ওয়াকিলা তাবাসসুম মুমু
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৪ ১৩:৫৮ পিএম
চিত্রকর্ম : সুলতান ইশতিয়াক
প্রায়ই আমরা আমাদের জীবন ও রাজনীতিকে আলাদাভাবে দেখি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যা কিছুই ব্যক্তিগত তার সবই রাজনৈতিক।
২০২৪-এর জুলাইয়ে এসে যখন বাংলাদেশের মানুষ থমকে গিয়েছিল স্লোগানে, টিয়ার শেলে, ধোঁয়ায়, গুলির আওয়াজে; তখন প্রায় প্রত্যেক বয়সি মানুষের বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের মাথায় উদিত হয় যে, রাজনীতি শুধু রাজ্য নীতির বিষয় নয়, রাজনীতি শুধু কোনো নির্দিষ্ট কুক্ষিগত ক্ষমতা নয়, রাজনীতি শুধু মঞ্চের ভাষণ নয়, রাজনীতি শুধু খবরের কাগজে পড়ার বস্তু নয়। রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের বাজারের দরদাম, বাসা ভাড়া, শিক্ষা, সংহতি, ব্যবহার, চলাফেরা, রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমুতে যাওয়া, কথা বলা, এমনকি সৃজনশীলতাও (শিল্প-সাহিত্য)!
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশে পেস্ট লাগানোর মতোই সাহিত্য ও রাজনীতি একে অন্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে লেপ্টে রয়েছে; যা আবার প্রায়ই পরস্পরকে প্রতিফলিত ও প্রভাবিত করে। সাহিত্য ধরে রাখে সময় এবং তা কাজ করে সে সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক আয়না হয়ে। সাহিত্য রাজনৈতিক অভিব্যক্তি, সমালোচনা এবং প্রচারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। যেমন ধরা যাক জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ এবং অ্যানিমেল ফার্মের কথা। জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস ‘১৯৮৪’ এবং ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ রাজনৈতিক অনুষঙ্গের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সাহিত্যের আইকনিক উদাহরণ। বাংলাদেশে হয়ে যাওয়া দুই হাজার চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও তার দুই রাজনৈতিক উপন্যাসের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। আন্দোলন চলাকালে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল অ্যানিমেল ফার্মের নানান সংলাপ : All animals are equal, but some are more equal than others. অ্যানিমেল ফার্ম একটি রূপক উপন্যাস যা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দুর্নীতি, বিশেষ করে রাশিয়ান বিপ্লব এবং স্টালিনের অধীনে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থানকে সমালোচনা করে। অন্যদিকে ‘১৯৮৪’ একটি ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস, যা একনায়কতন্ত্র, নজরদারি এবং সত্যের বিকৃতির সমালোচনা করে; যা বিংশ শতাব্দীর ফ্যাসিবাদ এবং স্টালিনিজমের উত্থান দ্বারা অনুপ্রাণিত। এ কাজগুলো রাজনৈতিক তত্ত্ব, একনায়কতন্ত্র এবং নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার বিপদ নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য পাঠ হয়ে উঠেছে।
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’ বইটিও বেশ জনপ্রিয় বর্তমানে। এটি শুধু ম্যাজিক রিয়েলিজমের একটি মাইলফলক নয়, এটি ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতি, ইতিহাস এবং সমাজের ওপর একটি গভীর ভাষ্যও। এ উপন্যাসে বহু প্রজন্মের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে; যা রাজনৈতিক সংঘাত, উপনিবেশবাদ এবং অর্থনৈতিক শোষণের যে গভীর ক্ষত, তাকে অন্বেষণ করে। মার্কেজের কাজে উঠে আসে ল্যাটিন আমেরিকার রাজনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে সমালোচনা। যা স্বৈরাচার, বিপ্লব এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রভাব আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। তার সাহিত্য ল্যাটিন আমেরিকার রাজনৈতিক জটিলতা বুঝতে বিশ্বব্যাপী পাঠককে সহায়তা করেছে এবং এ উপন্যাসটি সে অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সুতরাং এটা বলতেও আর দ্বিধা নেই যে, আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া এ নববিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে সাহিত্যের সান্নিধ্য অন্যতম একটা হাতিয়ার হবে নিঃসন্দেহে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সাহিত্য শুধু সময়কেই ধরে রাখে না, এর অভিনব বিশ্লেষণ, আলোচনা, বিশ্বরাজনীতির সঙ্গে তুলনা একটা দেশের সে সময়টাকে নতুন মাত্রা দান করে।
আন্দোলন বা অরাজকতাই যে শুধু আলোচ্য বিষয় তা নয়, নতুনভাবে গঠিত সরকারও প্রশ্নের দাবানলে পড়ে যখন সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতির সংযোগ ঘটে। এ পঠন সাধারণ মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে ও প্রশ্ন করতে শেখায়। কেনিয়ান লেখক নগুগি ওয়া থিয়াং ‘পেটালস অব ব্লাড’ নামক উপন্যাসে স্বাধীনতা-পরবর্তী কেনিয়ার নব-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের যে ব্যর্থতা তা নিয়ে সমালোচনা করেন। এটি দুর্নীতি, সামাজিক অবিচার এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকালে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার কথা উঠিয়ে আনে। ‘পেটালস অব ব্লাড’ কেনিয়ার সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতনকারী রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী কণ্ঠ হয়ে ওঠে। নগুগির কাজ আফ্রিকান সাহিত্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং সামাজিক পরিবর্তনে সাহিত্যের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করার কারণেই।
কাছাকাছি সময়ের আরব বসন্তের কথা না বললেই নয় (২০১০-২০১২)। আরব বসন্ত, যা আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত একটি সরকারবিরোধী আন্দোলন, আরবি সাহিত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এ আন্দোলন স্বাধীনতা, নিপীড়ন এবং একই সঙ্গে আশা জাগানিয়া স্বপ্ন অন্বেষণ করে এমন সাহিত্যিক কাজের উত্থান ঘটায়। মিসরীয় লেখক আলা আল-আস্বানির উপন্যাস ‘দ্য ইয়াকুবিয়ান বিল্ডিং’ আন্দোলনের সময় সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়। মোহাম্মদ শোকরির আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘ফর ব্রেড অ্যালোন’ আরব বিশ্বের সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। এ আন্দোলন সাহিত্যের নতুন নতুন ধারার উত্থান ঘটায়, যেমন ডিজিটাল স্টোরি টেলিং এবং ব্লগভিত্তিক বর্ণনা, যা ঘটনাগুলোর তাৎক্ষণিক এবং বাস্তব বিবরণ প্রদান করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাজ ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে ঠাকুর নিজেই আগ্রাসি জাতীয়তাবাদের সমালোচক ছিলেন, যেমনটি তার ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে দেখা যায়, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব অন্বেষণ করেছেন। তার সাহিত্য ভারতীয় রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
আমরা যে মাটিতে এখন দাঁড়িয়ে সে মাটিতেও যেমন লেগে আছে অজস্র আন্দোলনে শহীদ হওয়া আমাদের ভাইবোনদের রক্ত। সাহিত্যের ছেঁড়া পাতা থেকে শুরু করে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিতে ভরপুর নানা লেখায়ও এ রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দগদগে স্মৃতি হয়ে রয়ে গেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন, সংগ্রাম এবং সামাজিক সমস্যা বাংলাদেশি সাহিত্যে বারবার উঠে এসেছে। এসব সাহিত্য শুধু দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে ভূমিকা পালন করেনি, বরং রাজনৈতিক চেতনা ও সামগ্রিক সমাজ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখছে। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা হতে শুরু করে ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯), এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। শহীদুল্লা কায়সারের ‘সারেং বউ’ এবং হাসান আজিজুল হকের ‘আগুনপাখি’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বিভিন্ন আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত। এসব রচনায় রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বিবরণ পাওয়া যায়, যা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক এবং সামাজিক ঘটনা ছিল, যা সাহিত্যে একটি বিশাল প্রভাব ফেলেছে। এ সময় এবং পরবর্তী সময়ে অসংখ্য সাহিত্যিক কাজ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। আমাদের জুলাই কি বাংলাদেশের সাহিত্যে জায়গা নিতে পারবে? পারলেও তা কতটুকু?
এর উত্তর আমরা কিন্তু একদম শুরুতেই পেয়ে গিয়েছি। যখন দেখি ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ বইয়ের কথা আজও আমরা রেফারেন্স হিসেবে টেনে আনি রাজনৈতিক দর্শন বর্ণনা করতে গিয়ে।
অতএব আমরা আশা করতেই পারি আমাদের ২০২৪ সালের জুলাই ইতিহাস হয়ে থাকবে ও ছাত্রসমাজের অবদানের কথা বইয়ে আসবে, নাটকে আসবে, কবিতার ছন্দ-অনুপ্রাসে জায়গা করে নেবে। এমন দিন খুব বেশি দূরে নয়। মনে করুন, কাজ শুরু হয়ে গেছে।