আজাদুর রহমান
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৫৫ এএম
লালন সাঁই, ১৭ অক্টোবর ১৭৭৪-১৭ অক্টোবর ১৮৯০
ফকির লালন মুখে মুখেই গানের পদ রচনা করতেন। ফকির মানিক ও মনিরুদ্দিন শাহ্ বাঁধাগান লিখে নিতেন। মনে নতুন গান উদয় হলে হাঁক দিতেনÑ ‘আয় রে আয়, পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে’। মনিরুদ্দিন গান শুনে বাঁধাগান লিখতে গেলে তিনি হইহই করে উঠতেনÑ ‘লিখিস না, ছিনায় রাখ। এসব গান লোকে জানলে সারা বিশ্বে হইচই হবে। কেউ বুঝবে কেউ বুঝবে না।’ মনিরুদ্দিন শাহ্ লিখে রাখতেন। নিজহাতে বাস্তবে তিনি কয়টা গানের খাতা লিখেছিলেন, সে তথ্য সঠিকভাবে না পাওয়া গেলেও তার একটি হাতখাতা ফকির মন্টু শাহের হেফাজতে দেখেছিলাম। অরিজিনাল এ খাতাটিতে পর পর ৫৯৭টি গান আছে।
মনিরুদ্দিনের হাতের লেখা পরিচ্ছন্ন। কোথাও তেমন কাটাকুটি হয়নি। পাণ্ডুলিপির শেষভাগে আদ্যাক্ষরের বরাতে সাজানো আছে ঝকঝকে সূচিপত্র। কিছু পাতায় উই লেগেছিল বটে, কিন্তু মন্টু খুব যত্ন করে পুরো খাতার পাতাগুলো লেমিনেটিং করে নিয়েছেন। খাতা দেখাতে দেখাতে মন্টু একটু হতাশ হন। তারপর বলেন, ‘খাতাটা সরকারে চাইলে কোনো জাদুঘরে দিয়ে দেব। আমি মারা গেলে তো এ খাতাও একসময় হারাইয়া যাবে।’ আনোয়ারের কথাই সত্যি হলো। তিনি দেহত্যাগ করেছেন ক বছর আগে। জানি না সে খাতাটা উনি কার কাছে রেখে গেছেন। যা হোক, মনিরুদ্দিন শাহের হাতখাটাতা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। হ্যান্ডনোটের আদলে লেখা অরিজিনাল এ পাণ্ডুলিপিটি বাঁচিয়ে রাখতে এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
জীবদ্দশায়ই লালনের গান বহুলজনপ্রিয়তা পেয়েছিল। শিষ্যদের ধারণা, গানের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। প্রকৃতপক্ষে এত বিপুলসংখ্যক গান পাওয়া যায় না। শোনা যায়, কোনো কোনো শিষ্যের মৃত্যুর পর অসিয়ত মোতাবেক গানের খাতা তাদের কবরে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। অধিকন্তু সময়ে অনেক ভক্ত খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি। সাধুদের কাছে গান হলো জ্ঞান; তাদের সাধনসংগীত। মূলত গানের পদ-পদাবলিকে সাধুরা কালামের সমতুল্য ভাবেন। ফলে সুরের চেয়ে পদাবলির অন্তর্জালের সারকথাকেই বাউলরা মহৎ মনে করেন।
লালনকে সন্ধান করতে গেলে বারবার তাই গানের কাছে সমর্পিত হতে হয়। তাঁর জীবন সবার মতো নয়। তিনি বাস করেন চেনাÑঅচেনার মাঝামাঝি বন্দরে। তিনি কী বিশ্বাস করতেন, কী তাঁর ধর্মমত, জীবনপ্রণালি সবই তাঁর গানের দিব্যকথার মধ্যে বিরাজমান। অচেনা মানুষ ফকির লালন জীবনভর খুঁজে চলেছেন অচিন পাখি। সহজ কথায় বেঁধেছেন জীবনের গভীরতম গানÑ
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কম্নে আসে যায়।
তাঁর সহজাত কাব্যজ্ঞান এবং শব্দছন্দ এত উচ্চতর ছিল যে নেহাত সাদামাটা শব্দেরাও আন্তরিকভাবে উঠে আসত তাঁর গীতিকবিতায়। সার্থক কলাকৌশল ও মানানসই ব্যঞ্জনায় বাংলা, ইংরেজি, ফারসি, আরবিসহ অন্য সব শব্দ তিনি সমানে ব্যবহার করেছেন। সহজ শব্দ ব্যবহার করে গভীর কথার এমন আধ্যাত্মিক গীতিকবিতা একমাত্র লালন শাহই সফলভাবে সার্থক করে তুলতে পেরেছিলেন। যেমন এক ‘আয়না’ শব্দকেই তিনি তিন-চার রকম মানানসই কায়দায় ব্যবহার করেছেন তাঁর গানে। বাড়ির কাছে আরশিনগর, মন তুমি পাড়াহীন দর্পণ অথবা আয়নাআটা রূপের ছটা, আয়নামহল কিংবা শুধুই আয়না-পদগুলো সুন্দর মানিয়ে যায় লালনগানে।
লালনগানের ধারা মূলত বহুমাত্রিক। অন্যতম ধারাটি প্রবাহিত হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রেম-প্রার্থনার সঙ্গে। সংখ্যাগত দিক থেকে মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কিত গান সর্বাধিক হলেও সনাতন হিন্দুধর্মমতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ গানের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সে যা হোক, একজন কবি হিসেবে লালনের প্রধান কৃতিত্ব তাঁর গান সর্বজনগ্রাহ্য। গ্রাহ্য শব্দ মনমতো ব্যবহার করে তিনি জীবনের নিগূঢ় রহস্যের কথা বলতে পেরেছিলেন। গীতিকথার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য এতটাই গভীর এবং সাবলীল যে সুদূর দেশের মানুষও অনুবাদ করতে থাকে তাঁর গান। অনেক আগেই বহু গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। জাপানিজ, ফারসি, ইতালি ও হিন্দি ভাষায়ও চলছে তরজমা এবং অনুবাদের কাজ। ইংরেজ লালন গবেষক জেমসের কথাই ধরা যাক। জেমস ‘খাঁচার ভিতর অচিনপাখি কম্নে আসে যায়’সহ বেশ কয়েকটি গানের ইংরেজি অনুবাদ করেন। তাঁর ছন্দময় অনুবাদটির দু-পাঁচ লাইনের মধ্যেই পাওয়া যায় ভাষাগত ভঙ্গিমার আধ্যাত্মিক ভাবÑ
How does the unknown bird go
Into the cage and out again?
Could I but seize it?
I would put the fetters of my heart
Around it’s feet.
গোরা পাগল, হর গোবিন্দ, রাধাশ্যাম, শ্যামানন্দ, গগন হরকরা, অধরচাঁদ, পদ্মলোচন, দিনদয়ালসহ ভারত উপমহাদেশের আরও কিছু বাউল পদকর্তার দেখা মিললেও লালনের মতো করে জীবনের গভীর ভাববোধ এমন সর্বজনগ্রাহ্য করে এ বাংলায় আর কেউ বলতে পারেননি। অবশ্য মরমি গানের বিচারে লালনের সঙ্গে দেওয়ান হাছন রাজার গানের খানিক মিল পাওয়া যায়। লালন অচিনপাখিকে সন্ধান করেছেন এবং পাখি দিয়েই অচিনপাখির উপমা টেনেছেন। অন্যদিকে হাছন রূপক সেই পাখিকেই ডেকেছেন ময়না বলে। লালন যাকে খাঁচা বলেছেন, হাছন তাকেই পিঞ্জিরা জ্ঞান করেছেন। মূলত তাঁরা দুজনই পাখিরূপে আত্মার সন্ধান করেছেন। খাঁচা কিংবা পিঞ্জিরা সেখানে আমাদের পার্থিব দেহ-আত্মার বাতাবরণÑ
মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে
কান্দে হাছন রাজার মন মনিয়ায়রে।
বাংলার বাউল-ফকিরদের মতো চীনা দার্শনিকদের মধ্যেও কিছু কিছু আধ্যাত্মিক পদকর্তার সন্ধান মেলে। ওইসব প্রাচীন চীনা দার্শনিকের তেমন কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও বৃদ্ধ দার্শনিক কুনফুসিয়াস এবং তাও কে কিংয়ের নাম খুব উল্লেখযোগ্য। কুনফুসিয়াসের অধিকাংশ প্রবচন যদিও নীতিগত বিষয়ের ওপর তথাপি তাঁর কিছু রহস্যময় ও আধ্যাত্মিক প্রবচন আছে। যেমনÑ
We know so little about life, how can we then know about death?.ÑCunfucius
অথবা
I am a transmitter and not an originator; I am one who believes in and love the ancients.ÑCunfucius
অন্যদিকে তাও কে কিং আধ্যাত্মিক লাইনে কুনফুসিয়াসের চেয়েও বেশখানিক আগে চলেন। তাঁর অনেক প্রবচন আছে যেগুলো যেমন আধ্যাত্মিক তেমন রহস্যময়। তা ছাড়া তাঁর প্রবচনে বাউলধর্মী উদাসী মনেরও পরিচয় মেলেÑ
There is something that existed before the earth and the sky began and its name is the way-Tao ke Ching.
একজন কবি কতটা শব্দ শাসন করতে পারেন, কতটা বেমানান বিদঘুটে শব্দ ভাবরসে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারেন তা তাঁর শব্দ সমন্বয় ক্ষমতা থেকে খানিক আন্দাজ করা যেতে পারে। আপাত এবং আলাদাভাবে ‘কোতা’ শব্দটি খাপছাড়া শোনালেও তিনি এ শব্দ সফলভাবে ব্যবহার করেছেনÑ
কুত্বি যখন কফের জ্বালায়
তাবিজ তাগা বাঁধবি গলায়
তখন কি হবে ভালায়
মস্তকের জল সুস্ক হলে।
কোতা শব্দ লালন শুধু ব্যবহারই করেননি, সুরের সঙ্গে এর সমন্বয় করে একটি মানানসই আধ্যাত্মিক গীতিকবিতায় পরিণত করেছেন; যা হৃদয়কে সহজগ্রাহ্য করে তোলে। কোতা শব্দের মতো আরও অনেক শব্দের কথা বলা যেতে পারে যেমন ভড়ুয়া বাঙ্গাল, জলছ্যাচা কল, প্যালা দেওয়া, আবাল গুদড়ী, তালো ডোঙ্গা, খাজলত, ইল্লত, খুসকি জারী, ইঞ্জিল কল, বাটপার ইত্যাদি। লালনের বহুবিধ গানে অহরহ এ রকম দেশিবিদেশি শব্দ ও শব্দযুগলের সংমিশ্রণ ঘটেছে। এসব শব্দ স্বতন্ত্রভাবে অনেকটা বেসুরো ও বেমানান ঠেকলেও লালন পদাবলিতে শব্দগুলো এমন কায়দায় ব্যবহার করেছেন যে, সুরের সঙ্গে যোগ হয়ে তা এক নিগূঢ় ভাববোধ এনে দিয়েছেÑ
ভালো জলছ্যাচা কল পেয়েছ মনা
ডুবারুজন পায় সে রতন
তোর কপালে ঢনঢনা।
লালনগানের একটি প্রজ্ঞাময় দিক হলো শব্দের সরল গাঁথুনির সঙ্গে সুরের একান্ত মনোনিবেশ। শব্দের কাছে এসে সুর এমনভাবে মজেছে যে এদের মাদকতা এবং ভাবরস সহজেই মানবমনকে প্রজ্ঞানন্দে বিভোর করে তোলেÑ
বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শি বসত করে
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।
বাউলরা দেশময় ছড়িয়ে থাকলেও তাদের মন পড়ে থাকে লালনের বারামখানায়। বছরে তিন-তিন ছয় দিনের দুটি দিনরাত্রির বড় আয়োজন ছাড়াও সুযোগ পেলেই নানা ছুতোয় বাউলরা চলে আসেন তাদের মনতীর্থে। সংখ্যাতীত ভক্ত-অনুরাগী, আউল-বাউল সাধু-বৈষ্ণব আর ফকির-দেওয়ানের পদচারণে ক্রমেই ভারী হয়ে যায় সাধুবাজার। ভাবজগতের মধ্যে বেজে ওঠেÑতিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে।