ড. রাশিদ আসকারী
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৪ ১৩:০৭ পিএম
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৪ ১৪:৩৪ পিএম
উত্তর-ঔপনিবেশিকতা হালের সাহিত্য সমালোচনার জগতে এক মৌল শব্দ। এটি একটি বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি, যার মাধ্যমে আমরা ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে রচিত সাহিত্য বা বিভিন্ন উত্তর-ঔপনিবেশিক সংকট অধ্যয়ন করতে পারি। এসবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু সীমাবদ্ধ নয়, পরিচয় সংকট, সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধার, ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং তার প্রতিরোধ। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনা ক্ষমতা-সম্পর্কের আলোকে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব বিষয়ে অনুপুঙ্খ তদন্ত করে। এ সমালোচনাধারা উত্তর-ঔপনিবেশিক বাইনারি হিসেবে ‘অন্য (Other)’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত আখ্যানগুলো তুলে ধরে এবং উপনিবেশের দ্বারা উপেক্ষিত মানুষ সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা, প্রভৃতির সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনার প্রতি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য সমালোচনা ১৯৯০-এর দশকে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে উদ্ভূত হয় এবং প্রখ্যাত সমালোচক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের ‘ইন আদার ওয়ার্ল্ডস’ (১৯৮৭), বিল অ্যাশক্রফ্টের ‘দি এম্পায়ার রাইটস ব্যাক’ (১৯৮৯), হোমি কে. ভাভার ‘নেশন অ্যান্ড ন্যারেশন’ (১৯৯০) এবং এডওয়ার্ড সাইদের ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (১৯৭৮) ও ‘কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম’ (১৯৯৩)সহ বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী কাজের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
তবে উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনার মূলমন্ত্র ফরাসি আফ্রো-ক্যারিবীয় মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক-দার্শনিক ফ্রানৎস ফানোঁর ‘দ্য রেচেড অব দি আর্থ’ (১৯৬১) এবং ইতালীয় কমিউনিস্ট চিন্তাবিদ ও কর্মী আন্তোনিও গ্রামশির ‘দ্য প্রিজন নোটবুকস’ (১৯৪৮)-এর মধ্যে পাওয়া যায়। গ্রামশিকে হেজিমনির ধারণার জনকও বলা যেতে পারে, যা মূলত এক রাষ্ট্রের ওপর অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আধিপত্যের নগ্ন প্রকাশ এবং ঔপনিবেশিক দাসত্বের সব চিহ্ন বহন করে। ফানোঁর রচনা ফ্রান্সের আফ্রিকান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ‘সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলার কথা বলে। ফানোঁ দাবি করেন, উপনিবেশিত জনগণকে সাংস্কৃতিক/রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর এবং আত্মপরিচয় খুঁজে পেতে তাদের নিজস্ব অতীত পুনরুদ্ধার করতে হবে। ইউরোপীয় উপনিবেশকারীরা তাদের শাসিত দেশগুলোর ইতিহাসকে অবমূল্যায়ন এবং উপনিবেশপূর্ব সময়কে আদিম/অস্তিত্বহীন/অন্ধকার যুগ হিসেবে চিত্রিত করত। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা এ মানসিকতা শক্তিশালী করার জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রণীত হয়েছিল এবং তাদের শেখানো হয়েছিল যে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সামাজিক অগ্রগতি অ-ইউরোপীয় বিশ্বে ইউরোপীয়দের আগমনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। ফরাসিরা একে The mission civilisatrice, পর্তুগিজরা Missão civilizadora এবং ব্রিটিশরা রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের ভাষ্যে The White Man’s Burden বলেন। কিন্তু তা ছিল স্থানীয় জনগণের পাশ্চাত্যীকরণের মাধ্যমে সভ্যতা বিস্তারের একটি আদর্শগত প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতিপত্র।
অতীত পুনরুদ্ধার হলো উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রথম ধাপ এবং পরবর্তী ধাপ সেই ঔপনিবেশিক মতবাদ অস্বীকার করা যা উপনিবেশের অতীতকে এতকাল পরিকল্পিতভাবে অবমূল্যায়ন করেছে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো এর মাধ্যমে উদার মানবতাবাদী সমালোচক কর্তৃক মহৎ সাহিত্যের চিরস্থায়ী গুরুত্বের দাবি চ্যালেঞ্জ করা। উত্তর-ঔপনিবেশিক সমালোচনা এ সর্বজনীনতাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং প্রমাণ করে যে এ ধরনের ‘সর্বজনীনতা’ প্রায়ই ইউরোপকেন্দ্রিক আদর্শ প্রচার এবং অ-ইউরোপীয়দের, বিশেষভাবে আফ্রো-এশীয়দের প্রান্তিকীকরণ করে। উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য সমালোচনা প্রায়ই সাহিত্যিক গ্রন্থগুলোয় উপনিবেশকারী এবং উপনিবেশিতদের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়া পরীক্ষা করে এবং গ্রন্থবিশেষ ঔপনিবেশিক আদর্শ সমর্থন না প্রত্যাখ্যান করে, তা বিশ্লেষণ করে।
রবীন্দ্রনাথ ও উত্তর-ঔপনিবেশিকতা
বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) কেবল ভারতে নয়, সমগ্র বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রেরণার একটি সাহিত্যিক/ সমালোচনামূলক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। ১৯২৭ সালে বিখ্যাত ফরাসি বুদ্ধিজীবী এবং ঔপন্যাসিক অঁরি বারবুস তাঁকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি পিটিশনে স্বাক্ষরের জন্য চিঠি লিখেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ এতে স্বাক্ষর করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে গোর্কি, রোমাঁ রোলাঁ, বারবুস প্রমুখের উদ্যোগে ফ্যাসিবাদ থেকে সংস্কৃতি রক্ষা করার জন্য একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর সমর্থনে ভারতীয় চিন্তাবিদদের দ্বারা একটি ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়েছিল, যেখানে রবীন্দ্রনাথ, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, মুনশি প্রেমচাঁদ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, নন্দলাল বসুসহ অন্যরা স্বাক্ষর করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দর্শনের হদিস অন্বেষণ মুখমণ্ডলে নাসিকার অবস্থানের মতো সহজ নয়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের সমর্থক ছিলেন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অনেক কিছুর বিরোধিতা করেছিলেন, তবে তা তার নিজের মতো করে। আর দশজন জাতীয়তাবাদীর মতো নয়। হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র মামলা এবং বিভিন্ন পরবর্তী ঘটনাবলি থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ কেবল গদর ষড়যন্ত্র (গদর বিদ্রোহ নামে পরিচিত এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে একটি সর্বভারতীয় বিদ্রোহ শুরু করার পরিকল্পনা) সম্পর্কে জানতেনই না, এ আন্দোলনে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রী তেরৌচি মাসাতাকে এবং ওকুমা শিগেনোবুর সাহায্য চেয়েছিলেন। এ বিদ্রোহ ব্যর্থ হয় এবং লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় ৪২ জন বিদ্রোহীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, এ বিদ্রোহে ঘোরতর ক্রুদ্ধ ব্রিটিশরাজ ১৯১৯ সালে কুখ্যাত রাওলাট অ্যাক্ট পাস করে যেকোনো ব্যক্তিকে যেকোনো সময় কারণ প্রদর্শন ছাড়াই গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা পুলিশকে প্রদান করে। এ কালো আইনের প্রতিবাদে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে অনুষ্ঠিত এক বিশাল সমাবেশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ার ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মির গুর্খা ও শিখ পদাতিক রেজিমেন্টের সেনাদের দিয়ে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। সেনারা অ্যামুনিশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্দেশ মানতে থাকে। সহস্র মানুষের মৃত্যু হয় এবং সহস্রাধিক আহত হয়। এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ‘নাইটহুড’ ত্যাগ করেন। তৎকালীন ভারতের ভাইসরয় এবং গভর্নর জেনারেল লর্ড চেমসফোর্ডের কাছে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আমার প্রতিবাদ আমার ভীত-সন্ত্রস্ত স্বদেশবাসীর যন্ত্রণার প্রকাশ।’ (My protest is an expression of the anguish of my terrified countrymen)।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার কবিতা ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ এবং গান ‘একলা চলো রে’ সাধারণ মানুষের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘একলা চলো রে’ গানটি মহাত্মা গান্ধীর বিশেষ প্রিয় ছিল। ভিয়েতনামি যুবকরা তাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে তার লেখা থেকে প্রেরণা পেয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে তাকে স্মরণ করতেন।
যদিও রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের প্রধান মোটিফগুলো হলো প্রকৃতি, ভক্তি, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, রহস্যবাদ, জাতীয়তাবাদ। তার অনেক লেখা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার সূক্ষ্ম দুর্বলতাগুলো অনুসন্ধান করে। তার দুটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘ঘরে বাইরে’ এবং ‘চার অধ্যায়’ এবং নাটক ‘রক্তকরবী’সহ আরও অনেক সাহিত্যকর্মে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি বিতৃষ্ণা প্রকাশ পেয়েছে। ঘরে বাইরে (১৯১৬) এবং চার অধ্যায় (১৯৩৪) উপন্যাস দুটি ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রচিত। উপন্যাস দুটির প্রধান চরিত্রগুলো ঘরে বাইরের নিখিল, বিমলা, সন্দীপ এবং চার অধ্যায়ের ইন্দ্রনাথ, এলা, অতীনÑ তাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নিজ নিজ রূপ মূর্ত করে তোলে। এভাবে রবীন্দ্রনাথ ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের কদর্য রূপ, প্রধান চরিত্রদের দ্বারা আধিপত্যবাদ প্রত্যাখ্যান এবং আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার অন্বেষণের বিষয়গুলো সুনিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন। ঔপনিবেশিক শাসনের কদর্যতা নিরূপণ এবং তার বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধের উপায়গুলো প্রচলিত উত্তর-ঔপনিবেশিকতা অনুশাসিত নয়। বরং এটি একটি অনন্য রাবীন্দ্রিক বি-ঔপনিবেশিকায়ন পদ্ধতি। এটি ‘মনের উপনিবেশ মুক্তকরণ’ স্ব-আলোকিতকরণ এবং স্ব-ক্ষমতায়ন যা সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্জন সাপেক্ষ, সম্মিলিত সহিংসতা কিংবা প্রতিহিংসার মাধ্যমে নয়। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বস্তুনিষ্ঠ সমালোচক ছিলেন এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অন্ধ বিপ্লব সমর্থন করেননি। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তিনি জনগণের আত্মনির্ভরতা এবং বৌদ্ধিক বিকাশের ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
এটি কিছুটা Ngugi wa Thiong’o-এর Decolonizing the Mind-এর মতো, যা সাম্রাজ্যবাদের ঐতিহাসিক ভ্রান্ত প্রচারণা থেকে আফ্রিকাকে মুক্ত করার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হতে মানুষকে উত্সাহিত করার এক শক্তিশালী আহ্বান। বিষয়টি আফ্রিকা মহাদেশ এবং তার জনগণের স্থিতিশীলতা, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি এবং সংকল্পের শক্তির ওপর জোর দেয়। রবীন্দ্রনাথের অনেক কাজ ইউরোকেন্দ্রিক এবং জাতীয়তাকেন্দ্রিক ন্যারেটিভকেও চ্যালেঞ্জ করে যা দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় কণ্ঠ এবং অভিজ্ঞতাকে চাপা রেখেছে। রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথা হলো ভারতীয় ইতিহাস উপনিবেশমুক্ত করার জন্য তার দৃঢ় আহ্বান, ক্ষতিকর রটনাগুলোর মুখোশ উন্মোচন এবং উপমহাদেশ সম্পর্কে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি রচনা।
নাটক রক্তকরবী ১৯২৩ ও ১৯২৪ সালের মধ্যে রচিত এবং ১৯২৬ সালে ভারতের তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় প্রকাশিত হয়। এটি একটি মিথ ব্যবহার করে একটি জাতির বিনির্মাণের ধারণা পুনর্গঠন করে এবং এর পাঠক/দর্শকের মধ্যে ঔপনিবেশিকতার কুফলগুলো প্রকাশ করে। যা ভারতীয়দের চোখে অস্পষ্ট ছিল। কীভাবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ঔপনিবেশিক প্রভুদের স্বার্থ সংরক্ষণের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল, এটি তার সমালোচনা করে। নাটকটি রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, ‘অধিকারলিপ্সু সমাজের কবলে আধুনিক মানুষের ভয়াবহ দ্বিধা নিয়ে আলোচনা করে।’ (The play deals with the frightful dilemma of the modern man in the grip of an acquisitive society). রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের প্রাধিকার, শনাক্তকরণ এবং অ-পশ্চিমী মানুষের বিশাল বিশ্বকে, যাকে বলা যেতে পারে অন্য, ব্যাখ্যা করার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার সমালোচনা করেন। রক্তকরবী ভারতীয় মানুষের এ ‘অন্যত্বে’র গভীরে প্রবেশ করে এবং তা বিমোচনের পথ দেখায়। নাটকটি ইউরোপীয় উপনিবেশিকতার এজেন্সিগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিদেরও অনুসন্ধান এবং সমালোচনা করে। এ নাটকে অধ্যাপক চরিত্রটি চিত্রিত করে রবীন্দ্রনাথ প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, পশ্চিমা শিক্ষার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য ভারতীয়দের আত্মপরিচয় কেড়ে নেবে এবং মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবে।
রবীন্দ্রনাথের কবিতা সংকলন যেমন ‘মানসী’ (১৮৯০), ‘চিত্রা’ (১৮৯৬), ‘কণিকা’ (১৮৯৯), ‘কথা’, ‘কাহিনী’, ‘কল্পনা’, ‘ক্ষণিকা’ (১৯০০) এবং ‘নৈবেদ্য’ (১৯০১)-এর মধ্যে বহু রাজনীতি-সচেতন কবিতা রয়েছে যা কবির শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ ভারত বিনির্মাণের প্রত্যয় প্রকাশ করে। কবিতাগুলো কল্পনার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক আধিপত্য প্রত্যাখ্যানের ক্লাসিক উদাহরণ হিসেবে পড়া যেতে পারে, যা এডওয়ার্ড সাইদের উপনিবেশিকতাবাদবিরোধী তাত্ত্বিক ভিত্তির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বস্তুত উপনিবেশিকতা ছিল পুঁজিবাদী ইংল্যান্ড এবং ইউরোপের জন্য একটি লাভজনক উদ্যোগ, এবং রবীন্দ্রনাথের কবিতায় পুঁজিবাদ প্রত্যাখ্যানের অর্থ উপনিবেশিকতা প্রত্যাখ্যান। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প সংকলন ‘গল্পগুচ্ছ ১’ (১৯০০) এবং ‘গল্পগুচ্ছ ২’ (১৯০১)-এ সংকলিত এবং ১৮৯১ সালে গ্রামীণ বাংলায় পরিভ্রমণ শুরু করার পর থেকে রচিত গল্পগুলো তার উপনিবেশিকতাবিরোধী মনোভাব প্রকাশ করে।
রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধে প্রত্যক্ষভাবেই রাজনৈতিক। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি রাজনৈতিক প্রবন্ধ ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’ এবং ‘সাম্রাজ্যবাদ’ মৌলিক ঔপনিবেশিকতাবিরোধী চিন্তাধারার সাক্ষ্য দেয়। ১৯০৫ সালের দিকে বঙ্গ ও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সময় এক বৃহত্তর সংকলনের অংশ হিসেবে প্রকাশিত এ প্রবন্ধগুলো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক রাজনীতি এবং ভণ্ডামিপূর্ণ নীতির কঠোর সমালোচনা করে। ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের নীতির, যা দৃশ্যত প্রশাসনিক সুবিধার একটি পদক্ষেপ হলেও বাস্তবে একটি সাম্প্রদায়িক বিভাজন কৌশল, প্রতি সংক্ষুব্ধ হয়ে বঙ্গের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন একটি বিশাল গণআন্দোলনে পরিণত হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন। তা ছাড়া গণবক্তৃতা এবং প্রবন্ধের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ উপনিবেশিকতার একটি বিস্তৃত সমালোচনা শুরু করেছিলেন; এর আইনি, প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, এবং এর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মূল্যবোধের ত্রুটিগুলো উন্মোচন করেছিলেন।
তিনি ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধ রচনা করেন ৮০ বছর বয়সে, জীবনের শেষ দিকে। এটি ছিল সমগ্র বিশ্বের জন্য এক অশান্ত সময়। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপকে ধ্বংস করেছে, অন্যদিকে ভারতে সত্যাগ্রহ আন্দোলন দানা বাঁধছে। এ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে রবীন্দ্রনাথ ভারতের ওপর ব্রিটিশ দখলদারির কারণে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলোর কার্যকারণ নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তিনি লেখেন, ঔপনিবেশিক শাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষ ভেবেছিল যে বিজ্ঞান, আধুনিক শিক্ষা এবং উন্নত প্রশাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে ভারতবর্ষের সামাজিক জীবনে প্রভূত কল্যাণসাধন হবে। কিন্তু এমন বিশ্বাস অচিরেই ভেঙে যায়। রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের সমালোচনা করেন উন্নত প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনে ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার বঞ্চিত করার জন্য, যা তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে পারত বলে তিনি একদা গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তার মতে ইরান, রাশিয়া, জাপান এবং তুরস্ক আধুনিকায়ন এবং উন্নয়নের দিকে এগিয়ে গেলেও ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষ উপনিবেশিকতার দীর্ঘ অন্ধকারের নিচে চাপা পড়ে ছিল। তবু সভ্যতার সংকট প্রবন্ধটি একটি আশাবাদী নোট দিয়ে শেষ হয়। যদিও বহিঃস্থ শাসকমহলের দ্বারা ভারতীয় সমাজের অগ্রগতি বারবার ব্যাহত হয়েছে, তদুপরি রবীন্দ্রনাথ জনগণের আত্মবিশ্বাস এবং বিবেচনাবোধের ওপর আস্থা হারাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম জাতীয় সভ্যতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রভাবিত হবে।
উপনিবেশবিরোধী সাহিত্য/সমালোচনা সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান থাকা সত্ত্বেও একজন উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখক এবং বিউপনিবেশায়ন তাত্ত্বিক/সমালোচক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা উত্তর-ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং বিউপনিবেশায়ন অধ্যয়নকারী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আজও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি।
লেখক : বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, দ্বিভাষিক লেখক, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক এবং প্রাক্তন উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া