সোহরাব পাশা
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৪ ১৩:৫৮ পিএম
মহাদেব সাহা, জন্ম : ৫ আগস্ট ১৯৪৪
রবার্ট লুইস স্টিভেনশন বলেছেন, ‘এক অর্থে কবিতা সাধারণ মানুষের, পথের মানুষের কাছের জিনিস। কারণ কবিতার উপাদান হলো শব্দ, আর সেই শব্দগুলো জীবনেরই ভাষা।’ অন্যদিকে আমরা প্রায় একই রকম বোধের রূপান্তর লক্ষ করি হোর্হে লুইস বোর্হেসের মন্তব্যে। তিনি বলেন, ‘বস্তুত আমি সব রকমের কাব্যতত্ত্বকে স্রেফ কবিতা লেখার উপকরণ মনে করি।’ (কবিতার কারখানা, অনুবাদ : অপূর্ব জামান)।
কবিতা কী? কেন?-এর বিষয়াশয়, আশ্রয়-নিরাশ্রয়, উপাদান-উপকরণ, উপমা-রূপক, চিত্রকল্প ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তর মত ও পথের নির্দেশনা বা দৃষ্টান্ত আছে। এবং তা থাকাটাও স্বাভাবিক; কারণ প্রতিভা নিরন্তর নতুনকে সৃষ্টি করে, এ যেন ফুলের ওপর ফুল বসিয়ে নতুন আলোর সুবাস ছড়ানো। আর এর মূল কারণ হচ্ছে প্রবহমান ‘সময় ও জীবন’।
দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, ‘জগৎ ও জীবনের অনুকৃতি ও বিকৃতি দুই-ই যুগপৎভাবে শিল্পে উপস্থিত। অনুকৃতির অসম্পূর্ণতা সে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেভাবেই হোক না কেন, বিকৃতির শামিল ও তার প্রয়োজন মেটায়।’ (দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়Ñরূপ, রস ও সুন্দর-নন্দনতত্বের ভূমিকা)।
‘কবি কী সৃষ্টি করেন ও কীভাবে সৃষ্টি করেন এবং পাঠকের মনে তার রচনা কী প্রতিক্রিয়া জাগায়-এ বিষয়গুলোই হচ্ছে কবিতার স্বরূপ নির্ণয়ের মাপকাঠি।’ (কবিতার কথা-বিমল কৃষ্ণ সরকার)। কবিতার আবেগ প্রসঙ্গে তিনি ওয়ার্ডসওয়ার্থের একটি চমৎকার উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন-(poetry takes its origin in emotion recollected in tranq uillity)-‘প্রশান্ত আবেগের যে স্মৃতি জাগে তাই থেকে কাব্যের উদ্ভব হয়।’ উপর্যুক্ত মতামতের প্রতিধ্বনি মেলে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে, তিনি মনে করেন-‘অর্থই অগাধ। কবি অর্থকে গৌণ করে শব্দের দ্বারস্থ হন না। শব্দের চলতি সীমাকে তিনি বারে বারে ছাড়িয়ে যান, সেই অগাধ অর্থের কাছে যাবেন বলেই।’ (বাংলা কবিতার কালান্তর-সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়)।
কবি মহাদেব সাহার কবিতার বিষয়, স্বরূপ, অর্থ ও শৈল্পিক রূপায়ণের আলোকে প্রাসঙ্গিকভাবে এ আলোচনা। মহাদেবের জন্ম ৫ আগস্ট, ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ (২০ শ্রাবণ, ১৩৫১ বঙ্গাব্দ)। সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে। পিতা গদাধর সাহা, মাতা বিরাজ মোহিনীর একমাত্র সন্তান। ঢাকা কলেজ, বগুড়া কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন। প্রথমে বাংলা ও পরে কিছুদিন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। লেখালেখির শুরু কৈশোরে। স্ত্রী নীলা সাহা, দুই পুত্র তীর্থ ও সৌধকে নিয়ে সংসারযাপন।
আপাদমস্তক কবি তিনি। আধুনিক বাংলা কাব্যে তিনি একটি নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি করে নিয়েছেন-বহুপ্রজ কবি হিসেবে শুধু নয়, কবিতার বিষয়, আঙ্গিক প্রকরণেও বহুমাত্রিক কবিকৃতির কারণেই। মহাদেব কবিতাবিমুখ পাঠককে ফিরিয়ে এনেছেন কবিতার ভালোবাসায়, পাঠের নিমগ্নতায়। এর কারণ পাশ্চাত্যের বহু মতবাদের দাসত্বে ও বিমূর্ততার ভেলকিবাজিতে একদা কবিতা হয়ে উঠেছিল দুর্বোধ্য জটিল কুহক। মহাদেবের কবিতার মুগ্ধ মুখরতায় পাঠক পুনর্বার মনস্ক হয়েছেন কবিতায়।’
ষাটের দশকে যেসব কবি আবির্ভূত হলেন, ‘বস্তুতই তাঁদের সম্মুখে ছিল বন্দী মুহূর্ত, অলঙ্ঘ দেয়াল, অবরুদ্ধ সমাজচেতনা ও জটিলতম সমাজ গঠন।’ (কথামালা এবং পূর্ব বাংলার কবি ও কবিতা : সৈয়দ আকরম হোসেন)। স্বরচিত কবিতা সম্পর্কে মহাদেব সাহার ভাষ্য বিনম্র, আবেগময়। সৌন্দর্যের প্রত্যাশা ও সত্যের বাণী বহনের আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। তারই এষণা এবং অন্বেষণ কবি ও কবিতার কাজ। এ সম্পর্কে মহাদেব সাহা বলেন, ‘... সাহিত্যের সৌন্দর্য আর মানবিক শ্রেয়বোধ দুটি ভিন্ন মেরুর ব্যাপার নয়। ঘৃণা কিংবা পাপবোধ থেকেও পৃথিবীতে মহৎ সাহিত্যের সৃষ্টি হয়েছে বটে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত আর্তি সে তো অপ্রেম থেকে প্রেমেই, ঘৃণা থেকে ভালোবাসায়ই, অহংকার থেকে সমর্পণেই। সারা পৃথিবীতে রচিত কবিতার মূল বিষয়বস্তু যদি একই বাক্যে প্রকাশ করতে হয়, তাহলে অনিবার্যরূপে বলতে হবে, সমস্ত কবিতার মূল বিষয় সুখের জন্য ব্যাকুলতা কিংবা আরো পরিশুদ্ধ করে বলা যাবে প্রেমের জন্য আর্তি। যদি তাই হয়, তাহলে সমগ্র সাহিত্যই তো আসলে মানবিকতার দিকেই প্রসারিত।’ (কবির দেশ ও অন্যান্য ভাবনা)। প্রাসঙ্গিকভাবে কবি শেলির বক্তব্যও মনে পড়ে poetry is the record of the best and happiest moments of the happiest and best minds.’
এ যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষও যেন মেশিন, কৃত্রিম ভালোবাসায় প্রাণহীন জড়বস্তুময়। এ দুঃসহ সময় মণিকাঞ্চনের লাভ ও লোভের সামাজিক প্রেক্ষাপট। যাপিত জীবনে স্বস্তি নেই-শান্তি-প্রশান্তি নেই ঘরে ও বাইরে। এ যেন এক প্রেমহীন-মর্মরিত অস্থির কালের যাত্রাধ্বনি। মহাদেবের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে-সেই নৈঃসঙ্গ্য বেদনার কাতর সুর- ‘ক্ষমা করো এই ব্যর্থ অক্ষম কবিকে/সে বড়ো কাতর আজ, সে যে বড়ো ভীরু,/বস্তু তাকে ক্রমশ করেছে গ্রাস, ক্ষমা করো তাকে’(ক্ষমা করো তোমার কবিকে)।
বিশ শতকের শেষ চার দশক এবং একুশ শতকের এক যুগের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের কাব্যভুবনে মহাদেব সাহার কবিতার অন্বেষণ-স্বপ্নময় নিরন্তর নিবিড় আরাধনা। তিনি বলেন, ‘এই কবিতার জন্যে আমি আপাদমস্তক ছিন্নভিন্ন এমন ফতুর/ভাঙা শিরদাঁড়া, পোড়-খাওয়া একটি মানুষ/একটি কবিতার জন্যে যীশুর মতো আমি ক্রুশবিদ্ধ/এই কবিতার জন্যে জীবনকে এখনো আমি ভালোবাসি, এতো ঘৃণা করি’ (এই কবিতার জন্যে)।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘অলৌকিক আনন্দের ভার বিধাতা যাহারে দেন/তার বক্ষে বেদনা অপার/’ এ অলৌকিক আনন্দ ভাবের আদিগন্ত বেদনা যেন কবির বুকে মেঘের পাথর হয়ে চেপে বসে থাকে যতক্ষণ না প্রকাশের নির্ভার ভাষা পায়। কবিহৃদয়ের এ স্বপ্নময়-অনুভূতি মহাদেব প্রকাশ করেছেন তার কবিতায়-‘একটি কবিতা লেখার পর কতো লক্ষ টন পাথর যে/বুক থেকে নেমে যায়/একটি কবিতা লেখার পর হঠাৎ ভালো হয়ে যায় মন/বুক জুড়িয়ে যায়-/সুখে-দুঃখে আবার বাঁচতে ইচ্ছে করে/বড়ো ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।’ (একটি কবিতা লেখার পর)
ষাটের দশকের ভাবনা-বেদনা ও জীবনবীক্ষণকে পরিণত বয়সের পরিবর্তিত মূল্যবোধে কীভাবে তিনি বিবেচনা করেছেন তার পরিচয় পাওয়া যায় তার আলোচিত ‘ষাটের দশক’ কবিতায়। ‘যেন পুরাতন প্রেম বাঁধা পড়ে যায় নব প্রেমজালে।’ নিবিড় আবেগতাড়িত কণ্ঠে মহাদেবের উচ্চারণ ‘কোথায় কেমন আছো তুমি প্রিয় ষাটের দশক/তোমার কি এখন খুবই কষ্ট, তুমি খুবই একা/দরোজায় তোমার কি শুধু দীর্ঘশ্বাস, গ্রিলে ভীষণ গোধূলি।’ (একা হয়ে যাও) ‘কবিই আমার একমাত্র পরিচয়। এর বাইরে আমার অন্য কোনো পরিচয় নেই। একজন প্রকৃত কবির জন্ম হয় কবি হিসেবেই চেষ্টা করে কবি হওয়া যায় না।’ অর্থাৎ তিনি মনে করেন, অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমে কবি হওয়া যায় না। প্রকৃত কবিরা ‘কবি’ হয়েই জন্ম গ্রহণ করেন। কবি যেন স্বয়ম্ভু, দ্বিতীয় ঈশ্বর। তিনি বলেন, ‘শৈশব, বলতে গেলে বাল্যকাল থেকেই আমি কবি। আমি প্রথম কবিতা লিখেছি সাত/আট বছর বয়সে।’ সফিকুন্নবী সামাদী সম্পাদিত/নিরিখ ডিসেম্বর ২০০৮)
কবির আত্মদর্শন ও জীবনচেতনার শৈল্পিক নির্যাস ফুল্ল হয়ে ওঠে কবিতার ভাষায়। বোধের এ পরিভাষা আরও বেশি মূর্ত হয়ে ওঠে উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পের বৈভবে। সাধারণ কথা অসাধারণের বিরামচিহ্নহীন মাত্রা পায় শৈল্পিক ব্যঞ্জনায়। যেমন মহাদেব যখন বলেন, ‘মানুষের বুকের ভেতর যতো বর্ষা ঋতু আছে। প্রকৃতিতে ততো নেই।’ ইতিহাসের বহু পাতা/বড়ো অন্ধকার/পৃথিবীর সব অভিধান এখন দুঃখিত শব্দের বিশ্বকোষ অথবা ‘দুয়ার ভেঙে দেখেছি ঘর দুয়ার ছাড়াই বন্ধ/টুকরো টুকরো দুঃখ আর টুকরো টুকরো আগুন হচ্ছে কবিতা। এই কবিতা লেখার জন্য সারাটি জীবন অনুবাদ হলো অশ্রুজল’ (শ্রেষ্ঠ কবিতা)
