হামিদ কায়সার
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ০৯:০২ এএম
আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ০৯:১২ এএম
রশীদ করীম, ১৪ আগস্ট ১৯২৫-২৬ নভেম্বর ২০১১
উত্তম পুরুষ যখন প্রকাশিত হয়, ১৯৬১ সালে, তখন বাংলাদেশের উপন্যাসের গতিমুখ বিচিত্র প্রবাহিণী। পূর্বসূরি আবু ইসহাক, আবু রুশদ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সরদার জয়েনউদ্দীন, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ইসহাক চাখারী, আকবর হোসেন, আফসার উদ্দিন, দৌলতুন্নেসা, শওকত ওসমান প্রমুখের পাশাপাশি তখন ক্রম উত্তরণ ঘটতে চলেছে রশীদ করীমসহ রাজিয়া খান, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শহীদুল্লা কায়সার, জহির রায়হানের মতো একঝাঁক প্রতিভাবান ঔপন্যাসিকের। স্বভাবতই বাংলাদেশের উপন্যাস এ সময়ে স্পর্শ করে আধুনিকতার নতুন সব বাঁক। বহু বিচিত্র বিষয়ের অবতারণা হয়, ঘটে বহুমাত্রিক চরিত্রের সমাবেশ। গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে উপন্যাসে রূপায়িত হতে থাকে নগরজীবন, নগরযন্ত্রণা। রাজনীতি-ইতিহাস নানা বিষয় আশ্রয় করে লিখিত হতে থাকে একের পর এক নতুন উপন্যাস। তার মধ্যে যে কটি উপন্যাস কালোত্তীর্ণ হয়ে থাকবে, উত্তম পুরুষ তার অন্যতম।
উত্তম পুরুষকে কোনো কোনো সমালোচক ১৯৪৭-পূর্ববর্তী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকালে কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সমাজের জীবনচিত্র, ইতিহাস বলে উল্লেখ করেছেন। এ সত্যি। সেই সঙ্গে এ-ও সত্যি, উত্তম পুরুষ শাকের নামে একজন মানুষের কিশোর থেকে যৌবনে পদার্পণের এক মর্মস্পর্শী মানবিক আখ্যান। এ শাকেরকে লেখক রশীদ করীম যে অতি উত্তমভাবেই চেনেন, তা শাকেরের চরিত্রটির বিশ্বস্ত ও বিস্তৃত বিশ্লেষণেই বোঝা যায়। রশীদ করীম নিজেও জন্মেছিলেন কলকাতায়, এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। সে কারণেই সে সময়ের মুসলিম জীবনচিত্রটি তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বর্ণনায় এঁকে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। সক্ষম হয়েছেন সময়ের অন্তর্মূল থেকে দগদগে ক্ষতগুলো জাগিয়ে তুলতে। আমরা শাকেরের চোখ এবং হৃদয় দিয়ে দেখি ধনী এবং গরিবের বৈষম্য, জাতিতে জাতিতে ভেদ কতটা গভীর, কতটা নির্মম।

শাকের সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। বেশ ভালোভাবেই তার কৈশোরের দিনগুলো কাটছিল। কিন্তু দৈবক্রমেই হোক আর দুর্বিপাকেই, ফুটবল খেলার মাধ্যমে উচ্চবিত্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান মুশতাকের সঙ্গে ওর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সেই সূত্রে মুশতাকের বাড়িতে শুরু হলো শাকেরের আসা-যাওয়া আর চেনা-পরিচয় হতে লাগল শ্রেণিবৈষম্যের একেকটি তীব্র কশাঘাতের সঙ্গে। দারিদ্র্যের গ্লানি, জীবনের অসহায়ত্ব একে একে বুঝতে শিখল সে। মুশতাকের বোন সেলিনাই যার হোতা। রশীদ করীমের আধুনিক মনন এবং স্বচ্ছ দৃষ্টির পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার এই সেলিনা চরিত্র নির্মাণের পারঙ্গমতায়। যেখানে বর্তমান প্রেক্ষাপটেও জনপ্রিয় লেখকরা ধনীর দুলালির সঙ্গে গরিব নায়কের প্রেম-বিবাহ ঘটিয়ে দিয়ে ‘তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’ জাতীয় উপন্যাস লিখে চলেছেন, সেখানে আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে, রশীদ করীম কী আশ্চর্য দক্ষতায় সেলিনা চরিত্র নির্মাণ করেছেন বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত থেকে। সেলিনা ধনীর দুলালি, বিলাসব্যসনে অভ্যস্ত। সে হাই সোসাইটিতে চলাফেরা করে। সঙ্গত কারণেই আনস্মার্ট কিংবা পোশাক-আশাকে অনুজ্জ্বল শাকেরকে তার ভালো লাগে না। ওর খারাপ ব্যবহারের চাবুক-স্পর্শে শাকের অতিষ্ঠ। কিন্তু ঘটনাবশত সেলিনার জীবনের অন্ধকার কিছু দিক জেনে ফেলে শাকের। সেলিনা শাকেরের সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করে একদিন রাতের বেলা নিজের ঘরে ডেকে এনে চিৎকার জুড়ে দিয়ে পরিবারকে জানিয়ে দেয়, শাকের চুপি চুপি কখন ওর ঘরে ঢুকেছে! যাতে কেউ কখনও সেলিনা সম্পর্কে শাকেরের কোনো কথা বিশ্বাস না করে সেজন্যই শাকেরকে সমাজে কলঙ্কিত করার এ ব্যবস্থা। ধনী-গরিব সম্পর্কের বাস্তব চিত্র এর থেকে আর কি বেশি মর্মস্পর্শী হতে পারে!
ওদিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। সে যুদ্ধের প্রভাবে কলকাতাজুড়ে আতঙ্ক, জিনিসপত্রের দাম-অভাবÑশাকেরের পরিবারটির দারিদ্র্যে সংযোগ হলো নতুন উপদ্রব। মাকে না খেয়ে থাকতে হয় প্রায়ই। মুসলিম জীবনের উচ্চবিত্তের অবক্ষয়, মধ্যবিত্ত পরিবারের কঠিন জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কেরও বাস্তব চিত্র পাওয়া যায় এ উপন্যাসে। যে শেখরকে অতি কষ্টের অর্থ দিয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিল শাকের; সেই শাকেরকে শেখরের বাড়িতে উপেক্ষিত হতে হয় মুসলমান বলে। শেখরের মা গভীর কৃতজ্ঞতা বোধ সত্ত্বেও শাকেরকে ঘরে নিতেই প্রস্তুত নয়, খাওয়ানো তো দূরের কথা। শেখরের বোন চন্দ্রার সঙ্গে শাকেরের সম্পর্কটি গভীর হতে গিয়েও পারে না, শুধু এই জাতিভেদের কারণে। যুদ্ধের বাজারে সলিলের মতো লম্পটের কাছে চন্দ্রার শরীর সমর্পণ শুধু দারিদ্র্যের নিষ্পষণচিত্রই নয়, একই সঙ্গে শাকেরের বিড়ম্বিত হওয়ারও কাহিনী। প্রথমে সেলিনা পরে চন্দ্রা, আরও পরে উপন্যাসের একেবারে শেষ পর্যায়ে নিহার ভাবির কাছেও বিড়ম্বিত শাকের নামক উত্তম পুরুষের যৌবন-জীবন। এ ট্র্যাজেডি যে কেবল শাকেরের নয়, পৃথিবীর সব উত্তম পুরুষেরই, তা রশীদ করীম জানিয়ে দিতে পেরেছেন সাফল্যের সঙ্গে। এখানেই ‘উত্তম পুরুষ’ উপন্যাস হিসেবে কালজয়ী হয়ে ওঠার সম্ভাবনায় উজ্জ্বল।
বর্তমানে উপন্যাসের ভাষা এবং বর্ণনা অনেক সহজ এবং সাবলীল হয়ে উঠেছে। এর প্রবর্তক কি রশীদ করীম! আশ্চর্য সহজসরল, প্রাঞ্জল তার ভাষা। একটুকু সামান্যও মেদ নেই, বাহুল্য নেই। রয়েছে একটি সরস এবং অভিজাত ছন্দময় গতি। আর একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলে ‘উত্তম পুরুষ’ উপন্যাস এবং রশীদ করীমের প্রতি অবিচার হবে। তার ডিটেইলিংস। ছোট ছোট টুকরো টুকরো ঘটনা, কাহিনী কি সবিস্তার এবং গভীরভাবেই না তিনি উপস্থাপন করতে জানেন। কিছুই তার চোখ এবং মন এড়ায় না আর সাধারণ বিষয়ও তার বর্ণনাগুণে কত অসাধারণ এবং আবেদনময় হয়ে ওঠে। ‘উত্তম পুরুষ’ উপন্যাস পাঠ করা তাই একটি সুখকর অভিজ্ঞতাও বটে।
আমি প্রথম পাঠে হোঁচট খেলে কী হবে, ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উত্তম পুরুষ বিপুলভাবে অভিনন্দিত হয়েছিল। শুধু সেই সময়ের অত্যন্ত প্রেসটিজিয়াস আদমজী পুরস্কার-ই লাভ করেনি, একই সঙ্গে সমালোচকদের দ্বারা হয়েছে প্রশংসিত। লাভ করেছে বিশাল পাঠকপ্রিয়তা। মাত্র পনেরো মাসের মধ্যে প্রথম প্রকাশের ২ হাজার ২৫০ কপি বই নিঃশেষিত হয়েছে। তাই পরের বছরই দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে বাজারে আনাতে হয় আরও ৩ হাজার ২৫০ কপি; যা তখনকার সময়ের জন্য অভাবনীয় তো বটেই, আধুনিক সময়ের সঙ্গেও তুলনা করবার মতো।
২০১১ সালে রশীদ করীমের প্রয়াণের পর তার বন্ধু সুস্মিতা ইসলামের কাছে লেখা রশীদ করীমের একটি চিঠি সৌভাগ্যবশত আমার পড়ার সুযোগ হয়। উত্তম পুরুষসংক্রান্ত কিছু কথাবার্তার উল্লেখ থাকায় যা বোধ হয় শেয়ার করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। চিঠিটা তিনি লিখেছিলেন ১৯৫৮ সালে ঢাকা থেকে, আর পৌঁছেছিল কলকাতা। কালের অমোঘ খেয়ালেই কি না, সেই সুস্মিতা ইসলামও পরে তার সুদীর্ঘ শেষজীবন কাটিয়ে গেছেন ঢাকায়। ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনিও রশীদ করীমের মতোই যাত্রী হয়েছেন মহাকালের। চিঠিটা যেমন দুই বন্ধুর অকৃত্রিম অমলিন সম্পর্কের দুর্লভ নিদর্শন, তেমন উত্তম পুরুষের প্রসঙ্গ থাকায় অর্জন করে নিয়েছে সাহিত্যমূল্যও। কেন কীভাবে? পড়লেই বোঝা যাবে আর সে কারণেই মনে হলো এটি সাহিত্যমোদীদেরও পাঠযোগ্য।
গোলাম মুর্শেদ রশীদ করীমের মূল নাম, এ চিঠিটা যখন লিখেছেন বোঝাই যাচ্ছে উত্তম পুরুষ লেখা নিয়ে তিনি কতটা নিমগ্ন ছিলেন। লিখতে পারার আনন্দ, লিখতে না পারার বেদনা সব মিলিয়ে অদ্ভুত মিশেল অনুভূতি। আর উত্তম পুরুষ যারা পাঠ করেছেন, তারাও নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন, এ উপন্যাসটি ঘিরে রশীদ করীমের যেমন পরিকল্পনা ছিল, শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠেনি। তিনি উত্তম পুরুষ লিখতে চেয়েছিলেন তিন খণ্ডে। যেমনটি লেখা হয়েছিল শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত। শুধু এমন একটি তথ্যের জন্যই এ চিঠিটি অন্তত রশীদ করীমের সাহিত্যমানস জানার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তম পুরুষ উপন্যাস নিয়ে তিনি নিজেও একটি লেখা লিখেছিলেন, সেটা অসুস্থ অবস্থায়, সে কারণেই বোধকরি সেখানে প্রকৃত তথ্য সেভাবে বেরিয়ে আসেনি, আর এ চিঠিটি তিনি লিখেছিলেন উত্তম পুরুষ রচনার সময়। তাই এ চিঠিটি ছোট হলেও যথেষ্ট মূল্যবান।
এখন যদি এ চিঠির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, তাহলে লক্ষ করা যাবে, রশীদ করীম যেভাবে উত্তম পুরুষ লিখতে চেয়েছিলেন, সেভাবে পরিকল্পনামতো হয়ে ওঠেনি। তিন খণ্ডের বদলে এটি লেখা হয়েছিল এক খণ্ডেই। এ চিঠি তিনি লিখেছিলেন ১৯৫৮ সালে, আর উত্তম পুরুষ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে এমন কী কারণ ঘটল যে, লেখক তিন খণ্ডে উপন্যাসটি লেখার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে এক খণ্ডেই সমাপ্ত করেছেন! না, এর জবাব তিনি কোথাও লিখে যাননি, এমনকি ইঙ্গিতও রাখেননি। আমি নিজে তার একাধিকবার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছি। কখনোই এ বিষয়ে জানতে চাইনি, কৌতূহলও ছিল না। কীভাবে থাকবে, এ চিঠি আবিষ্কার হলো রশীদ করীম অনন্তলোকে পাড়ি জমানোর অনেক দিন বাদে, এইতো মাত্র সেদিন ২০১৭ কি ২০১৮ সালে। যখন আমি সুস্মিতা ইসলামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি তার একটি বই লেখার কাজে সহযোগিতার সূত্রে। রশীদ করীমের জীবদ্দশায় এ চিঠি হাতে পেলে উত্তম পুরুষ উপন্যাস লেখার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে প্রবেশ করা যেত আরও খানিকটা গভীরে।