সাব্বির জাদিদ
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩৬ এএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
বিকালের মোলায়েম রোদ শুয়ে আছে দৃষ্টি চশমা হাউসের সিঁড়িতে। মনোরম সে রোদ মাড়িয়ে দোকানের ভেতর পা গলাতেই পনেরো বছর আগের এক ধূসর স্মৃতি শরিফুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। শরিফুলের সামনে আজ থরে থরে সাজানো সানগ্লাস এবং ওই সানগ্লাস কিনতেই সে দোকানে এসেছে, অথচ পনেরো বছর আগে এ সানগ্লাসের জন্য আদরের ছেলেকে সে থাপ্পড় মেরেছিল। স্মৃতি ভোলার জন্য পনেরো বছর কম সময় নয়। বিশেষত এক নিম্নমধ্যবিত্ত বাবা, প্রতিদিনই যাকে সংসারের নির্দয় কাঁটায় রক্তাক্ত হতে হয়, সন্তানের গালের একটি থাপ্পড় ভুলতে তার জন্য পনেরো বছর নয়, পনের ঘণ্টাই যথেষ্ট। শরিফুলের ক্ষেত্রে হয়েছিলও তাই। ওই থাপ্পড়ের এক ঘণ্টা পরই সে হয়ে উঠেছিল স্বাভাবিক মানুষ। এমনকি দুই দিন পর ভুলেও গিয়েছিল ঘটনা। কিন্তু আজ, এত বছর পর, দৃষ্টি চশমা হাউসে ফুলের মতো সাজানো সানগ্লাসের সামনে দাঁড়িয়ে, সেই অতি সাধারণ ঘটনা বড় বেদনা হয়ে বাজতে থাকে শরিফুলের হৃদয়ে। তার কেবলই মনে হয়, সামান্য একটা সানগ্লাসের জন্য সিক্সে পড়ুয়া ছেলের গায়ে হাত তোলা তার ঠিক হয়নি। পরক্ষণে তার মনে দানা বাঁধে নতুন সংশয়। আসলেই কি ওটা সামান্য ঘটনা? সম্মান এবং সংস্কারের বাইরে যাদের জীবনে বিশেষ কোনো অর্জন নেই, সেই পরিবারে বেড়ে ওঠা একটি ছেলের পক্ষে সানগ্লাস চুরি সামান্য ঘটনা হতে পারে না। এতে যে জীবনের একমাত্র অর্জনটুকুও ধুলোয় মিশে যায়। হ্যাঁ, অনীক একটি সানগ্লাস চুরি করেছিল। এ কাজে অনীককে প্ররোচিত করেছিল সহপাঠী জায়েদ। ওরা তখন হরিনারায়ণপুর বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। এক ভাদ্রের সকালে জায়েদ ক্লাসে এলো সানগ্লাস পরে। মুহূর্তে ক্লাসজুড়ে হইচই পড়ে গেলÑ জায়েদ আজ নায়ক সেজে এসেছে। বন্ধুরা ভিড় জমাল জায়েদের চারপাশে। কেউ কেউ ছুঁয়ে দেখতে লাগল ওর কালো চশমাটি। জায়েদের সঙ্গে যাদের ভাব ছিল, তারা বিশেষ ওই চশমাটি চোখে লাগিয়ে দোতলার বারান্দা থেকে রোদ ঝলসানো সবুজ মাঠের দিকে তাকানোর সুযোগ পেল। তরিকুল সূর্যের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, এটা পরে রোদে তাকানোয় তো ভারি আরাম!
জায়েদ সেদিন ক্লাসের নায়ক। সে ভারিক্কি চালে বলল, রোদের মধ্যে যেন ক্রিকেট খেলতে অসুবিধা না হয়, সেজন্য আব্বা কিনে দিয়েছে।
Ñকত দাম রে?
Ñতা জানি না। একশ তো হবেই।
সেদিন জায়েদকে ঘিরে স্কুলের বারান্দায় যে ভিড় জমেছিল, সে ভিড়ের এক নিরীহ সদস্য ছিল অনীক। সম্পর্কের দূরত্বের কারণে জায়েদের কাছে ভিড়তে পারছিল না সে। কিন্তু ভেতরটা তার পুড়ে যাচ্ছিল। চশমাটা যদি একবার সে চোখে দেওয়ার সুযোগ পেত, এক মুহূর্ত দেরি না করে তখনই ছুটে যেত লক্ষ্মণ কাকার সেলুনে। বিরাট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখত নিজেকে। কিন্তু জায়েদের কাছের বন্ধুদের দাপটে সে সুযোগ পেল না অনীক। সারাটা সকাল তার মন খারাপ হয়ে রইল। ভাদ্রের সেই চকচকা দ্বিপ্রহরে অনীকের মনের মাঝে ঢুকে গেল সানগ্লাস। তারও অমন একটি সানগ্লাস চাই। তবে খেলার জন্য নয়, নায়ক হওয়ার জন্য। অনীক টিভিতে দেখেছে, নায়ক শাকিব খান সানগ্লাস পরে নায়িকাদের সামনে ভাব নেয়। অনীক নিজেকে শাকিব খানের সঙ্গে তুলনা করে। তারও শাকিব খানের মতো চুল। তারও শাকিব খানের মতো গায়ের রঙ। তারও শাকিব খানের মতো মুখের হাসি। পার্থক্য এক জায়গায়Ñ সানগ্লাস। শাকিব খানের সানগ্লাস আছে, অনীকের নেই। অনীকের বিশ্বাস, একটি সানগ্লাস থাকলে সেও শাকিব খানের মতো সুন্দর হয়ে উঠবে। অনীক বাড়িতে গিয়ে বায়না ধরল সানগ্লাসের। একই ক্লাসের জায়েদের যদি সানগ্লাস থাকতে পারে, অনীকের কেন নয়!
মা তো শুরুতে সানগ্লাস জিনিসটা ধরতেই পারলেন না। বললেন, তুই কি চোখে কম দেখিস যে চশমা পরবি?
অনীক কী করে বোঝায়, এটা পাওয়ারওয়ালা চশমা না, সানগ্লাস।
Ñওই হলো, একই জিনিস। কিন্তু এটা দিয়ে তুই কী করবি?
Ñখেলা করব।
Ñচশমা দিয়ে খেলা!
Ñআরে দিয়ে না, পরে।
Ñখেলার জন্য চশমা পরতে হয় তা তো কোনো দিন শুনিনি।
Ñরোদ ঠেকানোর জন্য। এটা পরলে রোদের মধ্যেও বল ক্লিয়ার দেখা যায়। সহজে ছক্কা মারা যায়।
Ñমন দিয়ে পড়ালেখা কর। চাকরি করে যত খুশি চশমা কিনিস। আমাকেও একটা দিস।
বিরক্ত হলো অনীক। পৃথিবীর সব বাবা-মাই কি এমন! তাদের সব আলাপের গন্তব্য ওই পড়ালেখা!
মায়ের সঙ্গে ছেলের এই সংলাপ যখন চলছিল, শরিফুল তখন বাড়ি ছেড়ে বেশ দূরে মাঠে, কলার ক্ষেতে পানি দিচ্ছে। বিকালে যখন কলাগাছের ছায়া ভূতের মতো দীর্ঘ হয়ে এলো, শরিফুল তখন বাড়ি ফিরল। আমেনা বড় মমতা নিয়ে স্বামীর হাতে পানির গ্লাস দিল আর ছেলের সানগ্লাসের কথা তুলল। কিন্তু বউয়ের কথা পরিশ্রান্ত শরিফুলের কান স্পর্শ করলেও হৃদয় স্পর্শ করল না। কারণ যেদিন সে ছেলের বাবা হয়েছে, সেদিন থেকেই জেনেছে, সন্তানেরা বায়না নিয়েই পৃথিবীতে আসে। সন্তানদের এসব বিলাসী বায়নার চেয়ে শরিফুলের কাছে অধিক সত্যের নাম ভাত। ভাতের ওপর সত্য কিছু নেই। অনীক সানগ্লাস পেল না। তার সব ক্রোধ গিয়ে পড়ে আব্বার ওপর। যে আব্বা চাল কিনতে পারে, সংসারের যাবতীয় ব্যয় মেটাতে পারে; একটি সানগ্লাস কেনা তার জন্য কী এমন কঠিন কাজ! আসলে ছেলের সাধ-আহ্লাদ বোঝার মনটাই নেই আব্বার। অনীকের মাঝে মাঝে মনে হয়, সে আর স্কুলে যাবে না, পড়বে না, মূর্খ হয়ে থাকবে। বড় হয়ে যখন চাকরি পাবে না, তখন বুঝবে সবাই। একটি সানগ্লাসের জন্য মনের মাঝে যখন এসব সংঘাত চলে, তখন শহর থেকে এক পাত্র আসে অনিতাকে দেখতে। অনিতা অনীকের বোন। ক্লাস টেন। বুবুর বিয়ে হবে কী হবে না, হলে বুবু কোথায় থাকবে কী থাকবে না, এসব ভাবনার ধারেকাছে নেই অনীক। তার চোখ তখন পাত্রের বুকপকেটের দিকে। যেখানে সানগ্লাসের একটি ডাঁটি ঈদের বাঁকা চাঁদের মতো উঁকি মারছে। অমনি খুশিতে ঝলমলিয়ে ওঠে অনীক। এই লোকের সঙ্গেই তো বুবুর বিয়ে হওয়া উচিত। এ অচেনা মানুষটা যদি দুম করে তার দুলাভাই হয়ে যায়, অনীককে সানগ্লাসটা না দিয়ে কি সে থাকতে পারবে! অনীক মানুষটার চারপাশে ঘুরঘুর করে। পানির জগ, গামছাসহ যখন যা প্রয়োজন এগিয়ে দেয়। মানুষটা ভালোও। অনীককে স্নেহ করে। একবার তো গালে হাত বুলিয়ে দেয়। সময় বইতে থাকে। রান্নাঘর থেকে ছড়িয়ে পড়ে পোলাওয়ের সুবাস। পাড়ার দুই চাচি অনিতাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পাত্রের সামনে পাঠান। পাত্রের বোন ও দুলাভাই অনিতাকে বেশ কিছু প্রশ্ন করে। পাত্রী দেখা শেষ হলে শুরু হয় খাওয়াদাওয়া। অনীকের মনে হয়, এই ছেলের সঙ্গেই বুবুর বিয়ে হয়ে যাবে। আর বিয়েটা হলেই সে হয়ে যাবে সানগ্লাসের মালিক। কিন্তু বিয়ে যদি না হয়! তারা যদি কোনো কারণে অপছন্দ করে বুবুকে! না, সানগ্লাস বিষয়ে অনীক সংশয়ের মাঝে থাকতে চায় না। যেকোনো মূল্যে তার এ সানগ্লাসটা চাই। খাওয়াদাওয়ার পর পাত্র যখন বাথরুমে যায় এবং যাওয়ার আগে টেবিলের খাতার পাশে রেখে যায় সানগ্লাস, তখন সেদিকে তাকিয়ে চোখ চকচক করে অনীকের। রুমে তখন অনেক মানুষ। সবাই খাটের ওপর পা তুলে বসে গল্প করছে। অনীক জানে, ভিড়ের ভেতরেই প্রিয় জিনিস লুকানো সহজ। ভিড়ের সুবিধাটাই নেয় অনীক। সবাইকে একঝলক দেখে নিয়ে সে খাতার ভেতর লুকিয়ে ফেলে সানগ্লাসটি। এরপর ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। অস্বাভাবিক দ্রুততায় পাশের ঘরে জুতার ভেতর লুকিয়ে ফেলে জিনিসটি। তারপর ভয়ে-আনন্দে-উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সে বাড়ি থেকে পালায়। সারা দিন আর বাড়ি ফেরে না অনীক। পোলাওয়ের ঘ্রাণ তার পেটের মধ্যে ক্ষুধার ছোবল বসালেও সে বাড়ি ফেরে না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে যখন চারপাশ নিথর হয়ে আসে, যখন বাঁশঝাড়ের মাথায় একঝাঁক শালিক কিচিরমিচির শব্দে মাতম করে, যখন কুসুম পেলব সূর্যটি বুবুর মুখের মতো মিষ্টি হয়ে শিমুল গাছের ফাঁক দিয়ে ডুবে যায় তখন তাড়া আসে ঘরে ফেরার। চঞ্চল অনীক আজ বড়দের মতো গম্ভীর। সাহসী অনীক আজ হরিণশাবকের মতো ভীরু। ঘরে ফেরার পথে যাকেই সে দেখে মনে হয় আব্বা তাকে খুঁজতে পাঠিয়েছে। অমনি সে গাছের আড়ালে লুকানোর উদ্যোগ করে। গাবতলায় বসে থাকা একটা কুকুর ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে অনীকের দিকে। ওর মনে হয়, কুকুরটাও নিশ্চয় জেনে গেছে ওর চুরির খবর। অনীক ভয়ে ভয়ে কুকুরের সামনের পথটা পার হয়ে যায়। বাড়ির সামনে গিয়ে ডুমুরের ঝোপের আড়ালে সে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়ে আর আল্লাহর কাছে বলে, বাড়িটা যেন আগের মতোই থাকে, বুবুকে দেখতে আসার আগে যেমন ছিল। বিড়ালের মতো চুপিচুপি টিনের দেউড়ি ঠেলে বাড়ির ভেতর ঢোকে অনীক। স্বস্তির খবর, আব্বা তখন বাড়িতে নেই। মা জায়নামাজে। বুবু শুয়ে। ঘুঘুর বাসার মতো নিঝুম পুরো বাড়ি। অনীক কলতলায় না গিয়ে ধুলো পায়ে চুপিচুপি শুয়ে পড়ে নিজের বিছানায়। ভাবে, খুব দ্রুতই ঘুম নেমে আসবে। আর ঘুমিয়ে গেলেই পরদিন সকালে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এর আগেও সে অন্যায় করে ঘুমিয়ে গিয়ে সকালে সাধারণ ক্ষমা পেয়েছে। কিন্তু আজ যে ঘুমই আসে না। একদিকে ক্ষুধা ও ভয়, অন্যদিকে সানগ্লাসের উত্তেজনা। অনীক চোখের পাতা ফাঁক করে মাঝে মাঝে সেই জুতাটি দেখে, যার পেটের ভেতর এ পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তুটি লুকিয়ে আছে। অনীক খুব করে চায়, সবকিছু দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাক। চুরির সানগ্লাস সবার সামনে চোখে পরার মতো স্বাভাবিক। কিন্তু সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার আগে যে ঝড় ওঠা নিয়ম প্রকৃতির, সেই ঝড়ের মুখোমুখি হতেই হয় অনীককে। শরিফুল বাদ এশা বাড়ি ফিরে কান ধরে টেনে তোলে অর্ধঘুমন্ত ছেলেকে। ঠাস করে একটা থাপ্পড় মেরে শুধু একটা কথাই বলে, চোর!
অনিতা ছুটে এসে আগলে ধরে ভাইকে আর চিৎকার কলে বলে, মারেন কেন! এতটুকু ছেলে!
আজ অনীকের আঘাত ঠেকাতে ছুটে এসেছে বুবু, অথচ দুই দিন পর ঘটক পাত্রপক্ষের যে বার্তা নিয়ে আসবে, সে বার্তায় সবচেয়ে বেশি আঘাত পাবে বুবু। সত্যিই, দুই দিন পর ঝুম বৃষ্টির দুপুরে অনীক-অনিতা দুজনই যখন ঘরবন্দি, তখন ভিজতে ভিজতে ঘটক এসে জানায়Ñ পাত্রপক্ষ অনিতাকে পছন্দ করেনি। ঘটক চলে যেতেই ধীর পায়ে অনীকের পাশে এসে বসে অনিতা। তারপর বৃষ্টির মতো ছলছল চোখে বলে, ভাই, তোর জন্য আমার বিয়েটা হলো না!
অক্টোবরের নরম বিকালে দৃষ্টি চশমা হাউসে শরিফুল যখন দোকানের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন সানগ্লাসটি খুঁজে ফেরে, হাসপাতালে অনীকের মাথার কাছে বসে তখন পুরোনো দিনের এসব স্মৃতিচারণা করে অনিতা। অনীক হাতড়ে ফিরে বুবুর বাহু স্পর্শ করে বলে, আব্বা কোথায়, বুবু?
Ñআব্বা দোকানে গেছে সানগ্লাস কিনতে।
Ñআব্বা যদি সেদিন সানগ্লাস কিনে দিত, তোমার বিয়েটা ভাঙত না।
Ñচুপ কর পাগল। আমি এখন অনেক ভালো আছি।
সত্যিই, অনিতা এখন বেশ ভালো আছে। সেই বিয়েটা ভেঙে গেলেও অন্য পাত্রের সঙ্গে জীবন জোড়া লাগতে সময় লাগেনি অনিতার। সে এখন ঢাকায় থাকে। স্বামী একটি গার্মেন্টের ফ্লোর ইনচার্জ। অনীকের পড়ালেখা হয়নি। যে ছেলে ক্লাস সিক্সে থাকতে শাকিব খান হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং সেই স্বপ্নপূরণে সানগ্লাস চুরি করে, তার পড়ালেখা হওয়ার কথাও না। টেনেটুনে ইন্টার পরীক্ষা দেওয়ার পর সে চলে এসেছে ঢাকায় এবং দুলাভাইয়ের দৌলতে ঢুকে পড়েছে গার্মেন্টে। চাকরির জীবন ভালোই চলছিল অনীকের। কিন্তু এরই মাঝে চলে আসে বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তÑ কোটা সংস্কার আন্দোলন। চারপাশে অগুনতি মানুষের মিছিল দেখে আজন্ম বাউন্ডুলে অনীকের মন থাকে না ঘরে। সেও নেমে আসে পথে। একদিন, দুই দিন, তিন দিনÑ প্রতিদিনই সে মিছিল করে। এর মাঝে সে অনেক সহযোদ্ধাকে চোখের সামনে লাশ হতে দেখে। সে যত রক্ত দেখে, সে যত লাশ দেখে রাজপথ তত তাকে পাগলের মতো ডাকে। আগস্টের পহেলা তারিখে, যখন দেশের আকাশে নতুন সূর্যের কিরণ উঁকি মারছে, তখন অনীকের জীবনে নেমে আসে স্থায়ী অন্ধকার। চোখে ছররা গুলি খেয়ে সে ভর্তি হয় হাসপাতালে। সানগ্লাস পরে শাকিব খান হতে চাওয়া ছেলেটা এক টুকরো আলোর জন্য, মাকে একটু দেখবার জন্য হাসপাতালের বেডে ছটফট করতে থাকে। এ দিনগুলো অনীকের জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময়। এ দিনগুলোয় সে ঢাকা মেডিকেল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা নেয়। কিন্তু কোথাও সে আলোর দেখা পায় না। দিন যত যায়, তার পৃথিবী ততই অন্ধকার হতে থাকে। শেষমেশ অক্টোবরে ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন, দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে উন্নত চিকিৎসার জন্য যেতে হবে সিঙ্গাপুরে। লাগবে অন্তত পঞ্চাশ লাখ টাকা, যা অনীকের পরিবারের জন্য এক দুঃস্বপ্ন। শরিফুল বিভিন্ন এনজিওর কাছে যায়, সরকারের কাছে ধরনা দেয়, কিন্তু পঞ্চাশ লাখ টাকার স্বপ্ন অধরাই রয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত অন্ধত্বের নিয়তিই তাই মেনে নেয় অনীক ও তার পরিবার।
আজ হাসপাতাল থেকে রিলিজ পাবে অনীক। একদিন বুবুর বাসায় থেকে কাল সে ফিরে যাবে সবুজের মায়াভরা গ্রাম ছুটিপুরে। বেদনা এক জায়গাতেইÑ গ্রামে ফিরলেও শালিকের ওড়াউড়ি আর দেখতে পাবে না সে। দেখতে পাবে না ঠান্ডা ডাবের মতো গোলগাল চাঁদ ও বৃষ্টি। আর এসব ভেবে, সানগ্লাস পরে নায়ক হতে চাওয়া অনীক হাসপাতালের বালিশ ভেজাতে থাকে।
সন্ধ্যার আগেই চশমার দোকান থেকে ফিরে আসে আব্বা। সঙ্গে নিয়ে আসে একটি সানগ্লাস। অনীকের পাশে তখন মা ও বুবু। শরিফুল গোপনে চোখ মুছে অনীকের সামনে এসে দাঁড়ায়। ছেলের দৃষ্টিহীন চোখ থেকে হাসপাতালের দেওয়া পুরোনো সানগ্লাসটা খুলে পরিয়ে দেয় নতুন সানগ্লাস। তারপর ভেজা গলায় বলে, বাড়িতে যাবি, কত মানুষ তোকে দেখতে আসবে, এ সময় পুরোনো চশমা পরলে হবে! এই নে তোর নতুন চশমা। পনেরো বছর আগে দিতে পারিনি। আজ তার কাফফারা দিলাম।
আব্বার কথায় ডুকরে ওঠে মা। অনিতা ভাইয়ের এলোচুল কপাল থেকে সরিয়ে উৎফুল্ল গলায় বলে, ভাই, নতুন সানগ্লাসে তোকে নায়কের মতো লাগছে!