্ধ সবার কাছেই প্রিয়। ওসমান আলী তখন প্রায় মধ্যবয়সি এক চাকরিজীবী। পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে অতি সন্তর্পণে তিনি এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগীরা অপেক্ষাকৃত কম বয়সের হলেও ওসমানের কোনো সমস্যা নেই। সর্বোচ্চ প্রশ্নের সঠিক উত্তরদাতা পাবেন একটি ২৬ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন।
ওসমান আলী প্রতিজ্ঞা করেন, আমার স্ত্রী আমাকে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করুক রঙিন টেলিভিশন পেলে বুঝতে পারবে আমি কী জিনিস। তখনকার দিনে টেলিভিশনই এক অমূল্য দর্শনীয় বস্তু। বলা যায়, রঙিন টেলিভিশন ছিল প্রায় বিরল।
চার.
ওসমান আলী সে বছর টিভিতে একটানা পাঁচটি এপিসোডে অংশ নিলেন। প্রতিটিতেই তিনি প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন। অপেক্ষাকৃত তরুণদের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতা তাকে বাড়তি আনন্দ দেয়। তিনি টেলিভিশন শোতে অংশ নেওয়ার কথা তার স্ত্রীকে না জানালেও স্ত্রী আগেই তার নিকট আত্মীয়স্বজনকে খবর দিয়ে রাখতেন। যেন সবাইই তার পাগল স্বামীর মেধা দেখেন। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক বা সঞ্চালকও ইতোমধ্যে দর্শক দরবারে তার প্রতিভার তারিফ করতে শুরু করেছেন। অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তরও ওসমান মুহূর্তের মধ্যে সশব্দে উচ্চারণ করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। রানার-আপ পর্বেই তিনি প্রথম স্থান বাগিয়ে নেন। চূড়ান্ত পর্বে উঠে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হন এবং যথারীতি পরের সপ্তাহের শেষ এপিসোডে সর্বাধিক পয়েন্ট লাভ করে রঙিন টিভি নিয়ে বাসায় ফেরেন।
সেদিন রাত পোহাতেই কী যেন এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটে গেল। ওসমান আলী তৃতীয় কন্যার বাবা হলেন। স্ত্রীর মন ভেঙে যায়। তিনি সাফ বলে দিলেন কেউ তার টিভি দেখবে না। এ রঙিন টেলিভিশন হোটেলের নিচতলায় রেখে আসো। স্ত্রীপক্ষের সবাই আশা করে ছিল এবার অন্তত একটি পুত্রসন্তান আসবে। না, তা হলো না। দুই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ওসমান ভাবলেশহীন বসে আছেন টিকাটুলীর একটি মাঝারি মানের ক্লিনিকের অপেক্ষাগারে। তিনি মনে মনে আওড়াচ্ছেন ‘এতে কি কারও হাত আছে! আল্লাহ পাক সব ঠিক করে রেখেছেন। রিজিকের মালিক তো তিনি। আমার সুন্দরী কন্যারা অবশ্যই একদিন অনেক বড় হবে।’
ওসমান আলীর জিতে আনা রঙিন টেলিভিশনের আনন্দ যেন মাটি হয়ে গেল। চাকরির বিভাগীয় পরীক্ষা পাস করতে না পারা লোকটি তার স্ত্রীর কাছে সব সময় এক অপদার্থ, অকর্মণ্যই থেকে গেলেন।
পাঁচ.
একদিন দুপুরবেলায় পাশের কক্ষের বাসিন্দা মামুন সাহেবের দরজায় জোরে কড়া নাড়ছেন ওসমান আলী। সময়ে অসময়ে তিনি এমনটা করেন। এতে প্রতিবেশীদের কেউ কিছু মনে করত না। তবে আজকের কড়া নাড়ার একটা বিশেষ হেতু আছে। তিনি মনস্থ করেছেন বাসায় মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা করলে পরিবারে সুখশান্তি আসবে। স্ত্রী-কন্যাদের ওপর আল্লাহর নেকনজর বর্ষিত হবে। তাই তিনি আগামীকাল বাদ আসর তার কক্ষে অনুষ্ঠেয় মিলাদ মাহফিলের দাওয়াত দিতে এসেছেন। এ উপলক্ষে নিচতলার মসজিদের ইমাম রহমতুল্লাহ হুজুরকে বলা হয়েছে। তিনি অতি উঁচুমানের বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব এবং হাফেজ। তার বয়ান ও কণ্ঠের মাধুর্য নিয়ে সর্বত্র প্রশংসা আছে। এতে আরও অল্পসংখ্যক প্রতিবেশীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কাজেই মামুন ভাই আপনাকে থাকতেই হবে।
মামুন সাহেবের স্ত্রী জানেন ওসমান আলী ভাইয়ের মিষ্টি খুব প্রিয়। মিষ্টি খাওয়ানোর কথা বলে তাকে যেকোনো স্থানেও নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তিনি তাড়াতাড়ি বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের দুই পিস মিষ্টি এবং এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেন। বেচারা আনন্দের সঙ্গে মিষ্টি খেয়ে ভাবির জন্য দোয়া করলেন। বললেন, ভাবি কখনও আমাকে এক পিস মিষ্টি দেন না। দুটি করে দেন। ওসমান বাসা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মামুন তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, বলো, এই পাগলের দাওয়াতে লোকজন যাবে তো? স্ত্রী বললেন, অন্য কেউ যাক না যাক তুমি কিন্তু যাবে। মিলাদ মাহফিল বলে কথা।
পরদিন বাদ আসর মামুন সাহেব যথাসময়ে তার নির্দিষ্ট কক্ষে গিয়ে হাজির হলেন। তখন ইমাম সাহেব আর হোস্ট ওসমান আলী দুজন মাথায় টুপি পরে মেঝেতে কেবলামুখী হয়ে বসে আছেন। ইমাম সাহেবের হাতে একটি ছোট দানার তসবি। তার চোখ বন্ধ। মামুন সাহেব তৃতীয় জন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চতুর্থ জনকে পাওয়া গেল না। মনে হয় আমন্ত্রিত সবাই তাকে উপহাসের পাত্র বিবেচনা করে অনুপস্থিত থাকে। অবশেষে তিনজনের উপস্থিতিতে যথাযথ নিয়মে ওসমান আলীর মিলাদ মাহফিলের সমাপ্তি হলো। আগরবাতি, গোলাপজল ও তবররক সবই আনা হয়েছিল। শুধু অতিথি ছিল না। কষ্টের ব্যাপার হলো, তার এমন আয়োজনে স্ত্রী এবং তিন কন্যার অনুপস্থিতি চোখে পড়ার মতো ছিল।
ছয়.
এ পৃথিবী কত বিচিত্র! সৃষ্টির কি নিগূঢ় রহস্যময়তা, কি ছলাকলার জীবনগাথা! সবকিছু যেন মানুষের অগম্য ও দুর্বোধ্য। মেধাবী ওসমান আলী আর কোনো দিন বিভাগীয় পরীক্ষাগুলো পাস করতে পারেননি। ফলে তার একটিও পদোন্নতি হয়নি। তেত্রিশ বছর আগে তিনি যে পদে সরকারে যোগদান করেছিলেন, বলা যায় একই পদমর্যাদা নিয়ে গোটা জীবন কাটিয়ে দেন। চাকরি জীবনের একটা সময়ে এসে চাকরি, পদপদবি, পদোন্নতির আলোচনা শুনলে তিনি নিভৃতে এড়িয়ে যেতেন। পারতপক্ষে নিজের সহকর্মীর নাম মুখে আনতেন না। শুনলে আনমনা হয়ে অন্যত্র তাকিয়ে থাকতেন। তবে জীবনের এক অপরাহ্ণ বেলায় দাঁড়িয়ে মনের অজান্তেই অনেকটা স্বগতোক্তির মতোন করে একবার বলে উঠেছিলেন, ‘জানেন, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব কিন্তু আমার ব্যাচমেট এবং মেধা তালিকায় আমার অনেক পরে তার পজিশন ছিল।’
চাকরির শুরু থেকে সুদীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন সরকারের অধীনে তিনি কাজ করেছেন। কাজ বলতে এক প্রকার অফিসে যাওয়া-আসার মতোন। কখনও কেউ তাকে আমলে নিত না। সচিবালয়ের তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সমকক্ষ জীবিকা ছিল তার। তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, সরকারের অপার বদান্যতা এবং অনুকম্পা নিয়েই তার এমন বেদনাদায়ক চাকরিকালের করুণ যবনিকাপাত ঘটে। আরও এক বিপন্ন বিস্ময় যে, অবসর জীবনের অম্লমধুর স্মৃতির কোনো মিনার গড়ে তোলার আগেই ওসমান আলী আকস্মিক এক জোছনাভরা রাতে মানুষের পৃথিবীর সব হিসাবনিকাশ বুঝিয়ে দিয়ে অনন্তলোকে পাড়ি দেন।