বিপ্লব বড়ুয়া
প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৩:৫৩ পিএম
প্রকৃতি হচ্ছে এমন এক সম্পদ যেটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনাচারের অনেক ঊর্ধ্বে। প্রকৃতির দান অকল্পনীয়, বিস্ময়কর। প্রকৃতির আলো-আঁধারে নিত্য বয়ে চলে মানুষের জীবনের গতি। প্রাকৃতিক বিচিত্রতা আছে বলেই মানুষ আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মবিশ্বাসী এবং পরিবর্তনশীল। প্রকৃতির ধর্ম হচ্ছে পরিবর্তন। পরিবর্তনের ধারায় যুগপৎভাবে এগিয়ে যাওয়ার নামই হচ্ছে জীবন। জীবন পরিশুদ্ধতায় রূপ দিতে হলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা চাই। আমাদের বুঝতে হবে প্রকৃতির রূপ হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময় ও কালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যে বিষয়ের মধ্যে বৈচিত্র্যের প্রভাব অনুপস্থিত তার স্থায়িত্বকাল অত্যন্ত ক্ষীণ।
ড. কুন্তল বড়ুয়া বাঙালি মনন চেতনার একজন সার্থক উত্তরাধিকার। তার লিখিত গ্রন্থের নাম ‘প্রসঙ্গ : চাকমা নাটক’। তিনি বিষয়ের খুঁটিনাটি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠা মানুষের জীবনযাপন খুব কাছ থেকে অবলোকন করেছেন এবং সে দৃশ্যপটগুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সাহিত্যের রূপমাল্যে গেঁথে পাঠোপযোগী করে তুলেছেন; যা ইতিহাসের অনন্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
ভিন্ন ধাঁচ ও রুচির বইটি হাতে নিয়ে যখন উল্টেপাল্টে দেখছিলাম তখন মনে হলো কেমন করে লেখক এ রকম একটি বিষয় গবেষণার জন্য বেছে নিলেন। সংস্কৃতি ও দেশপ্রেম ছাড়া এ ধারার শ্রমসাধ্য কাজ কখনও সম্ভব নয়। গ্রন্থটি পাঠের মাধ্যমে ঋদ্ধ হলো আমার নবচৈতন্যের অভিজ্ঞতার ঝুলি। আসলে নতুন স্বাদ, নতুন গন্ধের সন্ধান পেলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করার চেষ্টা করি। চাকমা নাটক গ্রন্থটি তেমনি একটি। গোগ্রাসে গেলার প্রেরণায় বইয়ের বেশ কিছু অংশবিশেষ পাঠ করতে সক্ষম হই। গ্রন্থটির বিষয়বস্তু কী হতে পারে তা নামের মধ্যেই সহজে অনুমেয়। চাকমা জনগোষ্ঠীর নাটকের উপাখ্যান তুলে আনতে গিয়ে একটি জীবনসংগ্রামী জাতির চিত্র এ গ্রন্থটিতে খুঁজে পেয়েছি; যা ইতঃপূর্বে তেমনভাবে গ্রন্থিত হয়নি। লেখক একজন শিক্ষক, নাট্যকর্মী এবং সমতলীয় বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাতেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কিন্তু কীভাবে তিনি এ দুর্বোধ্য নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা অর্জন করলেন, তা-ও এক বিস্ময় বটে।
লেখক চাকমা সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনধারণের ভিন্নমাত্রিকতার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় যে, তিনি এ বিষয়ের ওপর পিএইচডি করেছেন। লেখক একদিকে নাট্যকলার শিক্ষক আবার অন্যদিকে নাট্যকার ও প্রশিক্ষক। ‘কথাসুন্দর’ নাট্যদলের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। সে কারণে তিনি বিষয়বস্তুর অনেক গভীরে প্রবেশ করে শেকড় তুলে আনার চেষ্টা করেছেন এবং এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। ১৯৮১ সালে ‘গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে চট্টগ্রামের সংস্কৃতিজগৎ সমৃদ্ধ করেছেন এবং অদ্যাবধি নিজেকে চলমান রেখেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের জনপ্রিয় শিক্ষক ড. কুন্তল বড়ুয়া যখন আলাপ-মশগুলে ডুবে থাকেন তখন তার মুখে বাংলা ভাষার শব্দচয়নের সৌন্দর্য কত যে মহিমামণ্ডিত রূপে ভেসে ওঠে, এ গুনিজনের সংস্পর্শে না গেলে তা টের পাওয়া যাবে না। চাকমা বা অন্য নৃ-গোষ্ঠীর বিচিত্রতার সঙ্গে মিশে গিয়ে অমূল্য রত্ন বের করে আনতে সক্ষম হয়েছেন। লেখক আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন এভাবেÑ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী থেকে চাকমা সম্প্রদায় অনেক অগ্রসর শিক্ষাদীক্ষায় ও সংস্কৃতিতে; কিন্তু আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয়ে অকৃত্রিমতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে ফেলেছে। এতে শুধু একটা সম্প্রদায়ের নয়; গোটা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতির ক্ষতি বলে লেখক ইঙ্গিত করেছেন। ইতিহাসের নবসংযোজন নব উন্মেষের পথিকৃৎ কুন্তল বড়ুয়ার প্রসঙ্গ : চাকমা নাটক গ্রন্থ। গ্রন্থে লেখক নয়টি গবেষণালব্ধ প্রবন্ধের মাধ্যমে চাকমা সম্প্রদায়ের ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়েছেন। ১. প্রাচীন চাকমা আখ্যানপালা গেংগুলীগীদ-এর প্রয়োগরীতি : সমকালীন ভাবনা। ২. চাকমা নৃ-গোষ্ঠীর নাট্য-আখ্যানে আচারিত লৌকিক-ধর্ম বিশ্বাসের প্রভাব। ৩. সমকালীন চাকমা নাটক : লোকসাহিত্য ও প্রয়োগভাবনা। ৪. চাকমা সম্প্রদায় : নৃত্যাচার ও কৃত্যাচার। ৫. সমকালীন চাকমা নাটকে উপস্থাপিত সমাজভাবনা। ৬. জুম ইসথেটিকস্ কাউন্সিলের ৪০ বছর। ৭. কিংবদন্তি শিল্পী গেংখুলি রমণী মোহন চাকমা। ৮. চাকমা সম্প্রদায়ের নাট্যকার ও তাদের নাটক। ৯. চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নাটকের আলোকচিত্র। গ্রন্থে লেখক বেশ কিছু শিল্পী ও নাট্যকারের জীবনকথা এবং নাট্যশিক্ষা ও নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িতদের পরিচয় তুলে ধরেছেন।
পাঠক যাতে সহজে বুঝতে সক্ষম হন তার জন্য ফোর কালারের ছবি সংযুক্ত করে আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী করেছেন। ১৭৬ পৃষ্ঠার বইয়ের মূল্য ৪০০ টাকা। বইটি প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের অভিজাত প্রকাশনা সংস্থা ‘খড়িমাটি’। প্রচ্ছদ করেছেন আলোকচিত্রী জাবের আহমেদ চৌধুরী। আশা করি গ্রন্থটি ইতিহাস অনুসন্ধিৎসু পাঠকের মন জয় করবে।