× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সেই প্রশ্নÑ এতদিন কোথায় ছিলেন?

টোকন ঠাকুর

প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৪২ এএম

জীবনানন্দ দাশ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯-২২ অক্টোবর ১৯৫৪

জীবনানন্দ দাশ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯-২২ অক্টোবর ১৯৫৪

তিন বাচ্চার মা, পেটে তার আরেকটি বাচ্চা উঁকি দিচ্ছে। স্বামীর স্কুলে দপ্তরির চাকরি। বাড়ি থেকে স্কুল ৮ কিলো দূরে। দপ্তরি লোকটা যে সকালে বেরিয়ে যায় বাইসাইকেল চালিয়ে, ফেরে প্রায় সন্ধ্যায়। স্বামী বেচারা মানুষ হিসেবে কেমন? তা আর ভাবনায় আসে না। খালি মনে হয়, দপ্তরি থেকে যদি কোনো প্রমোশন পেত, হয়তো বেতন বাড়ত। সংসারে খরচ তো বাড়ছেই। তিনটি বাচ্চা, আরেকটি কামিং সুন।

দপ্তরি বেরিয়ে গেছে সেই সকালেই। যাওয়ার সময় বউকে আজও বলেছে, সাবধানে থাকবা। বেশি চলাফেরা করবা না, পেটে চাপ লাগবে।

স্বামীর সাবধানবাণী মনে রাখলেও সে একটু-আধটু চলাফেরা করে, সংসারের কাজও তো আছে। কে করে দেবে?

জ্যাঠশ্বশুরের নতুন বাড়ি ২০০ গজ দূরে। জ্যাঠার বড় মেয়েও পোয়াতি। পোয়াতি-পোয়াতি গল্প করার ইচ্ছে হলো বলেই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে জ্যাঠশ্বশুরের বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। পথে ছোট্ট একটু ফাঁকা মাঠের মতো, সেখানে খানিকটা জঙ্গল। তারই পাশে পুরোনো দিনের দিঘি। দিঘির পার দিয়েই রাস্তা, জেলা সদরের দিকে চলে গেছে। সে দিঘির পারে পৌঁছে গেল এবং বিপত্তিটা বাধল। প্রথমে সে খেয়ালই করেনি যে আগন্তুক লোকটা তার দিকে তাকিয়ে আছে। আগন্তুক লোকটা তাকে দেখছে দেখে সে প্রথমে লজ্জা পেলেও সামলে নিল নিজেকে।

পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময়ই লোকটা আচমকা কথাও বলে ওঠে, একটু জল খেতে চাই।

সে বুঝতে পারে না লোকটা রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে জল পান করতে চায় কীভাবে? তাই সে লোকটার পিপাসাকে পাত্তা না দিয়েই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু লোকটা ফের বলল, জল খাব।

সে এবার আমলে নিল তার পিপাসা। বলল, রাস্তায় খাওয়ার জল পাব কোথায়?

তাহলে বাড়িতে গিয়েই খাব, অনেক হেঁটেছি... পিপাসা পেয়েছে।

আমাদের বাড়িতে?

সে বুঝেই উঠতে পারল না, একজন অপরিচিত পুরুষ লোক কীভাবে আবদার করে! বলল, মানে?

মানে আমি জল খাব।

জল খাবেন তো আমি কী করব? আমি গেলাম।

বলেই সে হাঁটা ধরে। লোকটিও নাছোড়বান্দা। লোকটি তার পথ আটকায়। সে এবার গলার স্বর পরিবর্তন করে, যেখানে যাচ্ছিলেন যান। আপনি তো আমার পরিচিত না।

পরিচিত হয়ে পড়েছি এতক্ষণে, তা না? লোকটি বলল।

আপনি কি নাটোর রাজবাড়ি দেখতে আসছেন? যান, দেখে আসেন।

দেখে আসব? কোথায় আসব, তোমাদের বাড়িতে? কোন বাড়ি তোমাদের?

আমাদের বাড়ি কেন আসবেন? মুশকিলে পড়লাম তো!

লোকটি এবার একটা নিঃশ্বাস ফেলে জোরে। সে তাকিয়ে থাকে, কেন যেন যেতেও পারে না।

লোকটি বলল, রাজবাড়ির পুরোনো ইট-সুরকি দেখতে আসিনি আমি।

সে তাকাল। তাকানোয় যেন তার জিজ্ঞাসাÑ কী দেখতে আসছেন তবে?

আমি হাজার বছর ধরে হাঁটাহাঁটি করে বেড়াচ্ছি, কেন জানো?

সে কোনো উত্তর দিল না। চারপাশ দেখে নিল, কেউ দেখছে কি না। ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমে, এ দুপুরে কেউ নেই চারপাশে। তবু সে প্রশ্ন করে বসে, কত বছর হাঁটছেন আপনি?

হাজার হাজার বছর।

পাগল আপনি?

নিশ্চিত।

মানুষ বাঁচে কয় বছর?

তার কোনো ঠিক নেই। কেউ ৮০ বছর, কেউ ৮০০ বছর।

হেসে ফেলল নারী। লোকটি বলেই যেতে থাকল, পেয়েছি। আমি যা চাই, পেয়েছি।

কী?

একজোড়া চোখ, যেখানে আমার বাসা বুনতে চাই আমি। বাস করব।

এবার একটু সন্দেহ হলো তার। সেই চোখ কোথায় পাবেন?

তোমার কাছে।

মানে?

তোমার চোখজোড়া আমি নিয়ে যাব।

কী! পথ ছাড়েন। আমি যাব।

তোমার চুলও আমি নিয়ে যাব।

কোথায় নিয়ে যাবেন? আমার চুল দিয়ে আপনি কী করবেন?

কবিতার মধ্যে তোমার চুল দিয়ে বাক্য লিখে রাখব।

তাতে কী হবে?

পাঠক পড়তে পারবে।

তাতেই বা কী হবে?

তারা জানবে এ চোখের কথা, চুলের কথা।

আমার জানানোর কোনো দরকার নেই, আপনি যান।

আমি তো যাবই। চোখও নিয়ে যাব। চুল নিয়ে যাব। তোমাকে নিয়ে যাব।

কোথায় নিয়ে যাবেন? আমি কোনো পরপুরুষের সঙ্গে যাব না।

আমি তোমার ঘরপুরুষ না, আবার পরপুরুষও না।

তাহলে কী?

আমি জীবনানন্দ দাশ। বাড়ি বরিশাল।

হুম। দাশ মশায়, দয়া করে এবার চলে যান, নাটোরের রাজবাড়ি দেখতে অনেক লোক আসে... দ্যাখেন গা।

কথাটা লাগল মনে। কিন্তু তখন মনই তো নেই। মন তখন ওই নারী হরণ করে নিয়েছে। জীবনানন্দ দাশকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে। সে এবার তা বলেও ফেলল, আমি খুব ক্লান্ত। তোমাকে চাই।

এভাবে চাইলেই তো আর হলো না। এবার এ নারী মনে হয় সত্যি সত্যি চলে যাবে কবির সামনে থেকে। কবিও তা বুঝতে পারলেন। বললেন, আমার সঙ্গে যেতে তোমার খুব অসুবিধা হবে?

হবে। আমার সন্তানরা আছে না? স্বামী আছে না?

আছে থাক। তুমি চলো।

কোথায় যাব?

কোনো একটা দ্বীপে, যেখানে কেউ থাকে না।

নারী তার উঁচু হয়ে থাকা পেট দেখিয়ে ইঙ্গিত করে, এ বাচ্চার কী হবে? আমার অন্য বাচ্চাদের কী হবে... এসব আপনার মাথায় আছে?

জীবনানন্দ দাশ বললেন, আমি তো ওদের কথা লিখব না। শুধু তোমাকে লিখব। তোমার চোখের কথা লিখব, চুলের কথা লিখব। তুমি আমার সঙ্গে চলো। তোমাকে নিয়ে থাকব আমি।

কোথায় থাকবেন? লোকলজ্জা আছে না?

না। আমার লোকলজ্জা নেই। আমার কবিতা নিয়ে থাকি। কবিতাই আমার দেশ।

আমি কি কবিতার দেশে থাকব?

হ্যাঁ।

সম্ভব?

সম্ভব। তোমাকে খুঁজে বেড়িয়েছি, পথে পথে। বরিশাল, কলকাতা, অশোকের ধূসর জগতেও খুঁজেছি। ঢাকায়ও খুঁজেছি। ইডেন কলেজের সামনে সন্ধ্যায় ঘোরাঘুরি করেছি। তোমাকে পাইনি। না পেলে কী করব?

এ নারী এবার দ্বিধাগ্রস্ত। এ নারী এবার দ্বিধাবরী। এ নারী আজ দ্বিখণ্ডিতা। কী করবে সে?

সে পারছে না, সে আজ ইচ্ছে করলেও পারবে না, এটা সে জানে। তবু তার মন কেঁদে ওঠে। সে এ দিঘির পারের রাস্তা থেকে চলে যেতে চায় কিংবা চায় না। কবি বুঝে ফেলেন, এ নারী যেতে পারবে না। না গেলেও তার চুল, চোখ নিয়ে যাওয়া যায়। তবু শেষ চেষ্টা... চলো না। 

এ নারীই সেই বনলতা সেন। ফলে তার সেই প্রশ্নটি আমরা আজও ভুলতে পারলাম নাÑ এতদিন কোথায় ছিলেন? 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা