ইভান অনিরুদ্ধ
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৪:৪৩ পিএম
শহর এখন পুরোপুরি পাক বাহিনীর দখলে। নেত্রকোণা সরকারি কলেজের ফাঁকা হোস্টেলে তারা ক্যাম্প করেছে। সন্ধ্যা হলেই ছোট্ট এ মহকুমা শহর মিলিটারির আতঙ্কে গোরস্থানের মতো নীরব হয়ে যায়। সব বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যায় একটা ভুতুরে চেহারা পায় শহরটি। সবাই একটা দমবন্ধ পরিবেশে সময় পার করছে। নিজের নিঃশ্বাসের আওয়াজও নিজের ভেতর অস্বস্তি ধরিয়ে দেয়! তিন দিন হলো ময়মনসিংহ থেকে পাঁচ ট্রাক মিলিটারি মোক্তারপাড়া ব্রিজ পেরিয়ে সদর্পে শহরে ঢুকেছে। যোগেনবাবু সন্ধ্যায় টিউশনি থেকে ফিরছিলেন। এত তাড়াতাড়ি এই গ্রামের মতো মহকুমা শহরে পাক বাহিনী চলে আসবে তা তার ধারণায় আসেনি। তিনি রাস্তার ধারে বদরুলের টং দোকানের পেছনে নিজেকে আড়াল করে এক অজানা শঙ্কায় জলপাই রঙের পাঁচটি ট্রাকের চলে যাওয়া দেখলেন।
বাড়ি ফেরার পথে যোগেনবাবু একটি সিগারেট ধরালেন। দ্রুতপায়ে হাঁটছেন তিনি আর ঘন ঘন সিগারেটে টান দিচ্ছেন। ঘরে তার বৃদ্ধা মা আরতি দেবী, স্ত্রী রমা আর তার বড় ভাইয়ের মেয়ে রেণু। রেণু সরকারি কলেজে আইএ প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছে এবার। রমার বাচ্চা হবেÑ সাত মাস চলছে। যোগেনবাবু ভাবছিলেন, যুদ্ধ তো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন কতদিন চলবে তা কে জানে? তবে ঢাকায় রমনা ময়দানে শেখ মুজিব বাঙালিদের মনে স্বাধীনতার যে মন্ত্র ঢুকিয়েছেন তাতে আজ হোক, কাল হোক এ দেশ স্বাধীন হবেই। তিনি নিজেকে প্রশ্ন করলেনÑ আচ্ছা, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটা শেখ মুজিবের নামের আগে না দিয়ে যদি অন্য কোনো নেতাকে দেওয়া হতো, তাহলে কি তা এতটা জুতসই হতো? মোটেই না, এক্কেবারেই না। যোগেনবাবু মনে মনে বঙ্গবন্ধুর মঙ্গল কামনায় ওপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করলেন। রমা যোগেনবাবুর দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী টাইফয়েডে মারা যাওয়ার পর তিনি ঠিক করেছিলেন আর বিয়ে করবেন না। স্কুলের চাকরি আর টিউশনি করেই জীবনের নিঃসঙ্গতা দূর করে দেবেন। কিন্তু মায়ের চাপে, বংশরক্ষার তাগিদে বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় বিয়েটা করতে হলো। বড় ভাই তিন বছর আগে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেছেন। ভাইয়ের শোকে বউদিও বছর দেড়েক হলো গত হয়েছেন। তাই বাপ-মা মরা রেণুর দায়িত্বও তিনি নিজের মেয়ের মতো পালন করছেন।
নেত্রকোণা শহরের এ বাড়িটা যোগেনবাবুর পৈতৃক। এক কাঠা জমির ওপর এল প্যাটার্নের বড়সড় একটা টিনের ঘর। সামনের অর্ধেকটা জুড়ে উঠান। উঠানের এক পাশে বারোমাসি এলাচি লেবুর গাছ। পাড়াপড়শি অনেকেই আসে এ গাছের এলাচিগন্ধী লেবু নেওয়ার জন্য। কোনো কারণে যোগেনবাবুর মন খারাপ হলে এ লেবু গাছের কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। লেবু ফুলের ঘ্রাণ তার এত ভালো লাগে যে বোঝাতে পারবেন না। অনেকের অনেক রকম ফুল প্রিয় হয়। কিন্তু তার লেবু ফুল খুবই প্রিয়। জুলাইয়ের এ ভ্যাপসা গরমেও তিনি বাইরে থেকে বাড়িতে ঢোকার সময় কিছুক্ষণের জন্য লেবু গাছটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটা ছোট ডাল টেনে লেবু ফুলের ঘ্রাণ শোঁকার চেষ্টা করলেন। কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। তিনি বিড়বিড় করে লেবু গাছটার দিকে তাকিয়ে বললেন, আহা, আজ রাতে একটা ঝুমবৃষ্টি নামলে খুব ভালো হতো। তখন রমাকে নিয়ে অনেকক্ষণ সেই বৃষ্টিতে ভিজতেন। রমা হয়তো রাজি হতো না তার এ পাগলামিতে। কিন্তু তিনি জোর করেই তাকে ঘরের বাইরে নিয়ে আসতেন। তারপর জোরে আওয়াজ করে গাইতেন রবীন্দ্রনাথের সেই গানটাÑ ‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে ...।’
দুই
ঘরে ঢুকতেই রমা খুব উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, শহরে নাকি মিলিটারি এসেছে? যোগেনবাবু কিছুটা বিরক্তি নিয়ে রমার দিকে তাকালেনÑ হুম, তাই তো দেখলাম। পাঁচটা ট্রাক ভরে মিলিটারি শহরে ঢুকেছে। সরকারি কলেজের হোস্টেল দখল করে ক্যাম্প করেছে। পাশ থেকে রেণু জিজ্ঞেস করল, কাকা, তাহলে কলেজ কি বন্ধ থাকবে? যোগেনবাবু তার ভাতিজির দিকে মুচকি হেসে উত্তর দিলেন, মারে, জান যদি না বাঁচে তাহলে কলেজ আর পড়াশোনা দিয়ে কী হবে? আগে আমাদের জান বাঁচাতে হবে।
রাতে খাওয়ার সময় দরোজায় মৃদু কড়া নাড়ল কেউ। রেণু গিয়ে দরোজা খুলে দিল। যোগেনবাবুর প্রতিবেশী আবদুস সালাম সাহেব ঘরে ঢুকলেন। তিনি মহকুমা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। যোগেনবাবুর বাড়ির দেয়াল লাগোয়া তার বাড়ি। ভালোমন্দ যেমনই হোক, যোগেনবাবুর মা বলেন, প্রতিবেশী আর ঘরের বউ বদল করা যায় না। মিলমিশ করেই থাকতে হয়। সালাম সাহেব সরাসরি ভেতরের ঘরে চলে এলেন। আরতি দেবী তার নাতনিকে বললেন, রেণু, তোর কাকাকে একটা থাল ধুয়ে ভাত বেড়ে দে। সালাম সাহেব ব্যস্ত হয়ে বললেন, মাসিমা, আমি এখন খাব না। ঘণ্টাখানেক আগে যে খাবার খেয়েছি তা এখনও গলা পর্যন্ত আটকে আছে। পাকিস্তানি মেজর আমাকে ডেকেছিল। এলাকার পরিস্থিতি জানতে চেয়েছে। কোন এলাকায় কতজন হিন্দু আর মুক্তিবাহিনীর লোক আছে তার একটা লিস্ট দিতে বলল! তার সঙ্গেই এক টেবিলে বসে খাওয়াদাওয়া করে এলাম। এ কথায় ঘরের সবাই বজ্রাহতের মতো সালাম সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি হাসিমুখে বললেন, আপনারা হলেন আমার আপনজন। ঘরের সঙ্গে ঘর, অনেক দিনের সম্পর্ক। আমাকে ভুল বুঝবেন না। পরিস্থিতি খুব খারাপ, কার ভাগ্যে কখন কী ঘটে বলা যায় না। আমি বলি কি, আপনারা আপাতত শহর ছেড়ে অন্য কোথাও নিরাপদ জায়গায় চলে যান। পরিস্থিতি ভালো হলে আবার বাড়িঘরে ফেরত আসবেন।
যোগেনবাবু ভাত রেখে উঠে পড়েছেন। তিনি অসহায়ের মতো সালাম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, এ অবস্থায় কোথায় যাব? গ্রামে গিয়ে থাকাও কি নিরাপদ এখন? সালাম সাহেব উত্তরে বললেন, তা ঠিক, সব জায়গায়ই সমান বিপদ। তার চেয়ে বরং আরেকটা কাজ করেন। শুনেছি আপনাদের কলকাতায় আত্মীয় আছে। কলমাকান্দা বর্ডার পার হয়ে ওপারে চলে যান। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। যুদ্ধ শেষ হলে আবার দেশে ফিরে আসবেন। সালাম সাহেবের এ কথায় আরতি দেবী ধরা গলায় বললেন, নিজের ভিটেমাটি, ঘরবাড়ি রেখে আরেক দেশে যাব বাবা? এ বাড়ি, এ সংসারের জিনিসপত্র কার কাছে রেখে যাব? রমা আর রেণু কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। যোগেনবাবুর চোখের ইশারায় তারা থেমে গেল। তিনি সালাম সাহেবকে বললেন, যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে ভাই। আপনি যেহেতু মুসলিম লীগের নেতা, তাই এখন বিপন্মুক্ত আছেন। এ কারণে আপনাকে বিশ্বাস করে সবকিছু আপনার জিম্মায় রেখে যেতে চাই। প্রতিবেশী হিসেবে আমরা কেউ কারও অমঙ্গল চাই না। আপনি কথা দিলে আমরা আগামীকালই ওপারে চলে যেতে চাই।
ঘরের পরিবেশ পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। আর সেই বিশাল ভারী পাথরের নিচে যেন চাপা পড়েছে যোগেনবাবুর পরিবার। রেণু কিছুক্ষণ ফুঁপিয়ে কেঁদে এখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আরতি দেবী বিলাপ করে কাঁদছেন। কেবল রমা সালাম সাহেবকে বলল, ভাই, আপনি কেবল আমাদের প্রতিবেশী নন, আমার আপন ভাইয়ের মতো। তাই সবকিছু আমানত হিসেবে আপনার কাছে দিয়ে গেলাম। সালাম সাহেব যোগেনবাবুর হাত চেপে ধরে বললেন, আল্লাহর কসম খেয়ে বলছি, আমার ওপর আপনাদের যে বিশ্বাস, সে বিশ্বাসের অমর্যাদা এবং আমানতের খেয়ানত আমি জান থাকতে করব না। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
সারা রাত যোগেনবাবুর পরিবারের কেউ ঘুমায়নি। কী যে এক মরণযন্ত্রণায় মানুষগুলো ছটফট করেছে তা কেবল ওপরওয়ালাই জানেন! ভোরবেলা থেকেই কেবল যতটুকু সহায়সম্বল সঙ্গে নেওয়া যায় তাই গোছগাছ করল সবাই। এ পাড়ায় এখন কেবল তিন ঘর হিন্দু পরিবার আছে। আগে আরও বেশি ছিল। পরিস্থিতির কারণে সবাই দেশ ছেড়ে ওপারে চলে গেছে। কিন্তু যোগেনবাবু প্রতিজ্ঞা করেছিলেন নিজের জন্মভিটা, দেশ ছেড়ে কোথাও যাবেন না। কিন্তু আজ তার সে প্রতিজ্ঞা মিথ্যা হয়ে গেল। যেন নিজের কাছেই হেরে গেলেন। তবে যুদ্ধের এ রকম ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে হেরে যাওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ যে খোলা নেই। বৃদ্ধা মা, অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী, কলেজ পড়ুয়া ভাতিজি এদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টা এ মুহূর্তে তার কাছে সবার আগে। শেষমেশ এতগুলো প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই যোগেনবাবুর পরিবার যুদ্ধের এ বিভীষিকাময় পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে বর্ডার পার হয়ে কলকাতা চলে গেল।
যোগেনবাবুর পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকেই সালাম সাহেব খুব ফুরফুরা মেজাজে আছেন। চোখের সামনে তার প্রতিবেশী ভয়ে দেশ ছেড়েছে। ঘরবাড়ি তার জিম্মায় দিয়ে গেছে। তার ভেতরের গোপন ইচ্ছার কথা তো আর এ অসহায় প্রতিবেশী আঁচ করতে পারেনি! এসব ভেবেই তার মনের ভেতর এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ খেলা করছে এখন। সারা দেশের মানুষ যখন স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, লড়াই করছে, প্রাণ দিচ্ছে তখন এ সালামের মতো হাতেগোনা কিছু মানুষরূপী শয়তানই কেবল আনন্দে মেতে আছে। মিলিটারির কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। খুব উৎসাহ নিয়ে তিনি এবং তার লোকজন শহরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোকদের তালিকা মিলিটারি ক্যাম্পে দিচ্ছেন। সে তালিকা ধরে ধরে পাক বাহিনী শহরে অভিযান চালাচ্ছে। মুক্তিবাহিনী এখনও এ দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেনি। তবে সহসাই তারা শহরে ঢুকে হয়তো এদের ক্যাম্পে গেরিলা আক্রমণ চালাবে।
সারা দেশে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। মাসখানেকের ভেতর এক রাতে মুক্তিবাহিনীর তিনটি সশস্ত্র গেরিলা দল পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্পে আক্রমণ চালায়। তুমুল যুদ্ধের ভেতর দিয়ে একদিন নেত্রকোণা শহর পুরোপুরি দখল করে নেয় মুক্তিবাহিনী। সালাম সাহেব সুযোগ বুঝে শহর ছেড়ে পালিয়ে কোনো এক গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেন। মুক্তিবাহিনীর লোকেরা তার বাড়ি এসে হামলা করে। তাকে না পেয়ে ঘরবাড়ি ইচ্ছামতো ভাঙচুর করে চলে যায়।
তিন
দেশ স্বাধীন হওয়ার সাড়ে পাঁচ মাস পর যোগেনবাবু কলকাতা থেকে নিজের ভিটায়, নিজের প্রিয়তম এ শহরে ফিরে এলেন। তিনি এখন একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জয়লাভ করা স্বাধীন দেশের নাগরিক। তার ভেতরে বাঁধভাঙা উল্লাস। তিনি আপাতত একাই এসেছেন। তার ফুটফুটে একটি ছেলে হয়েছে। কয়েক দিন পর তিনি পরিবারের অন্য সবাইকে নিয়ে আসবেন। যোগেনবাবু স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে উদ্ধত ভঙ্গিতে নিজের উঠানে পা রাখলেন। তিনি দেখলেন, উঠানের মাঝখানে যে তিন হাত উঁচু সীমানাপ্রাচীর ছিল তা নেই। এলাচিগন্ধী লেবু গাছটা নেই, তুলসী গাছটা নেই। তার মনে হলো এ কোন ভিটায় তিনি ফিরে এলেন! কার উঠানে পা রাখলেন!
যোগেনবাবু সালাম সাহেবের অপেক্ষায় অনেকক্ষণ ঘরের বারন্দায় বসে রইলেন। তার ঘরের দরোজায় অন্য দুটি তালা ঝুলছে, যার চাবি সালাম সাহেবের কাছে। তবে সালাম সাহেবের বাড়ি থেকে কেউ উঁকি দিয়েও দেখল না যোগেনবাবুকে। নয় মাসের যুদ্ধ কেমন করে বদলে দিয়েছে সব তা-ই ভাবছেন তিনি বসে বসে। যুদ্ধের কত অসীম ক্ষমতা! বেশ কিছুক্ষণ পর সালাম সাহেব ফিরলেন। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, মুখে মেহেদি দেওয়া চাপদাড়ি, চোখে সুরমা আর মাথায় জিন্নাহ টুপি। এ এক অন্যরকম সালাম সাহেব! যোগেনবাবু তার দিকে এগিয়ে গেলেন কিন্তু সালাম সাহেব তার চিরচেনা প্রতিবেশীকে যেন চিনতে চাইলেন না ইচ্ছা করেই! যোগেনবাবু যা বোঝার তা বুঝে নিয়েছেন। যে সালাম সাহেব একাত্তরে যুদ্ধের সময় নেত্রকোণা মহুকুমা মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন, সেই সালাম এখন ভোল পাল্টে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ দলের নেতা হয়ে গেছেন। আল্লাহর কসম খেয়ে যে লোক তার ভিটেমাটির জিম্মাদার হয়েছিলেন, সেই লোক এখন তার ভিটেমাটি দখল করে নিজের মতো করে বাড়ি সাজিয়েছেন।
কারও কাছে বিচার না দিয়ে যোগেনবাবু বাড়ির ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। চোখেমুখে অক্ষমতার নির্মম ছাপ এঁকে অসহায়ের মতো বাড়িটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার প্রিয় জন্মভূমি পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হলো অথচ নিজের ভিটা দখল হয়ে গেল আমার সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীর দ্বারা। হে ভগবান, তুমি একদিন এর বিচার কোরো!
শেষবারের মতো যোগেনবাবু শহরের বুক চিড়ে বয়ে চলা মগরা নদীর পারে এসে দাঁড়ালেন। কি স্বচ্ছ সেই নদীর জল! মাথার ওপর তারাজ্বলা আকাশ। রাতের অন্ধকার চারপাশে যেন একটা কালো চাদর মুড়ি দিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। এ রকম অন্ধকারেও যোগেনবাবু যেন তার ছেলের হাসিমুখটা দেখতে পেলেন!