× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইসমায়েল কাদারে

মৃত সেনাদের ‘ জেনারেল’

আমিরুল আবেদিন আকাশ

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৪ ১৫:০২ পিএম

ইসমায়েল কাদারে, ২৮ জানুয়ারি ১৯২৬-১ জুলাই ২০২৪

ইসমায়েল কাদারে, ২৮ জানুয়ারি ১৯২৬-১ জুলাই ২০২৪

১ জুলাই আলবেনিয়ায় কবি, নাট্যকার ও কথাসাহিত্যিক ইসমায়েল কাদারে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। দীর্ঘদিন স্বৈরশাসনের রাহুগ্রাসে থাকা ইউরোপের দরিদ্রতম এবং ক্ষুদ্র একটি দেশ আলবেনিয়া। সংকটময় এ দেশেরে প্রধানতম সাহিত্যিকের লেখার প্রতি সারাবিশ্বের পাঠকের রয়েছে অপার কৌতূহল। বাংলা ভাষাভাষি অধিকাংশ পাঠকের কাছে তিনি ‘পিরামিড’ বইটির জন্য সম্প্রতি বেশ জনপ্রিয়তা পেলেও তার আরও বই রয়েছে। কবি বলে নিজেকে অভিহিত করলেও তিনি কথাসাহিত্যিক হিসেবেই গুরুত্ব পেয়ে থাকেন বেশি। তার উপন্যাসের তালিকাও দীর্ঘ। অধিকাংশ উপন্যাস ৫০০ পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে যায়। মজার বিষয়, পিরামিডকে তার সবচেয়ে জনপ্রিয় বই বললেও ইসমায়েল কাদারের আরও বেশ কয়েকটি বই বাংলায় অনুবাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ‘মৃত সেনাদের ‘জেনারেল’ বা জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মি বইটিও রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ২০ বছর পর ইতালীয় এক জেনারেল এক সামরিক যাজককে সঙ্গী করে আলবেনিয়ায় এসে পৌঁছান। এক অদ্ভুত বিষণ্ন বৃষ্টিময় দিনে জেনারেলের আগমন। তার কাজ আলবেনিয়ায় যুদ্ধে নিহত সেনাদের মরদেহের অবশেষ উদ্ধার করে নিয়ে আসা। আলবেনিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল এবং বিষণ্ন আবহাওয়ায় জেনারেলের আগমনের মুহূর্ত ঠিক বিষণ্ন হলেও আনন্দের।

উপন্যাসের শুরুতে কাদারে এমন এক বর্ণনার আশ্রয় নেন যেন ট্রাম্পেট বেজে উঠছে। উপন্যাসটির প্রারম্ভ থেকেই চোখ আটকে যায়। জেনারেল আলবেনিয়ায় নামার আগ পর্যন্ত জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকেন বিশাল উপত্যকার দিকে। যেকোনো সময় মেঘের আড়াল থেকে পাহাড়ের ডগা প্লেনের পেট চিড়ে দিতে পারে। কেমন ভূতুড়ে এক আবহ। ইংরেজিতে জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মি বললেই মনে হয় ভূতুড়ে কোনো গল্প আসছে। জেনারেলের আসার সময়ের এ দায়িত্ব মহান। আলবেনিয়ার বিমানবন্দরে তার আগমনের পর তুষার আর বৃষ্টির স্যাঁতসেঁতে আবহতেও ট্রাম্পেট যেন বেজে ওঠে; অন্তত কাদারের বর্ণনা যেন তা-ই বলে। যখন তিনি বলেনÑ

আলবেনিয়ার মাটির গভীরে সমাধিস্থ হাজারো যোদ্ধার দেহাবশেষ কত বছর যেন তারই আগমনের অপেক্ষায় ছিল। জেনারেল অবশেষে এসেছেন, তার আগমন ত্রাণকর্তা যিশুর মতো; সঙ্গে যোদ্ধাদের দীর্ঘ তালিকা আর নিদর্শনসংবলিত নির্ভুল মানচিত্র। মাটির গভীর থেকে তিনি তাদের উদ্ধার করবেন, বহুদূরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেবেন সামান্য যা রয়েছে। আজ থেকে ২০ বছর আগেই অন্য জেনারেলরা এ সেনাদের ভুল নির্দেশনায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু জেনারেল তো তা করতে আসেননি। মৃত্যুর পর বিস্মরণের থাবা থেকে উদ্ধার করতে এসেছেন তিনি। একের পর এক সমাধিক্ষেত্রে তার অভিযান, একদিন যারা আচমকা হারিয়ে গেছেন, তাদের খুঁজে বের করবেন তিনি।…

জেনারেল যে অসম্ভব প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলেন তা আগামী কয়েক বছরে পর্বতের নিচে চাপা পড়ে যাবে। কাদারে এ উপন্যাসে এক ভয়াবহ বাস্তবতা তুলে ধরেন। কাদারেকে বোঝার জন্য তার প্রথম এ উপন্যাসটিকেই বেছে নেওয়া। কাদারে যেন বলতে চেয়েছেন, যুদ্ধ প্রবহমান। এ লেখার মাধ্যমে কাদারে নিজে হয়ে ওঠেন একজন সেনাপতি। যেন জানাতে চান তিনি, যুদ্ধ চলতেই থাকে। আলবেনিয়া এমন একটি দেশ যার দখল কারও নয়। তার পরও এ দেশটি যেন ইউরোপের সবার। ঐতিহাসিকভাবে আলবেনিয়ার ওপর বিদেশিরা বহুবার অভিযান চালিয়েছে। হিটলারের শাসনামলে ইতালির মুসোলিনি আলবেনিয়ায় সামরিক অভিযান চালান। হিটলারেরও আগে আলবেনিয়া অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার পরও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেও আলবেনিয়া শক্ত অর্থনৈতিক ভিত গড়তে পারেনি। আলবেনিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস স্বাধীনতার পরবর্তীতে তাদের ঐতিহাসিক ‘আয়রন কার্টেন’ বা লৌহপর্দার প্রভাব ছিল। কাদারের এ উপন্যাসে তা এতটা স্পষ্ট উঠে আসেনি। তবে পরবর্তীতে জেনারেলের চরিত্র বিশ্লেষণে তা বহু অংশেই উঠে আসে। বিশেষত জেনারেল এবং তার সঙ্গে থাকা যাজকের এক অংশে, আলবেনিয়ানদের যুদ্ধপ্রিয়তার প্রসঙ্গ উঠে আসে। আলবেনিয়ানরা যুদ্ধপ্রিয়। তাদের কাছে যুদ্ধ একটা ভেনডেটা বা সাংস্কৃতিক প্রথা। কিন্তু সেই আলোচনার সময় জেনারেলদের কর্মী আলবেনিয়ান রোডমেন্ডার প্রতিবাদ করেই বলে, ‘আপনারা বিদেশিরা এখানে আসেন। তারপর আমাদের নিয়ে অনেক যত্ন নিয়ে গবেষণা করলেও এ কথাটিই সত্য প্রমাণ করতে চান।’ ঠিক এখানেই কাদারের প্রতিবাদ।

জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মির জেনারেল আড়াই বছরের এ অভিযানে ২০ বছর আগের যুদ্ধের সংকীর্ণতা স্পষ্ট অনুভব করেন। কিন্তু এ অনুভবের যাত্রা তার জন্য আনন্দদায়ক ছিল না। জেনারেল প্রবেশ করেছিলেন ট্রাম্পেট বাজিয়ে। কিন্তু এ ক্লান্তিকর যাত্রায় অসংখ্য অনুভূতি তাকে জানায়, যুদ্ধ শেষ হয়নি। কারণ মানুষের অনুভূতি কিংবা সামরিক ব্যবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরও গাঢ় অন্ধকার। জেনারেল যত মহৎ কাজেই ইতালিতে আসুক না কেন, তাকে কেউ স্বাগত জানায়নি। তবে কেউ তাকে সেজন্য কিছু বলেওনি। যুদ্ধে মৃতদের প্রতি আলবেনিয়ানরা অসম্মান দেখায়নি। অনেক সময় অনেক সেনার কবর তারা চিহ্নিত করেও রেখেছে। কিন্তু অতীতের সেই ক্ষোভ মেটেনি। জেনারেল এবং যাজকের নাম আমরা জানতে পারি না। এ দূরত্ব কাদারে গোটা উপন্যাসেই ধরে রেখেছেন।

জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মিতে বেশ কয়েকটি বিষয়কে ইসমায়েল কাদারে যুক্ত করেছেন। আমরা দেখি, জেনারেল তার এ ক্লান্তিকর, নোংরা সফরে একসময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তার মনে হয় তিনি যাদের দেহাবশেষ সংগ্রহ করছেন তারা সবাই এখন তার অধীন সেনা। এ সেনাদের নিয়ে তিনি আলবেনিয়ায় পরাজয়ের যুদ্ধগুলো জিততে পারবেন। শুধু আলবেনিয়া কেন, তিনি চাইলে বিশ্বের বড় যুদ্ধও জিততে পারেন। জেনারেলের এ সামরিক প্রবণতা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, সামরিক সংস্কৃতি এমনই। আর এ সামরিক সংস্কৃতিই যোদ্ধাদের আগ্রাসি করে তোলে। পৃথিবীর অনেক প্রান্তে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা আত্মহত্যা করে। এমন দিক তো আছেই। কাদারের এ উপন্যাসে পাঠক আহামরি কিছু পাবেন এমন না। মনে হবে কিছুই যেন নেই। কিন্তু জেনারেলের এ মানসিক পরিণতি এবং তার ট্রাম্পেট বাজানোর আবহের মন কীভাবে যেন বদলে যায়। যুদ্ধ, সামরিক সংস্কৃতি তার দায়িত্ব শেষ করলেও অতীত ভুতের মতো, মৃতের মতো ঘাড়ে চেপে বসে ঠিক সামরিক বাহিনীর ওপরই।

জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মির গল্প মানবিকও। জেনারেলদের দল ঠিকই মাটির গভীর থেকে সামরিক সদস্যদের বের করে আনে। কিন্তু কাজটি কি সহজ? অথচ যুদ্ধের ময়দানে নিজ সামরিক বাহিনীর এক বন্ধুকেই কবর দিতে বেয়নেট বা হাতের ছোট ছুরি ব্যবহার করেছে অনেক সেনা। এত কঠিন কাজ, প্রিয় বন্ধু যেন অন্তত শেয়ালের খাবার না হয়। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল, অনেক ইতালীয় সেনা দলছুট হয়ে আলবেনিয়ান কৃষকের খামারে কাজ নেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবচেয়ে অদ্ভুত এক পরিণতিও এখানে। নিজের প্রথম উপন্যাসে কাদারে যে নাটকীয়তা, লেখার বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেছেন তা অদ্ভুত, কিন্তু এক চৌকশ লেখকের প্রমাণ। ২৫০ পৃষ্ঠার এ উপন্যাসেই এক মহৎ ঔপন্যাসিকের যাত্রা হয়েছিল। চলতি মাসেই সে যাত্রা থেমেছে। ভাগ্যিস, ম্যান বুকার পুরস্কারটি পেয়েছিলেন। তাই আজ এ লেখককে আমরা জানতে পেরেছি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা