রেজাউল করিম খোকন
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ০৮:৫৬ এএম
চিত্রকর্ম : মতিয়র রহমান
সন্ধ্যার পর গাঢ় হয়ে আসছে অন্ধকার। এ সময়টায় এক ধরনের ক্লান্তিভাব ছড়িয়ে পড়ে গ্রামজুড়ে।
সন্ধ্যার নির্জনতা ছাপিয়ে কাছেই কোনো একটা গাছে বাস করা তক্ষক ডাকছে। টোট্ ট্যাং, টোট্ ট্যাং, টোট্ ট্যাং...।
আজকাল সন্ধ্যা নামলেই ওটা আপনমনে ডাকতে শুরু করে। বেশ কদিন ধরে আমিরন এটা লক্ষ করছে। তাহলে কি বাড়ির আশপাশে কোনো গাছে বাস করা তক্ষকটা তার সবকিছু জানে? তাকে সতর্ক ও সাবধান করতেই সরীসৃপ এ প্রাণীটা সন্ধ্যা নামার পর এভাবে ডাকতে শুরু করে? তক্ষকের একটানা ডাক যেন পরিবেশটা কেমন ভুতুড়ে করে তুলছে। ঘরে হারিকেনের ম্লান আলোয় ঘরের সবকিছু স্পষ্ট দেখা যায় না। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আমিরনের উদ্বিগ্ন মুখটা দেখা যায়। ঘরের মধ্যে একা আমিরন, মেয়েটা আজ বাড়িতে নেই। কয়েক দিন আগে অনেকটা অনিচ্ছায় বাপের বাড়ি মায়ের কাছে রেখে এসেছে। নানার বাড়িতে কয়েক দিন বেড়াক। একলা বাড়িতে থাকতে থাকতে মেয়েটা কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে শুধু কাঁদে। যন্ত্রণা দেয় তাকে। নানার বাড়িতে কয়েকটা দিন থাকলে ভালো লাগবে তার। অজুহাত দেখাতে মাকে কথাগুলো বলেছে আমিরন। এত্তটুকুন অবুঝ মেয়ে পাশে নেই, বুকের ভেতরটা হুহু করছে। উপায় ছিল না তার। বাধ্য হয়েই নাজুকে তার নানাবাড়ি রেখে আসতে হলো।
ধার দেওয়া বিশ হাজার টাকা ফেরত না পেয়ে বিরক্ত হচ্ছিল হানিফ। বাড়ি এসে বারবার পাওনা টাকা ফেরত না পেয়ে নানা কটুকথা বলে চলে গেলেও একসময় লোকটার আচরণ বদলে যায়। যে কথা শুনে হতবাক হয়ে যায় আমিরন। লোকটা তার পাওনা টাকা ফেরত না পেয়ে হঠাৎ এমন কুপ্রস্তাব দেবে, ধারণা করতে পারেনি সে। হানিফ পেশায় কসাই, স্বামী মজিরুলের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও পরিচয়। চরম বিপদে বিশ হাজার টাকা ধার দেওয়া মানুষটি সম্পর্কে মোটামুটি ভালো একটা ধারণা ছিল তার। ধার দেওয়া টাকাটা ঠিকমতো ফেরত না পেয়ে হঠাৎ একদিন হানিফ আমিরনকে বলে, তোমরা আমার বিশ হাজার টাকা আর ফেরত দিতে পারবা না, ঠিকই বুঝতে পারছি। তোমার স্বামী ঢাকা শহরে রিকশা চালাইয়া আমার টাকা আর ফেরত দিতে পারব না, এইটা আমি কইয়া দিতে পারি। এইভাবে তো আমি মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধৈর্য ধইরা অপেক্ষা কইরা থাকতে পারমো না। মানুষের হায়াত-মউতের কোনো ঠিকঠিকানা নাই। কে বাঁচে, কে কোন সময় মরে বলা যায় না। তার চেয়ে আমি আমার পাওনা বুইঝ্যা নিতে চাই।
Ñহানিফ ভাই, কীভাবে আপনি আপনার পাওনা বুইঝ্যা নিবেন?
Ñতোমার স্বামী মজিরুল একটা ভাদাইম্যা পুরুষ। সে কোনো দিনই টাকাটা শোধ করতে পারব না। এখন তুমি আমার পাওনা মিটাইবা। তোমার সেই ক্ষমতা ও যোগ্যতা আছে। আমি যা বলব তোমার তাই করতে হবে।
হানিফের কথা শুনে লজ্জা-অপমানে কেমন যেন হয়ে যায় আমিরন। পাওনা টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তাকে এমন কথা শুনতে হবে! লজ্জায়, অপমানে তার মাটির সঙ্গে মিশে যেতে মন চায়। মরে যেতে ইচ্ছে করে।
Ñআপনি কী কইতাছেন এইসব কথা? আপনের পাওনা টাকা ফেরত দিতে পারতেছি না বইল্যা আপনি বাড়িতে আইয়া যা-তা বলবেন, খারাপ প্রস্তাব দিবেন, এইটা মগের মুল্লুক নাকি! কিছুটা রেগে যায় আমিরন। ফোঁস ফোঁস করছে সে রাগে।
Ñএত জেদ দেখাও কার সাথে? তোমার সাহস তো কম না! বছর পার হইয়া গেল, তোমরা আমার একটা টাকাও ফেরত দিতে পারো নাই। এখন আমি আমার পাওনা বুইঝ্যা নিতে চাই। ভিটাবাড়ির কিছু অংশ আমার নামে লেইখ্যা দিতে কইলাম, সেইটাতেও রাজি হইল না তোমার ভাদাইম্যা স্বামী। এখন আমার কথামতো তুমি যদি রাজি না হও তাহলে ঢাকা শহরে লোক পাঠাইয়া তোমার স্বামী মজিরুলের জানটা কবজ করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। তুমি বিধবা হইতে চাও এই অল্প বয়সে? তুমিই ঠিক করো।
হানিফের এবারের কথাগুলো শুনে বাস্তবতা উপলব্ধির চেষ্টা করে আমিরন। সে নিজের অসহায়ত্ব টের পায় পুরোদমে। হানিফের অনেক লোকজন আছে। টাকার জোরে ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি হয়েছে এখন। চাইলে যা খুশি সবই করতে পারে লোকটা। ভাড়া করা লোকজন দিয়ে স্বামী মজিরুলকে খুন করে ফেলাটা অসম্ভব নয় তার কাছে। রাস্তায় ছুরি মেরে অথবা বাস, ট্রাক, কার চাপা দিয়ে একজন রিকশাচালক মানুষকে মেরে ফেলাটা তাদের জন্য ডালভাত ব্যাপার। পাওনা টাকার জন্য যদি এখন স্বামী মজিরুলকে অকালে হারিয়ে ফেলে বিধবা হয়, তাহলে ছোট্ট অবুঝ মেয়েটিকে নিয়ে কোথায় যাবে, কী করবে সে ভেবে দিশাহারা হয়ে পড়ে। কাউকে হানিফের কুপ্রস্তাবের কথাটা বলাও যায় না। এতে নিজের ইজ্জত-সম্মান আরও নষ্ট হবে। এসব কথা মজিরুলকে জানানোরও সুযোগ নেই। পাশের বাড়ির ময়না ভাবির মোবাইল দিয়ে মাঝেমধ্যে যোগাযোগ হতো বটে, তবে বেশ কিছুদিন ধরে কথা বলতে পারছে না আমিরন তার স্বামীর সঙ্গে। যে মোবাইল ফোন নম্বরে কথা বলত সেটা অন্য একজন মানুষের, যে মজিরুলের সঙ্গে থাকত একই ঘরে। সেই নম্বরে ফোন করে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। কী হয়েছে সেখানে, জানে না আমিরন।
সন্ধ্যার পর হানিফ এসে ঠিকই হাজির হয়। একলা বাড়িতে পরপুরুষের উপস্থিতি আমিরনের অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়। লোকটা কিছুতেই ছাড়বে না তাকে। তার মতলব টের পায় আমিরন। হানিফ উঠানে দাঁড়িয়ে গলা নামিয়ে শুধু বলে, আমিরন, আজ তোমার কোনো আপত্তি শুনমো না। আমি সেইদিন যেসব কথা বইল্যা গেছি তা নিশ্চয়ই তোমার মনে উপলব্ধি হইছে। এখন তুমি কী করবা বইল্যা ভেবেছ?
ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলটা টেনে মাথায় দিতে দিতে আবছা আলো-আঁধারিতে উঠোনে দাঁড়ানো মানুষটিকে দেখতে পায় আমিরন। এ রকম একটা অবস্থার মুখোমুখি হবে আগে দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। সাধারণ গ্রাম্য অজপাড়াগাঁয়ের একজন সহজসরল গৃহবধূ সে। এমন পরিস্থিতিতে কখনও পড়েনি। অন্য কারও কাছে এমন পরিস্থিতির কথাও শোনেনি। এখন হানিফ প্রধানের কথার জবাবে কী বলবে, হঠাৎ ভেবে কূল পায় না সে। ততক্ষণে উঠোন পেরিয়ে ঘরের দাওয়ায় উঠে আসে হানিফ। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা নির্বাক নারী আমিরনকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের মধ্যে টেনে আনে। প্রচণ্ড উত্তেজনায় অসহায় একজন নারীর শরীরের দখল নিতে অস্থির এবং ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় অনেকটা জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয় আমিরনের। আত্মরক্ষায় চিৎকার দেবার শক্তি, সাহস, ইচ্ছা সবই যেন একসঙ্গে হারিয়ে ফেলে সে। ততক্ষণে হানিফ প্রচণ্ড শক্তিতে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে রাখা আমিরনকে ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢোকায়। ঘরের মধ্যে ঢুকেই চতুর হানিফ ফিসফিস করে আমিরনের কানের কাছে মুখ এনে শুধু বলে, ‘চুপ, একদম চুপ থাকবি তুই। একটুও শব্দ করবি না। কোনো চিল্লাচিল্লি করলে তোরই ইজ্জত-সম্মান যাইব। কোনো লাভ হইব না। আমার কাজে একদম বাধা দিবি না বইল্যা দিলাম। বাধা দিলেই তোর খবর আছে। এখন শুধু চুপচাপ থাক। যা করার আমিই সব করব।’
আমিরন একটা দম দেওয়া পুতুলের মতো শুয়ে থাকে বিছানায়। হানিফের বীভৎস লালসার শিকার হতে হতে কোনো অতল অন্ধকারে যেন হারিয়ে যায়। লোকটার কোনো কিছুতেই আর বাধা দেয় না। তাকে বিবস্ত্র করে লোকটা, তারপর একটানা কিছুক্ষণ ধরে তার জান্তব লালসা মেটায়। ঘরের মধ্যে থাকা হারিকেনের ম্লান আলোয় আমিরনের বেদনার্ত, দুঃখী, অসহায় মুখটা আবছা দেখা যায়। তার দুই চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ফোঁস ফোঁস কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে উন্মত্ত হানিফের মুখ থেকে কিছু পাশবিক জান্তব শব্দ যেন মাতিয়ে তুলতে চাইছে ঘরের পরিবেশ। আমিরন অনেক কষ্টে দাঁতে দাঁত চেপে হানিফের পাশবিকতা সহ্য করে। একসময় সব সহ্যের সীমা পেরিয়ে যায়। অনিচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেকে সমর্পণের ধকল আর সইতে পারে না সে। জ্ঞান হারায়। এরপর আর কিছুই জানে না আমিরন।
দুই.
সেই শুরু আমিরনের জীবনের এক কালো অধ্যায়।
ধারের টাকা ফেরত না পাওয়ার অজুহাতে তার ওপর বাড়িতে চড়াও হয়ে হানিফ কসাইয়ের সাহস বেড়েছে। সেদিনের সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া ঘটনার পর তার লালসার শিকার হওয়া আমিরন গ্রামের কাউকে, পাড়াপড়শি ঘনিষ্ঠ আপনজন কাউকে এ বিষয়ে কিছু বলেনি, এটা নিশ্চিত হয়েছে লোকটা। ধার নেওয়া মজিরুলের বউ আমিরনকে আগে বেশ কয়েকবার দেখলেও তেমন মনোযোগ দেয়নি তখন। হিংস্র নেকড়ে যখন মাংসের স্বাদ একবার পেয়ে যায় কোনোখানে, বারবার সেখানে ছুটে আসে মাংসের স্বাদ নিতে। হানিফ কসাই সারা জীবন গরু-খাসির মাংসের ব্যবসা করে আসছে। কিন্তু মেয়েমানুষের শরীরের স্বাদ নেওয়ার নেশাটা তার রক্তে মিশে গেছে অনেক আগেই। লোকনিন্দা, বদনাম, বাড়িতে বউ-ছেলেমেয়েদের চোখেমুখে ঘৃণার প্রকাশ ইত্যাদি তাকে সেই নেশা থেকে কোনোভাবেই টলাতে পারেনি। বিশ হাজার টাকা ফেরত না দিতে পারার অজুহাতে মজিরুলের বউ আমিরনের ওপর এক সন্ধ্যারাতে চড়াও হয়ে কেমন যেন অবাক হয়ে গেছে। ঘরে হারিকেনের স্বল্প আলোয় আমিরনের নিরাবরণ শরীরটা দেখে কেমন যেন উন্মাদ হয়ে উঠেছিল মানুষটা। সেই ঘটনার পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও এ নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা, কথাবার্তা শোনা না যাওয়ায় হানিফ মনে মনে বেশ আশ্বস্ত হয়েছে। যাক, তাহলে আমিরন সেদিনের ঘটনা কাউকে বলেনি। নিজের মধ্যে চেপে রেখেছে মানসম্মান হারানোর ভয়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তেমন অপ্রত্যাশিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হলে মেয়েরা মানসম্মান, সামাজিক অবস্থান, পরিবারের কথা ভেবে সেটা চেপে রাখে, কাউকে খুলে বলে না। এটা প্রায় সময়েই তাদের মধ্যে আরও বড় বিপদ ডেকে আনে। আমিরনের বেলায়ও তাই ঘটতে থাকে।
একসময় তক্ষকটা একটানা ডাকতে ডাকতে ক্লান্ত হয়ে থেমে যায়। এরপর সুনসান নীরবতা বিরাজ করে চারপাশে। ধারের টাকা দিতে না পারায় কয়েক দিন আগে আমিরনকে কুপ্রস্তাব দিয়ে চলে গিয়েছিল হানিফ। মাঝখানে কয়েক দিন এ বাড়িমুখো হয়নি লোকটা। হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল যেন আমিরন।
হানিফের ভয়ংকর লালসার থাবা থেকে নিজেকে রক্ষা করার কোনো উপায় নেই তার কাছে। অসহায়ভাবে তার অন্যায় চাহিদার কাছে নিজেকে সমর্পণের কোনো বিকল্প নেই, এটা উপলব্ধি করার পর আমিরনের কাছে জীবনটা মূল্যহীন, অর্থহীন মনে হয়। এমন লাঞ্ছনা, অপমান আর গ্লানিময় জীবনের বোঝা আর টেনে নিতে মোটেও ইচ্ছে করে না। এ জীবন রেখে আর লাভ নেই। পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে সব লাঞ্ছনা, অপমান, গ্লানির বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে না। ভয়ংকর এক অমানুষের জান্তব লালসার কাছে নিত্যদিন নিজেকে বলি দিতে হবে না। সবকিছু থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে সঙ্গে সঙ্গেই। আত্মহত্যার কথা ভেবেছে আমিরন বেশ কয়েকবার। নদীতে ঝাঁপ দিয়ে মরার কথা চিন্তা করলেও সেখানে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে। বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূর দিয়ে রেললাইন চলে গেছে। সেখানে সারা দিনে অনেক ট্রেন ছোটাছুটি করে। তার মধ্যে যেকোনো একটার নিচে ঝাঁপ দিয়ে পড়লেই নিশ্চিত মৃত্যু। শরীর খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। নদীতে ঝাঁপ দিতে অথবা ট্রেনের নিচে পড়তে যেতে চাইলেও তিন বছর বয়সি মেয়ে নাজুকে একা ফেলে রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার কথা ভাবতেই বুকের ভেতরে দারুণ তোলপাড় অনুভব করে আমিরন। ফলে গ্লানিময় জীবনের বোঝা, অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করে যেতেই হয়। তার পক্ষে আত্মঘাতী হওয়া সম্ভব হয় না।
এখন হানিফের কথামতো সন্ধ্যের পর আমিরনকে একাকী নিজের ঘরে অপেক্ষায় থাকতে হয়। হানিফ এসে তার চাহিদা পূরণ করে চলে যায়। এর মধ্যে একদিন সঙ্গী খবিরকে নিয়ে হাজির হয়েছে। তার চাহিদা পূরণেও বাধ্য করেছে আমিরনকে। এমন নোংরা জঘন্য ব্যাপারে সায় দিতে না চাইলেও হানিফের জোরজবরদস্তিতে নিজেকে তাদের ইচ্ছার বলি হতে হয়েছে। একপর্যায়ে খবির তার মোবাইলে তাদের নোংরামির অনেক কিছুই ভিডিও করেছে। মোবাইলে সেই ভিডিও করার ব্যাপারটি বুঝতে না পারলেও পরবর্তী সময়ে হানিফ ও খবির তাকে সেই ভিডিও দেখিয়েছে। ভিডিওতে নিজেকে দেখে চমকে উঠেছে আমিরন। এ মানুষগুলো কী জঘন্য রুচির! নিজেরা অপকর্ম করে ক্ষান্ত হয়নি। সেই অপকর্মের ছবি মোবাইলের ক্যামেরায় তুলে রেখেছে। মোবাইলে ভিডিও দেখতে দেখতে আমিরনের কেবলই মনে হয়, এ দুনিয়ায় কেয়ামত নেমে আসে না কেন? এখনই কেন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায় না?
হানিফ এবং তার সঙ্গে আসা খবিরের ক্রমাগত অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়নে অতিষ্ঠ আমিরন তার সব বোধশক্তি, অনুভূতি যেন দিনে দিনে হারিয়ে ফেলছে। সে কি বেঁচে আছে? নাকি মরে গেছে! অনেক সময় ঠিক অনুভব করতে পারে না। একটা জিন্দালাশ হয়ে যেন সে চলাফেরা করছে, সংসারের কাজকর্ম করছে। আবার প্রায়দিনই সন্ধ্যার পর তার ঘরে আসা দুজন পুরুষের অন্যায়, অত্যাচার, অসভ্যতা নির্বিকারে মেনে নিচ্ছে, সহ্য করছে। কোনোভাবেই তাদের প্রতিরোধ করছে না। বনজঙ্গলে চার পায়ে ভর দিয়ে চলাফেরা করা হিংস্র নেকড়ের মতো আচরণ করছে মানুষগুলো। তার কাছে মনে হয় চরম অভিশপ্ত একটা সময় পার করছে সে, যা কোনো দিনই শেষ হবে না। হানিফ ও খবির আমিরনকে শাসিয়েছে বেশ কয়েকবার। যদি কেউ কোনোভাবে তাদের এ অপকর্মের কথা জানতে পারে তাহলে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় তোলা সেই জঘন্য খারাপ ভিডিও ছড়িয়ে দেবে সবখানে। তখন আমিরনের মানসম্মান নিয়ে এ গ্রামে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে, তার স্বামী এসব ঘটনা জানার পর নিশ্চয়ই তাকে আর ঘরে রাখবে না। অসতী, কলঙ্কিনী, দুশ্চরিত্রা নারী বলে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। এক মুহূর্তও ভাববে না কোন কারণে, কার অক্ষমতায়, ব্যর্থতায় আমিরনকে এ দুঃসহ নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে, কেন কলঙ্কিনী হিসেবে চিহ্নিত হতে হয়েছেÑএসব নিয়ে মোটেও চিন্তা করবে না লোকটা। এটা শুধু মজিরুল নয়, প্রায় সব পুরুষমাত্রই করবে। এতসব ভেবেই আমিরন দুঃসাহসী হয়ে কিছু করতে পারেনি। কাউকে এ বিষয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেছে।
বাপের বাড়ি থেকে মা খবর পাঠিয়েছে। মেয়েটা নানার বাড়ি যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন পেরোলেও আমিরন তাকে দেখতে যায়নি একবারও। কীভাবে যাবে? ওখানে গেলেই তো মেয়েটা তার সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসার জন্য গোঁ ধরবে। মেয়েটার কথা মনে হলেই আমিরনের বুকের ভেতরটায় হুহু করে ওঠে। তীব্র এক হাহাকার জাগে। এটা সহ্য করা কঠিন। আমিরন এখন অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে গেছে যেন। তার চারপাশে পাড়াপড়শি, আত্মীয়স্বজন অনেকে থাকলেও তাদের সবার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলেছে যেন নিজেকে। সবার সঙ্গে হয়তো দেখা হচ্ছে, কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু সবকিছুর পরও একটা অদৃশ্য দেয়াল গড়ে উঠেছে গত দুই মাসে। এক জঘন্য, কুৎসিত, অসভ্য পৃথিবীতে যেন তার বিচরণ এবং জীবনযাপন। যেখানে তার নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই। তার কোনো স্বাধীনতা নেই।