শ্রদ্ধা
স্বরোচিষ সরকার
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৪ ০৮:৫২ এএম
গোলাম মুরশিদ, ৮ এপ্রিল ১৯৪০-২২ আগস্ট ২০২৪
লন্ডনের কুইন্স হাসপাতালে ২২ আগস্ট বেলা ১১টায় গোলাম মুরশিদ যখন মারা যান, তখন দুজন অপরিচিত নার্সই মাত্র তার শেষযাত্রার দর্শক ছিলেন। ক্যানসার আক্রান্ত স্ত্রী এলিজা ছিলেন বাড়িতে, পুত্র অর্থনীতির অধ্যাপক পাণিনি ছিলেন আমেরিকায়, কন্যা স্কুলশিক্ষক অমিতা ছিলেন হাসপাতালের পথে। অমিতা এসে দেখেন গোলাম মুরশিদ তার বিছানায় শক্ত হয়ে শুয়ে আছেন। মাত্র কয়েক দিন আগে মুরশিদ তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, তোমার হাতে হাত রেখে আমি চিরবিদায় নিতে চাই। কিন্তু সে সুযোগ তার হয়নি। বাস্তবে জীবনসঙ্গিনীকে বাদ দিলে গোলাম মুরশিদ সত্যিকার অর্থেই একজন নিঃসঙ্গ মানুষ ছিলেন। বন্ধুবান্ধব, ছাত্রছাত্রী, আত্মীয়স্বজন সবাই তাকে এতটা সমীহ করত যে, কারও সঙ্গেই তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারত না। ছেলেমেয়েদের বেলায়ও তা খানিকটা সত্য। তার যদি সত্যিকারের ঘনিষ্ঠতা কিছু থেকে থাকে, তা ছিল বইপত্রের সঙ্গে, লেখালেখির সঙ্গে, গবেষণার সঙ্গে। রাজনীতি ও ধর্ম সব সময় এড়িয়ে চলতেন বলে আড্ডায়ও কখনও তিনি সাবলীল ছিলেন না। এমনকি খাবারদাবারের প্রতিও ছিলেন নিরাবেগ। সারা দিন ডাইনিং টেবিলে বসে থাকতেন ঠিকই, তবে ল্যাপটপটা সামনে নিয়ে। কাজ করার ফাঁকে হয়তো কিছু খেয়ে নিতেন, যেটুকু একেবারে না হলেই নয়। মৃত্যুর সময়ও মানুষটি কাউকে কিছু না বলে নীরবে চলে গেলেন। লন্ডন ইলফোর্ডের গার্ডেনস অব পিসে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে আছেন। এর মানে মৃত্যুর পরও তার নিঃসঙ্গ থাকার ব্যবস্থাটা পাকাপোক্ত হলো। তার ভক্ত-অনুরাগীর সিংহভাগ বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায়। তাদের মধ্যে ঠিক কজন সেখানে গিয়ে গোলাম মুরশিদের কবরে ফুল দিতে পারবেন, সন্দেহ হয়। অর্থাৎ জীবনেও ব্যক্তি গোলাম মুরশিদ যেমন অন্যদের কাছ থেকে দূরে ছিলেন, মরণের পরও তিনি তার সেই নিঃসঙ্গতা বজায় রাখলেন। তাই বলে কি গোলাম মুরশিদকে সবাই ভুলে যাবেন? যদি না যান, তাহলে এ নিঃসঙ্গ মানুষটা এমন কী কীর্তি রেখে গেছেন, যার জন্য মরণের পরও তিনি স্মরণের যোগ্য?
গোলাম মুরশিদের মূল কীর্তি বঙ্গবিদ্যাচর্চা। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ চর্চা পাঠচক্রের পক্ষ থেকে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে তাকে যখন সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তখন তার এ কীর্তির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে উচ্চারিত হয় এবং এ সভায় তাকে ‘বঙ্গবিদ্যাবিশারদ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সে সভা অলংকৃত করেছিলেন আনিসুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক, শামসুজ্জামান খান, হাবিবুল্লহ সিরাজী, ভীষ্মদেব চৌধুরী প্রমুখ গুণিজন। গোলাম মুরশিদের এ বঙ্গবিদ্যাচর্চার প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করলেই বোঝা যাবে, কেন তিনি স্মরণীয় এবং যত দিন বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি থাকবে, তত দিন তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
প্রথমেই দেখা যাক বাংলা ভাষার ইতিহাসে তার অবদান কতটা। গোলাম মুরশিদ বাংলা ভাষার ক্রমবিকাশ নিয়ে গবেষণা করেছেন। বিশেষভাবে লিখিত ভাষার যে ঐতিহ্য বাংলা ভাষা ধারণ করে, তা কীভাবে সূচিত হয়েছিল, কীভাবে তার বিকাশ ঘটেছিল এবং কীভাবে তা বর্তমান চেহারা লাভ করেছে, এগুলো নিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ‘কালান্তরে বাংলা গদ্য’ (১৯৯২) এবং ‘বাংলা ভাষার উদ্ভব ও অন্যান্য’ (২০১৯) বই দুটি। এর মধ্যে প্রথম বইয়ে তিনি বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন নিয়ে যে তত্ত্ব হাজির করেছেন, তা বাংলা ভাষার ইতিহাসে অসাধারণ সংযোজন। যে আনুষ্ঠানিক বাংলা ভাষা লিখিত যোগাযোগে ব্যবহার করা হয়, তা মানুষের মুখের ভাষা থেকে কীভাবে ধীরে ধীরে সরে গেল, লেখকরা কীভাবে স্থানীয় ভাষার শব্দ সংস্কৃত ভাষার শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে শুরু করলেন, সে ইতিহাস তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এবং প্রক্রিয়াটির তিনি নাম দিয়েছেন সংস্কৃতায়ন। উনিশ শতকের সূচনায় এ প্রক্রিয়া কীভাবে দ্রুতগতি লাভ করে, গোলাম মুরশিদ দৃষ্টান্ত তুলে ধরে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন। গোলাম মুরশিদের ভাষাচিন্তায় এটি একটি মৌলিক ধারণা। তার সম্পাদিত তিন খণ্ডের ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ থেকেও তার এ তত্ত্ব প্রমাণিত হয়। বাংলা ভাষার বৃহত্তম এ অভিধানে প্রায় দেড় লাখ শব্দের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। লিখিত একটি শব্দ ঠিক কখন থেকে বাংলা ভাষায় চালু হলো, কখন তার চেহারার বদল ঘটল, কখন থেকে তা অপ্রচলিত হয়ে গেল, আবার কখন থেকে তার অর্থের বদল ঘটতে শুরু করলÑএসবের বিবরণ এ অভিধান থেকে পাওয়া যায়। বাংলা শব্দের সূত্রে এ অভিধান আসলে হাজার বছরের বাংলা ভাষার ইতিহাসই ধারণ করে।
গোলাম মুরশিদের অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ ও জীবনাচরণ ভবিষ্যতের উন্নত বাঙালির কাছে নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য আদর্শ। সুদূর ভবিষ্যতে কখনও সে আদর্শের জয় হলে গোলাম মুরশিদ তার জীবনে ও মরণে যে নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তার অবসান হবে। তেমন সুদিনে গোলাম মুরশিদই হবেন সর্বগ্রস্মরণীয়
বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চায়ও গোলাম মুরশিদ তার স্থায়ী আসন তৈরি করে নিয়েছেন। তার একটি বইয়ের নাম ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ (২০০৬)। শিরোনামে সংস্কৃতি থাকলেও এটি আসলে বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের বই। আলোচ্য বিষয়ের ব্যাপ্তি ও গভীরতা বিবেচনায় বইটি তুলনীয় হতে পারে একমাত্র নীহাররঞ্জন রায়ের ‘বাঙালির ইতিহাস : আদি পর্ব’ (১৯৪৮) বইয়ের সঙ্গে। নীহাররঞ্জন রায়ের বইয়ের নামের মধ্যে বাঙালির ইতিহাস থাকলেও এটি আসলে বাংলার মানুষের বাঙালি হয়ে ওঠার আগেকার ইতিহাস। নীহাররঞ্জনের বইয়ের আলাচ্য কাল দ্বাদশ শতকের পূর্ববর্তী। অন্যদিকে গোলাম মুরশিদের বইয়ের আলোচ্য কাল দ্বাদশ শতক থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের কাল পর্যন্ত। গোলাম মুরশিদের এ বই পড়ে জানা যায়, কীভাবে ১৩৫২ সালে বাংলাভাষী এলাকা নিয়ে একটি রাজনৈতিক ভূগোল তৈরি হয় এবং সেই সূত্রে ভবিষ্যতের বাঙালি জাতীয়তার বীজ বপিত হয়। গোলাম মুরশিদ তার এ ইতিহাস লিখেছিলেন অত্যন্ত নির্লিপ্ত থেকে। ফলে কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা বইটিতে নেই। একই কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষী অঞ্চলগুলোয় বইটির অসাধারণ জনপ্রিয়তা লক্ষ করা যায়। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত বইটিকে ‘মহাগ্রন্থ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। দিল্লি থেকে এর একটি ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হতে দেখেও এর গুরুত্ব বোঝা যায়।
গোলাম মুরশিদের লেখা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইগুলোও একইভাবে সর্বজনগ্রাহ্য। এ সর্বজনগ্রাহ্যতার পেছনেও বড় কারণ তার নির্লিপ্তি। কোনো ধরনের রাজনৈতিক আদর্শের কাছে তিনি নতি স্বীকার করেননি। গবেষণার মাধ্যমে তার কাছে যা গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, তা তিনি অকপটে বলেছেন। এ প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে তিনি তার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটি বইয়ের নাম রেখেছেন ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর : একটি নির্দলীয় ইতিহাস’ (২০০৯)। বইয়ের উপশিরোনাম অংশটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আক্ষরিক অর্থেই তিনি এটা রক্ষা করেছেন। ফলে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অনুসারীদের কাছে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। এ বইয়ের অনুকূল ও বিরূপ নানা রকম সমালোচনা সমকালে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোও তাকে প্রভাবিত করতে পারেনি। বইটির পরবর্তী সংস্করণে তাই মুদ্রণপ্রমাদ ছাড়া আর কোনো সংশোধন প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করেননি। ‘যখন পলাতক’ (১৯৯৩) বইয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের যে স্মৃতিচারণা করেছেন, সেখানেও তার এ গবেষকসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত। রচনার প্রকৃতির দিক দিয়ে বইটি হয়তো সৃজনশীল, কিন্তু তথ্য উপস্থাপনের দিক দিয়ে এটি গবেষণাধর্মী একটি বই হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশে মানবীবিদ্যা চর্চা নিয়েও গোলাম মুরশিদের কাজ প্রারম্ভিক। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালের ৮ মার্চকে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণা করার পর সারা পৃথিবীতে সমাজে নারীর ভূমিকা, অগ্রগতি ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। গোলাম মুরশিদ তখন হিন্দু সমাজ সংস্কার আন্দোলন নিয়ে কাজ করছিলেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বেশ কয়েকজন বাঙালি নারী তাদের জীবনসংগ্রাম লিপিবদ্ধ করেছিলেন, সেগুলো তখন তার চোখে পড়ে। বিশেষভাবে ‘বামাবোধিনী’ নামে একটি পত্রিকায় তিনি সেকালের নারীদের মনোলোকের বিশাল একটি অংশের খোঁজ পান। সমকালীন আরও বহু রচনা তাকে বাঙালি নারীর জাগরণ নিয়ে গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করে। মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর শিবনারায়ণ রায়ের অধীনে তিনি এটা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয় রাজশাহী থেকে ১৯৮৩ সালে। এর নাম : ‘রিলাক্ট্যান্ট ডেবুট্যান্ট : রেসপন্স অব বেঙ্গলি উইমেন টু মডার্নাইজেশন’। অল্পকালের মধ্যে ১৯৮৫ সালে ‘সংকোচের বিহ্বলতা : আধুনিকতার অভিঘাতে বঙ্গরমণী’ নামে বইটির একটি বাংলা অনুবাদ বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে। একুশ শতকের সূচনায় বাংলাদেশ-ভারতসহ উপমহাদেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় উইমেন স্টাডিজ বা মানবীবিদ্যা নামে বিভাগ খুলেছে। এসব বিভাগের পাঠ্যক্রমে গোলাম মুরশিদের এ গবেষণা শুধু পাঠ্য তাই নয়, এ বিদ্যাশৃঙ্খলায় প্রারম্ভিক ও আকরগ্রন্থ হিসেবে এটি সমাদৃত। তাই উপমহাদেশে যত দিন মানবীবিদ্যার চর্চা অব্যাহত থাকবে, গোলাম মুরশিদও তত দিন স্মরণীয় হবেন।
গোলাম মুরশিদ সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হবেন মধুসূদনের জীবনী ‘আশার ছলনে ভুলি’ (কলকাতা, ১৯৯৫) এবং কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী ‘বিদ্রোহী রণক্লান্ত’ (ঢাকা, ২০১৮) গ্রন্থ দুটির জন্য।
মধুসূদনের জীবনীটি রচনার জন্য গোলাম মুরশিদ দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। কাজ করেছেন লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি, ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রোডস লাইব্রেরি, বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, ভার্সাইয়ের মিউনিসিপ্যাল আর্কাইভ প্রভৃতিতে। ভাগ্যিস, এসব গ্রন্থাগার ও আর্কাইভে এমন কিছু মালমসলা ছিল, যা মধুসূদনের জীবনী পুনর্গঠিত করতে সহায়তা করেছে। যেমন রেবেকার পিতার নাম টমসন কি না, হেনরিয়টা ধর্মমতে তার বিবাহিত স্ত্রী কি না, কখন কোথায় তার কোন সন্তানের জন্ম হয়েছে, কখন তাদের আপ্সুদীক্ষা হয়েছে, কৃষ্ণমোহনের কন্যা দেবকীর সঙ্গে তার সম্পর্ক হওয়ার আদৌ কোনো সম্ভাবনা ছিল কি না, বিশপস কলেজে কী কী বিষয় পড়তেন, মাইকেলের উত্তরসূরিরা কে কোথায় বাস করেনÑএমন বহু তথ্য গোলাম মুরশিদ এসব গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। তথ্য উদ্ধারের চেয়েও বড় যে কাজটি তিনি করেছিলেন, তা হলো মধুসূদনের সাহিত্যের সঙ্গে মধুসূদনের ব্যক্তিজীবনের সম্পর্ক খুঁজে বের করা। এ কাজের মাধ্যমে মধুসূদনের ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি তার মনোলোককেও গোলাম মুরশিদ উন্মোচন করতে পেরেছিলেন। জীবনীটি প্রকাশের পরপরই বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপক আহমদ শরীফ। প্রসঙ্গত তিনি লিখেছিলেন : ‘মাদ্রাস থেকে ফ্রান্স অবধি নানা জায়গায় অসংখ্য তথ্য এবং সেসব তথ্যের অসামান্য বিশ্লেষণ দিয়ে গোলাম মুরশিদ প্রথম মধুসূদনের অন্তর্জীবন, সাহিত্যজীবন এবং প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে অভূতপূর্ব যোগাযোগ ঘটিয়েছেন। এই প্রথম মাইকেলের পূর্ণরূপ প্রকাশ পেলো।’ সমালোচক শর্বরী সিন্হাও প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেছেন, লিখেছেন : ‘একজন কবি/নাট্যকারের জীবনকে কেবল তাঁর জীবনের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে দেখার চেষ্টা নয়, বরং তাঁর লেখার মধ্যে লুকিয়ে থাকা নানা সূত্র থেকে তাঁর মানসিক জীবনের মূল ধারাগুলিকে চিহ্নিত করাÑএটাই এই বইয়ের প্রধান আবেদন।’ গোলাম মুরশিদের আগে মধুসূদনের জীবনী বহু জনে লিখেছেন, যেমন যোগীন্দ্রনাথ বসু, নগেন্দ্রনাথ সোম, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী, ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষ, সুরেশচন্দ্র মৈত্র প্রমুখ। গোলাম মুরশিদের জীবনীটি কতটা পূর্ণাঙ্গ, ওইসব জীবনীর পাশাপাশি পাঠ করলে তা ভালোভাবে বোঝা যায়। ভবিষ্যতের বাংলা সাহিত্যসেবীর কাছে এভাবে মাইকেল মধুসূদনের নামের সঙ্গে গোলাম মুরশিদের নাম একত্রে স্মর্তব্য হবে।
কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী সম্পর্কেও প্রায় অভিন্ন মন্তব্য করা যায়। এ জীবনীতে গোলাম মুরশিদ নজরুলের ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি তার অন্তরলোক উদ্ধার করেছেন। এই প্রথম নজরুল ইসলামের এমন একটি জীবনী তৈরি হলো যেখানে নজরুল পূজ্য নন, অলৌকিক ননÑএকজন কবি এবং রক্তমাংসের মানুষ। নজরুল জীবনের যাবতীয় খুঁটিনাটি তিনি অত্যন্ত নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে দেখেছেন। গোলাম মুরশিদের অন্যান্য বইয়ের মতো এ জীবনীরও একটা মূল ভাব আছে, শিরোনামের মধ্যে তিনি সে ভাবের প্রতিফলন ঘটিয়ে লিখেছেন : বিদ্রোহী রণক্লান্তÑঅর্থাৎ নজরুলের জীবন বিশ্লেষণের পরে গোলাম মুরশিদের মনে হয়েছে, নজরুল ইসলামের সাহিত্যজীবন বিদ্রোহ দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে তিনি ক্লান্ত বা পরাজিত এক ব্যক্তি। তার এ পরাজয় কীভাবে বোঝা যায় এবং সে পরাজয়ের পেছনে কী কী কারণ সক্রিয় ছিল, গোলাম মুরশিদ তা বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন। গোলাম মুরশিদের এ ডিসকোর্সের সঙ্গে হয়তো অনেকে একমত হবেন না, এজন্য অনেকে তাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনাও করেছেন, কিন্তু যেসব যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে গোলাম মুরশিদ তার এ দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাকে তারা খণ্ডন করতে পারেননি; শুধু গায়ের জোর দেখিয়েছেন। সত্য সব সময় কঠিন। সেই কঠিনের মুখোমুখি হতে হয় গবেষককে, এবং সেই কঠিন সত্য পাঠকের কাছে তুলে ধরতে হয় নিরাবেগ দৃষ্টিতে। কোনো ধরনের আদর্শ দিয়ে সত্য দেখতে গেলে সত্য বিকৃত হতে বাধ্য। গোলাম মুরশিদ সেই সত্যের সঙ্গে আপস করেননি। এক একটা তথ্য সংগ্রহ করতে এবং প্রচলিত ধারণা খণ্ডন করতে তিনি প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন। বিশেষভাবে তথ্য বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ধারণায় উপনীত হওয়ার যে যোগ্যতা তিনি দীর্ঘ গবেষকজীবনে আয়ত্ত করেছিলেন, নজরুল জীবনীতে তিনি তার সর্বোত্তম প্রয়োগ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন।
ওপরে যেসব বইয়ের উল্লেখ করা হলো, তা ছাড়াও গোলাম মুরশিদ আরও নানা বিষয় নিয়ে বই লিখেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিয়ে তার বহু মূল্যায়ন অভূতপূর্ব। ব্রিটেনে বাঙালির ইতিহাস বা বাংলা গানের ইতিহাসবিষয়ক বইয়ে তিনি বহু নতুন তথ্য যোগ করেছেন। তার প্রবন্ধগুলোর অধিকাংশই গবেষণা-প্রবন্ধ। এসব প্রবন্ধের প্রায় সবকটিতেই তিনি মৌলিক ধারণার জন্ম দিয়েছেন। পরবর্তী গবেষকরা প্রায় ক্ষেত্রে এসবের বরাত ব্যবহার করেন, করছেন এবং হয়তো ভবিষ্যতেও করবেন। এটাও তাকে স্মরণের ছোট একটা ধারা।
বাঙালি সমাজ স্বভাবতই হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালিতে দ্বিধাবিভক্ত। পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা প্রায় এক শতাব্দী ধরে কবন্ধের মতো বাঙালির ঘাড়ে চেপে বসে আছে। জীবনদর্শন ও জীবনযাপনে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনাধারী লোকের সংখ্যা এখানে সত্যি সত্যিই বিরল। অথচ পৃথিবীর অন্যতম সভ্য জাতি হিসেবে বাঙালিকে প্রতিষ্ঠিত করতে এর কোনো বিকল্প ছিল না। এমন পরিবেশে গোলাম মুরশিদের অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ ও জীবনাচরণ ভবিষ্যতের উন্নত বাঙালির কাছে নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য আদর্শ। সুদূর ভবিষ্যতে কখনও সে আদর্শের জয় হলে গোলাম মুরশিদ তার জীবনে ও মরণে যে নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তার অবসান হবে। তেমন সুদিনে গোলাম মুরশিদই হবেন সর্বগ্রস্মরণীয়।