× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শার্লক হোমসের স্রষ্টা ডয়েল

রাজ রিডার

প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:১২ এএম

স্যার আর্থার কোনাল ডয়েল, ২২ মে ১৮৬৯-৭ জুলাই ১৯৩০

স্যার আর্থার কোনাল ডয়েল, ২২ মে ১৮৬৯-৭ জুলাই ১৯৩০

শার্লক হোমস স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের এক অনবদ্য সৃষ্টি। এই সৃষ্টিকে অনবদ্য বলতেই হবে। কারণ শার্লক হোমসের মাঝে যে চমক আছে তা গোয়েন্দা কাহিনীনির্ভর অতীতের যেকোনো চরিত্রকে ছাপিয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে এডগার এলান পোর অগস্ত দুপা, চার্লস ডিকেন্সের ইন্সপেক্টর বাকেট, উইলকি কলিন্সের সার্জেন্ট কাফ কিংবা এমিল গ্যাবোরিয়াউ-এর মসিয়ে লুককের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তবে এই চরিত্রগুলো শার্লক হোমসের আগে সৃষ্ট হলেও কোনোটিই শার্লক হোমসের মতো সিরিজ আকারে দেখা যায়নি। অগস্ত দুপা কিংবা মসিয়ে লুককের গোয়েন্দা কারিশমা যুক্তিনির্ভর। কিন্তু কোনান ডয়েল হোমসকে এই প্রথা ভেঙে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কারণ হোমস শুধু যুক্তিতর্কেই ক্ষান্ত নয়। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর ভিত্তি করেই সে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। ফলে, অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় এতটা বিস্তারিত হতে পারে, তা শুধু শার্লক হোমসের বেলাতেই ঘটেছে। বালুকণা, ধূলিকণা, পায়ের চিহ্ন, হাতের চিহ্ন এমনকি উচ্চতাও যে কেস সমাধান করতে পারে তা শুধু শার্লক হোমসে দেখা যায়। রক্ত পরীক্ষা, হস্তাক্ষর, আঙুলের ছাপও যে প্রমাণ হতে পারে তা সে সময়ের পুলিশ প্রশাসনও বুঝে উঠতে পারেনি। জানতে পেরেছে প্রথম কোনান ডয়েলের লেখাতেই। সেহেতু সহজেই বোঝা যায় যে কোনান ডয়েল যুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা অনুসন্ধানকে বিজ্ঞাননির্ভর করে তুললেন। 

আবার দুপা এবং লুকক যদিও খুব দক্ষ গোয়েন্দা তবুও তাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে পাঠক তেমন কিছুই উদ্ধার করতে পারে না। অপরপক্ষে হোমসের ছোট ছোট মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো পর্যন্ত পাঠকের নজরে আসে। যেমন হোমস খুব মেধাবী হলেও খুবই খামখেয়ালি। সম্পর্কের ক্ষেত্রে খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখে। হাতে যখন কাজ থাকে না তখন ক্লান্তি চেপে ধরে। আবার তার বন্ধু ওয়াটসনও খানিকটা শার্লক হোমসের চরিত্রের গভীরতা বুঝতে সাহায্য করে। দুপা এবং লুকক খানিকটা অতিমানবীয়। কিন্তু শার্লক হোমস মনস্তাত্ত্বিকভাবে জটিল হলেও তার আচার-আচরণে, মাদকাসক্তিতে কিংবা বিভিন্ন ভুলভ্রান্তিতে তাকে সন্তোষজনকভাবে মানবিক করে তোলে, যা ফুটিয়ে তুলতে পো কিংবা গ্যাবোরিয়াউ ব্যর্থ হয়েছে। 

মামলার ধরনেও শার্লক হোমসের যথেষ্ট বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। দুপা, কাফ কিংবা লুকক খুবই সীমিত পরিসরে সীমিত বিষয়ে মামলা সমাধানের চেষ্টা করে। অপর পক্ষে, হোমস দেশি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করে : চুরি থেকে শুরু করে হত্যা মামলা, ইংল্যান্ডের অজপাড়াগাঁ থেকে শুরু করে লন্ডনের অন্ধকার অলিগলিতে সব জায়গাতে শার্লক হোমসকে দেখা যায়। ফলে চারিত্রিক বিচিত্রতায় হোমস হয়ে উঠেছে অনেক আপন। সেজন্যই হয়তো সব ধরনের পাঠকের কিংবা দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে কোনান ডয়েল। 

আবার বয়ানের ক্ষেত্রেও কোনান ডয়েল স্বতন্ত্র। ওয়াটসন একই সঙ্গে সঙ্গী এবং বয়ানের কণ্ঠস্বর। এই কণ্ঠস্বরই বুঝতে সাহায্য করে হোমসের চুক্তি-তর্ক-মেধা এবং একই সঙ্গে পাঠককে বয়ানের সঙ্গে সংযুক্ত রাখে। কিন্তু আগের চরিত্রগুলোতে দেখা যায় লুকক, দুপা কিংবা কাফ নিঃসঙ্গ নির্জনে মামলা সমাধান করছে। ফলে পাঠকের সঙ্গে লেখকের কম মিথস্ক্রিয়া ঘটছে। এই মিথস্ক্রিয়া কম হওয়ার কারণে কোনোভাবেই সেসব গোয়েন্দা পাঠকের আপন হয়ে উঠছে নাÑ যেমনটা হয়ে উঠছে হোমস। তা ছাড়া হোমস এবং ওয়াটসন একই সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে, রেস্তোরাঁতে যাচ্ছে, শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলা করছে, হাসি তামাশা করছে। সেহেতু গল্প ক্লাইমেক্সে পৌঁছতে পৌঁছতে অনেকগুলো কমিক রিলিফের সম্মুখীন হয়, যা অতি সূক্ষ্ম মামলা বুঝতেও পাঠকের তেমন বেগ পেতে হয় না যেমনটা আগের সাহিত্যকর্মগুলোতে হয়েছে। তাই বুঝি চুরুট টানতে টানতে হ্যাট পরে টলতে টলতে হেঁটে যাওয়া এই গোয়েন্দায় সবচেয়ে বেশি পাঠকের মনে দাগ কেটেছে। 

আর্থার কোনান ডয়েল পাঠকদের অফুরান আনন্দ, সাহস, জ্ঞান বিলিয়েছেনÑ এতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে এও মনে রাখতে হবে যে একটি শক্তি আরেকটিকে গিলে ফেলার অধিকার রাখে না। হতে পারে একটি বেশি বুদ্ধিমান, বেশি চৌকস, বেশি রসালো, বেশি ঝকঝকে তকতকে, তবুও তার অধিকার নেই অপর আরেকটি আপেক্ষিকভাবে কম বুদ্ধিমান, কম চৌকস, কম রসালো, কম পরিপাটি কোনোকিছুকে গিলে ফেলার। কারণ দুটি বয়ান দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে সৃষ্ট। দুটি ভিন্ন মেধার, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির, ভিন্ন আঙ্গিকের ভিন্ন ভিন্ন ফসল

আবার শক্তপোক্ত প্রতিপক্ষ প্রফেসর মরিয়ার্টি যে কি না মেধাই হোমসেরি সমকক্ষ পাঠকের মনে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। আগের গল্পগুলোতে আমরা এমন দীর্ঘমেয়াদি শত্রুতা দেখি না যেমনটা হোমস-মরিয়ার্টির বেলায় দেখি। 

এতক্ষণ দেখলাম হোমস কেন অন্যদের থেকে খানিকটা এগিয়ে আছে। এখন কিছুটা সমালোচনা মূলক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এই চরিত্রটিকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করব। প্রথমেই মনে রাখতে হবে এই চরিত্রটি ভিক্টোরিও যুগের চারিত্রিক আদলে সৃষ্ট। সেহেতু মাথায় রাখতে হবে এই যুগটি এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। আধুনিক ইউরোপ বলতে আমরা বুঝি রেনেসাঁস পরবর্তী ইউরোপ। রেনেসাঁসের ধাক্কায় সংস্কার হয়েছে, ফরাসি বিপ্লব হয়েছে, কোথাও কোথাও রাজতন্ত্রের উৎখাত হয়েছে, নতুন বুর্জোয়া শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে। আর যখন উপনিবেশবাদকে নায্যতা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন রকম দর্শন ও সাহিত্য একযোগে কাজ করেছে, যখন সভ্যতার মিশন, বিজ্ঞানমনস্কতা ইত্যাদি নামক তকমা পুরো পৃথিবীব্যাপী প্রচার জোরেশোরে চলছে তখনই আমরা দেখা পাই আলোকিত যুগের। এই যুগ ইউরোপকে সভ্যতার কেন্দ্রে বসিয়ে দেয় ভলতের, রুশো, কান্ট, লক প্রমুখ দার্শনিকের হাত ধরে। আর এ যুগের প্রভাব যখনও রগরগে প্রায় তার পরপরই সূচনা হয় রানী ভিক্টোরিয়ার যুগ। সেহেতু এই বিষয়টি খুব সহজেই অনুমেয় যে ব্রিটিশ নাগরিক স্যার আর্থার কোনান ডয়েল যে চরিত্রটি সৃষ্টি করবেন নিশ্চয়ই সে আধুনিক ইউরোপের মনোভাব ধারণকারী এমন কেউ হবে যে কিনা তার জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তি এমনভাবে প্রচার করবে, যা পৃথিবীর কোনায় কোনায় পৌঁছে যাবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য। এই চরিত্র এতটাই অহমিকায় পরিপূর্ণ যে কি না যেকোনো ধরনের জটিল কেস সমাধানে পটু। বলতে গেলে গোয়েন্দা জগতে সুপারম্যান হল শার্লক হোমস। সুপারম্যানের দুর্বলতা রয়েছে, তবে শার্লক হোমসের নেই। যা কেউ বোঝে না তা শুধু শার্লক হোমস বোঝে। একক জিনিয়াসের জ্বলন্ত মিথ সৃষ্টি করে ফেলেছে শার্লক হোমস। এই ইগো কিংবা অহমিকা কোনান ডয়েল পেয়েছে সেই আলোকিত যুগের অহমিকা থেকে। মামলা হাতে নেওয়ার আগেই যেন সমাধান করে ফেলবে এমনই আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান এই শার্লক হোমস। এই বিবেচনায় শার্লক হোমস আর মোটেও সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি থাকতে পারে না। বরঞ্চ সে হয়ে ওঠে শক্তিশালী ব্রিটিশ সম্রাজ্যের এক অপ্রতিরোধ্য এজেন্ট। 

আবার নৈতিকতার বিষয়টিও সে পেয়েছে ভিক্টোরিও যুগ থেকেই। সে শুধু অর্থের বিনিময়ে কাজ করে না। কখনও কখনও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে সে কাজে হাত দেয়। তা পক্ষান্তরে ‘সাদা চামড়ার বোঝা’ এই তত্ত্বেরই প্রতিফলন। এই একই নৈতিকতার ফাঁদে পা দিয়েছে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা। তাহলে সহজেই বিষয়টি অনুমেয় যে শার্লক হোমস কোনো সাধারণ গোয়েন্দা নয়। সে শুধু গোয়েন্দাগিরি করে রুজিরুটি উপার্জন করে না। তার একটি দার্শনিক, তাত্ত্বিক এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। যে অবস্থানই বুঝতে সাহায্য করে আর্থার কোনাল ডায়েলের অবস্থান। তাহলে আমরা এতটুকু উপসংহারে পৌঁছতেই পারি যে আর্থার কোনান ডয়েল দার্শনিকভাবে আলোকিত যুগের প্রচারক, তাত্ত্বিকভাবে যুক্তি এবং বিজ্ঞানের উপাসক এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কট্টর সমর্থক। 

তাহলে খুব সহজেই আমরা বুঝতে পারি, স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস মানবসভ্যতার কেন্দ্রে ইউরোপকে বসিয়েছে। এবং ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের মাঝে বসিয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে। আর এই সাম্রাজ্য-কেন্দ্রিক সভ্যতাকে জ্যাকস দেরিদার বিনির্মাণ তত্ত্ব দ্বারা বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই দ্বৈত প্রতিপক্ষের মধ্যে যারা কেন্দ্রে থাকে তারা সব সময় অপরপক্ষকে প্রান্তিক করে ফেলে। অর্থাৎ কেন্দ্র সব সময় প্রান্তকে কোণঠাসা করে ফেলে। আর প্রান্ত যখন কোণঠাসা হয়ে যায় তখন তার স্বাভাবিক পরিমণ্ডল আর স্বাভাবিক থাকে না। কারণ একবার কোণঠাসা হয়ে গেলে পরিসর কমে যায়। মুক্তভাবে চলাচলের অবকাশ কমে যায়। পরিমণ্ডল আস্তে আস্তে সংকুচিত হয়ে এতটাই সংকীর্ণ হয়ে যায় যে তার টিকে থাকা একপ্রকার অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়। তখন লড়াকু প্রজন্মের আর লড়াই করার শক্তি-সামর্থ্য কিছুই থাকে না। ফলে পুরাতন বয়ানের ওপর নতুন বয়ানের জয়জয়কার শুরু হয়। এই জয়জয়কার কতক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে যতক্ষণ না এই বয়ানটিকে কেউ চ্যালেঞ্জ করে বিকেন্দ্রিক করতে পারে। যদি কোনো একটি বয়ানের কেন্দ্র না থাকে তবে সেই বয়ানে কোনো প্রান্ত থাকে না। আর যখন কেন্দ্র নেই কিংবা প্রান্ত নেই তখন কারও পরিমণ্ডল সংকোচনের সুযোগও নেই। তাই জ্যাকস দেরিদা কেন্দ্রবিহীন সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। যে সমাজে কেন্দ্র লাগাতার প্রান্তকে ঠেসে ধরবে না। একটি বয়ানের পাশাপাশি আরও কিছু বয়ান থাকতেই পারে, তবে একটি বয়ান যদি আরেকটি বয়ানকে নিশ্চিহ্ন করে দেয় তখনই ঠিক জটিলতা সৃষ্টি হয়। 

আর্থার কোনান ডয়েল পাঠকদের অফুরান আনন্দ, সাহস, জ্ঞান বিলিয়েছেÑ এতে কোনো দ্বিমত নেই। তবে এও মনে রাখতে হবে যে একটি শক্তি আরেকটিকে গিলে ফেলার অধিকার রাখে না। হতে পারে একটি বেশি বুদ্ধিমান, বেশি চৌকস, বেশি রসালো, বেশি ঝকঝকে তকতকে তবুও তার অধিকার নেই অপর আরেকটি আপেক্ষিকভাবে কম বুদ্ধিমান, কম চৌকস, কম রসালো, কম পরিপাটি কোনোকিছুকে গিলে ফেলার। কারণ দুটি বয়ান দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে সৃষ্ট। দুটি ভিন্ন মেধার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির, ভিন্ন আঙ্গিকের ভিন্ন ভিন্ন ফসল।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা