মঈন শেখ
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:৩৪ এএম
গল্পের গল্প
হঠাৎ বুকের বাঁ পাশটা ভারী হয়ে উঠল। ইদানীং অল্পতেই এমনটা হচ্ছে। আজ একটু বেশি। ভারী অবশ্য পুরো জুলাই মাস ধরেই। মধ্য জুলাই থেকে যা জগদ্দল হয়েছে। সে ভারী বুকটাই হঠাৎ আঁচকেচে উঠল। জোরে জোরে বাতাস টেনেও হালকা হচ্ছে না বুক। আমার তো বুকের ব্যামো ছিল না। এ কদিনে হলো কি না জানি না। কেন যে ভিডিওটা দেখলাম? এমনিতেই আবু সাঈদ, মুগ্ধরা গেঁথে আছে এ পাতলা বুকে। এখন আরও একজন যোগ হলো। না দেখলেই ভালো হতো। অবশ্য না দেখেও উপায় নেই। মোবাইল খুললেই এমন ভিডিও, এমন খবর ভেসে ওঠে ডাহুকের মতো।
সাঁজোয়া যান থেকে ছেলেটিকে যখন রাস্তায় ফেলে দেওয়া হলো, তখন সে পড়ল গাড়ির গা-ঘেঁষে। ডান হাঁটু ওপরে তুলে আর বাঁ পা মুড়িয়ে আরাম করে শুয়ে পড়ল ছেলেটি। যেভাবে আমার শ্বশুর ঘুমান। ইদানীং আমার ছেলেটাও ঘুমায় একই ঢঙে। আমরা দুজন ছেলের ঘুমানো দেখে হেসে বলি, ঠিক নানার মতো ঘুমায়। ঢাকার রাজপথে ছেলেটি সেভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল। তার শুয়ে পড়া দেখে পুলিশ নিশ্চিন্ত হয়ে গাড়ির দরজা দিতে গেল। দরজা টানতে গিয়ে একবার তাকাল ছেলেটির দিকে। তারও বোধহয় এমন বয়সি একটি ছেলে আছে। না হলে ভাই। দরজা লাগানো হলো না তার। ছেলেটির উঁচিয়ে থাকা পা লেগে আছে গাড়ির পেছনের চাকার সঙ্গে। গাড়ি টান দিলেই চাকা নির্ঘাত উঠবে হাঁটুর ওপর। ক্ষিপ্র জনতার তখন এটাও একটা ইস্যু হবে। তারা স্লোগান দিয়ে বলবে, ছেলেটিকে পুলিশ ইচ্ছা করেই গাড়িচাপা দিয়েছে। বুদ্ধিমান পুলিশ ছেলেটিকে বাহু ধরে টেনে খানিক দূরে সরিয়ে দিল। আর তখনই নড়ে উঠল ছেলেটি। যেন গভীর ঘুম ভাঙিয়ে দিল কেউ। ছেলেটি সেই অভিমানে পিঠসহ বুক দুবার ওপরের দিকে তোলবার চেষ্টা করল আহ্লাদি ঢঙে। ঘুমটা সত্যিই গভীর ছিল। আবার ঘুমিয়ে পড়ল ছেলেটি। গভীর ঘুম। আর সেটা দেখেই বুক ফুলিয়ে চলল সাঁজোয়া যান।
গল্প
ইয়ামিন। শাইখ আশ-হা-বুল ইয়ামিন। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে গণনাযন্ত্র বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে লেভেল ৪-এ অধ্যয়নরত। এটা জেনে মনটা আরও ভারী হয়ে উঠল। মন ভারী হলে নাকি তার গতি আরও বাড়ে। দিগ্বিদিক ছুটে বেড়ায়। অদৃশ্য মন সদৃশ হয়ে লাফ দিয়ে উঠল। উন্মাদের মতো সে ছুটতে লাগল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অগ্নিগর্ভ সারা দেশ। রাজপথ, অফিস, থানা সবকিছু টগবগিয়ে ফুটছে। ফাঁপরে সময়ের মধ্যেই ঘুরে বেড়ায় মন। নোলক কবিতার কথা মনে এলো। দেশজুড়ে মন খুঁজে বেড়ায় হারানো নোলক। মন ছুটে গেল এমআইএসটিতে। সেখানে গিয়ে মন চিটচিটে অন্ধকারে ডুবে গেল। দুমড়ে মুচড়ে গেল। শত শত ইয়ামিন ক্যাম্পাসজুড়ে। সবার চোখে মুখে বিষণ্নতা। কেউ মোবাইল নিয়ে ইয়ামিনকে দেখছে। কেউ তার দেওয়া বিভিন্ন পোস্ট পড়ছে। ক্যাম্পাসের কোণে বসে ইয়ামিনের এক বন্ধু মোবাইলে কী একটা পড়ছে আর বারবার চোখের জল মুছছে। মন ছুটে গেল সেখানে। সে তখন পড়ছে ইয়ামিনের দেওয়া প্রতিবাদী পোস্ট। পোস্টে ইয়ামিন বলছে, ‘আমি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থী। চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য যদি আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে কোনোভাবে হেনস্থা করে, হুমকি দেয় বা বহিষ্কার করে দেয়; সে ক্ষেত্রে আমরা সম্মিলিতভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য সকল প্রকারের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করার ঘোষণা দেব। খুব মন দিয়েই পড়ছিল ছেলেটি। তার পেছনে আরও কয়েকজন দাঁড়িয়েছে। পড়া শেষ করে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। দোস্ত, তুইতো আমাদের মাঝ থেকেই নিজেকে সরিয়ে নিলি, পচা সমাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলি। আমরা এখন কার প্রতিবাদী কণ্ঠ শোনার জন্য কান পেতে থাকব। সব ন্যায্য অধিকার নিয়ে কর্তৃপক্ষের সামনে গিয়ে কে গলা তুলবে? আমরা যে দিশাহারা। খানিক দূর থেকে আরও একজন উঠে এসে তার কাঁধে হাত রাখল। আসা ছেলেটি বলল, না বন্ধু, ইয়ামিন আমাদের ছেড়ে যায়নি। ইয়ামিন আমাদের মাঝে আরও বেশি করে জেঁকে বসেছে। দ্যাখ, আমরা সবাই এখন তারই কথা ভাবছি। ইয়ামিন আমাদের মাঝ থেকে, এ আন্দোলনের মাঝ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়নি। সে আমাদের সামনে আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। ভালো করে দ্যাখ, ইয়ামিন বিজয় পতাকা নিয়ে গলা তুলে ডাকছে। চল আমরা মিছিলে যাই। আমরা সবাই ইয়ামিন। এক ইয়ামিন চলে গেছে কিন্তু লক্ষ ইয়ামিন এখন ওই এপিসি গাড়ি দখল করবে। চল সবাই। কথাটা বলতেই হুড়হুড় করে সবাই বেরিয়ে গেল ক্যাম্পাস থেকে। থাকল শুধু ইটপাথরের দালান আর পাথর হয়ে দেখতে থাকা কয়েকজন।
সর্বগ্রাসী ফেসবুক যেন আর গ্রাস করতে পারছে না। এ ছবিগুলো, এ ভিডিওগুলো আর ধারণ করতে পারছে না তার বিশ্বময় বুকে। সে বারবার উগরে দিতে চায় রক্তক্ষরা জুলাইয়ের দৃশ্য। ফেসবুক বারবার ভাসিয়ে তোলে একে ওকে, নানা ঘটনা। এখন ভাসিয়ে তুলছে ইয়ামিনকে। ফেসবুক কোনোভাবেই তাকে ধরণ করতে পারছে না। ইয়ামিন বড়ই ওজস্বী। ফেসবুকে এখন ভাসছে ইয়ামিনকে সাঁজোয়া যানের ভেতর থেকে টেনেহিঁচড়ে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য।
রাজপথের ডিভাইডারের গা-ঘেঁষে অলস ঢঙে চলছে এপিসি। যার ছাদে হাত-পা ছড়িয়ে আকাশমুখী শুয়ে আছে ইয়ামিন। শহরের অনেক অলিগলি ঘুরে ঘুরে এপিসি এবার ক্লান্ত। তবে জিরোবার জায়গা খুঁজে পায় না যেন। এখন পেল। এ জায়গা কিছুটা ফাঁকা বোধহয়। হঠাৎ থামল গাড়ি। ট্যাংকের পেছনে লাল আলো দুটি আরব্য রজনির দৈত্যের আগুনে চোখ হয়ে জ্বলছিল। কালচে নীল রঙের ট্যাংকের শরীরে লেখাÑ ঢাকা জেলা-১৪। সব শক্তি এক করে কয়েকজন পুলিশ ইয়ামিনকে ছুড়ে দিল। পাতলা ফিনফিনে আর লম্বা নিথর শরীরটা ঝুপ করে পড়ল পিচঢালা রাস্তায়। আমার মনে পড়ল খানিক আগে দেখা মোহাম্মদ হযরত আলীর টাইমলাইনে লেখা একটি পোস্টের কথা। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ইয়ামিনকে মনে আছে তো? ট্যাংকের ওপর থেকে আবর্জনার মতো যে ছেলেটাকে ফেলে দিয়েছিল, যে তখনও বেঁচে ছিল, দুমড়ে মুচড়ে নিচে পড়ে আরও কত ফ্র্যাকচার হলো, তার পরও টেনে নিয়ে গিয়ে রোড ডিভাইডারের ওপারে তুলে আবার ফেলে দিল একটা বাচ্চাকে, একটা মানুষের বাচ্চাকে! আল্লাহর আরশ কি কেঁপে ওঠেনি!!
ওই ভিডিওটা দেখে কান্না করেনি এমন মানুষ কম আছে। যখন ফেলে দিচ্ছিল, তখনও ছেলেটা জীবিত ছিল। সেই ছেলেটার নাম ইয়ামিন। শহীদ ইয়ামিন।’ আলীর এ পোস্টটি পড়েই ইয়ামিনকে ফেলে দেওয়ার ভিডিওটা দেখছি এখন। হ্যাঁ, তাকে আবর্জনার মতোই ফেলে দিচ্ছিল। আমার মনে এলো শৈশবে দেখা আবর্জনা ফেলার দৃশ্যটা। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ময়লা ফেলা গাড়িগুলো শহর থেকে ময়লা নিয়ে গিয়ে শহরের বাইরের গর্তে কীভাবে ফেলত। কীভাবে নানা ময়লার সঙ্গে কলার গাছকেও লম্বা পাতা ধরে টেনেহিঁচড়ে ছুড়ে ফেলত পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা।
কোন মিছিল থেকে ইয়ামিনকে তুলেছে কে জানে। পুলিশের শরীরে শক্তি বোধহয় খুব একটা ছিল না। প্রথম দফায় দূরে ফেলতে পারল না। ইয়ামিনের এক পা ঠেকে থাকল সাঁজোয়া যানের চাকার সঙ্গে। তার নীরব নিথর পা-ই যেন আটকে দিল গাড়িকে, পুলিশকে। নাঃ, ছেলেটা খুবই জ্বালায়। গাড়ি থেকে নামতে বাধ্য হলো পুলিশ। ইয়ামিনের বাঁ বাহু ধরে এবার আছাড় দিয়ে ফেলল। তাদের রাগ কিছুটা মিটল বোধহয়। হাত ঝেড়ে পুলিশ যখন গাড়িতে উঠল তখনই ইয়ামিন নড়ে উঠল। মারা গেছে ভেবে ফেললেও ইয়ামিন তখনও মরেনি। শেষবারের মতো প্রতিবাদ করল। পাতলা বুকটা দুবার আকাশের দিকে তুলল হেঁচকি তোলা করে। তার পরই ইয়ামিন থেমে গেল চিরথামা হয়ে। তখনও ভিডিও দেখার ঘূর্ণি মাথা থেকে যায়নি। সামনে ঘোর অন্ধকারই দেখছিলাম। মোবাইল আর দেখব না মনে করছিলাম। রেখে দেওয়ার আগেই মোবাইলে ভেসে উঠল মেরিনা নাসরিনের একটি পোস্ট। মেরিনা লিখেছেন, ‘এই ছেলেটা ইয়ামিন। এমআইএসটির তুখোড় একটা ছাত্র। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশ আছে, যে দেশের পুলিশ নিজের দেশের ছাত্রকে এভাবে হত্যা করে? ওর মায়ের অবস্থা কী আমি আন্দাজ করতে পারছি। বিলিভ মি, ওর জায়গায় আমার সন্তানকে চিন্তা করে একটা কথাই মনে হয়েছে, আমি দেশ কেন পুরো বিশ্বকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দিতাম হয়তো! এসব ভিডিও আমার সমস্ত স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা তছনছ করে দিচ্ছে। হায় আল্লাহ! ওর মা যেন কোনোভাবেই এ ভিডিও না দেখে। কোনোভাবেই না।’ ফেসবুকের আজ যেন বমনের ব্যারাম হয়েছে। স্ট্রোক করলে নাকি বমন করে মানুষ। ফেসবুকও কি স্ট্রোক করল জুলাইয়ের বাংলাদেশ বুকে ধরে? বারবার ভাসিয়ে তোলে ইয়ামিনকে। ভেসে উঠল আর এক মায়ের আর্তনাদ। ভেসে উঠল কোনো এক মায়ের পোস্টÑ ‘পুলিশের ভ্যান থেকে টেনে ফেলে দেওয়া হলো ছেলেটাকে! তখনও জানটা আটকে ছিল হয়তো। ডাঙায় তোলা ইলিশের মতো দুবার ছটফট, তারপর চুপ হয়ে গেল চিরতরে! ভিডিওটা যতবার দেখেছি অঝরে কেঁদেছি। ভিডিও দেখে ট্রমায় চলে যায়নি এমন মা আছেন বাংলায় আমি বিশ্বাস করি না।’ এ পোস্টটা পড়ে মনে খটকা লাগে। ইয়ামিন কি সত্যই ইলিশ মাছ ছিল। না, পুলিশের কাছে সে অত দামি মাছ ছিল না। অত দামি হলে রেখে দিত শর্ষে বাটার জন্য। আবার ফিরে এলো শৈশব। মনে পড়ল দিঘিতে তালগাছের ডিঙিতে বসে মাছ মারার কথা। বাবা খ্যাপলা জাল ফেলে যখন পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে তুলত, তখন ফাঁসে ফাঁসে গেঁথে থাকত চলা চলা খয়রা মাছ। আমার খুশির সঙ্গে রোদ ঝিলিক দিয়ে উঠত খয়রার পিচ্ছিল রুপালি পেটে। বেচারা খয়রা এক কি দুবার লাফাত বা লাফাতে চেষ্টা করত। মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে শুয়ে পড়ত খলইয়ের তলায়। থেমে যেত চিরথামা হয়ে।
হঠাৎ নিজেকে খুবই হীন মনে হতে লাগল। কত ছোটলোক আমি। আমি কি না ইয়ামিনকে তুলনা করছি খয়রা মাছের সঙ্গে। ইয়ামিন ইলিশ নয়, খয়রাও নয়। ইয়ামিন তো জুলাইয়ের বাংলাদেশ। স্বাধীনতার রাঙা ভোর। সূর্য তখনও না উঠলেও পুবাকাশের লাল হয়ে ওঠা সবাই দেখছিল।