নিসর্গ-প্রকৃতি, প্রেম, মানুষ, দৈশিক-রাষ্ট্রিক জীবনবীক্ষা বিবিধ বিষয়ের সমকালীনতাকে মহাদেব দেখেছেন অতীত ঐতিহ্যের সিঁড়িতে পা রেখেই। নিজস্ব কাব্য ভাষায় অবলোকন করেছেন আধুনিক চেতনায়। প্রকাশ পেয়েছে অসীম আলোর বিভায়। শিল্প-সাহিত্যের প্রচল-অপ্রচল কোনো ‘মতবাদ’ বা ‘ইজম’ তাকে তাড়িত করেনি। ফলে আধুনিকমনস্ক মহাদেব ‘কঠিন কথা’ প্রকাশ করেছেন সহজ ভাষায়। এখানেই তার বিশিষ্টতা। মহাদেব সাহা রাজনীতি বা সমকাল বিমুখ নন। তার ভাষা অসম্ভব পরিশীলিত, লিরিক্যাল, কখনোই তা উচ্চকণ্ঠ নয়; মৃদু অথচ গাঢ়। মানুষের জন্য তার অপরিমেয় ভালোবাসা, মমতা। একজন নারীর জন্য এ ভালোবাসা যেমন সুরে বেজে উঠতে পারে, তেমন আহত স্বদেশের জন্য, আবুল হাসানের গীতলতা এবং চিত্রলতা আছে তার কবিতায়। (কথা ও কবিতা : আবু হেনা মোস্তফা কামাল)।
ঐতিহ্যে আস্থাশীল, মানবিকতা, স্বদেশ, রাজনীতিসচেতনতা, প্রেমময়তা প্রকৃতি ও মানুষ, আনন্দ, মৃত্যু, অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তবুদ্ধি, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিষয় আশ্রিত মহাদেবের কবিতা। প্রকৃতির উপমায়-অনুষঙ্গে তার কাছে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে আরও বেশি ভালোবাসার প্রিয় মানুষ-‘কোনো গোলাপের বুকে এতো কোমলতা আমি/কখনো দেখিনি, যা এই দেখেছি আমি চিরদিন মানুষের বুকে/তৃষ্ণার আগুনে স্বর্ণোৎসব : মধুগন্ধে ভরা/মানুষের হৃদয়ের মতো কোনো এমন সবুজ তৃণ/তৃণক্ষেত্র ফোটেনি কখনো/সুখে-দুঃখে তাই বার বার ফিরে যাই মানুষের কাছে।’ (কাব্যসমগ্র/১)। আবার এ মানুষের অসভ্য আচরণে তার খুব মন খারাপ হয়ে যায়। ক্ষোভে-দুঃখে, বেদনায়-অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নেন মানুষের আলোছায়ার প্রশ্রয় থেকে। তার বেদনার্ত কণ্ঠে ধ্বনিত হয় অন্যস্বর-‘এখন মানুষ দেখে আমার/কোনো কোনো জন্তু ও পশুর কথা মনে আসে/তাদের ধারালো নখ স্বভাবের মধ্যে লুকানো বন্দুক/আমাকে ভীষণ সন্ত্রস্ত করে/’ (মানুষ বদলে গেছে) মহাদেব সাহা প্রেমের কবি। কিন্তু তার প্রেমের স্বরূপ বহুমাত্রিক-বহুস্তর অনুগামী-বহুমুখী। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছেন, অনবরত অসংখ্য কবিতা লেখার মধ্যে তিনি প্রেমের কবিতাই বেশি লিখেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রেমে পড়ে আমার এ কবিতা লেখা নয়। নিজেকে ভালোবাসার জন্যে তৈরি করছিলাম, সুতরাং সেটা আজকের নয়, বহুযুগের ওপার থেকে আসা।’ (বাংলাবাজার পত্রিকা ৯ আগস্ট, ১৯৯৯)।
‘শিল্প আর নারী তৃষ্ণা উভয়েই সমান/... যে-কোনো নারীর জন্যে আরো বহু দীর্ঘরাত আরো একজন্ম/আমি জেগে থাকবো, বেড়াবো/অবসাদে এতটুকু পা-ও টলবে না/’ (আরো একজন্ম পরে)। এ প্রসঙ্গে আরও অসংখ্য উজ্জ্বল উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ‘আরও এককোটি বছর এমনি নারীর মুখের দিকে/চেয়ে কেটে যাবে, নারীমন্ত্র ছাড়া আমি আর অন্য কোনো মন্ত্র জানি না/... নারীমন্ত্র নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে বেজে যায়।’ (নারী খোর)।
ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ বাংলা ও বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামের উজ্জ্বল ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশকে একই প্রচ্ছদে দেখেছেন কবি মহাদেব সাহা। ১৫ আগস্টের শোক দিবসে বিষণ্ন বিষাদে ভেঙে পড়েছে কবির হৃদয়। তিনি লেখেন, ‘কাঁদে দেশ এই খানে নির্জন সমাধির পাশে/এখানে এই সবুজ নিভৃত গ্রামে, মাটির হৃদয়ে/... ঘুমায় একটি দেশ, জ্যোতির্ময় একটি মানুষ’ (আমার মুজিব) অথবা, অন্য একটি কবিতার দৃষ্টান্ত ‘চোখে কত জল রাখি, বাংলা তাই বর্ষার আকাশ/আগস্ট বিষাদ কাব্য অশ্রুভেজা এই বর্ষামাস/বিষণ্ন পাখিরা দেখো কেবল দুঃখের কথা বলে’ (আগস্ট বিষাদ কাব্য/অন্ধের আঙুলে এত জাদু)। এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়-‘আর কোনো শব্দই আমি শুনবোনা কেবল তোমার প্রিয় কণ্ঠস্বর ছাড়া’ (তোমার পায়ের শব্দ)।
কবি মহাদেব সাহা ‘এই গৃহ এই সন্ন্যাস’ (১৯৭২) থেকে শুরু করে (২০২৪) একুশের বইমেলায় ‘লাজুক পদ্য’ (মাওলা ব্রাদার্স), ‘আমার সুখ দুঃখের পৃথিবী’ (অনন্যা)সহ তার ৮৪টি কাব্যগ্রন্থ-সাত খণ্ডে কাব্যসমগ্র, তিন খণ্ডে গদ্যসমগ্র, আটটি শিশুকিশোর গ্রন্থ, দুটি ভ্রমণের বই, ‘যেখানে ফুল ছিল না গন্ধ ছিল’ একটি গল্পের বই, ৫ শতাধিক গান নিয়ে ‘আমার গান’ শিরোনামে দুই খণ্ডে গানের বই এবং বহুল আলোচিত ‘আনন্দের মৃত্যু নেই’ (প্রবন্ধ, বাংলা একাডেমি), মুজিবসমগ্র (বিভাস), শ্রেষ্ঠ কবিতা (মাওলা ব্রাদার্স), ‘শিশুদের কবিতাসমগ্র’ (পারুল প্রকাশনী) বাংলা সাহিত্যে এক অসামান্য সংযোজন।
‘মহাদেব সাহার কবিতা সামগ্রিক অর্থেই ‘কবিতা’। তার কবিতা আঙ্গিকে যেমন, প্রকাশেও তেমন তার শৈল্পিক বিস্তার। দৈশিক-বৈশ্বিক, সুস্থ-সুন্দর-শিল্পিত জীবনের আকাঙ্ক্ষার দায়ভার গ্রহণের শর্তেও নিপুণ তার কবিতা। মহাদেবের কবিতার ক্যানভাস সুবিশাল, বিষয়বৈচিত্র্যেও বহুমুখী। হুমায়ুন আজাদ কথিত বিষয়বৈচিত্র্যে মহাদেব সাহার কবিতাও ঋদ্ধ (কবিও কবিতার সংগ্রাম) বর্তমান ও অনাগত কালের পাঠক এবং প্রিয়জনদের প্রতি মহাদেবের বিনয়ী প্রার্থনা-‘মনে রেখো ব্যথিত কবির মুখ/তাঁর অশ্রু, তার সংবেদনা/পারো যদি তাকে দিও বিষণ্ন বকুল/ঝরা ফুল সে-খুব কবির কাছে প্রিয়।’ (কবির প্রার্থনা)। ও বরেণ্য এ কবির ৮১তম জন্ম দিনে তার দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কমনা করে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
সহায়ক গ্রন্থসূচি
১. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়-রূপ, রস ও সুন্দর-নন্দতত্ত্বের ভূমিকা
২. হোর্হে লুইস বোর্হেসের ‘কবিতার কারখানা’। অনুবাদ : অপূর্ব জামান
৩. সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাংলা কবিতার কালান্তর
৪. মানবর্দ্ধন পাল-মহাদেব সাহা : কবির আঙুলে কত জাদু
৫. হুমায়ুন আজাদ-কবি মহাদেব সাহার পঞ্চাশ বছর পূর্তি স্মরণিকা-১৯৯৪
৬. কথা ও কবিতা-আবু হেনা মোস্তফা কামাল