মোকাদ্দেস-এ-রাব্বী
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:৫৮ এএম
বাজারে ছিলাম। বাজারে বলাবলি হচ্ছে, পানি আজ বেড়ে যেতে পারে। আমার ছাতা অন্য একজন ধার নিয়ে যাওয়ায় তার অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু পানি বাড়ার বলাবলির খবরে মনে হলো যত দ্রুত সম্ভব বাড়ি ফিরে যাওয়া দরকার। ছাতা রেখেই বৃষ্টিতে দৌড়াতে শুরু করলাম। দৌড়ে পাড়ার রাস্তায় নামার আগেই পিছলে পড়ে গেলাম। পড়ে বুঝলাম রাস্তায় পানি উঠে গেছে। উঠে দাঁড়াতেই বুঝলাম হাঁটুসমান পানি। যত দ্রুতগতিতে পা চালানো যায় ততটাই চেষ্টা করে পা বাড়াতে শুরু করলাম। বাড়িতে বাবা-মা, স্ত্রী আর মেয়ে আছেন। বাড়ি পৌঁছে দেখি আমাদের টিনশেডের ঘরেও পানি ঢুকে পড়েছে। জান্নাতুল বড় একটা পাতিলে পরনের কাপড়চোপড় নিয়ে প্রস্তুত। জান্নাতুল আমার স্ত্রী। ও বুঝে ফেলেছে এ বাড়িতে আর থাকা যাবে না। বাবা-মাও মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। অস্বাভাবিক বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে বন্যা যে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে তা বোঝার আর বাকি নেই।
মার কোমরের হাড় এমনভাবে ক্ষয় হয়েছে বেশি হাঁটাচলাও করেন না। বাবারও অনেকটা তাই। তিনি অবশ্য মসজিদ পর্যন্ত হেঁটেই যাওয়া-আসা করেন। তবে নামাজ দাঁড়িয়ে পড়তে পারেন না। বসে বসে পড়েন। বাবা-মাকে একসঙ্গে কীভাবে বাড়ি থেকে বের করব সে চিন্তায় পড়ে গেলাম। বিকল্প কিছু একটা খোঁজার জন্য ঘরের বাইরে গেলাম। কিন্তু হতাশ হয়ে বারবার ঘরের ভেতর আর বাইরে যাওয়া-আসা করতে থাকলাম। টেনশনে আমার কানের লতি গরম হয়ে গেল। আমার ছটফটানি দেখে বাবা বুঝতে পারলেন কিছুটা। বাবাই সহজ একটা সমাধান করে দিলেন। তখন আসরের ওয়াক্ত। বাবা বললেন, সেলিম তুই তোর মাকে আগে রেখে আয়। ততক্ষণে আমি আসরের নামাজটা আদায় করে নিই। পানি তখন খাটবরাবর। খাটের মধ্যে বসে নামাজ পড়া ঠিক হবে না। আমাদের একটা বড় টেবিল আছে। সে টেবিলটা খাটের ওপর তুলে দিলাম। জান্নাতুল বাবার জায়নামজটা পাতিল থেকে বের করে হাতে দিল। বাবার প্রিয় জায়নামাজ। নীল রঙের। বাড়িতে নামাজ পড়লে বাবা এ জায়নামাজটাতেই নামাজ পড়েন। মা বাবাকে গিফট করেছিলেন। যে কারণে বাবার প্রিয় জায়নামাজ। জান্নাতুলের হাত থেকে জায়নামাজটা নিয়ে টেবিলের ওপর বিছিয়ে দিলাম। বাবাকে ধরে সে টেবিলের ওপরে বসালাম।
কাপড়ের পাতিলটায় দড়ি লাগিয়ে সেই দড়ি কোমরে বেঁধে নিলাম। মেয়েকে কোলে নিল জান্নাতুল। মাকে পিঠে নিয়ে বাবাকে ঘরে রেখেই বেরোলাম। পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে হেঁটে স্কুলে পৌঁছাতে একটু সময় লাগল। স্কুলের দ্বিতীয় তলা মানুষজন আশ্রয় নিয়ে ইতোমধ্যে ভরে ফেলেছে। মাকে পিঠে নিয়েই উঠে গেলাম তৃতীয় তলায়। স্কুলের তৃতীয় তলায় ওদের রেখে আবার ছুটলাম বাবাকে আনার জন্য। বাড়ির কাছাকাছি রাস্তায় গিয়ে দেখি পানি দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অবস্থা আর নেই। কাজেই আমাকে সাঁতার কাটতে হলো। বাড়ির কাছে পৌঁছে দেখি আমাদের ঘরই নেই। পানিতে যেন সমান হয়ে গেছে। পুরো এলাকা নদী। আমি হাহুতাশ করে উঠলাম। ভেতরটা ভেঙে চুরমার হতে শুরু করল। বাবা! আমার বাবা কই! ডুকরে কেঁদে উঠলাম। চোখের জল আর বৃষ্টির জল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। ডুবুরির মতো পানিতে ডুব দিয়ে বাবাকে খোঁজার জন্য উতলা হয়ে গেলাম। ব্যর্থ চেষ্টা। পানি থেকে মাথা তুলে আবার সাঁতরিয়ে ভাসতে থাকি। ঠিক এই সময়ে ভাসতে থাকা একটা কলাগাছের কোনায় দেখতে পাই বাবার সেই নীল রঙের জায়নামাজ। জায়নামাজটা হাতে নিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করি। এমন সময় মসজিদের মাইকে ভেসে আসে, ‘সবাই সবাইকে আল্লাহর ওয়াস্তে মাফ করে দিয়েন। আর দেখা না-ও হতে পারে। সবাই সবার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন সবাইকে রক্ষা করেন।’ শুনেই বাবার জায়নামাজ গলায় পেঁচিয়ে ফিরে যেতে শুরু করলাম স্কুলের দিকে।
মার সামনে গিয়ে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম। মা বললেন, তোর বাবা কই। মার হাতে বাবার ভেজা জায়নামাজ দিয়ে বললাম, আমি যাওয়ার আগে কেউ হয়তো বাবাকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে। দেখি আশপাশে কোথাও আছে নাকি। বলেই উল্টো দিক হয়ে মিছেমিছি বাবাকে খোঁজার জন্য বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করি। একটু পা বাড়িয়ে পেছন ফিরে মার দিকে তাকাই। মা মনে হয় আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেননি। বাবার ভেজা জায়নামাজটা হাতে নিয়ে নীরবে কাঁদতে শুরু করলেন।