× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

রাজ রিডার

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৪৮ পিএম

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর মঞ্চে জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলান

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর মঞ্চে জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলান

পণ্ডিত রবিশঙ্কর কীভাবে জর্জ হ্যারিসনের দেখা পেলেনÑ এ এক আশ্চর্য বিষয়। পণ্ডিত রবিশঙ্কর জন্মগ্রহণ করেন বেনারসের এক বনেদি বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবারে। শুরুটা করেছিলেন নৃত্যশিল্পী হিসেবে। বড় ভাই উদয় শঙ্করের হাতেই নৃত্যের হাতেখড়ি। ইউরোপ এবং ভারতের বিভিন্ন জায়গায় নৃত্যকলা প্রদর্শন বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু মাত্র আঠারো বছর বয়সেই মোহ কেটে যায়। নৃত্যশিল্পী থেকে হতে চাইলেন সেতারবাদক। সেতার তাকে এমনভাবেই পেয়ে বসল যে কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই বড় ভাইয়ের দল ত্যাগ করে শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন ওস্তাদ আলাউদ্দিনের। উচ্চাঙ্গ সংগীতের এ ঘরানায় প্রবেশের পর রবিশঙ্করকে আর পেছন ফিরে দেখতে হয়নি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পঞ্চাশোর্ধ্ব রবিশঙ্কর ছিলেন তার খ্যাতির মধ্যগগনে। জীবনাবসনের আগে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার; পাঁচটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস, নাইটহুড, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ, এমনকি ভারতরত্ন পর্যন্ত।

অন্যদিকে জর্জ হ্যারিসনের জীবনের শুরুটা এতটা মসৃণ ছিল না। রবিশঙ্করের মতো মোটেও সচ্ছল জীবন দেখেননি। লিভারপুলের এ ছোট্ট শ্রমজীবী পরিবারটি চাইত ছোট হ্যারিসন যেন বড় সংগীতশিল্পী হয়। কিন্তু বাবা হ্যারল্ড হারগ্রিভস হ্যারিসন একজন বাস কন্ডাক্টর এবং মা লুইস মুদি দোকানের কর্মচারী। সব মিলিয়ে এমন স্বপ্ন দেখাটাও এক উচ্চাভিলাষ বইকি। তখন হ্যারিসন মাধ্যমিকের ছাত্র। পরিচয় হয় পল ম্যাকার্টনির সঙ্গে। ইতোমধ্যে পল ম্যাকার্টনি ও জন লেনন মিলে কোয়ারিমেন নামে এক ব্যান্ড দল গঠন করে ফেলেছেন। কয়েকবার নাম পরিবর্তনের ফলে পূর্ণতা পায় বিটলস। সদস্য সংখ্যা ছিল চারÑ হ্যারিসন (লিড গিটার), পল ম্যাকার্টনি (ভোকাল ও বেস গিটার), জন লেনন (ভোকাল ও রিদম গিটার) ও রিঙ্গো স্টার (ড্রাম)। মাত্র আট বছর ছিল বিটলসের পথচলা। তবু এটা মেনেই নিতে হবে সংগীতের ইতিহাসে তারা অন্যতম প্রভাবশালী রকসংগীতের যুগান্তকারী স্রষ্টা।

উনিশশ একাত্তরে যখন ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজন করা হয় তখন বিটলস ভাঙা প্রায় দুই বছর হয়ে গেছে। কনসার্টে হ্যারিসন তার পুরোনো সতীর্থদের ডাকতে ভোলেননি। শুধু আসেননি পল ম্যাকার্টনি। 

দুই.

বিটলসের পাট চুকিয়ে হ্যারিসন আবার ভারতীয় বৈদিক সংগীতের প্রতি আজীবন লালায়িত বাসনা অনুভব করতে থাকেন। আর এ টান থেকেই ষাটের দশকের মাঝামাঝি হ্যারিসন পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে দেখা করেন। রবিশঙ্কর প্রথমে কিছুটা আশ্চর্য হয়েছিলেন। কারণ পশ্চিমা রক এবং ভারতীয় সংস্কৃতির মাঝে ঠিক সামঞ্জস্যটা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ভারতীয় সংগীত মুখে মুখে হাজার বছর থেকেই চলে আসছে। আর প্রথাগতভাবে সনাতন ধর্মের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। অন্যপক্ষে হ্যারিসনের রক-এন-রোল সংস্কৃতি একেবারেই মুদ্রার ওপিঠ।

পঞ্চাশ-ষাটের দিকের মার্কিনিরা ভারতীয় সংস্কৃতিটা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। তারা ভেবেছিল ভারতীয় সংস্কৃতি অনেকটা মাদক, দ্রোহ কিংবা হিপ্পি সংস্কৃতির মতো কিছু একটা জিনিস। এ-জাতীয় মনোভাব রবিশঙ্করকে চরমভাবে আহত করে। ভারতীয় সংস্কৃতিকে খুব সস্তা ও নিচুভাবে উপস্থাপন করা হয় বলে রবিশঙ্করের দলের অন্য সদস্যরাও চরম অপমান বোধ করেন। এত কিছুর পরও হ্যারিসনের বিনয় রবিশঙ্করের মন জয় করে নিয়েছিল। ফলে বিশ্ব সংগীতাঙ্গন দেখল পূর্ব-পশ্চিমের আশ্চর্য মিলনমেলা। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে হ্যারিসনের ‘মাই সুইট লর্ড’ গানটি; যেখানে খ্রিস্টধর্মের হ্যালেলুইয়া এবং হিন্দুধর্মের ‘হরে কৃষ্ণ’ ভজনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কিংবা রাগ ‘রক’-এর উদ্ভব।

‘রবিই প্রথম ব্যক্তি, যে আমার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেনি। বরং আমিই তার দ্বারা আকর্ষিত হয়েছিলাম।’Ñ প্রথম পরিচয়ের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে জর্জ হ্যারিসন এমনটাই বলেছিলেন। আর অলিভিয়া হ্যারিসন, জর্জ হ্যারিসনের স্ত্রী, বলেছিলেন, ‘এখানে দুই স্বতন্ত্র ব্যক্তির মিলন হয়নি; হয়েছে দুই সংস্কৃতির।’

তিন.

৭ মার্চের ভাষণে মুক্তির সংগ্রামের ডাক দিয়ে ফেলেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৫ মার্চ কালরাতের ভয়াবহতা দেশিবিদেশি প্রায় সব জনপ্রিয় পত্রিকায়ই ছাপা হয়েছে। সে সময় পণ্ডিত রবিশঙ্কর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের সব খবর মার্কিন মুলুক থেকেই সংগ্রহ করছেন। মানুষ দিগ্‌বিদিক ছোটাছুটি করছে। লাশ কুকুরে চেটে খাচ্ছে। শকুন অপেক্ষা করছে। এর মাঝেই ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের বর্ডার খোলা হয়েছে। লাখো লাখো মানুষ ছুটছে। যেতে যেতে অনেকেই মারা পড়ছে। তার পরও ছুটছে। এমনকি নব্বই বছরের বৃদ্ধাও ‘চার পায়ে’ ছুটে চলেছেন। শরণার্থী শিবিরগুলো লোকারণ্য। ইন্দিরা গান্ধী শরণার্থীদের সব সহায়তা দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তবু হঠাৎ এত কিছুর ব্যবস্থা করতে ভারত সরকারও হিমশিম খাচ্ছে। এ বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধী দুই দফায় তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। এতসব ঘটনা এত দ্রুত ঘটে যাচ্ছিল যে, কোনটা ছেড়ে কোনটা নেওয়া যায়। কিন্তু ফল ছিল একটাইÑ বাংলার লাখো মানুষ মারা পড়ছে। এর একটা বিহিত দরকার ছিল। তা তো হবেই। হয়েছিলও। বাংলার দামাল ছেলেরাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর ডাকে। কিন্তু এ মুহূর্তে দরকার ত্রাণ। দরকার সাহায্যের। আর্ট অব গিভিং। এন অ্যাক্ট অব র‌্যানডম কাইন্ডনেস। রবিশঙ্করবাবুও ঠিক তা-ই করেছিলেন। শিল্পী হিসেবে কী বা করতে পারেন! কিন্তু মনটা তো বাঙালি। বাঙালির হাজার বছরের শোষণের ইতিহাস তিনি জানেন। কিন্তু এমন নৃশংসতা হয়তো কখনও কেউ দেখেনি কিংবা শোনেনি। তাই আয়োজন করতে চাইলেন কনসার্টের। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। সাহায্য চাইলেন জর্জ হ্যারিসনের। এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলেন এই সাবেক বিটলস সদস্য।

চার.

দশকের পর দশক বিভিন্ন সময় অসহায়দের সহায়তা করার জন্য কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। এ-জাতীয় কনসার্টকে বেনিফিট বা চ্যারিটেবল কনসার্টও বলা হয়। তাৎক্ষণিক সংকট বা বিপর্যয় নিরসনের জন্য এ-জাতীয় কনসার্টের আয়োজন করা হয়। আর এ তহবিল থেকে উপার্জিত অর্থ দুর্দশাগ্রস্তদের মাঝে বিতরণই এ-জাতীয় কনসার্টের মূল উদ্দেশ্য। হাটবাজারে কিংবা ঢাকার রাস্তায় বের হলেই দেখি মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমখানার জন্য অর্থ সংগ্রহ চলছে। এমনটা হয়তো প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই ঘটে চলেছে। তবে কিছু কিছু তহবিল সংগ্রহের ইতিহাস একেবারে নজিরবিহীন। যেমনটা ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’।

তবে একটু পেছন ফিরে দেখলে আমরা দেখতে পাই সুরকার জর্জ ফ্রিডারিক হেনডেল শিশুদের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছেন। তা-ও আবার ১৭৪৯ সালে, লন্ডনে। আরেকবার ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরির প্রায় ১১ লাখ সৈনিক নিহত হয়। তাদের বিধবা ও এতিম সন্তানদের সাহায্যের জন্য ১৯১৮ সালে এ কনসার্ট করা হয়। অনেক বড় পরিসরে ইউনিসেফের জন্য আয়োজিত ‘অ্যা গিফট অব সং, দ্য মিউজিক ফর ইউনিসেফ’ কনসার্টের কথা কে না জানেন। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। ২০০৪ সালে ঘটে যাওয়া সুনামির কারণে দুটি চ্যারিটেবল কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়, ‘সুনামি রিলিফ কার্ডিফ’ ও ‘সুনামি এইড’। এ ছাড়া আরও ডজনখানেক কনসার্টের নাম নেওয়া যায়। সবকটির উদ্দেশ্যই মহৎ।

পাঁচ.

‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন করা এতটা সহজ ছিল না। আগেই বলেছি পল ম্যাকার্টনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি আসবেন না। তার পরও এ কনসার্টে একটা ব্যাপক চমক ছিল, বিশেষ করে পশ্চিমা দর্শকের জন্য। কারণ বিটলসের কোটি কোটি ভক্ত তাদের দলের ভাঙন মন থেকে মেনে নিতে পারেনি। বিটলস আবার একসঙ্গে একই স্টেজে, এটা ভেবেই হাজার হাজার ভক্ত চরম উত্তেজিত ছিল। তা ছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানকে, ইয়াহিয়া প্রশাসনকে নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জার কর্তৃক প্রকাশ্যে সমর্থন মার্কিনিরা মেনে নিতে পারছিল না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বাংলাদেশের পালেই হাওয়া দিচ্ছিল। আর এ কনসার্টের পর বাংলাদেশের সংকটের কথা পৃথিবীর সব দেশে পৌঁছে যেতে থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে ইয়াহিয়া প্রশাসনের মতো মার্কিন প্রশাসনও সমানতালে হেয় হতে থাকে। মার্কিন প্রশাসন বিষয়টি দ্রুত বুঝে ফেলে। আর নিজেদের বিপদ না বাড়িয়ে সপ্তম নৌবহর প্রত্যাহার করে।

যা হোক রবি-হ্যারিসন যুগলের অনেক কাজ বাকি ছিল। জনপ্রিয় সব সংগীতজ্ঞকেই আমন্ত্রণ করা হচ্ছিল। শুরুতেই যার নাম না নিলেই নয় তিনি নোবেলজয়ী বব ডিলান। প্রথম জীবন থেকেই নৈতিক অবস্থানে ডিলান যুদ্ধবিরোধী। সেহেতু এ কনসার্টে ডিলান স্বতঃপ্রণোদিতই ছিলেন। তবে ডিলানের একটি বড় বাধা ছিল। তিনি এত দর্শকের সামনে গাইতে কখনও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। তবু এসেছিলেন এবং গেয়েছিলেন ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’।

গায়কদের মাঝে তখন জীবন্ত কিংবদন্তি এরিক ক্ল্যাপ্টন। সে সময় তার মানসিক অবস্থা খুব ভালো ছিল না। হতাশায় মাদকে ডুবে গেছেন। বছরখানেক ধরে গান করেন না। জর্জ হ্যারিসন যখন আশ্বস্ত করেন যে তিনি কনসার্টে মদ পান করতে পারবেন তখন তিনি রাজি হন। তা ছাড়া আরও অনেক গায়কই পরে যোগ দিয়ে কনসার্টটি সাফল্যমণ্ডিত করেছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় দূর থেকে ভূমিকা রেখে আত্মার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। বিলি প্রিস্টন এবং লিওন রাসেলের মতো বিখ্যাত গায়করাও উপস্থিত ছিলেন শতাব্দীর এ শ্রেষ্ঠ কনসার্টে। ভারতীয় ক্লাসিক সংগীতজ্ঞদের মধ্যে ছিলেন আকবর আলি খান এবং বিখ্যাত তবলাবাদক আল্লা রাখা।

ছয়.

এতক্ষণ যা আলোচনা হলো তা তো সবই আমাদের জানা। স্বাদে-গন্ধে নতুন কিছুই নেই এখানে। তবে একটি বিষয় আলোচনা করার জন্যই এতসব অবতারণা। যেহেতু কনসার্ট ফর বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে, সেহেতু এখন নিশ্চয়ই একটি পরিপক্ব সময় এসেছে যখন আমরা কনসার্ট ফর বাংলাদেশের ন্যারেটিভ বা বয়ান নিয়ে আলোচনা করতে পারি। তবে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে এ বয়ান আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা স্বাধীনতাকামী সত্তার মধ্য দিয়ে দেখতে হবে। নতুবা এ বয়ানটি আদর্শচ্যুত হবে। কনসার্ট কখন বয়ান হলো তার দিনক্ষণ উল্লেখ করে বলা বেশ কঠিন। তবে তা কোথায় বয়ানে রূপান্তরিত হয় তা বিস্তারিত আলোচনা করা যেতে পারে। একাত্তরের বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে বিস্তর ফারাক। বহু দিক দিয়েই তারা আলাদা। আর সংস্কৃতিতে তো বটেই। তবে আজ যে বয়ানটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই সে দিকটাতেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এখন দেখা যাক বয়ানটি কোথায় ঘটে; এক কথায় তা ঘটে ধারণক্ষম দর্শকের মনে। মানুষ তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা ভুলে যায়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ তখনও বলবৎ। সেহেতু আর কেউ যুদ্ধ চাইছিল না। কেউ আর মৃত্যু চাইছিল না। আর এসব বিভীষিকা তাজা রাখার জন্য তো এলেন গিন্সবার্গের মতো কবি কিংবা বব ডিলনের মতো কবি-গায়করা তো ছিলেনই। সেহেতু বাংলাদশে আবার যুদ্ধ, হোক না তা ছোট দেশের, সেটাকে অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। শুরুতেই উল্লেখ করেছি, ‘ধারণক্ষম দর্শকের মনে’ এ-জাতীয় বয়ান ঘটে থাকে।

তাহলে আমরা সহজেই দেখতে পাচ্ছি কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নামক চ্যারিটেবল কনসার্টটি নিউইয়র্ক শহরের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই সেই বয়ান ধারণক্ষম ছিল।

এ কথাটি অনেকাংশে ভারতের জন্যও সত্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, বিখ্যাত গায়ক আবদুল জব্বার ভারতের পথে পথে গান গেয়ে প্রায় ১২ লাখ রুপি সংগ্রহ করেছিলেন এবং তা বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে দান করেছিলেন। তা ধারণক্ষম না হলে ১২ লাখ রুপি কখনই সংগ্রহ হতো না।

ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি অতীতে দর্শক কোনো থিয়েটার, অপেরা কিংবা এ-জাতীয় কোনো অনুষ্ঠানে একটানা মনোযোগ দিতো না। যে-যার মতো ঘুরে বেড়াত। ফলে সেখানে তেমন কোনো বয়ানের সৃষ্টি হতো না। অনেকটা মদ-বারের মতো অবস্থা; একদিকে গান চলছে, কেউ জুয়া খেলছে, কেউ বা নেশায় চুর হয়ে পড়ে আছে। এ পরিস্থিতিতে নতুন কোনো বয়ান সৃষ্টি করা কার বাপের সাধ্য।

তবে সময় পরিবর্তনের সঙ্গে দর্শককে বশে আনা হয়েছে, যেন তারা চলমান বয়ানের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে। যদি এমনটা না হয় বয়ান কখনই সফল হবে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, যখন আমি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ি, তখন আমরা একটি নাটক করেছিলাম; আইরিশ নাট্যকার জন মিলিংটন সিঞ্জের ‘রাইডার্স টু দ্য সি’। সেখানে একটি লাইন ছিল, ‘আমরা এতগুলো মেয়ে এখন কীভাবে থাকব’। দর্শক সারি থেকে অতি উৎসাহী এক দর্শক উত্তর দেয়Ñ ‘আমরা আছি না’। সঙ্গে সঙ্গেই এমন এক সিরিয়াস লাইনের অর্থ বোঝার আগেই তা হাসিতামাশায় পরিণত হয়ে গেল। তাহলে এটা সহজেই অনুমেয় যে, একটি বয়ান প্রতিষ্ঠিত হতে হলে ধারণক্ষম দর্শক প্রয়োজন। একসময় ছিল যখন থিয়েটার থেকে দর্শক হইহুল্লোড় করতে করতে বের হতো। কিন্তু এখন নিভৃতে এক কোণে বসে সবাই নাটক দেখে এবং শেষে নীরবে থিয়েটার ত্যাগ করে। আর এ-জাতীয় দর্শক তৈরি করতে হয়। আগে দর্শক তৈরি করতে হবে; তারপর করতে হবে বয়ান। হাল সময়ে সৈয়দ জামিল আহমেদের নাটক পরিচালনায় এক জাতীয় বয়ানের উপস্থিতি লক্ষণীয়। আর তিনিও এক জাতীয় দর্শক সৃষ্টি করেছেন।

তাহলে এখন দেখা যাক, এ বয়ানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন কীভাবে কাজ করেছেন। আগেই বলেছি নিউইয়র্ক শহর তখন এ বয়ান শোনার জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু এখন দেখতে হবে দর্শককে শিল্পী হিসেবে রবি-হ্যারিসন যুগল কতটা অধ্যয়ন করতে পেরেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষ অনেকটা মিস্টিক হয়ে গিয়েছিল। তারা আধ্যাত্মিকতায় মুক্তি খুঁজতে শুরু করে। যার ফলে বেদ-পুরাণ-উপনিষদ ব্যাপকভাবে চর্চা হতে থাকে। তাই কায়দা করে রবিশঙ্কর কনসার্টের শুরুটা ধুন দিয়ে শুরু করেন, যা দর্শককে এক আধ্যাত্মিক ঘোরে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। ভুলভাবে হলেও ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল সে সময়। কথায় কথায় স্বামীজি কিংবা ঋষি-মুনিদের উদ্ধৃতি দেওয়া ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল।

এ পথ মসৃণ করার জন্য কবিগুরু কিংবা টি এস এলিয়টের মতো কবিরা বেশ ভূমিকা রেখেছেন। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বিচ্ছেদ ও মিলনের।

আগেই বলেছি এ বিচ্ছেদ বিটলস সমর্থকরা মেনে নেয়নি। সেহেতু বিচ্ছেদের পর মিলন ব্যাপক চমক। এমন চমক আছে ভার্জিলের ‘ইনিড’ মহাকাব্যে; যখন পাতালপুরীতে ইনিয়াস তার পিতা এঙ্কাইসাসের সঙ্গে দেখা করে, তখন মহাকাব্য এক করুণ রসে সিক্ত হয়। আবার বেহুলা যখন লখিন্দরকে ফিরে পায় তখনও ঠিক একই আবহ সৃষ্টি হয়।

হারানো বিটলসকে ফিরে পেয়ে দর্শকও আত্মহারা। আর লোকপ্রিয়তা কিংবা কনসার্টটি ভিন্নমাত্রা দেওয়ার জন্য অন্য সংগীতজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।

পরিশেষে এটা বলাই যায়, কনসার্ট ফর বাংলাদেশ রবিশঙ্করের মানসপুত্র। আর হ্যারিসন তার পালকপিতা। আর কনসার্ট নিজেই এক সফল সন্তান যে কি না পিতাযুগলের মান রেখেছে চলেন, বলনে, বয়ানে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা