× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এক যে ছিল রঙিন জীবন

কুমার প্রীতীশ বল

প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৪৪ এএম

এক যে ছিল রঙিন জীবন

‘আমার পাপী দেহ ধন্য

তোমার পরশ পাইয়া দরদী গো

থাকবো তোমার চরণদাসী হয়ে...’

পড়ন্ত বিকালে গানটি করতে করতে জয়ীর গলা ধরে আসে কান্নায়। আর গাইতে পারল না। একা একা কিছুক্ষণ কাঁদল। এখন সে প্রায় তা-ই করে।

এ জীবন তো আমি চাইনি। এ জীবন তো সেই জীবন না। সে জীবন রঙিন ছিল।

বেসিনের কলটা ছেড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবতে ভাবতে ঘরের ভেতর থেকে তক্ষক টিকটিক করে উঠল। জয়ীর ভাবনাকে কি সমর্থন জানাল তক্ষক? জয়ী চোখে মুখে পানি দেয়। শহরে তখন সন্ধ্যা নেমেছে। খানিকক্ষণ পর মাছের চোখের মতো মরা জোছনায় শহর ভাসবে।

ভাবি-ভাতিঝি অফিস থেকে ফেরেনি। তুরতুর ঘুমাচ্ছে। ভাতিঝি ঝুমার তিন বছরের জানটার জয়ী নাম রেখেছে তুরতুর। তুরতুরকে দেখাশোনার ভার জয়ীর। রান্নার কাজও করতে হয়। তুরতুররা আমেরিকা চলে যাবে। ওর বাবা সে কারণে চাকরি করে না। জয়ীর বাবা এনাম সাহেব আর ভাই থাকেন আনন্দনগর। আনন্দনগর জয়ীদের আদিবাড়ি।

আনন্দনগরে একসময় এমন মানুষ কম ছিল সিকদারবাড়ির জয়ীকে চিনত না। এর কারণ জয়ীর স্মার্টনেস আর শারীরিক সৌন্দর্য। গ্রামে থাকলেও গ্রামীণ মনে হয় না। সবাই তার সঙ্গে প্রেম করতে অস্থির ছিল। আনন্দনগরজুড়ে ছিল জয়ীর প্রেমিকরা। ব্যবসায়ী, খেলোয়াড়, কবি, অধ্যাপক, ছাত্রনেতা, ভবঘুরে কে নেই? জয়ীকে প্রেমনিবেদনের জন্য সালিশ-বিবাদও হয়েছে। এসব জয়ী জানত। কেউ এসব বললে জয়ী খিলখিলিয়ে হেসে উঠত।

সবাইকে টেক্কা দিয়েছিল সাদা বুলু। দুজন বুলু ছিল আনন্দনগরে। একজন ছিল কালো। আড়ালে তাই তাকে ডাকত কালা বুলু। অন্যজন ছিল ফরসা। তাকে ডাকত সাদা বুলু। দুজনই পছন্দ করত জয়ীকে।

সাদা বুলুর ছোট বোন নীলু জয়ীর সহপাঠী। নীলু জয়ীর কাছ থেকে হ‍ুমায়ূন আহমেদের যে বইটা নিয়েছিল, ওটার ভেতরে জয়ী সাদা বুলুর চিরকুটটা পেয়েছিল। বেশি কিছু লেখেনি। বড় বড় অক্ষরে শুধু লিখেছিলÑ ‘I Love You. জয়ী। ইতি সাদা বুলু।’ এ কখানা শব্দ জয়ী কতবার যে পড়েছে! পড়ে আর বুকের ভেতর কাঁপুনি অনুভব করে।

কী করবে ভেবে পায় না। জয়ী চিঠিখানা বুক শেলফের একেবারে পেছনে শেষ বইটির ভেতর লুকিয়ে রাখে। মাঝে মাঝে গোপনে বের করে পড়ে। বুকের ভেতর দুরদুর শুরু হলে আবার ঢুকিয়ে রাখে।

নীলু চিঠির ব্যাপারটা জানত। তা সে জয়ীকে বলেনি। জয়ীও কিছু জানায়নি। সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। নীলু আকারে ইঙ্গিতে অনেকবার জানার চেষ্টা করেছিল। জয়ী বুঝেও না বোঝার অভিনয় করে।

জয়ী একসময় মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, সাদা বুলুকে বলবে।

তখনই শায়লা এসে জয়ীকে বলল, আমি বুলুকে ভালোবাসি।

জয়ীর বুকের ভেতর আগের মতো দুরদুর শুরু হয়। কিন্তু বুঝতে দেয় না।

শায়লা বলল, আমি বুলুকে বলেছি।

বোকার মতো খিলখিলিয়ে হেসে জয়ী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করল।

হাসতে হাসতে জানতে চাইল, কী বলল তোকে?

শায়লা লাজুক হেসে বলল, ইয়েস।

জয়ীর হাসি হারিয়ে যায়। রাজ্যের অন্ধকার সামনে এসে হাজির হয়। আনমনা হয়ে পড়ে।

শায়লা জয়ীকে জড়িয়ে ধরল।

জিজ্ঞেস করল, আমাকে তুই হেল্প করবি?

জয়ী বলল, করব।

শায়লা যাওয়ার পর জয়ী সাদা বুলুর চিঠিটা বের করে একা অনেকক্ষণ কাঁদল।


এক সপ্তাহ পর শায়লা আবার আসে। জয়ীর হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যায়।

জয়ীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, কাল আমরা পালিয়ে যাচ্ছি।

জয়ী বলল, কী!

শায়লা জয়ীর মুখ চেপে ধরে।

তারপর ফিসফিস করে বলল, বিয়ে করব।

কোথায় যাচ্ছিস?

ঢাকায়।

ঢাকা!

কাউকে জানাস না কিন্তু।

না, জানাব না।

শুধু তোকে বলে যাচ্ছি।

শায়লা দৌড়ে চলে যায়। জয়ী আর কিছু জিজ্ঞেসের সুযোগও পেল না।

শায়লা-সাদা বুলুর পালানোর খবরটা জানাজানি হতেই আনন্দনগরে হইচই পড়ে যায়। 

শায়লার বাবা আজিজ সাহেব ব্যাপারটা মেনে নেননি।

তিনি অভিযোগ করলেন, জয়ীদের বাড়ি থেকে শায়লা পালিয়েছে। জয়ী শায়লাকে পালাতে সাহায্য করেছে।

জয়ীদের বাড়িতে এসে ক্ষুব্ধ আজিজ সাহেব শাসিয়ে গেছেন, আমি থানা পুলিশ করব।

জয়ীর বাবা এনাম সাহেব ব্যাংক কর্মকর্তা। গোবেচারা মানুষ। কারও সাতেও নেই, পাঁচেও নেই।

এনাম সাহেব ইজ্জতের ভয়ে জয়ী, মিলা দুই বোনকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। সঙ্গে তাদের মাকেও। এরপর জয়ী একবার আনন্দনগর গিয়েছিল এসএসসি পরীক্ষা দিতে।


শুরু হলো জয়ীর ঢাকাইয়া রঙিন জীবন। ঢাকার লাল-নীল আলো জয়ীকে আরও রঙিন করে দিল।

জয়ী ইডেন থেকে হোম ইকোনমিকসে মাস্টার্স করেছে। বিয়ের কথা পরিবার যে ভাবেনি এমন নয়। এনাম সাহেব জয়ীর জন্য অনেক সম্বন্ধ এনেছিলেন। জয়ী ফিরিয়ে দিয়েছে। একসময় বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত পাকাপাকিভাবে জানিয়ে দেয়। ঘোষণা দিল, একা একাই এ জীবন কাটিয়ে দেব। একা থাকলে পিছুটান থাকে না।

এনাম সাহেব সমন্ধ আনাতে ইস্তফা দিলেন।

জয়ী শিল্পী হবে। গান শেখে ছায়ানট আর বাফাতে। গানের অনুষ্ঠান করে। রাতবিরাতে বাড়ি ফেরে। সিনেমায় সাইড রোলে অভিনয় করে। এর মধ্যে সাত-আটটায় অভিনয় করেছে। একটু একটু নাম হচ্ছে। সিনেমায় অভিনয়ে পরিবারের সম্মতি ছিল না। পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে জয়ী ছুটেছিল সিনেমার রঙিন দুনিয়ার রঙিন জীবনের দিকে। এ জীবনে মোহ বেশি। খ্যাতি-অর্থ দু-ই আছে।

এ সময় পুরান ঢাকার এক ধনীর দুলাল জয়ীকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। সে আমেরিকা থাকে। বিয়ে করতে কয়েক মাসের জন্য এসেছিল। জয়ীকে এক গানের অনুষ্ঠানে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়।

জয়ী ওকে ছোট বোন মিলার সঙ্গে বিয়ে দিল। এনাম সাহেব আপত্তি করলেন না। বিয়ের কিছুদিন পর মিলাকে নিয়ে ছেলেটি আমেরিকা চলে যায়। মিলাকে বিয়ে করলেও ছেলেটির চোখের নেশা জয়ীকে অনুসরণ করত। এজন্য দুই পারিবারে অনেক ঝামেলা হয়েছে। ছেলেটি খুব খবিশ প্রকৃতির ছিল। জয়ী ওর খবিশপনা কখনও উপভোগ করত, কখনও আবার বিরক্ত হতো।


ঢাকাইয়া রঙিন জীবন শুরুর পর জয়ীর মধ্যে গভীর শূন্যতা তৈরি হয়। উড়নচণ্ডী জয়ী এ শূন্যতা কাটাতে নতুন মিশনে নামে। মধ্যবয়সি ধনীদের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানো। এক-দুজন না। একসঙ্গে কয়েকজন। কেউ কারও খবর জানে না। আজ ওর সঙ্গে কাল ওর সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। জয়ীর কোনো কিছুতে মন ভরছে না।

সময় এগিয়ে যায়।

ঢাকা জাদুঘরে এক গানের অনুষ্ঠানে জয়ীর সঙ্গে পরিচয় হয় নেহাল সাহেবের। মধ্যবয়সি এ আমলা তাকে কফির দাওয়াত দিলেন। এক দিন থেকে নিয়মিত হলো। ধীরে ধীরে সম্পর্কও গাঢ় হলো।

সম্পর্কের গভীরে ভাসতে ভাসতে নেহাল সাহেব একদিন বললেন, একটা অ্যাডভার্টাইজিং ফার্ম খুলব।

প্রস্তাবটা শুনে জয়ী খুশিতে টগবগিয়ে ওঠে। পরক্ষণেই মুখ গোমড়া করে ফেলল।

কি প্রস্তাবটা পছন্দ হলো না?

না, হবে না কেন? কিন্তু পুঁজি?

পুঁজির ব্যবস্থা করব আমি। নাম হবে জয়িতা বিজ্ঞাপনী সংস্থা। আমি চেয়ারম্যান। তুমি ম্যানেজিং ডিরেক্টর।

নেহাল সাহেব দুই প্রিয় বন্ধুকে করলেন ডিরেক্টর। ডিরেক্টর দুজনের রুম এক পাশে। অন্য পাশে চেয়ারম্যান আর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের রুম। মাঝখানে এক্সিকিউটরদের জন্য একটি কমনরুম। চেয়ারম্যান আর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের রুমের মাঝে একটি দরজা আছে।

নেহাল সাহেব বন্ধুদের জানিয়েছেন, জয়ীকে ব্যবহার করে কাজ জোগাড় করবেন।

জয়ী তা বুঝেছিল। নেহাল সাহেব ধনী হওয়ার সিঁড়ি হবে মনে করে জয়ী চুপ থাকে।


জয়ীর প্রথম দিকের বন্ধু সারোয়ার সাহেব বলছিলেন, এ ব্যবসা বেশি দিন টিকবে না।

সারোয়ার সাহেব একজন পাট ব্যবসায়ী। অঢেল অর্থ। অভিজ্ঞতার অন্ত নেই।

কেন? জয়ীর প্রশ্ন।

ওদের উদ্দেশ্য ভালো না। যদি পারো কিছু বাগিয়ে নাও।

জয়ী একটা প্লট বুকিং দিল। কিস্তির টাকা শোধ করে জয়িতা বিজ্ঞাপনী সংস্থা। এ নিয়ে দূরত্ব তৈরি হয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে ডিরেক্টরদের।

জয়ী নেহাল সাহেবকে নিয়ে আরেক রঙিন জীবনের স্বপ্ন দেখল। জয়ীর পরিবারের মনে হলো, নেহাল সাহেবের দ্বিতীয় স্ত্রী হতে যাচ্ছে জয়ী।

এক রাতে জয়ী স্বপ্ন দেখেÑ আকাশে আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ। একটি ভাঙা বাড়ির সামনে একা জয়ী দাঁড়িয়ে আছে। জয়ীর ঘুম ভেঙে যায়। এটা দুঃস্বপ্ন কি না বুঝল না। কদিন পর নেহাল সাহেব স্ট্রোক করলেন। জয়িতা বিজ্ঞাপনী সংস্থার কাজ বন্ধ হয়ে গেল। ডিরেক্টরদের সহায়তায় নেহাল সাহেবের মেয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে। জয়ী আউট। জয়ীর জীবনে নেহাল সাহেব পর্বের সমাপ্তি ঘটে। জয়ীর স্বপ্নভঙ্গ ঘটে।


স্বপ্নভঙ্গের গল্প শুনে সারোয়ার সাহেব ওয়াইনের গ্লাস হাতে টলতে টলতে জয়ীকে বললেন, কি হে, বলেছিলাম না?

ঢাকায় একটি প্লটের মালিক তো হলাম। নিজের এক খণ্ড জমি। নেশার ঘোরে জয়ী জবাব দিল।

তা-ও আমার বুদ্ধিতে। সারোয়ার সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন।

জয়ী চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে।

সারোয়ার সাহেব অশ্লীল ইঙ্গিত করেন।

তারপর টলতে টলতে বললেন, বেচারা তোমাকে সামলাতে পারল না। হার্ট অ্যাটাক করে বসল? খালি হাতে ফিরতে হতো। আমার কথা ধরে চললে ঠকবে না। তোমার জন্য আমি এত কিছু করি, তার পরও তোমার ভালোবাসা পেলাম না!

আচ্ছা, আর কী করলে তুমি বলবে আমি তোমাকে ভালোবাসি? সবই তো তোমাকে দিলাম। নেশাগ্রস্ত জয়ী ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।

সারোয়ার সাহেবকে ঘায়েল করতে জয়ী শেষ অস্ত্র ব্যবহার করল। এ কথা না বললে লোকটা চুপ হবে না।


জয়ী নানাজনের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে। শেরাটন, সোনারগাঁওয়ে ডিজে পার্টিতে যায়। সারোয়ার সাহেবকে ছেড়ে যায় না। সারোয়ার সাহেব এ কথা বোঝেন। জয়ীকে সারোয়ার সাহেবের আম্মা খুব পছন্দ করতেন। ভদ্রমহিলা চেয়েছিলেন জয়ী সারোয়ার সাহেবকে বিয়ে করুক। জয়ীর আপত্তি ছিল। আপত্তিটা দ্বিতীয় স্ত্রী হতে নয়। বয়সের ব্যবধান।

সারোয়ার সাহেবকে জয়ী বলেছিল, তোমার বড় ছেলের বয়স আমার চাইতে বেশি। তোমার সঙ্গে আমাকে মানাবে না। এই তো ভালো আছি।

সারোয়ার সাহেব হেসে বলেছিলেন, তাতে কী। মিয়া-বিবি রাজি তো কেয়া করেগা কাজি।

সারোয়ার সাহেব বেশি মদ্যপান করেন। মাঝেমধ্যে বেসামাল হয়ে যান। জয়ী তাই দূরে কোথাও যেতে চায় না। রঙিন দুনিয়ায় নাম কামাতে হলে সারোয়ার সাহেবের দরকার আছে। তাই ছাড়ে না। বিয়ে করার কথা জয়ী কখনও ভাবেনি।


জয়ী গাড়ি-বাড়ির মালিক ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে খাতির জমায় না।

এ প্রসঙ্গে জয়ীর অবস্থান স্পষ্ট।

আমার সঙ্গে খাতির করতে পকেট ভর্তি টাকা লাগবে।

কম বয়সি ছেলেছোকরার সঙ্গে মেশে না। কম বয়সিদের আবেগ বেশি। আবেগের বশে অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। বেশি বয়সিরা যা করবে ভেবেচিন্তে করবে।

জয়ী এসব সাথিকে বলে আর হাসে। জয়ী খিলখিলিয়ে হাসলে বোকা বোকা মনে হয়। সাথি জয়ীর জানের দোস্ত।


জয়ী কার সঙ্গে কোন দিন কখন দেখা করবে তার একটা শিডিউল আছে।

শুক্রবার বিকালটা ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের।

শুক্রবার বিকাল হলে জয়ী তৈরি থাকে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের ড্রাইভার মিসকল দিলে জয়ী রাস্তায় নামে। পাজেরো জয়ীকে নিয়ে চলে যায় ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের বাসার গেটে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এলে গাড়ি চলে যায় শুলশান মসজিদে। ওখানে নামাজ পড়েন। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব জয়ীকে নিয়ে সন্ধ্যায় গুলশান পার্কে হাঁটেন। ডিনারটা রেস্টুরেন্টে সেরে ফেলেন। কোনো কোনো দিন শপিং করেন। মাঝরাতে জয়ীকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যান।


ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের অ্যাপয়েন্টমেন্ট জয়ী মিস করে না। স্ত্রী-পুত্র না থাকলে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব জয়ীকে বাসায় নিয়ে যান। কক্সবাজার যান কখনও কখনও। জয়ী দুপি নামকরা পাঁচ তারকা হোটেলে ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সঙ্গে যায় না। ওই দুটি সারোয়ার সাহেবের এরিয়া।

ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সঙ্গে ঘোরাঘুরিতে জয়ীর কোনো আপত্তি নেই। বাণিজ্য মেলায় লাখ টাকার শপিং, ঈদ, পহেলা বৈশাখে দামি জামা-শাড়ি গিফট ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কাছ থেকে আসে। প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের হাতখরচা দেন। খুব হাতখোলা মানুষ। এমন একজন দুধেল গাইকে জয়ী ফেরাবে কোন মুখে!

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব একদিন বললেন, সামনের মাসে সিঙ্গাপুর যাব। যাবে নাকি?

জয়ী প্রথমে ভেবেছিল ইঞ্জিনিয়ার সাহেব হেঁয়ালি করছেন। তাই বলল, পরীক্ষা করছ?

সিরিয়াসলি বলছি।

আমার পাসপোর্ট নেই।

নেই কী হয়েছে। করিয়ে নেবে।

জয়ী নীরব থাকে।

টাকা দরকার? নিয়ে যাবে। কালই প্রসেস করো। ইমারজেন্সি পাসপোর্ট।

পাসপোর্টের ফরম পূরণের সময় স্বামীর নাম কী লিখবে জয়ী ইতস্তত করছিল। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব জয়ীর হাত থেকে কলমটা নিয়ে নিজের নাম বসিয়ে দিলেন।

জয়ী বলল, এটা কী করলে?

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব জবাব দিলেন, হোটেলে রুম বুকিং দেয় পাসপোর্ট দেখে।

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব জয়ীকে নিয়ে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বিজনেস ট্রিপে যান। জয়ীকে তিনি যখন ডাকেন, তখন পেয়ে যান।

জয়ী ইঞ্জিনিয়ার সাহেব যেভাবে চান, সেভাবে চলে। জয়ী অভিনয় ছেড়েছে। গানের অনুষ্ঠানও তেমন একটা নেয় না। বিশেষ করে রাতের প্রোগ্রামে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এসব পছন্দ করেন না। জয়ীকে ভালো লাগার এ জায়গাটাকে বিদায় জানাতে হলো। মাঝে মাঝে এ কারণে মনও খারাপ করে।

কোনো কিছু গোপন রাখা জয়ীর দীর্ঘদিনের গুণ।

ইঞ্জিনিয়ার সাহেব জানেন না জয়ীর আরও বন্ধু আছে। সারোয়ার সাহেব আর ইঞ্জিনিয়ার সাহেব জয়ীর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছেন। দুজনের মাঝখানে অনেকে এসেছে। আমোদ-ফুর্তি করেছে। কেউ কেউ এসে চলে গেছে। জয়ী অনেককে নিজ থেকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সারোয়ার সাহেব আর ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে জয়ী ছাড়েনি।

ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের সঙ্গে এই অন্যরকম সম্পর্কটা জয়ীর ভাবি-ভাতিঝি জানে। ওরা অন্য কাউকে নিয়ে কিছু বললে জয়ী রাগ করে না। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কথা বললে খেপে যায়। আড়ালে সবাই হাসে। টিপ্পনী কাটে। জয়ী গায়ে মাখে না। বাসায় গোপনে এখন সবাই তাকে ইঞ্জিনিয়ারের বউ বলে ডাকে।

জয়ীর জীবন এভাবেই চলছিল। এভাবে যদি যায়, তবে যাক না। ফুর্তি করে জীবনটা চালিয়ে দেওয়া যাবে।


জাহাঙ্গীর সব ওলটপালট করে দিল।

বান্ধবী সাথিকে নিয়ে জয়ী নরসিংদী গেল আরেক বন্ধুর মে দিবসের অনুষ্ঠানে গান গাইতে। যাওয়ার সময়ের পুরো হইহুল্লোড় সাথি ফেসবুকে লাইভ করে। জাহাঙ্গীর সেটা ফলো করে। জাহাঙ্গীর সাথির পিছু লাগে। সাথি পরিচয় করিয়ে দিল জয়ীর সঙ্গে জাহাঙ্গীরের।

জয়ী এখন জাহাঙ্গীর ছাড়া কিছু বোঝে না। প্রতিদিন সাক্ষাৎ করে। এতদিনকার সব শিডিউল তছনছ হয়ে গেল। জাহাঙ্গীর সুবিধার লোক ছিল না। বন্ধু রন্টুর সঙ্গে জয়ীর পরিচয় করিয়ে দিল। নীলগঞ্জে দুজনের সমান পরিচিতি। ওখানে ওদের ভয়ে কেউ কথা বলে না। দুজন একত্রে নারীসঙ্গ উপভোগ করে। নেশা করে। জাহাঙ্গীরের চেয়ে রন্টু সম্পদশালী। জয়ী চায় জাহাঙ্গীরের হয়ে থাকতে। এ নিয়ে সাথির বাসায় বিচার বসেছিল। সাথির বাড়ি ওদের গ্রামেই।

জয়ী বলল, টস কর। যে জিতবে সে পাবে।

জাহাঙ্গীর রাজি হয় না। রন্টু রাজি। অবশেষে সাথি টস করে। টসে জাহাঙ্গীর জিতল। জয়ী তা-ই চেয়েছিল।

জয়ী বলল, রন্টু তুমি হেরে গেলে।

রন্টু হারবার পাত্র নয়। সে চ্যালেঞ্জ করে।

রন্টু সাথিকে বলল, তুমি আমাকে সাহায্য করবে। এজন্য যত টাকা চাও পাবে।

টাকার লোভে সাথি রন্টুকে সাহায্য করে।

রন্টু জাহাঙ্গীরকে বলল, তোর তো বেলা আছে। জয়ীকে আমাকে দে।

জাহাঙ্গীর বলল, জয়ী রাজি থাকলে আমার আপত্তি নেই।

সাথির বাসায় জয়ীকে নিয়ে আসর বসে, খরচ দেয় রন্টু।

জয়ীকে নিয়ে বারে যায়, খরচ দেয় রন্টু।

জয়ীকে পেতে জাহাঙ্গীর-সাথি দুজনকে রন্টু টাকা দেয়। এ খবর একসময় জয়ী জেনে যায়।

জয়ী বলল, এ টাকা আমি পেলে সমস্যা কোথায়?

জয়ীর প্রচণ্ড টাকার লোভ। রন্টু জয়ীকে প্রলোভন দিল। আলাদাভাবে তার জন্য টাকা খরচ করল। এখন দেখাসাক্ষাৎ শুধু দুজনের মধ্যে। জয়ীর গাড়ির দরকার। রন্টু নীলগঞ্জ থেকে গাড়ি নিয়ে হাজির হয়। জয়ীর টাকার দরকার। রন্টু বিকাশ করে।

জয়ীকে একদিন ব্ল্যাঙ্ক চেক লিখে দিয়ে বলল, এটা রেখে দাও। যখন দরকার হবে অ্যামাউন্ট বসিয়ে নিও।

ওরা কোথায় কোথায় চলে যায়। কেউ জানেও না। খবরটা রন্টুর পরিবারে জানাজানি হয়ে গেছে। রন্টুর মা-বাবা, ভাই-বোন মেনে নেয়। ক্ষুব্ধ হয় বউ-ছেলে। রন্টু প্রেম করে বিয়ে করেছিল। মা-বাবা সে বিয়ে মেনে নেননি। ওদের সঙ্গে বউয়ের যোগাযোগ নেই। মা-বাবা শোধ নিতে জয়ীকে মেনে নিলেন। জয়ীর গান শুনে রন্টুর মা-বাবা, ভাই-বোন সবাই মুগ্ধ। জয়ীকে ওদের পছন্দ হয়। বাড়িও নিয়ে যায়।

রন্টু মা-বাবাকে জানাল, খুব শিগগিরই জয়ীর আমেরিকার ভিসা চলে আসবে। আমিও চলে যাব।

রন্টুকে এ কথা জয়ী বলেছে। জয়ী যে-কারও সঙ্গে আলাপের এক পর্যায়ে আমেরিকার খবরটা জানিয়ে দেয়। সাথি, জাহাঙ্গীর কেউ চায়নি ওরা এত ঘনিষ্ঠ হোক। তারা বাধা দিয়েছিল। এ কারণে রন্টুর সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বন্ধুত্ব বিবাদে রূপ নিল।

এটা এখন নীলগঞ্জে টক অব দ্য টাউন। রন্টুর স্ত্রী-পুত্র থাকায় জয়ীর বাবা আপত্তি করেছিল। পরে মেনে নিল বেচারা। যদি এবার কিছু হয়।

সারোয়ার সাহেব, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব এবং এতদিনের বন্ধুদের সবাইকে অন্ধকারে রেখে জয়ী বিশ লাখ টাকার কাবিন করে রন্টুকে বিয়ে করল। পাঁচ লাখ টাকা উসুল আর দশ ভরি স্বর্ণালংকার। রন্টুর দ্বিতীয় বউ হয়ে জয়ী কদিন খুব মাস্তি করল। ভেবে নিল, এটাই বুঝি জীবন। বাকি সব মিথ্যা আর ভুল।

সময় বয়ে যায় আগুনমুখা নদীর স্রোতের মতো। ধীরে ধীরে রন্টুর মোহভঙ্গ হতে থাকে।

রন্টু জয়ীর মোহ নয়, ততদিনে রন্টু জয়ীর অস্তিত্বে পরিণত হয়। জয়ী কিন্তু রন্টুর অস্তিত্বে পরিণত হলো না। রন্টুর মনে হলো, বানর সুযোগ পেলে গাছে ওঠার চেষ্টা করবেই।

আবার এক রাতে জয়ী স্বপ্ন দেখেÑ আকাশে আষাঢ়ের ঘন কালো মেঘ। একটি ভাঙা বাড়ির সামনে একা সে দাঁড়িয়ে আছে। জয়ীর ঘুম ভেঙে যায়। দুঃস্বপ্ন কি না বুঝল না। একা বিছানায় ভাবতে ভাবতে ভোরের আজান ভেসে এলো। কিন্তু অন্ধকার কাটেনি তখনও। আকাশে অনেক মেঘ। খানিকক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি শুরু হতে পারে।

জয়ীর বাসার ঠিকানায় কুরিয়ার আসে দুই দিন পর। হলুদ খামের চিঠিখানা ছিল তালাকনামা।

‘বনিবনা না হওয়ায়, স্বামীর অবাধ্য, প্রতারণা করিয়া নিজেকে কুমারী বলিয়া বিবাহ করাসহ ইত্যাদি কারণে (যাহা প্রচলিত আইন ও শরিয়তের সম্পূর্ণ পরিপন্থি) অদ্য তারিখে আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, সুস্থ মস্তিষ্কে, অন্যের বিনা প্ররোচনায় আপনাকে তালাকে বায়েন করিয়া বিবাহবন্ধন ছিন্ন করার নোটিস প্রদান করিলাম।’

তারপর রন্টুর সেই টানাটানা স্বাক্ষর। একদিন ব্যাংকের ব্ল্যাঙ্ক চেকে এ স্বাক্ষর করেছিল জয়ীর সামনে।

চেক আর তালাকনামা এখন জয়ীর আলমারিতে পাশাপাশি শুয়ে আছে একই খামে। একটি লোভ। অন্যটি শাস্তি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা