× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গৌরবের ডিসেম্বর

স্মৃতিকুয়াশায়

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৫০ পিএম

অলংকরণ : গ‍ুপু ত্রিবেদী

অলংকরণ : গ‍ুপু ত্রিবেদী

দূরাগত নদী এসে আমাদের কোনও গল্প বলার আগেই ফের দূরগামী হয়। আর লোকজনও বলে, মানুষ কখনও নদীর একই জলে দুবার স্নান করতে পারে না। ভাসতেও পারে না। এই যে আমরা থির হয়ে থাকি আমাদের উৎসস্মৃতির নদ-নদীতে, মুক্তিযুদ্ধ কালে, থাকি একাত্তরের সেই দিনগুলোতে,Ñ চিন্তাসূত্র এক হলেও সেখানেও তো আমরা বার বারই ডুব দেই, সাঁতার কাটি নতুন চিন্তার স্রোতে। স্পষ্ট দেখতে পাই, মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠছে ক্রমশই স্মৃতিসত্তার বিষয়, ইতিহাসচেতনার বিষয়। যতই তা ইতিহাস হয়ে উঠছে, ততই তাতে যুক্ত হচ্ছে ইতিহাসবিকৃতির ঝুঁকি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এমন বেশ কিছু স্মৃতিকথা ও তথাকথিত গবেষণাগ্রন্থ আমাদের সামনে আসতে শুরু করেছে (এবং ইদানিং হয়তো এ ধরণের বইয়ের রচনাকেই উৎসাহিত করা হচ্ছে), যেগুলো পড়তে পড়তে আমাদের মনে হয় যুদ্ধ করেছে আসলে সেনাবাহিনীর কতিপয় অফিসার, জনগণ তাদের জোগাল দিয়েছে কেবল; এমনকি রাজনৈতিক নেতা কিংবা ছাত্রনেতা, তারাও যুদ্ধ করেছে সেনাবার্তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে; ভাবখানা এই, মুক্তিযুদ্ধ কোনো জনযুদ্ধ ছিল না, তা কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বে হয়নি, হয়েছে সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অফিসাররা এসে হাল ধরাতে। মুক্তিযুদ্ধের নায়ক তারাই। এসব স্মৃতিকাহিনীর পাশাপাশি আরও কিছু স্মৃতিকাহিনীর স্তূপ জমেছে শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের, কিংবা আমলাদের। এসব স্মৃতিকাহিনী বেশ কাজে লেগেছে তাদের রাজনৈতিক-সামাজিক আসন পাকাপোক্ত করার কাজে, পদোন্নতি পাওয়ার কাজে। কিন্তু মানুষের মনে তা কোনও চেতনার বোধ সৃজনে ব্যর্থই হয়েছে। লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা কিংবা একটু রাজনীতি করা মানুষ কীভাবে যুদ্ধে গেছেন, দিনের পর দিন অস্ত্রধারী যোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন তা এসব বইয়ের পাতা থেকে বাষ্পের মতো উঠে এসে আমাদের চোখেমুখে একটু ভাপ দিয়েই বাতাসে মিলিয়ে যায়, আমাদের গাল চোখমুখ ঠান্ডা হয়ে যায় পরক্ষণেই। আমরা আর কিছু মনে করতে পারি না। 

রাজধানীর অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক লাইব্রেরির বই নাড়াচাড়া করতে গিয়ে একদিন হঠাৎ করে খুঁজে পেয়েছিলাম চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের সংগ্রহের একটি বই। সেটির প্রকাশকাল ১৯৭৩ সালের বিজয় দিবস। বইয়ের নাম Involvement In Bangladesh Struggle for Freedom। লেখকের নাম হিসেবে লেখা ছিল, A Participant। বাংলাদেশ থেকে নয়, বইটি বেরিয়েছিল কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের তরুণ প্রিন্টার্সে থেকে। প্রকাশক ছিলেন তাপস সাহা। প্রিন্টার্স লাইনে কোনও লেখকের নাম না থাকলেও ভূমিকার নিচে লেখা ছিল টি হোসেন, যার আবাস ধানমন্ডীর ৫ নং রোডে, সিটি নার্সিং হোমে। অনুমান করি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গ্রন্থাকারে লেখা এটিই প্রথম স্মৃতিকাহিনী। বইটি শেষ পর্যন্ত পড়া হয়ে ওঠেনি, আর রাজ্জাক লাইব্রেরি সম্প্রতি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বইটি আপাতত পাওয়ার উপায়ও নেই। তার পর যতদিন গেছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা রচনা একশ্রেণীর মানুষের স্বার্থসিদ্ধির বিষয়ও হয়ে উঠেছে। এদের প্রত্যাখ্যান করে, এদের এড়িয়ে সত্যিকারের স্মৃতিকথা খুঁজে নেয়াটাও আমাদের জন্যে এখন এক বড় যুদ্ধ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কিংবদন্তি সিরাজগঞ্জের নওগাঁর যুদ্ধ। একাত্তরের ১১ নভেম্বর সংঘটিত এ যুদ্ধে আব্দুল লতিফ মির্জা পরিচালিত পলাশডাঙা যুব শিবিরের যোদ্ধাদের ঘিরে ফেলে অতর্কিতে ওই আক্রমণ চালিয়েছিল সুসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ষোড়শ ডিভিশনের ২০৫ বিগ্রেডের ৩২ বেলুচ রেজিমেন্ট। কিন্তু গেরিলা দলটির সর্বাত্মক প্রতিরোধের মুখে এবং তাতে ব্যাপক জনগণেরও অংশগ্রহণের কারণে সেদিন পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল ওই রেজিমেন্ট। এমন ঘটনা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের আর কোনও যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটেনি। কিন্তু তার পরও এই যুদ্ধ কেন তত আলোচিত হয় না? এর একটি কারণ বোধকরি এই যে, এই যুদ্ধের নেতৃত্বে কোনও সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না; দ্বিতীয় আরেকটি কারণ, যুদ্ধের পরপরই এই গেরিলা নেতা যোগ দিয়েছিলেন বিরোধী এক নতুন গঠিত রাজনৈতিক  দলে। অনেক অনেক বছর বাদে কিংবদন্তিতুল্য সেই গেরিলা নেতার কাছে সেই সময়কার কথা জানতে চাইলে শুনতে হয়েছিল, পরে কোনো একসময়ে ইতিহাস লেখা হবে, এ কথা তো কখনোই তার মাথায় ছিল না, তাই সেসব দিনের কথা ঠিকঠাক মনেও রাখেননি। সত্যিই তো, মনে রাখার কিংবা মনে করার কী দায় পড়েছে তাঁর? সময়ের সাহসী সন্তান তিনি, পূরণ করেছেন সময়ের দায়। দূরাগত নদীর মতো তিনিও তো দূরগামী। তাঁর কী প্রয়োজন নিজের শৌর্য-বীর্যর কথা মনে করে নিজেকেই ছোট করার? কিন্তু তিনি মনে রাখতে নাও পারেন, আমাদের কী দায় নেই জানবার? আমরাই বা কতটুকু চেষ্টা করেছি, জেনে নেয়ার! মুক্তিযুদ্ধ যে কত ব্যাপক জনযুদ্ধ ছিল, তার উজ্জ্বল উদাহরণ তারা, বেসামরিক যোদ্ধা আর সাধারণজন। সেই জনযুদ্ধের কথা আমাদের কবে জানা হবে? 

এখন, প্রতিনিয়ত আমাদের এই প্রশ্ন তাড়িত করে, আহত করেÑবিভক্তি এসে একাত্তরের সেই চেতনপ্রবাহের নদীটিকে কি হত্যা করে ফেলছে? কিন্তু এমন বিভক্তি এলো কী করে? এলোই বা কবে? পঁচাত্তরে? নাকি একাত্তরেই? আগেও কি ছিল না বিভক্তি? জনগণ বিভক্ত না থাকুক, বিভক্ত কি ছিল না জনগণের নেতারা? নয় মাস কী এমন দীর্ঘ সময় পোড় খেতে খেতে দ্বন্দ্ব ভুলে একেবারে কাছে আসতে শিখেছিলেন তারা? প্রথম কয়েক মাস তো প্রস্তুতি নিতেই গেল। কিন্তু বিভক্তি তো এসেছে ওর মধ্যেই। শিলিগুড়ি সম্মেলন সেই ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা করেছে বটে, কিন্তু কতটুকু পেরেছে? মুক্তিযোদ্ধাদের দেখি, প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন কেউ ফ্রিডম ফাইটার হিসেবে, কেউ আবার বিএলএফ হয়ে। এখন কারও মুখে গর্বের দীপ্তি, আমি এফএফ ছিলাম; আবার পাশেই কারও মুখে ঝলসায় অহংকারের বাণী : না, না, আমি বিএলএফে ছিলাম। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্যে, মুক্তিযুদ্ধ করার জন্যে আওয়ামী লীগÑছাত্রলীগ বহির্ভূত দেশপ্রেমিকদের যে বার বার পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছে, সেসবও তো ‍মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরই অংশ। মুক্তিযুদ্ধে যে ঐক্য আমরা গড়তে পেরেছি, সে ঐক্য আসলে আমরা পেয়েছি প্রতি পদে পদে রক্ত দেয়ার মধ্যে দিয়ে। স্বাধীনতার জন্যে যেমন, তেমনই ঐক্যের জন্যেও আমাদের মূল্য দিতে হয়েছে। মুক্তি না এলেও মানচিত্রের স্বাধীনতা পেয়েছি এবং আবারও অনৈক্যের পথে হেঁটেছি, শহীদদেরও করেছি বিভক্তÑশিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে গিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রাখা হয়েছে শহীদ কৃষক-শ্রমিকদের থেকে আলাদা সারিতে। যে নদী জেগে উঠেছিল, সে নদী তখনই কি মরতে শুরু করেনি?

কখন মরতে শুরু করে একটি নদী? কিংবা কীভাবে বেঁচে থাকে একটি নদী? শাখাপ্রশাখা, হাওর-বাঁওড়, বিল-খালের কল্যাণেই বাঁচে। এসব জায়গা থেকেই পানি এসে নদীর মূলকে স্রোতস্বিনী করে, নিয়ে চলে সমুদ্দুরের দিকে। আবার প্রকৃতির অফুরান জল যখন নেমে আসে নদীর কাছে, তখন এসব শাখাপ্রশাখা, হাওর-বাঁওড় আর খাল-বিলই সে জল বুকে টেনে নিয়ে নদীর উন্মত্ততা ঢাকে। তাকে প্রবাহিত করে ছন্দোবদ্ধ স্বাভাবিক গতিপথে। খালÑবিল, হাওর-বাঁওড় আর নদীর শাখা-প্রশাখা যখন মরতে শুরু করে, তখন নদীও নিজেকে হারাতে শুরু করে। 

এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণের অপচেষ্টা করা হয়েছে; এ কথা যেমন সত্য, তেমনি এ-ও সত্য, নির্দলীয়করণের অপচেষ্টাও রয়েছেÑবিশেষত তাদের পক্ষ থেকে, যারা ছয় দফার আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার পরও ধরতে পারেননি, জনগণের মূল আকাঙ্ক্ষা এখন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে শোষণমুক্ত হওয়া। শ্রেণীসংগ্রামকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে তারা যে ব্যর্থ হয়েছেন, সেই গ্লানি ঢাকার প্রয়াসে তারা কখনও বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনও দল করেনি, মুক্তিযুদ্ধ করেছে জনগণ; কখনও-বা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব উগ্র জাতীয়তাবাদীরা করায়ত্ত করেছে। অথচ কে না জানে, মুক্তির সংগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধ সব কিছু জনগণই করে বটে, কিন্তু রাজনৈতিক এক বা একাধিক দলের নেতৃত্বই তা সংগঠিত করে, তাকে চূড়ান্ত সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কোনও দল যদি সেই সংগ্রাম ও আন্দোলনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়, তা হলে তার দায় সেই দল বা দলসমূহেরÑজনগণের নয়, নেতৃত্বদানকারী দলটিরও নয়। আবার একটি দল নেতৃত্ব দেয়ার স্থানে থাকার কারণে যদি আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী অন্য কোনও দল সংগঠনের ভূমিকাকে মুছে দেয়ার অপচেষ্টা করে, তা হলে তার মধ্যে দিয়ে মূলত নিজের অবস্থানকেই দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। কারণ ওই পুরানোইÑশাখাপ্রশাখা ছাড়া নদী কী করে বাঁচে? প্রতিবেশে বৃক্ষ যেমন আছে তেমনই আছে লতাগুল্ম। বটবৃক্ষ যেমন সত্য, তেমনই সত্য দোলকলস। কিন্তু এই ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যেমন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ও যুদ্ধে অবিসংবাদিত নেতা হলেও এটি ইতিহাসের জ্বলজ্বলে সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন তাজউদ্দীন আহমেদ, তিনিই মুক্তিযুদ্ধের নেতা। এই সত্য আওয়ামী লীগ বার বার অস্বীকার করতে চেয়েছে, অস্বীকৃতির মধ্যে দিয়ে দলের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাকেও নষ্ট করেছে এবং দলীয় নেতৃত্বে পরিবারতান্ত্রিকতা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করেছে। যে নদী স্রোতস্বিনী হয়ে উঠেছিল, গণতন্ত্রের তরঙ্গ জাগিয়ে তুলেছিল, সে নদী মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছে। 

এ মরা নদীকে জাগাতে এসেছিলেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। এ দেশের পাঠক সমাজের কে না জানে, তাঁর সেই ‘একাত্তরের দিনগুলি’র কথা?  সারা দেশের যুদ্ধে-স্বজন-হারানো-মানুষ সেই প্রথম অনুভব করেছিল তাদেরও কেউ মারা গেছে, তাদের কেউ যুদ্ধ করেছে; অনুভব করেছিল বিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল স্রোতের কাছে প্রতিদিন অপমানের গ্লানি। এ অনুভব, এ গ্লানি আওয়ামী লীগ অনেক বড় সংগঠন হওয়ার পরও অনেক চেষ্টা করে জাগাতে পারেনি নতুন প্রজন্মের বুকে, কেননা তারা শাখাপ্রশাখার ধার ধারে না। জাহানারা ইমাম নিজে শাখাপ্রশাখা; তার কল্লোলে জেগে উঠেছিল আরও বহু বহু শাখাপ্রশাখা, আর তাই জেগে উঠেছিল মূল নদী শেখ মুজিবও। এ এক সামাজিক আন্দোলন। আর এ ধরনের আন্দোলনই বোধের নদী নির্মাণ করে মানুষের মধ্যে। নির্মাণ করে চেতনার নদী। কিন্তু সেই বোধের, সেই চেতনার স্থায়িত্ব আর চলমানতা তো নির্ভর করে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি উদ্দেশ্যপ্রবণ হয় তবে সেই নদী আবারও নিষ্প্রাণ হতে থাকে। জাহানারা ইমামের আন্দোলনের পরিণতি অনেকটা তা-ই হতে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নতুন করে নতুন প্রজন্মের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। কিন্তু সে চেতনা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে হয়ে উঠেছে নেহাত পকেট-চেতনা, ক্ষমতায় টিকে থাকার চেতনা। তারা তা প্রয়োজন হলে পকেট থেকে বের করেন, রুমালের মতো দু-তিন-চার ভাঁজ করে ঘাম মোছেন, নাকে চাপেন, আবারও রেখে দেন পকেটের মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদরা বোঝেন কেবল যুদ্ধাপরাধের বিচার করা। কেননা কেবল এ দাবির মধ্যেই যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সীমায়িত করা যায়, তবে তাদের রাজনৈতিক ব্যবসা জমে ভালো। কিন্তু একটি জনগোষ্ঠী যখন মুক্তিযুদ্ধ করতে যায় তখন তো তারা এ লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করে না যে স্বাধীনতা এলে বিরোধীদের বিচার করা হবে, যদিও এটিও একটি অনুলক্ষ্য হয়ে ওঠে, যদিও যুদ্ধাপরাধের বিচার করা অবশ্যই অপরিহার্য বিষয়। কিন্তু তারও চেয়ে বড় ব্যাপার হলো মৌলিক অধিকারগুলো সুপ্রতিষ্ঠিত করা, সংবিধান সমুন্নত রাখা। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সংবিধান আমরা অর্জন করলাম তাকে যারা বারবার দলীয় প্রয়োজনে পরিবর্তন করলেন, যারা এখনও এটাকে নিয়ে কেবল কাটাছেঁড়া করতেই ব্যস্ত, তাদের পক্ষে কি সম্ভব মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে জেগে ওঠা জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করা? সম্ভব ইতিহাসের অন্তর্গূঢ় বিবরণটি সুপ্রতিষ্ঠিত করা? সম্ভব নয়, আর সেটা তারা চানও না। তাই বার বার শাসকের পরিবর্তন ঘটে আর ইতিহাস নতুন করে লেখার নামে, ইতিহাসের নতুন বয়ান দেয়ার নামে নতুন করে পুরানো বিকৃতি সাধনের অপচেষ্টা চলে। যেমন, এখন আবার শুরু হয়েছে এই বিকৃত ভাষ্য প্রদানÑএকাত্তর নাকি সাতচল্লিশের ধারাবাহিকতার ফসল। অথচ ইতিহাসের সাধারণ পাঠকের পক্ষেও বোঝা সম্ভব, একাত্তর সাতচল্লিশের ধারাবাহিকতার ফসল নয়, বরং তা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিধারায় ছেদ ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলার মুক্তিসংগ্রামকে প্রলম্বিত করেছে; হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎ বসু, আবুল হাশিম ও কিরণ শংকররা মুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেটিকে ব্যাহত করেছে, রুদ্ধ করেছে। একাত্তর সেই সাতচল্লিশকে পরাস্ত করে বাংলাকে বৈশ্বিক রাষ্ট্রিক রাজনীতির মূল স্রোতে নিয়ে এসেছে।

আমাদের স্মৃতি হয়তো ক্ষীণ, কিন্তু স্মৃতিসত্তা নিশ্চয়ই নয়; আর সে কারণেই কুয়াশা কাটিয়ে বার বার স্মৃতি ফিরে আসে। স্মৃতির স্রোত বইতে থাকে। বইতে বইতে দু’কুল ছাপিয়ে ওঠে, পলি ফেলে, নিয়ে আসে নতুন নতুন সৃষ্টির সম্ভার। আর দূরাগত নদীর সঙ্গে আমরাও বার বার দূরগামী হই। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা