ইমরান মাহফুজ
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৪৬ এএম
চিত্রকর্ম : আলপ্তগীন তুষার
যেকোনো সময়ের কবিই হন্তারকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলেন। মানে আগুন নিয়ে আগুন খেলা। এটা চিরায়ত কবিদের মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত। অস্বীকারের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান জানান দেওয়া। প্রথমে নিজেকে অস্বীকার, পরে অন্যদের। এমন করে প্রতিটি সময়ের শিল্পীর যাত্রা। দেখা যায়, প্রথমেই শিল্পের আক্রমণ অগ্রজদের, বাদ যায় না প্রিয় কবিও। আজকের শিশু যেমন দেশের ভবিষ্যৎ তেমন আজকের কবি ও কবিতা মানে তারুণ্যের কাব্যাগুন। এ আগুনে তারুণ্য প্রত্যয়দীপ্ত হয়ে গলেও যান অনেকখানি। কাব্য বসন্তে গড়েন পাটাতন, সাধনায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা দেন ধীরে ধীরে।
কবি সব সময় ও সমাজের অনুভূতির কথা বলেন। কবিতা মানে নিজের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভোগ। সৌন্দর্যের স্নিগ্ধতায় মোহিত হয়ে, কবিতা বিষয়ে প্রেম-ভালোবাসার মতো বেশি বলতে যাওয়া বা ফতোয়া দেওয়া বিপজ্জনক। মানব জীবনে এর চূড়ান্ত চেহারা নেই। বোধের আঙিনায় জিজ্ঞাসাÑ কবিতার প্রকৃত পাঠক কি তার খোলস উন্মোচনে সক্ষম? কবিতা কি এদের কাছে শুধু শব্দের অর্থ জেনে, কবিতা বুঝতে চেষ্টা করা, না। কবি ভাবের আলনায় ঝুলিয়ে দেন অনুভূতি।
কিন্তু কবিতার জন্মের সঙ্গে সব সময় জড়িয়ে থাকেন একজন মৌলিক সত্তার অধিকারী স্রষ্টা। অনুভূতির বাইরে বাংলাদেশের কবিতা কেমন? আমাদের কবিতায় জড়িয়ে আছে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকারবোধ, জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধ, গণমানুষের স্বপ্নভঙ্গ, প্রগতি-প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্ব, স্বৈরাচারের উত্থান ও গণতন্ত্রের বিপর্যয়ের মন খারাপের গাড়ি। এমন ঘাত-প্রতিঘাত, উত্থান-পতনের মুখোমুখি হয়নি কলকাতা, লাহোর। তাই আমাদের কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছে জীবনসংগ্রাম, পথচলার বহুরৈখিকতা, মাটি ও মানুষের গল্প।
অন্যদিকে নতুনদের কবিতা বিজ্ঞানমনস্কতার ছোঁয়ায় ভিন্ন অর্থে মানুষকেন্দ্রিক করে তুলেছে। পূর্ববিবেচনায় বাংলা ভাষায় নজরুলই প্রথম দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মানুষের জয়গানের কথা উচ্চারণ করেন। আর জসীমউদ্দীন করেন মাটিলগ্ন জীবন ও চিরায়ত গল্পের চিত্রায়ণ। শামসুর রাহমান শহরকে দেখেছেন আধুনিকতায় আর আল মাহমুদ গ্রাম শহরে এনে উপস্থাপন করেছেন লোকজ জনপদের পাটাতনে। ‘সত্তর দশকের স্লোগানধর্মী ও বিমর্ষ প্রকাশকে অস্বীকার করতে পেরেছিল আশির কবিরা।’ নব্বইয়ের পরে প্রযুক্তিগত উন্নয়নে প্রথম-দ্বিতীয় দশকের কবিরা নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছেন কবিতায়। সময়ের কবিতার বৈশিষ্ট্য সরাসরি বলতে হলে বলা যায়, থিম ভেঙে ফেলার অভিযান, কেন্দ্রের শাসন অস্বীকার, মতের পাল্টা মত, মুক্ত ছন্দে যাপন, স্লোগানভিত্তিক রাজনীতির বিপক্ষে, বেগের গতি কমিয়ে আবেগ এবং ভাষার নিজস্বতায় বহুরৈখিকতা উপস্থাপন।
দুই.
দেশভাগের ক্ষত নিয়ে একাত্তরে আপ্রাণ লড়েও বৈষম্যের চিত্র উজ্জ্বল বাংলাদেশে আজ! সারা দুনিয়ায় একতরফা যুদ্ধÑ প্রতিপক্ষ হচ্ছে কচুকাটা। আরও আছে দেশবিদেশে সামাজিক অবিশ্বাস-অনাচার। বিশ্বরাজনীতিতে মাত্রাতিরিক্ত সহিংসতা ও নারকীয়তাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এভাবে বর্তমানকে গ্রাস করছে বহুমাত্রিক সংকট। তাতে কবিতার বিষয় তো বটেই, সাহিত্যের ভাষা, ভঙ্গি, ফর্ম, সবকিছু তছনছ হওয়া স্বাভাবিক। আবার স্বাভাবিক জীবনযাপনেও দুঃস্বপ্নরা করেছে ভিড়।
দশকের পর দশক রাষ্ট্রীয় মদদে জেল-জুলুমের ভয়ংকর জনপদে পরিণত হয়েছে স্বদেশ। আইনে বন্ধ করা হয়েছে ব্যক্তির বাকস্বাধীনতা। কী এক ভয়াবহ সময়Ñ আস্থা ও বিবেকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে সমকাল! আটকে থাকা জীবন নিয়ে আমাদের যত বিস্ময়, ভয় ও অস্থিরতা। অবচেতন মনে তবু প্রাণে বাঁচতে চাই। জীবনে এভাবে গ্রহণ করে আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন। আর যে জীবনের অনুভূতি প্রত্যাখ্যান করে তার নাম মৃত্যু! মাঝের সময়টা সরল দোলকে আমাদের দোলায় কাব্য। তারুণ্যের শক্তি নিপুণ কারিগরের কবিতা। দেখব এর মাঝে কে কী গেঁথে দিচ্ছেন কবিতায়।
মজার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশে বসে কেউ ভারতের, কেউ আমেরিকার, কেউ আফ্রিকার কেউ বা চীন-জাপানের কবিতা লিখছেন। স্বদেশের সংকট চোখে পড়ছে না। আসলে যার চোখে আলো নেই, তার পক্ষে দুনিয়ার নিখুঁত আলোর পথরেখা দেখা অসম্ভব। এ সংকট আমাদের একাংশের। এ তো হতে পারে না। প্রত্যেক সৃজনশীল মানুষের স্বাতন্ত্র্য থাকা আবশ্যক। এর মাঝে সময়ের অন্য একটা অংশ কলম ধরেছেন, চোখের সঙ্গে হৃদয় খুলে স্বতন্ত্রতায় লিখছেন। দ্রোহ ও প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গগুলো (কবিতা) চলার প্রেরণা জুগিয়ে দিচ্ছেন কেউ কেউ।
তিন.
চলমান শতাব্দীর সময় সমাজের ভয়াবহতা ধরেছেন অনেকে, তার মধ্যে কবি ফরহাদ মজহার একজন। তার বইয়ের নাম ‘তুমি ছাড়া আর কোন্ শালারে আমি কেয়ার করি?’, মোহন রায়হানের ‘কবি কাপুরুষ হলে পৃথিবীতে নামে অন্ধকার’, রেজাউদ্দিন স্টালিনের ‘পৃথিবীতে ভোর হতে দেখিনি কখনো’, সাখাওয়াত টিপু রাখছেন ‘রাজার কঙ্কাল’, সবার বইতে রয়েছে অসামান্য সব কবিতা। রাষ্ট্র ও সরকারকে ইঙ্গিত করে কবিতা লেখায় ‘কুরুচিপূর্ণ’ কবিতার অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ও কবি সাইদুর রহমানকে (২০২২)। অথচ কবিতা কবির নিজস্ব বিষয়। তাতে কোনো বাক্য-শব্দ কুরুচিপূর্ণ কি না তা কারও বলার সুযোগ নেই। ক’বছর আগে আলোচিত গুলশান (হোলি আর্টিজান) হত্যাকাণ্ডে নিহত ইতালীয় নাগরিক অন্তঃসত্ত্বা নারী সিমোনা মনটির অনাগত শিশু মাইকেলেঞ্জেলো স্মরণে কবি তারিক সুজাত লিখছেনÑ জন্মের আগেই আমি মৃত্যুকে করেছি আলিঙ্গন, আমার কোনো দেশ নেই, ভাষা নেই, জাতি নেই, ধর্ম-অধর্ম, পাপ-পুণ্যের ভেদাভেদ নেই। আসলে মৃত্যু নিয়ে ভেদাভেদ নেই।
সময়ের জনপ্রিয় কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ তার বইয়ের নাম রাখছেন ‘মানুষ দেখতে কেমন’, জাকির আবু জাফরের ‘রোদেরও আছে অন্ধকার’, মুহম্মদ ইমদাদের ‘অন্ধ পৃথিবীর জানালাগুলি’, জামসেদ ওয়াজেদের ‘ছায়াবৃত্ত ইতিহাস’, মনসুর আজিজের ‘আঁধারের নাকফুল’, পিয়াস মজিদের ‘বসন্ত কোকিলের কর্তব্য’, আলতাফ শাহনেওয়াজের ‘সামান্য দেখার অন্ধকারে’, তালাশ তালুকদারের ‘টোপার বাইরে পৃথিবী কেমন’, আশরাফ জুয়েলের ‘যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব’, কাজল রশীদ শাহীনের ‘এই আমি কোথাও নেই’, সাইয়েদ জামিলের ‘রাষ্ট্রবিরোধী গিটার’, রিমঝিম আহমেদের ‘অনন্তকলহ’, জাহিদ সোহাগের ‘ব্যাটারিচালিত ইচ্ছা’, মাজহার সরকারের ‘গণপ্রজাতন্ত্রী নিঃসঙ্গতা’, সফিকুল ইসলামের ‘যে কথা যায় না বলা’, জব্বার আল নাঈমের ‘তাড়া খাওয়া মাছের জীবন’, মনদীপ ঘরাইয়ের ‘আমাকে বোঝেনি কেউ’, পলিয়ার ওয়াহিদের ‘সময়গুলো ঘুমন্ত সিংহের’, আশিক রেজার ‘ভেড়া ও ভয়তন্ত্র’, শরাফত হোসেনের ‘যে আগুন স্বর্গের সমান’, রাসেল রায়হানের ‘বিব্রত ময়ূর’, কাজী বর্ণাঢ্যের ‘আমার ছাদের নিচে তোমাদের আকাশ’, সানাউল্লাহ সাগরের ‘কালো হাসির জার্নাল’, সালেহীন শিপ্রার ‘প্রকাশ্য হওয়ার আগে’, অনিন্দ্য দ্বীপের ‘মুখোশের রঙ’, মোহাম্মদ জসিমের ‘অসম্পাদিত মানুষের মিথ’, মিছিল খন্দকারের ‘এক ভয়কে ডর দেখাচ্ছে অন্য একটা ভয়’, অনির্বাণ সূর্যকান্তের ‘আব্বু তুমি কাঁদতেছ যে?’, সাফিনা আক্তারের ‘ভুলে থাকা পাপ’, মঈন মুনতাসীরের ‘শিশমহল’, সাম্য শাহের ‘বিপ্লবী রক্তের গান’, আখতারুজ্জামান আজাদের ‘সামরিক কবি, বেসামরিক প্রেমিক’, হাসান রোবায়েতের ‘মুসলমানের ছেলে’, ইজাজ আহমেদ মিলনের ‘পোড়ামাটির ক্যানভাসে বিরামহীন বেদনা’, আফরোজা সোমার ‘অন্ধঘড়ি’, নুসরাত নুসিনের ‘দীর্ঘ স্বরের অনুপ্রাস’, খালেদ রাহীর ‘কিছু দুঃখ ব্যক্তিগত’, শামীম হোসেনের ‘সান্ধ্য মাংসের দোকান’, রাসেল আবদুর রহমানের ‘ইতিহাস লিখছে অন্ধকারের গান’, নিলয় রফিকের ‘অজ্ঞাত আগুন’, সৈয়দ এনামুল তাজের ‘খুলে দেখি ফুলের যৌবন’, মাসুম মুনাওয়ারের ‘সূর্যোদয়ের দৃশ্যাবলি’, মীর রবির ‘অ্যাকোয়ারিয়ামে মহীরুহ প্রাণ’, তবীব মাহমুদের ‘আহত আত্মার মুক্তি চাই’, রাহাত রাব্বানীর ‘শূন্যতার বিলাপ’, কিংবা নিবন্ধের রয়েছে ‘মুখোশপরা পাঠশালা’। এমন আরও আছেন সময়ের জানা, চেনা ও কম চেনা কবি।
ওপরে প্রায় সবার কবিতা সাবলীল এবং দেশের সংকট ধরেছেন দরদিভাবে। যেমন ভাব, আবেগ আর অনুভূতির কাব্যিক প্রকাশের মতো সহজ কিছু আর হতে পারে না। কবি যে যুগেরই হোন না কেন, তার কবিতা হয় সব কালের। মানব জীবনের এমন রূপক প্রকাশের উপস্থিতি আসলেই চোখে পড়ার মতো। বইগুলোর চিন্তা বিচিত্র, বিভিন্ন কবি ও কবিতা একই সময়ের হলেও একসঙ্গে বলার ধরন আলাদা। উল্লেখ নেই এমন অনেকে আছেন ভালো লেখেন, ধরেন সময়ের ক্ষত। এবার কিছু উদাহরণ হাজির করা যাকÑ
১.
তুমি অন্ধ হয়ে গেছ, ফলে
তুমি যাকে বলছ পাখি
ওগুলো তো ভীতসন্ত্রস্ত কবুতর
যাদের ধরেÑ বেঁধে আনা হয়েছে শান্তির নামে। (টোকন ঠাকুর)
২.
আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবিদের ঘাড় ধরে বের করে দেয়ার কথা যে ব্যর্থ কবি প্লেটো
বলেছিলেন তাতে আমি খুশি। পৃথিবীতে ১টা আদর্শ রাষ্ট্র থাকা খুব দরকার। তবে
এথেন্সের ওই লোকটা জানতো না যে আদর্শ রাষ্ট্র তৈরি করার আগে দরকার ১টা
অনাদর্শ রাষ্ট্র। যেমন আলোর আগে তৈরি হয়েছিলো অন্ধকার। জন্মের আগে খোদা
তৈরি করে রেখেছেন মৃত্যু। নতুন এই রাষ্ট্রের কথা শুনে কবিদের খুশি হবার কিছু
নেই। কেননা মন্দ ওই জীবগুলোকে আমরা এমনকি অনাদর্শ রাষ্ট্রেও ঠাঁই দেবো না! (ইমতিয়াজ মাহমুদ)
ভাব ও ভাষায় এ কবিতাগুলোকে বাংলাদেশের কবিতা বলে চেনা যায় সহজেই। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘তিনি অভিজ্ঞতা ও সারবত্তার কথা বললেও, নিজে অভিজ্ঞতার চেয়ে কল্পনাকে দিয়েছেন বেশি গুরুত্ব। বলা যায় তাঁর কবিতার বিপুল অংশেই এই কল্পনার প্রাচুর্য রয়েছে।’
কথা তো সত্য কিন্তু সময়ের কবিরা বাস্তবতা সঙ্গে নিয়ে হাঁটেন। একজন কবি আট-দশ জন মানুষের মতোই সমাজে বাস করেন; কিন্তু তিনি দেখেন হৃদয়চক্ষুর বিশালতা দিয়ে। উল্লেখদের কবিতার ভাঁজে ভাঁজে দেশপ্রেম, দ্রোহ, সমকাল, অজানা গন্তব্যের ছবি পরিস্ফুটিত। এ প্রসঙ্গে আল মাহমুদ বলেছেন, ‘কবিতা জীবন খেয়ে জীবন ধারণ করে।’ হেলাল হাফিজ বলছেন, ‘জীবন খরচ করে কবিতা লিখেছি।’ কামাল চৌধুরী বলছেন, ‘প্রকৃত দায় পূরণ করা কবি হচ্ছেন সমাজের নায়ক।’
এমন কবি সমাজে কজন? প্রকৃত কবি যেকোনো সমাজে খুব কমসংখ্যক থাকেন। এর মাঝেই কেউ কেউ অতন্দ্রপ্রহরীর মতো সমাজ পাহারা দেন, রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কথা বলেন বঞ্চিত মানুষের হয়ে। উপস্থাপিত কবিতায় দেখা যায়, এ কবিরা চলমান সমাজেই আছেন। অনুভূতি ও বোধের সমন্বয়ে লিখেছেন। আর এমন কবিতার খোঁজে নিরেট পাঠক সব সময়ই তৃষ্ণার্ত থাকেন, কোনটা নিরীক্ষাধর্মী, কোনটা বোধের অনুরণন তা তালাশ করেন। তারুণ্যের কবিরা অনেক সাহসী উচ্চারণও করেছেন।