× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাবার বাবার গল্প

শান্তা মারিয়া

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৪ ১৪:৩৩ পিএম

বাবার বাবার গল্প

পঞ্চাশের দশক। পূর্ব পাকিস্তান। পুলিশ এসেছে ৭৯ বেগমবাজারের বাড়িতে। জ্ঞানতাপস বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র কাছে বলা হলো আপনার ছেলে দেশদ্রোহী। সে কমিউনিস্ট। সে কখনও জেল থেকে ছাড়া পাবে না। তাকে মুচলেকা দিতে বলুন, তার সহযোগী কমিউনিস্টদের নাম বলতে বলুন। তাহলে আপনার ছেলে মুক্তি পাবেন। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে শহীদুল্লাহ্ বললেন, ‘আমার ছেলে দেশদ্রোহী নয়। সেটা হলে তাকে আমি নিজে হাতে গুলি করতাম। আমার ছেলে দেশপ্রেমিক। সে মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে। তাকে আমি নতি স্বীকারের কথা বলতে পারব না।’ ঘটনাটির উল্লেখ রয়েছে শহীদুল্লাহ্‌র পুত্র কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহর আত্মস্মৃতিমূলক ‘পলাতক জীবনের বাঁকে বাঁকে’ গ্রন্থে।

ব্যক্তিজীবনে প্রবল ধর্মনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কতখানি প্রগতিশীল ও মুক্তবুদ্ধির মানুষ হলে এমন উত্তর দেওয়া সম্ভব। পঞ্চাশের দশকে এ দেশের বামপন্থি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সৈনিক কমরেড তকীয়ূল্লাহ তার স্মৃতিচারণায় বারবার উল্লেখ করেছেন তার বাবার প্রেরণা ও উৎসাহের কথা। আমার বাবা তকীয়ূল্লাহর কাছ থেকে শুনেছি, দাদা ছিলেন তার জীবনে চলার পথের প্রয়োজনীয় সাহস ও প্রেরণার উৎস।

দাদা তখন বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ। সে সময় বাবা দাদার সঙ্গে সেখানে কয়েক বছর ছিলেন। সেখানেই তিনি প্রথম কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তখন কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র-কর্মীরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে কাজ করেছেন। এ কাজে বাবা দাদার কাছ থেকেই পুরোপুরি মানসিক সমর্থন পান। দাদা ব্যক্তিজীবনে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। দাদা বলতেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারা ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ এঁকে দিয়েছেন যে মালা তিলক টিকিতে বা টুপি লুঙ্গি দাঁড়িতে তা ঢাকবার জো নেই।’ দাদার এ কথাগুলো শুধু মুখের কথা ছিল না। তিনি পারিবারিকভাবেও এর চর্চা করেছেন। আমার বাবার ছোটবেলায় তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় থাকতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় দাদা শিক্ষক হিসেবে এখানে চলে আসেন। আমার বাবা তকীয়ূল্লাহর জন্ম ঢাকাতেই ১৯২৬ সালে। দাদার এবং প্রখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের বাংলো ছিল পাশাপাশি। দুই পরিবারের মধ্যে ছিল দারুণ সদ্ভাব। দাদার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ছিলেন সত্যেন বোস। অসাম্প্রদায়িকতার এ চর্চা পুরো পরিবারেই ছড়িয়ে পড়েছিল। ভালো খাবার রান্না হলে এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়িতে তরকারির বাটি দেওয়া-নেওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। গ্রামোফোনের রেকর্ডও এ-বাড়ি থেকে ও-বাড়িতে বিনিময় হতো। দাদা তার সহকর্মী, বন্ধু ও ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িক বিভাজন মানতেন না।

১৯৫০ সালে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কথাও এখানে বলা চলে। যখন পাকিস্তান সরকারের মদদে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় তখন তিনি নিজের বাড়িতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন মানুষকে আশ্রয় দেন। শুধু তাই নয়, তিনি চকবাজারের জামে মসজিদে জুমার দিন বক্তৃতায় বলেন, ‘যদি কেউ কুরআন শরিফ থেকে প্রমাণ করতে পারে যে, নিরপরাধ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যার বিধান রয়েছে তাহলে তিনি নিজের নাম পাল্টে ফেলবেন।’ তিনি তার বাড়িতে আশ্রয়কেন্দ্র খোলার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘পারলে আমাকে প্রতিরোধ করো।’ তার এ বলিষ্ঠ বক্তব্যের পর চকবাজারে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেমে যায়।

তকীয়ূল্লাহ তখন কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে ঢাকায় দাঙ্গা প্রতিরোধে কাজ করছিলেন। শহীদুল্লাহ্‌র এ উক্তি তাকে ও অন্য কর্মীদেরও অনুপ্রাণিত করে। সন্তানদের সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত সহজ। সন্তানরাও বাবার আদর্শ সম্মান করতেন। তার প্রদর্শিত পথে চলার চেষ্টা করতেন। একজন ভাষাসৈনিক হিসেবে তকীয়ূল্লাহর প্রধান প্রেরণাই ছিলেন তার পিতা। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে তকীয়ূল্লাহ ছিলেন অন্যতম প্রধান কর্মী। আর শহীদুল্লাহ্ ছিলেন ভাষা আন্দোলনের পথনির্দেশক। ১৯৫১ সালে তকীয়ূল্লাহ ভাষা আন্দোলন এবং বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেপ্তার হন।

রাজবন্দি থাকা অবস্থায় অনেক নির্যাতনের মধ্যেও তকীয়ূল্লাহ মনোবল ধরে রেখেছিলেন। জেলবন্দি অবস্থায় ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সংগ্রাম চালিয়ে যান। এটা সম্ভব হয়েছিল বাংলা ভাষার জন্য তার বাবার প্রবল অনুরাগ ছিল বলেই।

বস্তুত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য পিতা-পুত্রই দুজনেরই অনুরাগ ছিল প্রবল। বাংলা বর্ষপঞ্জির গবেষণায় বাবার আরাধ্য কাজটিই এগিয়ে নিয়ে যান তকীয়ূল্লাহ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন কীভাবে ও কেন বাংলা বর্ষপঞ্জির সংস্কারকাজ করেছিলেন বাবা। তিনি মনে করতেন, বাংলা বর্ষপঞ্জি টিকিয়ে রাখতে হলে সেটি আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক করতে হবে। পঞ্জিকানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে এটিকে যুগোপযোগী এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহজ করতে হবে।

তার এ অসমাপ্ত কাজটিই তকীয়ূল্লাহ সমাপ্ত করেন। তারা দুজনই প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. মেঘনাদ সাহার পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। পঞ্চাশের দশকে শহীদুল্লাহ্ চীন সফর করেন। তিনি অল পাকিস্তান ওলামা দলের নেতৃত্ব দিয়ে চীনে গিয়েছিলেন সেখানকার নতুন প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য।

শহীদুল্লাহ্ সমাজতন্ত্রের আদর্শে মুগ্ধ হন। ইসলামের সাম্যবাদী আদর্শের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পান। তাই তিনি বামপন্থি আন্দোলনে তকীয়ূল্লাহর অংশগ্রহণকে মানসিক পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। দাদার এসব কথা আমার বাবা আমাদের বলতেন।

শহীদুল্লাহ্‌র সব লেখা সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজটিও করেছিলেন পুত্র তকীয়ূল্লাহ। বাংলা একাডেমি থেকে তার রচনাবলি প্রকাশের কাজে প্রচুর শ্রম ও সময় ব্যয় করেছেন তিনি। শহীদুল্লাহ্‌র কাছ থেকে আরেকটি বিষয় আমাদের পরিবারের প্রথা হয়ে দাঁড়ায়। সেটি হলো বই পড়া এবং বইকে ভালোবাসা। আমাদের বাড়িতে গড়ে তোলা হয় ব্যক্তিগত লাইব্রেরি।

শহীদুল্লাহ্ কি তার পরিবারের সদস্যদের সময় দিতেন? এমন প্রশ্ন বাবাকে করলে তিনি মৃদু হাসতেন।

বলতেন, অবশ্যই তিনি বাজারে যেতেন না কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে দীর্ঘ খোশগল্প করতে পারতেন না। সে রকম সময় তার ছিল না। তিনি যতক্ষণ বাড়িতে থাকতেন ততক্ষণ নিজ লাইব্রেরি ঘরেই থাকতেন।

তবে পরিবারের সদস্যদের জন্য তার কর্তব্য পালন করেছেন ভালোভাবেই। তার দুই কন্যা ও সাত পুত্রকে সুশিক্ষিত করে তুলেছেন। তাদের বিয়ে দিয়েছেন। আমার বাবাকে পারিবারিক জীবনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি নিজে উদ্যোগ নেন। কলকাতায় তার একজন বন্ধু ছিলেন, খান বাহাদুর আফাজউদ্দিন আহমেদ। দেশবিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। তারই কন্যার সঙ্গে নিজের ছেলের বিয়ে দেন। আমার মা খানবাহাদুরের কন্যা হওয়া সত্ত্বেও কমিউনিস্ট তকীয়ূল্লাহকে বিয়ে করতে আপত্তি জানাননি মোটেই। মা চিরদিনই তার শ্বশুর-শাশুড়ির 

প্রিয় পাত্রী ছিলেন। কারণ তাদের অসংসারী ছেলেটিকে তিনি পারিবারিক আবহে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন।

আমার বাবার ডাকনাম ছিল বেলাত। দাদা বিদেশে থাকার সময় তার জন্ম হয়। জন্মের সময় ছেলেকে দেখতে পারেননি বলে এ সন্তানের প্রতি তার বিশেষ স্নেহ ছিল। তকীয়ূল্লাহ ১৯৫৫ সালে পাঁচ বছর জেলে বন্দি থাকার পর মুক্তি পেয়ে যখন ঘরে ফিরে এলেন, তখন দাদা তাকে পশ্চিমবঙ্গে পাঠিয়েছিলেন। তার হাতে দিয়েছিলেন বন্ধু কমরেড মুজফ্‌ফর আহ্‌মদকে লেখা একটি চিঠি। দাদার ইচ্ছা ছিল তার এ ছেলেটি যেন পশ্চিমবঙ্গেই থেকে যায়। এতে পেয়ারার ভিটেবাড়ি দেখাশোনা এবং নিরাপত্তাও মিলবে। কারণ দাদার ধারণা ছিল পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় বেশি বৈরী। তকীয়ূল্লাহ অবশ্য ফিরে এসেছিলেন। তার কর্তব্য ছিল দেশের প্রতি। ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই শহীদুল্লাহ্‌র মৃত্যুর পর তিনি তীব্র শোকে আক্রান্ত হন। কারণ ‘বাবু’ ছিলেন তার জীবনে প্রধান আশ্রয়। পিতার মৃত্যুর পরই একজন সন্তান সঠিকভাবে বুঝতে পারে তার কী হারিয়েছে! তকীয়ূল্লাহও বুঝেছিলেন। তিনি সারা জীবন পিতাকে স্মরণ করেছেন পরম শ্রদ্ধায় ও গভীর ভালোবাসায়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা