× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সত্তরের কবিতার প্রবণতা ও হাসান হাফিজ

আহমেদ মাওলা

প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৪৬ এএম

হাসান হাফিজ, ১৫ অক্টোবর ১৯৫৫

হাসান হাফিজ, ১৫ অক্টোবর ১৯৫৫

প্রতিটি দশকেই এমন কিছু তরুণ, মননঋদ্ধ এসে দাঁড়ান; যাদের কাছে কবিতা হয়ে ওঠে অপরিহার্য, জীবনের গভীর অভাবের বিবরণ, পরম প্রাপ্তির উল্লাস, ঘনিষ্ঠ বান্ধব, রোদনের মতো প্রিয়তমা, একমাত্র গন্তব্য, লোভনীয় ভবিষ্যৎ, উদ্বেল আকাঙ্ক্ষা, আত্মমুক্তির একমাত্র বাহন। কবিতাই হয়ে ওঠে একমাত্র উপাস্য দেবতা ও ঈশ্বর। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের কবিতায় যে তরুণ কবিগোষ্ঠীর আবির্ভাব ঘটেছিল, স্বাভাবিকভাবেই তারা হৎপিণ্ডে ধারণ করেছিলেন সমকালীনতার উত্তাপ, জীবনানুভূতির ভিন্ন এক ব্যাখ্যা উপস্থিত করেছেন তাদের কবিতায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজের চেহারা-ছবি সত্তরের দশকের কবিতায় অনিবার্যভাবে পড়তে থাকে এবং উপমা, রূপক-চিত্রকল্পে মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গের উপস্থিতি কবিতাকে নতুনভাবে তাৎপর্যবান করেছে। নবজাগ্রত সমাজ, নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের নব উদ্দীপনায় অজস্র কবি জোয়ারের মতো উপস্থিত হন।

‘যেহেতু জোয়ার ছিলো প্রবল, জোয়ার নেমে গেলে, দেখা গেল সত্তরের অনেক কবিরই হাত ও চেতনা থেকে কলম খসে গেছে। এই খসে যাওয়ার একটা কারণ রয়েছে কবিতার আত্মস্বভাবে। কবিতা কখনো একেবারে কালজ হতে পারে নাÑতার একটি পা ঢুকে আছে কালোত্তরে। শুধু পা নয়Ñচোখও। আজ বলতেই হয়, সত্তরের অনেক কবির মধ্যে ছিলো না এই কালোত্তরের চোখ।’ (আবদুল মান্নান সৈয়দ/করতলে মহাদেশ, পৃষ্ঠা ২০২) সত্তরের কবিতার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনাসম্পৃক্তি। কালোত্তরের চোখ ছিল না বলেই সমকালীন প্রয়োজন মিটিয়েছে সত্য। কিন্তু চিরকালীন চেতনায় অভিষিক্ত হতে পারেনি। সত্তরের আত্মচারিত্র্য খচিত কবিরা হলেন আবিদ আজাদ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, দাউদ হায়দার, নাসির আহমেদ, শিহাব সরকার, কামাল চৌধুরী, সাইফুল্লাহ্ মাহমুদ দুলাল, হাসান হাফিজ, ময়ূখ চৌধুরী, আসাদ মান্নান, ত্রিদিব দস্তিদার, মিনার মনসুর, আবিদ আনোয়ার, নাসিমা সুলতানা, মাহমুদ কামাল প্রমুখ।

সত্তরের দশকের কবিতার স্বরূপ শনাক্ত করতে গেলে আমরা দেখতে পাই তিরিশোত্তর বাংলা কবিতার দীঘল একটি পটভূমি তো তারা পেয়েছেনই, তার ওপর পেয়েছেন বিশাল একটি সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঐতিহাসিক বিজয় পতাকা। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে সত্তরের কবিদের চেতনালোক, তাই একটা উচ্চমার্গীয় কণ্ঠধ্বনি সবার মধ্যে বিদ্যমান। পূর্ববর্তী ষাটের কবিরা যেমন লিটল ম্যাগাজিন কেন্দ্র করে সমবেত, যুক্ত থেকেছেন নানা গোষ্ঠীতে; সত্তরের সংখ্যায় প্রচুর হলেও পরস্পরবিচ্ছিন্নতার কারণে কোনো সুনির্দিষ্ট স্রোত তৈরি করতে পারেননি। সত্তরের কাব্যশস্যের যে বৈশিষ্ট্য সহজে চোখে পড়ে, তা হচ্ছে বিষয়বৈচিত্র্য, মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুষঙ্গ ব্যবহার, সর্বোপরি কাব্যভাষা। সত্তরের কাব্যভাষা সহজ-সরল, অজটিল, স্বচ্ছন্দ প্রকাশভঙ্গির কারণে অনেকের কবিতা হয়ে উঠেছে স্লোগানসর্বস্ব, উচ্চমার্গীয় চিৎকার।

অনেকের কবিতায় স্বাভাবিক ছন্দও অনুপস্থিত এবং নিরেট গদ্যসজ্জা অনেকের কবিতার প্রধান ভূষণ হয়ে পড়েছে। ফলে গদ্যসজ্জার কংক্রিট কবিতা ছন্দহীনতার কারণে গভীরতর জীবনবীক্ষা বা নান্দনিক ভাব-ব্যঞ্জনায় ব্যর্থ হওয়ায় তা পাঠকের মমর্মূলে পৌঁছাতে পারেনি। সত্তরের দশকে আগন্তুক ঋতুর মতোই অসংখ্য পত্রপত্রিকার প্রকাশ লক্ষ করা গেলেও উল্লেখ করার মতো কোনো সাহিত্য আন্দোলননির্ভর লিটল ম্যাগাজিন বা সাহিত্য পত্রিকা চোখে পড়ে না। সত্তরের কবিরা প্রায় সবাই হয়ে ওঠেন দৈনিক পত্রিকার সাহিত্যপাতানির্ভর; যা তাদের জন্য মোটেই আশীর্বাদ হয়নি। কেননা আর যা-ই হোক, দৈনিক পত্রিকার পাতা এ বাণিজ্যের যুগে কখনও সাহিত্যের মুখপত্র হতে পারে না। সত্তরের দশকের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। প্রবণতার সমূহ স্রোতের মধ্যে ভেসেও যে কজন আত্মচারিত্র্য খচিত কবির সাক্ষাৎ পাই, তার মধ্যে হাসান হাফিজ অন্যতম।

যে টগবগে তারুণ্য নিয়ে হাসান হাফিজ কাব্যযাত্রা করেছিলেন, সেই দীপ্তকান্ত পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম হয় ‘এখন যৌবন যার’ অর্থাৎ রূপমুগ্ধ যৌবন সঙ্গী করে তিনি কবিতার শিল্পতীর্থ পথে অগ্রসর হন। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। এ দুয়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে তার কাব্যমানস। তারপর বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক পালাবদল, ব্যক্তির ভেতরের ভাঙচুর, মূল্যবোধের নিদারুণ অবক্ষয়, অসহ্য বাস্তবতা সবকিছুর অভিজ্ঞতা জারিত হয়েছে হাসান হাফিজের কবিতায়। 

প্রেম ও ভালোবাসার বিচিত্র অনুভূতি-অভিজ্ঞতা তার কবিতায় রূপায়িত হলেও তিনি প্রকৃতিতে আশ্রয় এবং অত্মসমর্পণ করার প্রধান কারণ হাসান হাফিজ প্রবলভাবে জীবনবাদী কবি, জীবন তিনি চেটেপুটে খেতে ভালোবাসেন। সত্তরের দশকের প্রবণতা, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের মাটিতে যে বিমূঢ় বিস্ময় দেখেছেন, তা তাকে বেদনাহত করেছে। সংবাদিক হিসেবে অনেক কিছু দেখেছেন, যদিও তার কবিতায় আশ্চর্যজনকভাবে কোনো নির্দিষ্ট দলীয় অনুগত্যের প্রকাশ নেই, নেই কোনো স্লোগানের দুর্গন্ধ। নির্লোভ, নিরাসক্ত মানুষের মতো স্বস্তির পথে হেঁটেছেন। ‘আধা সেঞ্চুরির ঠিক দ্বারপ্রান্তে/পৌঁছে এসে মনে হয়/জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে গেছি/এতো রক্ত, এতো পাপ, নিষ্ঠুরতা/মানবিকতার ক্ষতি, অপচয় দেখে দেখে/বেঁচে থাকা বোধটিকে ক্লান্ত মনে হয়... এই ক্লীব সময়ের দৌরাত্ম্য ও দীর্ঘতা/কে কোথায় ভেসে যাবে ঠিক নাই/… তারপরও বলতে চাই না মৃত্যু ওহে/তুহুঁ মমশ্যামসমান।’ (বয়স যখন ঊনপঞ্চাশ/পুণ্য পুঁজি কিছু নাই) প্রকৃতিকে তিনি দেখেছেন মানব জীবনের আশীর্বাদ হিসেবে। সমকালীন জীবন ও সমাজের বহুবিধ বিচ্যুতি হাসান হাফিজের সংবেদনশীল  হৃদয় ক্ষতবিক্ষত করে। এ অনিষ্ট এবং ক্ষতি অপরিমাপ্য। কুড়াল হাতে বৃক্ষনিধন, নদী-খাল দখল-দূষণ, তাকে ব্যথিত করে। শুশ্রূষার জন্য পথ হাঁটেন, সন্ধান করেন এক নির্মল পৃথিবীÑএটাই হাসান হাফিজের অন্বিষ্ট ইউটোপিয়া। এটাই হাসান হাফিজের ‘এক সমুদ্র দুঃখ তিয়াস’। তাই তো তিনি বলেন, ‘শামুক স্বভাব ছিল তাই সর্বক্ষণ/নিজেকে গুটিয়ে রেখে/চেয়েছি কল্যাণ/... এই কৈফিয়ৎ দিচ্ছি নিজেকেই, অন্য কাউকে নয়/কৈফিয়ৎ তো না দিলেও চলে/চাহিদা কিছু নেই/...পরজন্ম যদি থাকে/শামুক করো না বিধি/শামুকেরা প্রশংসিত নয়/এই প্রাণী ধীরগতি/তৃষ্ণায় শুকিয়ে মরে/নিজেরই ভিতরে/জল পায় না শুধু পায় মরণ ছোবল’ (পিপাসার্ত পরজন্ম/এক সমুদ্র দুঃখ তিয়াস) আত্মপরতা ও স্বার্থপরতা, লাভ আর লোভের ডালপালা, ঈর্ষার আগুন, হাসতে হাসতে বুকে ছুরি বসিয়ে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা, প্রতারণার ছলচাতুরী এসব দেখে হাসান হাফিজ পার্থিব জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষা দিয়ে যে জীবন তিনি রচনা করেছেন, তা যেন অধরাই থেকে গেল এক জীবনে। 

হাসান হাফিজ ‘প্রেম’ থেকে ‘প্রকৃতিতে’ তারপর আশ্রয় বা প্রত্যাবর্তন করেছেন অধ্যাত্মচেতনার দিকে। এটি তার মানস অভিযাত্রা, ক্রমাগত নিজেকে নিজে অতিক্রমের একেকটি ধাপ। প্রকৃতি থেকে অধ্যাত্ম্য চেতনার এ শৈল্পিক বাঁকবদল তার কবিতাকে নতুন একটি শিল্পমাত্রা দান করেছে। এ পর্যায়ে তার কাব্যগ্রন্থের নাম হয় ‘পুণ্য পুঁজি কিছু নাই’। 

হাসান হাফিজ এভাবে আসক্তিহীন পৃথিবীর অধিবাসী হয়ে ওঠেন। পরিশুদ্ধ পথের সন্ধান করেন। যে পথে হেঁটেছেন বাংলার আউল-বাউল, সুফি-দরবেশ, লালন-হাছন। সমতটের সমতলে, যেখানে অপার্থিব আলো এবং সহজিয়া জীবনের তরি চলে নিরবধি। ‘ধাবমান সন্ধ্যা’ এজন্য তার কাছে ‘গৌরব’ হয়ে ওঠে এবং তিনি ‘লিরিকের’ খোঁজে বের হনÑ

‘লিরিকের সঙ্গে যদি কখনো গোধূলিলগ্নে নদীরপাড়ে অকস্মাৎ দেখা হয় তাকে বলে দেবো আমি কানে কানে চুপিচুপি তার জন্যে ঘুমের সমুদ্র সাঁতরে লোনাজলে প্রাণ ভিজিয়েছি, এখন আরোগ্য চেয়ে ঘুরে মরছি শূন্যতার অথৈ চাতালে, কোনো নিরাময় কিংবা প্রশমন হয়তো পাওয়া সম্ভব হবে না জানি, তারপরও একটু আধটু চেষ্টা করতে ক্ষতি নাই’ (যদি পাই লিরিকের দেখা)

নৈরাশ্য নয়, অধ্যাত্মচেতনায় নিমজ্জিত কবি যেন ঘনায়মান সন্ধ্যায় নদীর ওপারে ‘লিরিক-রমণী’র সঙ্গে দেখা হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। এই তার ভবিতব্য বা পরিণতি। এটাই হাসান হাফিজের কবিতার ‘পুণ্য ও পুঁজি’, অর্জিত অহংকার। হাসান হাফিজের কবিতার বাঁকবদল, শৈল্পিক অর্জন সত্তরের দশকের অন্য কবিদের থেকে এভাবে আলাদা করে শনাক্ত করা যায়। ৭০তম জন্মদিনে তাকে অভিনন্দন। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা