× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভাগ্যিস, মা সঙ্গে ছিলেন

টোকন ঠাকুর

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:৩৬ এএম

ভাগ্যিস, মা সঙ্গে ছিলেন

যেকোনো প্রাণীই টিকে থাকতে চায়। হরিণ যেমন টিকে থাকতে চায় জঙ্গলে, বাঘও তাই চায়। যদিও বাঘের জন্য হরিণ কোনো সমস্যা না হলেও হরিণের জন্য বাঘ একটি যমদূত। তার পরও হরিণ টিকে আছে। মানুষের মধ্যেও যারা বাঘ, তারা মানুষের মধ্যে থাকা হরিণের পেছনে ছুটছে বা থাবা বসিয়ে দিচ্ছে। অসহায় দুর্বল মানুষটি কি তাহলে বেঁচে থাকতে পারবে না? টিকে থাকতে পারবে না? অসহায় মানুষটিকে কেউ দেখবে না? এমনিতেই জীবনে আনন্দ যেমন থাকে বা থাকবে, দুর্গতিও আসবে। সেই দুর্গতি নাশ করেই মানুষ টিকে আছে, টিকে থাকবে। নিরন্তর শুভর সঙ্গে অশুভর লড়াইও জারি থেকে যাচ্ছে। দুর্গতিনাশিনী মা তো আছেন, এ আস্থা সন্তানের থেকে যাবে। অসহায় মানুষটিকে বাঁচাবে কে? মহিষাসুর তো আছেই, তাহলে অসহায়কে আশা দেবে কে? শক্তি দেবে কে? স্বপ্ন দেবে কে? 

মা। মা তাঁর সন্তানকে বাঁচাবেন। অসহায়ের পাশে মা আছেন সব সময়ই তবু আশ্বিনের নবরাত্রিতে মা আসবেন, সেই আগমনীতে ঢাক বেজে উঠবে, শিশুরা নির্ঘুম আনন্দের উৎসবে মাতবে। জগতে মা যে শ্রেষ্ঠ, তাই প্রতিষ্ঠিত হবে। বধ হবে মহিষাসুর, বধ হবে মানুষের মধ্যে থাকা অন্যায্য শক্তির উৎস। সামাজিক ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যে এগিয়ে যাবে মানুষ। বহুকাল এ চর্চা করে আসছে মানুষ। মানুষ তার অভিজ্ঞতাকেই পুঁজি করে চল করে নিয়েছে এ উৎসব, শারদীয় দুর্গোৎসব। প্রতি বছর আশ্বিনে নদীপারে কাশফুল দুলে উঠবে, হাওয়ায় পুজোর গন্ধ ভাসবে। এ দেশ তো নদীমাতৃক, নদীও তো মা, ফসলের মাঠ আমাদের মা, মা বিরাজমান সর্বত্র। মাকে ছাড়া সন্তান অসহায়Ñঅনাদিকালের মতো আজও এ সত্য সক্রিয়। আমরা সত্যের কাছেই ঘুরেফিরে নত হয়ে থাকব। আমরা সত্যের দিকেই নতজানু হব। আমরা সত্যের উপাসনা করব। সন্তানের জন্য মা সত্য। মা তার রক্ষার ভার নিয়ে আছেন। মা তার সাহস, কর্মশক্তি, অন্যকে ভালোবাসবার শক্তি। সব দুর্গতির নাশ তিনি করবেন তার সন্তানের জন্য। কিন্তু সেই অনাদিকালের মা তো সর্বদা দৃশ্যমান নন, তাঁকে দৃশ্যমান করে তুলবে সুন্দর, তাঁকে মূর্তমান করে তুলবে সৃজন, ঘরে ঘরে তাঁর উপস্থিতি ঘটাবে মানুষের স্বপ্নকল্পনা। উৎপাদিত শস্যের মতোই মানুষের মনে স্বপ্নকল্পনার ভান্ডার তৈরি হয়, মানুষ তা লালন করে। সেই সুন্দর, সেই সৃজন, শস্য উৎপাদন বা স্বপ্নকল্পনার ভেতর দিয়েই মা আমাদের ভেতরে উপস্থিত, মা আমাদের মনে বাস করেন। মা সেই সৃজনের ভেতর দিয়ে আসেন। মা আসেন সুন্দরের ভেতর দিয়ে। মা অশুভকে বধ করতে আসেন। মা জগৎকে ভারসাম্যে আনেন। সম্মিলিত মানুষ তখন ভালো থাকে। মা সম্মিলিত মানুষের মা। মা সেই শক্তিময়ী। ভক্তি তাঁর প্রাপ্য। স্মরণ তাঁর সন্তানের জন্যই।

মা দেবী। মা ভর করেন মানুষের মধ্যে। তখন সেই মানুষ সীমিত থেকেও অসীমের দিকে ধাবিত হয়। সেই মানুষ বড় হয়, সবার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা কুড়িয়ে নেয়। মায়ের একটিই ধর্মÑসন্তানের মঙ্গল নিশ্চিত করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমাদের অনেক মা ছিলেন তাঁর যোদ্ধা সন্তানের সাহস ও আশা। ইতিহাস জাহানারা ইমামকে মুক্তিযোদ্ধাদের মা স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম সাহস ও শক্তি সঞ্চারী মা অনেক। আমরা যেন মাকে ভুলে না যাই। মা ভর করেন বলেই মা হয়ে যান কমরেডের মা, হাজার চুরাশির মা। মায়ের কোনো তুলনা হয় না পৃথিবীতে। মা ভর করেন বলেই সন্তান বীর হয়ে ওঠে। সন্তান কুমুদিনী হাজং হয়ে ওঠেন। সম্প্রতি আমরা দেখলাম, বাংলাদেশের মেয়েরা ফুটবল খেলায় দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ইতিহাসে বিরল অর্জন আমাদের। ছেলেরা পারেনি, মেয়েরা পেরেছে। মেয়েদের মধ্যে মা ভর করেছেন। মা ভর করেছেন বলেই তো ফুটবলার কৃষ্ণারানী সরকারের পায়ে অমন জাদু ফুটে উঠল। ফাইনালে তাঁর পায়ে দুটি গোল! বাংলাদেশের মেয়েরা জিতে গেল, বাংলাদেশ জিতে গেল। মা ছিলেন বলেই যোদ্ধারা জিতে গেল দেশে দেশে। মা না থাকলে তো সন্তানের জন্মই হতো না। তবু মায়ের যথার্থ মর্যাদা কি আমরা দিতে পেরেছি? মায়ের প্রতি কর্তব্যে কি আমরা অবহেলা করিনি? কবি লিখলেন, আমাদের মা আমাদের বড় করতে করতে একদিন আমরা এত বড় হয়ে গেলাম যে, মাকেই আর চোখে দেখতে পাই না। মা কি এতই ছোট হয়ে গেলেন, ক্ষুদ্র হয়ে গেলেন? নইলে তাঁকে আমরা দেখতে পাই না কেন? মায়ের চেয়ে তো বড় কেউ নেই, তাহলে সেই মা কী করে আমাদের অবহেলার শিকার হতে পারেন? এই বোধ ও বার্তা মর্মে নিতে হবে আমাদের। শুধু নিজের নয়, অন্যের কল্যাণ ও মঙ্গলে নিজকে বিলিয়ে দিতে পারা দরকার, মা যেমন দেন। মা যেমন নিজের জন্য নয়, সন্তানের জন্যই নিজেকে ব্যয় করেন। আশ্বিনে পুজোর দিনে তাই মায়ের সুসন্তান হলে আমাদের ভাবতে হবে অন্যদের কথা। সম্পদ কম থাকা মানুষকে আমরা গরিব বলে থাকি। গরিব মানুষের শুধু সম্পদই কম আছে, আর সবকিছুই তো আছে সম্পদশালীর মতোই, তাহলে শুধু সম্পদ কম থাকার জন্য তাকে বা তাদের ‘গরিব’ বলে সিল মেরে দেওয়ার কী আছে? অথচ কোনো না কোনোভাবে সম্পদশালী আদতে দখল করেছে যার সম্পদ, সে-ই তখন ‘গরিব’ হয়ে গেছে। অর্থাৎ কূটকৌশলে তাকে গরিব বানানো হয়েছে। গরিবের খাওয়াদাওয়া, চিকিৎসা, পোশাকপরিচ্ছদ, বাড়িঘরদোর বা বেঁচে থাকা সবই সেই কূটকৌশলের কাছে পরাজিত হয়েছে, মা আছেন সেই গরিবের পাশে। মা সেই অসহায়ের পাশে তাকে শক্তি জোগাচ্ছেন, সাহস দিচ্ছেন তার মনে, বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে লড়তে হবে। মা লড়াইয়ের শক্তি দিচ্ছেন আমাদের। আমরা লড়াই করব। সব অন্যায়ের বিরুদ্ধেই আমরা লড়ব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমরাও যেন অন্যায়কারী হয়ে না পড়ি, তা খেয়াল রাখাও কাজ আমাদের। যদি অন্যায়ের বিপক্ষে লড়তে গিয়ে নিজেরাও অন্যায়ের জাল বিস্তার করি, তাহলে মা থেকে আমরা দূরে চলে যাব, মা থেকে আমরা বিচ্যুত হয়ে যাব। যেন তা না হই। এই হচ্ছে মায়ের বার্তা। ভারসাম্য রচনা করে এগোতে হবে আগামীর দিকে, নইলে মানব সম্প্রদায় একদিন হুমকির মুখে পড়বে। কারণ আজকের যে মানুষ অসহায় বা অর্থসম্পদে গরিব, শেষবিচারে সেও কিন্তু অন্যদের মতোই মানুষ। তাই তাকে রক্ষা করাটা মানুষেরই দায়িত্ব। শুধু মানুষ নয়, সর্বপ্রাণ রক্ষায় আমাদের মনোযোগ অব্যাহত রাখতে হবে। ব্রহ্মাণ্ড সর্বপ্রাণেই সুন্দর। আর সর্বোচ্চ সুন্দরের পাদদেশ ও চূড়া আমাদের মা। দেবী দুর্গার আগমনীতে এ অনুভব যেন ছড়িয়ে থাকে আমাদের চৈতন্যে। আমরা যেন আমাদের অনুভবের শক্তি ক্রমাগত বাড়িয়ে নিতে পারি বা বাড়িয়ে নিতে থাকি এবং তা যেন আমাদের তপস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

শারদীয় দুর্গোৎসব যেন সর্বজনীন হয়ে ওঠে সত্যি সত্যি, তা নিশ্চিত করতে হবে। কে করবে? কারা করবে? করতে হবে সবাইকে মিলেই। একদা বনজঙ্গলে বাঘের সঙ্গে লড়াই করেছে যেমন সবাই মিলে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করেছে যেমন সবাই মিলে; সে রকম মিলে মিলে সমাজের ভেতরে তাকানো জরুরি। নইলে শুধু উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে লাভ নেই। উৎসবে সম্পদশালীর ফুটানি দেখিয়ে লাভ নেই। আমরা তো জানিই কার সম্পদ কে মেরে দিয়েছে। কার বাড়ি কে দখল করেছে। কার মেয়েকে কারা তুলে নিয়ে গেছে। বিবস্ত্র মেয়েটির লাশ কারা ফেলে গেছে খালের ধারে, আমরা সবাই জানি। কোনো গণমাধ্যমেও যদি খবর না ছাপা হয়, ন্যায্য বিচার যদি না-ও প্রতিষ্ঠা পায়, তা-ও আমরা জানি কে কী করেছে। সামাজিক মানুষের সবকিছুই জানা হয়ে যায়। মনে মনে আমরা কিন্তু বিচার করতে থাকি। মনের আদালতে আমরা অন্যায়কারীকে শাস্তি দিয়ে থাকি। সেই শক্তি আমাদের আছে। আমাদের মা আছেন যে!

শারদীয় দুর্গোৎসবে আমাদের অনেক দায়িত্ব। সে দায়িত্ব থেকে কেটে পড়লে মা নাখোশ হবেন। মা কষ্ট পাবেন। মাকে কষ্ট দিয়ে আমাদের কেমন বেঁচে থাকা হবে, কেমন বেঁচে থাকা হয়? বিপদে আপদে মা-ই তো আমাদের সব। মনোজাগতিক ঈশ্বরের স্বকল্পিত প্রতিমূর্তি মা, ঋষি কবি বলেছেন কত আগেই। সন্তানের জন্য তো একটি বাক্যই যথেষ্টÑভাগ্যিস, মা ছিলেন সঙ্গে, নইলে কী দুর্দশাই না হতো আমাদের।

সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা