হাবীব ইমন
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৯:০১ এএম
অনিচ্ছায় হাঁটছি বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলির শহরে, আকাশজুড়ে কুকুরের টহল, দেহ থেকে দেহে ওড়ে ওরা, বাষ্পের সংকেতÑ পৌরাণিক আলো এসে পড়ে রাস্তায়, নিবিড় হয়েছ তুমি, সন্ধ্যা থেকে এ আগুন, জাগিয়ে তুলেছ প্রেমে-লজ্জায়
প্রিয়তমা ‘কপিলা’, অনেক দিন তোমাকে এ নামে ডাকি না। আজ ডাকলাম, কেন ডেকেছি। ইচ্ছা হলো, এই আর কি! মানুষ অনেক কিছু চায় না, এটা কি সত্যি! অনেক কিছুই চায় মানুষ। পায় না। পাবে না জেনেও চায়। এসব মিথ্যে সানুনয় মিনতিÑভেঙে যাওয়া তাসের ঘর, তাই নয় কি!
বহু আগের এক কাল। বিলেতের হাওয়ায় থাকতেন জন কিটস, চেয়েছিলেন ‘সময়’। ক্ষণজন্মা এ কবি ফ্যানি ব্রাউনির প্রচণ্ড প্রেমে পড়েছিলেন। বিয়ে হওয়ার কথা ছিল তাদের। কিটসের ধরা পড়ে যক্ষ্মা। কিটস তখন ফ্যানিকে লিখেছিলেন চিরকুট। তার অংশবিশেষ এ রকমÑ‘প্রায়ই মনে হয় এমন, আমরা দুজন যদি হতাম প্রজাপতি, আর বাঁচতাম গ্রীষ্মের তিনটে দিন। তোমার সঙ্গে অমন তিন দিন যে আনন্দে ভরে তুলতে পারতাম, তা হতো সাদামাটা পঞ্চাশটা বছরের বেশি।’ কিটসের এ কথাটা পাড়তেই তোমার কথা মনে হলো।
তোমার কথা শুনতে চাই খু-উ-ব। শুনতে চাই তোমার কথা। বহুদূর থেকে ভেসে আসাÑঅশ্বত্থ পাতায় তোমার স্বর রেখে যাওÑবৃষ্টি পড়ার মতো তোমার উচ্চারণগুলো বনাঞ্চলে ঘুরে বেড়াবে; তোমার এবং আমার নিদ্রায় হাওয়া এসে উড়বে, ঘূর্ণিবাতাসে সেই ঘুম আরও গাঢ় হবে।
দুই.
‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আঙুলের মিহিন সেলাই ...’
চিঠি দিও : মহাদেব সাহা
কতদিন চিঠি লিখি না! কতদিন হয়ে গ্যালো, তোমার কাছে চিঠি লেখা হয় না, কোনো নিবেদন করা হয় না। মুঠোফোনের খুদে বার্তাও লেখা হয়নি আজকাল। এই তো ক’দিন আগে ওরা ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে, কারফিউ দিয়েছে, তোমার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। তুমি জামালপুরে। খিলগাঁওয়ে বসে আমি এক ধরনের ‘আয়নাঘর’ অনুভব করছি। হয়তো বুঝতে পারবে না এ কেমন বিদীর্ণ জ্বালা! জীবন এখন আমার হাতের মুঠোয় নেই। বারবার ‘পালাই-পালাই’ করছে।
তোমার নাগাল পাচ্ছি না কিছুতেই। কেমন আছো জানতে পারছি না। বেখেয়ালের মনটাকে তখন খুব কাছ থেকে অনুভব করছি। কী বিক্ষিপ্ত-কী বিরুদ্ধ এক সময়। হৃদয়ের কাছাকাছি যাওয়ার হয়তো এটাই ছিল মহার্ঘ্য সময়। অথচ তোমার-আমার সমস্ত অনুভূতি যেন এক হয়ে উঠছিল নতুন এক সকাল, কী অপেক্ষা! তারুণ্যের এ নতুন-মিহিন ভোর উপভোগ করেছি ঠিকই। তবে কোথায় যেন হাহাকার, হৃদয় হুহু করা অনুভূতি!
কতদিন দেখি না তোমাকে! যখন তুমি থাকো না ঢাকায়, ভীষণ ‘ছন্নছাড়া’ মনে হয়, মনের ভেতর এতটা বিপর্যস্ত আগে কখনও লাগেনি, এখন ভীষণ ফাঁকা লাগে, শূন্য লাগে। তুমি তো জানো আমার কাছে কেউ নেই, যার কাছে ভেঙেচুরে জমা রাখতে পারি। যে আমাকে আদর করে, যত্ন করে আগলে রাখবে।
আমার চারপাশ এত নীরব কেন, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এখন মনে হয় যেন একটা শূন্য গোয়ালঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে আছি একা। মানুষের শত্রুরা তো আর তাকে একাকিত্বের নরকযন্ত্রণার মধ্যে ঠেলে দেয় না। ভালোবাসার মানুষই একাকিত্বের মধ্যে ঠেলে দেয়। আমার প্রতি অবিচার কতটা সহি, কিংবা ঈশ্বরের প্রদত্ত, তার বাছবিচার নিশ্চয়ই তুমি করতে পারবে। নির্জলা সত্য, আমার প্রতি নির্দয় অবিচার করা হয়েছে, এ বোধ জীবনের প্রতি আমার প্রতিটি ধারণাকে নিয়ন্ত্রণ করছে, অসহিষ্ণু করেছে। হয়তো বা আমিই সমসাময়িককালে তোমাদের সমাজে-তোমাদের রাষ্ট্রে ‘কৌতুক’ হয়ে উঠেছি আমারই অন্তরালে।
অনিচ্ছায় হাঁটছি বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলির শহরে, আকাশজুড়ে কুকুরের টহল, দেহ থেকে দেহে ওড়ে ওরা, বাষ্পের সংকেতÑপৌরাণিক আলো এসে পড়ে রাস্তায়, নিবিড় হয়েছ তুমি, সন্ধ্যা থেকে এ আগুন, জাগিয়ে তুলেছ প্রেমেÑলজ্জায়।
এ চিঠিটা যখন লিখছি, তখনও তুমি জামালপুরে। হয়তো এ সুযোগে তোমাকে চিঠি লেখার একটা অবকাশ পেয়েছি। মুদ্রিত প্রেম যেন আরও তীব্র হয়ে উঠছে, আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। হয়তো কোথাও কোথাও জোনাক আলো জ্বলছে। আমার এক আঙুলের ছাপে, আর অন্য আঙুলের বুনন, তা যেন অগ্রন্থিত হৃদয়ের নকশিকাঁথাÑজানি না কখনও তোমার ভীরু-গোপন দ্বার খুলবে কি না। আচ্ছা, তুমি কি আমাকে ডাকো এখনও? মাঝে মাঝে কানে বাজেÑ‘অ্যাই ইমন, অ্যাই ইমন...’ নাকি আমি ভুল শুনি মাঝরাতে।
এ গল্পটা একটা রাতের আকাশ। গাঢ় কালো ঘন রাতের বয়ান। এ গল্প-এসব সাদা সুঘ্রাণ আশা ও আকাঙ্ক্ষা, কেবল তোমার জন্য।
তিন.
হাত ধরে ধরে ঘরে ফিরিয়ে নাও আমাকে
এলামই যখন, তবে থাকি না দুজনে একসঙ্গে!
মনে আছে নিশ্চয়, আমার ভীরু প্রাণে জ্বালিয়েছিলে প্রণয়, তুমি এসেছিলে একদিন। কত এলোমেলো পথ হেঁটেছি দুজনে, একসঙ্গে চলার জন্য, একসঙ্গে থাকার জন্য! কত স্বপ্ন বুনেছি, এঁকেছি দুজনে, আমাদের কক্ষ হবে শুভ্র-সাদা, বারান্দায় থাকবে কামিনী-হাসনাহেনা-বেলিভরা গাছগাছালি। সবুজমদি সুবাস নিতে নিতে আমাদের রাত হবে, আমাদের দিন হবে। আমাদের একটা ময়ূরাক্ষী নদী থাকবে, ওখানে আমরা সাঁতার কাটব, একটা ডিঙি থাকবে, মল্লারে এ ঘাট-ও ঘাট সমগ্র জীবন পার করব। তুমি বলেছিলে, ‘আমাদের বিছানার রঙ হবে সাদা’। তুমি বলতে, ‘সাদা মানে শান্তি। একটা শান্তি-শ্বেত সংসার গড়ে তুলব’। তোমাকে একটা সাদা তোয়ালে দিতে বলেছিলে।
এ শব্দেরা পথহারা বেলি ফুল! সাদা বেলি ফুল! নাকি সাদা সৌরভ। তুমি কি পাও খুঁজে?
চার.
যদি পেয়ে থাকো, হয়তো তীব্র ঘৃণায়-তীব্র বিরক্তিতে ওই চিঠি বুকের কোনায় রেখে দেবে? হয়তো আমার চিঠিও তোমার গহিনে পৌঁছাবে না কোনো দিন।
কি অবুঝ আমি! মনে হয়েছে আমাকেই তোমার ভালোবাসতে হবে। যেন আমরা দুজন জন্মেছি দুজনের জন্য। তুমি কি গভীর করে বুকের মধ্যে রয়ে আছো এখনও! রোজ আমি টের পাই, বৃষ্টির শব্দে তোমাকে ভীষণভাবে অনুভব করি। তুমি কি আমার কামিনীর ঘ্রাণ শুনতে পাও? তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। ভালোবাসা যে যাকে-তাকে বিলোনো যায় না। হয়তো একদিন তুমি ফিরে আসবে, হয়তো-বা সমস্ত প্রত্যাখ্যান উপেক্ষা করে তোমার মল্লারে আমি হাজির হব জীবিত অথবা মৃত।
দুজন কবির কথা বলি তোমাকে, একজনের নাম। তসলিমা নাসরিন; অন্যজন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। রুদ্রর মৃত্যুর পর তসলিমা নাসরিন লেখেনÑ‘আমাকে সকাল বলে ডাকতে তুমি। কতোকাল ঐ ডাক শুনি না। তুমি কি আকাশ থেকে সকাল, আমার সকাল বলে মাঝে মধ্যে ডাকো? নাকি আমি ভুল শুনি? তুমি পাবে তো এই চিঠি? জীবন এবং জগতের তৃষ্ণা তো মানুষের কখনো মেটে না, তবু মানুষ আর বাঁচে ক’দিন বলো? দিন তো ফুরোয়। আমার কি দিন ফুরোচ্ছে না? তুমি ভালো থেকো। আমি ভালো নেই।’ আমার কি দিন ফুরিয়ে গেছে?
আচ্ছা, আমি মরে গেলে তুমি কি লিখবে? নাকি কেবল আমার লোবানের গন্ধ শুনবে!