শামসুর রাহমানের কবিতা
আহমেদ বাসার
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩৮ এএম
শামসুর রাহমান, ২৩ অক্টোবর ১৯২৯-১৭ আগস্ট ২০০৬
নৈঃসঙ্গ্য আধুনিক মানুষের এক অনিবার্য নিয়তি। জন্মগতভাবে মানুষ যেমন নিজের ভেতরে নৈঃসঙ্গ্যের বীজ বহন করে, তেমন সমাজ-উত্থিত বিবিধ অনন্বয়ও ব্যক্তির মধ্যে তৈরি করে নৈঃসঙ্গ্যবোধ। নৈঃসঙ্গ্যচেতনার সূতিকাগার আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ (Alienation)। বস্তুত মাতৃগর্ভ থেকে বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে এক বিরূপ বিশ্বে মানবশিশুর যাত্রা হয়। ফলে জন্মটাই যেন এক বঞ্চনা। আমৃত্যু তাকে এ বোধ তাড়িত করে, যাকে জাক লাকাঁ বলেছেন trauma বা মানসিক ধাক্কা। আর এ মানসিক ধাক্কা ঘটে জন্মের মুহূর্তেই, ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। অর্থাৎ জরায়ুর উষ্ণ পরিবেশ ও নিশ্চিন্ত বিরাম ত্যাগ করে প্রাকৃতিক শীতলতার মধ্যে নেমে আসাটাই লাকাঁর মতে একটি বৃহৎ trauma। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে মানুষের সহযাত্রী এ একাকিত্ব বা বিচ্ছিন্নতা। তাই Erich kahler তার The Tower and the Abyss গ্রন্থে বলেছেন, The history of man could very well be written as a history of the alienation of man. আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা কার্ল মার্কস দেখিয়েছেন অসম সমাজব্যবস্থার অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে। সমাজের মৌলকাঠামো ও উপরিকাঠামোর ভেতরকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত, শ্রম ও মজুরির অপরিসীম ব্যবধানই আধুনিক মানুষের মনোলোকে গেঁথে দেয় বিচ্ছিন্নতাবোধ। আধুনিক কবিদের কবিতায় নৈঃসঙ্গ্যের প্রগাঢ় প্রতিফলন লক্ষ্যযোগ্য। তিরিশের দশকের অন্যতম কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে (১৯০১-১৯৬০) আমরা বলতে শুনি, ‘বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী।’ বিরূপ বিশ্বের কশাঘাত কবি জীবনানন্দ দাশকেও (১৮৯৯-১৯৫৪) করে তুলেছিল একাকী, নিঃসঙ্গ। সময়, সমাজ ও জীবনের প্রতিকূলতায় ক্ষতবিক্ষত কবির হাহাকার উঠে আসে হৃদয়স্পর্শী ভাষায়Ñ
‘তবু কেন এমন একাকী?
তবু আমি এমন একাকী!’
তিরিশের দশকের কবিতার ঐতিহ্য আশ্রয় করে উঠে আসা শামসুর রাহমানও নৈঃসঙ্গ্যচেতনায় আক্রান্ত। তার সমগ্র কাব্য-ভূগোল যেন এক নৈঃঙ্গ্যের দীর্ঘ ছায়া আর তা উত্তরণের প্রাণান্ত প্রয়াস। প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে (১৯৬০) কাব্যগ্রন্থেই তার নৈঃসঙ্গ্যচেতনার তীব্রতা ধরা পড়ে। এ গ্রন্থে প্রধান হয়ে উঠেছে ‘প্রতিবেশের সঙ্গে তার অনন্বয়চেতনাÑ
বিরূপ লতার গুচ্ছে জড়িয়ে শিং
কালো রাত্তিরে তৃতীয় প্রহরে একা
কাঁদে প্রত্যহ হরিণ-হৃদয় যার
তাকে নেব চিনে প্রাণের দোসর সে-যে’
শামসুর রাহমানের নৈঃসঙ্গ্যচেতনায় ব্যক্তিমানস ও সমাজবাস্তবতার যুগপৎ প্রভাব লক্ষণীয়। অন্তর্মুখী স্বভাব ও বিরূপ সমাজ তাকে করে তোলে নিজস্ব মনোলোকের বাসিন্দা। তাই জনতার খুব কাছাকাছি নেমে এলেও তিনি জনতার কবি হতে পারেননি, বহুমানুষের ভিড়েও তিনি ভীষণ একা এবং নিঃসঙ্গÑ
‘চারদিকে লোকের ভিড় আর তুমুল
জনগর্জন, তবু কেমন নিঃসঙ্গ লাগে নিজেকে।’
নাগরিক মনোভঙ্গি শামসুর রাহমানের নৈঃসঙ্গ্যচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নগরের প্রতিটি মানুষই একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। নির্মম, নিষ্ঠুর ও বিমাতাসুলভ শহর সংবেদনশীল যেকোনো মানুষের হৃদয়ে রক্ত-ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। যান্ত্রিক শহরে মানুষও যন্ত্রবৎ চালিত হয়। কারও সঙ্গে কারও কথা বলার অবসর নেই। চারদিকে পাথর আর দেয়ালঘেরা শহর মানুষকে চরম নৈঃসঙ্গ্যের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে প্রকৃতির লালিত্যহীন শহরে দেয়ালের সঙ্গে কথা বলাই যেন মানুষের নিয়তি। শামসুর রাহমানের ভাষায়Ñ
‘তবে কি এভাবে
অন্ধ দেয়ালের সাথে কথা বলে যাব একা একা?’
সমাজ-প্রতিবেশ বিচ্ছিন্ন এ শহরে মানুষ সমস্ত বিশ্বাস-প্রত্যয় হারিয়ে নৈঃসঙ্গ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ফলে আত্মচেতনার ক্ষেত্রেও দেখা দেয় আত্মসংশয়। সংশয়, সংঘাতে বিদীর্ণ মানুষ নিজের কাছে নিজেই অচেনা হয়ে যায়। শামসুর রাহমানের কবিতায় সত্তাবিচ্ছিন্ন মানুষের নৈঃসঙ্গ্যের তীব্র প্রকাশ লক্ষ্যযোগ্যÑ
‘আমি এক কংকালকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটি, প্রাণ খুলে কথা বলি পরস্পর। বুরুশ চালাই তার চুলে বুলোই সযত্নে পাউডার।’
নিজের সত্তা থেকে অস্থি-মজ্জা-হাড়-কঙ্কালকে বিচ্ছিন্নভাবে অনুভব করার মধ্যে নৈঃসঙ্গ্যের তীব্রতা সহজেই ধরা পড়ে। এ আধুনিক মানুষ শুধু সমাজ থেকেই বিচ্ছিন্ন নয়, নিজের শরীরী অনুভব থেকেও বিচ্ছিন্ন। শামসুর রাহমান তার অজস্র কাব্যপঙ্ক্তিতে দুলিয়ে দিয়েছেন ‘দমবন্ধ করা’ নৈঃঙ্গ্যের তীব্র দহনÑ
‘এখন মাঝরাস্তায় আমি, দমবন্ধ-করা নিঃসঙ্গতা
একটা মাকড়সার মতো হাঁটছে
আমার চোখে, গালে, কণ্ঠনালিতে।’
এ পঙ্ক্তিগুলোয় প্রতিফলিত হয়েছে নৈঃসঙ্গ্যের নগ্নরূপ। ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাস ও মানস-কাঠামোর স্বকীয়তা শামসুর রাহমানের নৈঃসঙ্গ্যচেতনাকে অভিনব রূপ দিয়েছে। নির্জনতাপ্রিয় মনোভাব তাকে অবলম্বনহীন এক ধূসর ভূখণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়Ñ
‘নীলিমা-মনস্ক ঈগল কি কাঁদে পাহাড় চূড়ায়
শ্বাসরোধকারী একাকিত্বে কোনোদিন?
পাখা তার দ্যুতিহীন, ভীষণ বিবশ পড়ে আছে বড় একা’
এখানে ‘নীলিমা-মনস্ক’ ঈগলের আড়ালে ব্যক্তি শামসুর রাহমানকে খুঁজে পেতে খুব কষ্ট হয় না। নৈঃসঙ্গ্যের বেদনার পাশাপাশি কবি-স্বভাবের স্বকীয়তার ঘোষণাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রেম, সংসার ও পারিবারিক জীবনের ব্যর্থতাও তাকে নৈঃসঙ্গ্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। কবি তীব্রভাবে রমণীর ভালোবাসা আঁকড়ে ধরে একাকিত্বের সমাধিসৌধ রচনা করতে চান, কিন্তু বারবার ব্যর্থ হন। ফলে নৈঃসঙ্গ্যের গহ্বরে পতিত কবির আর্তনাদ শিল্পিত হয়ে ওঠে এভাবেÑ
‘এমন কোনো প্রান্তর নেই বাকি,
নেই কোনো নদীতীর কিংবা পথ, অথবা পাতাল
যেখানে যাইনি আমি তোমার সন্ধানে, অন্তরাল
নিজেই করেছ সৃষ্টি, আজ আমি ভীষণ একাকী।’
রমণীর ভালোবাসার তৃষ্ণায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত জীবনানন্দ দাশকেও আমরা নৈঃসঙ্গ্যের বেদনায় জর্জরিত হতে দেখেছি। শামসুর রাহমান তার প্রিয়তমা রমণীকে জল-স্থল-পাতালে খুঁজে খুঁজে একাকিত্ব বরণ করেছেন। অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশ জেনে গেছেন তিনি ‘নক্ষত্রের পারে’ কিংবা পৃথিবীর ‘ধুলো মাটি কাঁকরে’ হারালেও কাঙ্ক্ষিত রমণী তাকে খুঁজতে আসবে না কোনো দিনÑ
‘যদি আজ পৃথিবীর ধুলো মাটি কাঁকরে হারাই
যদি আমি চলে যাই
নক্ষত্রের পারেÑ
জানি আমি, তুমি আর আসিবে না খুঁজিতে আমারে’
তবে নৈঃসঙ্গ্যের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও তার কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে। কখনও তিনি জনসমুদ্রে কিংবা মিছিলের মাঝখানে নেমে আসেন। কিন্তু সেখানেও নিজেকে তার বড় একা মনে হয়। কখনও তিনি ক্ষোভে-দুঃখে-যন্ত্রণায় চিৎকার করেন, কিন্তু তাতে তার নৈঃসঙ্গ্যের বিশাল গহ্বরই কেবল উন্মোচিত হয়।
‘আমি কি থাকব পড়ে লোকালয় থেকে দূরে এমন একাকী?
বহুদিন তুমি চোখ তুলে দেখনি আমাকে, বহুদিন
আমার আকাঙ্ক্ষাগুলি-আঙুলের ডগায় নাচিয়ে
দিয়েছ হেলায় ছুঁড়ে, আমি অভিমানে
নিশ্চুপ গিয়েছি চলে নিজের নৈঃসঙ্গ্যে পুনর্বার।’
নৈঃসঙ্গ্যের তীব্র বোধ শামসুর রাহমানের কবিতায় একটি অন্তর্লীন যন্ত্রণা-স্রোতের জন্ম দেয়, যা তার কবিতা করে তোলে নরম-কোমল ও হৃদয়স্পর্শী। ফলে বাংলাদেশের উত্তাল রাজনৈতিক বিক্ষোভ কবিতায় ধারণ করেও তিনি হতে পারেননি কাজী নজরুল ইসলামের মতো উচ্চকণ্ঠের কবি। প্রতিবাদী কবিতায়ও তার গোপন অসহায়তা ও নৈঃসঙ্গ্যের ছায়া লেগে থাকে, যা তাকে স্বকীয়তায় ভাস্বর করে তোলে।