বর্ষামঙ্গল
রফিকুন নবী
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১০:৪৭ এএম
আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১১:৩৮ এএম
ঋতুবৈচিত্র্যে প্রত্যেকটি ঋতুর আলাদা রূপ ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলাদেশের ঋতুগুলোর মধ্যে বর্ষাকে নিয়ে যদি আলাদা করে ভাবি, তাহলে এর দুটি বিশেষ দিক পাওয়া যায়। একটি হলো সংস্কৃতিসেবীদের কাছে বর্ষা, আরেকটি কৃষিভিত্তিক জীবনব্যবস্থায় কৃষকদের বর্ষা। কৃষিজীবীদের কাছে বর্ষার গুরুত্ব আলাদা।
বর্ষার ভাবগত দিক নিয়ে বলতে গেলে লক্ষ করা যায়, কবি-সাহিত্যিকরা প্রাচীন আমল থেকেই এ ঋতুর প্রতি একটু বেশি দুর্বল। তাই বর্ষার রূপ-বিভাকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে অজস্র গান, কবিতা ও চিত্রকর্ম। কালিদাসের মেঘদূত থেকে শুরু করে এখনও বর্ষা নিয়ে লেখা হচ্ছে। মুঘল চিত্রকলাতেও বর্ষার ছাপ রয়েছে। যার ধারা বর্তমানেও প্রবাহমান। বর্ষা নিয়ে আমার নিজেরও অনেক চিত্রকর্ম রয়েছে। বর্ষার আকাশে আলো-ছায়ার খেলাটা ধরতে চিত্রশিল্পীদের সঙ্গে আলোকচিত্রীরাও কিন্তু থেমে নেই। বর্ষায় শুধু যে সৃজনশীল মানুষ সৃষ্টির নেশায় বিভোর হয়ে থাকে তা নয়, এ সময় পশুপাখির আচরণেও ঘটে পরিবর্তন। মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হয়। গ্রামের বধূরা নাইওর যায়। এখন বোধহয় এসবের একটু পরিবর্তন এসেছে। তবে বর্ষার সময় মানুষের জীবনাচার পাল্টায়। কৃষিভিত্তিক জীবনব্যবস্থা তো একসময় পুরোটাই ছিল বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। এখনও পাহাড়ের মানুষ বৃষ্টির পানি ধরে রাখে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ডের কৃষকরা কৃষিকাজের জন্য বর্ষার পানি ধরে রাখে।
আমার ব্যক্তিগত ভাবনা থেকে বলছি, ছবি আঁকার জন্য আমি বর্ষার অপেক্ষা করি না। ভাবি না যে কবে বর্ষা আসবে, তখন ছবি আঁকব। কবিরাও নিশ্চয়ই বর্ষার অপেক্ষায় বসে থাকেন না যে তখন কবিতা লিখবেন।
বর্ষার অনেক রূপ, তার মজা ও আনন্দও অনেক। এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে সেই মজাটা আর নেই। আমাদের সময়ের বর্ষার সবচেয়ে যে মজার ঘটনা মনে পড়ে, তা হলো ভারী বর্ষণ শুরু হলে স্কুল ছুটি দিয়ে দিত। যাকে বলে ‘রেইনি ডে’। এখন ‘রেইনি ডে’র জন্য স্কুল ছুটি দেয় বলে আমার জানা নেই। যেদিন অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামত, মন উৎফুল্লতায় ভরে উঠত। ক্লাস বন্ধ। বাড়ি ফেরার তাড়া। বাচ্চারা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। স্কুলঘরের ছাদ গড়িয়ে বৃষ্টির জল পড়ার শব্দ। গ্রামের বর্ষা আর শহরের বর্ষার অনেক তফাত। শহরে অল্প একটু বৃষ্টিতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তায় পানি জমে। গাড়ির চাকা পর্যন্ত পানিতে ডুবে যায়। নগরের বাসিন্দাদের সহ্য করতে হয় অন্তহীন দুর্ভোগ।
বর্ষার প্রকৃত সৌন্দর্য গ্রামে। বিশেষ করে, হাওর ও বিল এলাকায় বর্ষার সময় নৌকা ছাড়া কোথাও যাওয়া যায় না। অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছে। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। লোকালয়ে পানি উঠেছে। মানুষ পানিবন্দি। বর্ষা আসছে, এজন্য গ্রামের মানুষের আগাম প্রস্তুতি থাকে। গ্রামীণ বর্ষার সঙ্গে শহরের বর্ষাকে মেলানো যাবে না। তবে গ্রামের বর্ষার রূপ এখন অনেক বদলেছে। গ্রামে টিনের চালের ঘরও কমে গেছে। টিনের চালে অবিরাম বৃষ্টির জলপতনে অন্য রকম এক দ্যোতনা তৈরি হয়। সেটা বর্ণনাতীত। বৃষ্টি দেখতে ও শ্রবণ করতে হয়। টিনের চাল গড়িয়ে বৃষ্টি পড়ার শব্দ সংগীতের সুরের ধারার সঙ্গে তুলনীয়।
বাবা পুলিশে চাকরি করতেন। সেই সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থেকেছি। তবে একদম ছোটবেলায় ছিলাম নাটোরের সিংড়ায়। সিংড়া চলনবিলের মধ্যে একটি থানা। অনেক ছোট ছিলাম। সেখানকার সব কথা মনে নেই। পরে গল্পে জেনেছি চলনবিলের দুর্ধর্ষ ডাকাতদের কাহিনী। বর্ষার পানিতে টইটম্বুর বিলের মধ্যে নৌকায় চলাচলে ভয়ও ছিল। আমাদের নৌকা অবশ্য পুলিশ পাহারা পৌঁছে দিত। সে সময় চলনবিলে সারা বছর পানি থাকত। বর্ষার সময় ভয়াবহ রূপ নিত আজকের চলনবিল। আমার দেখা শৈশবের চলনবিলের সঙ্গে একে এখন কোনোভাবেই তুলনা করা যাবে না। সেখানকার খুব বেশি স্মৃতি নেই আমার। তবে বিলের থইথই পানি দেখেছি। বিলের মধ্যে মহাসড়ক তৈরি করায় দিগন্ত বিস্তৃত বিলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়েছে। বর্ষার সময় ট্রেনে চড়ে যাওয়ার সময়েও চলনবিল দেখেছি। দূরের গ্রামগুলো যেন পানির ওপর ভাসছে। কী এক অপরূপ দৃশ্য! বর্ষার পানিতে চরাচর একাকার হয়ে খাল-বিল পানিতে ভাসে। এ সময় কষ্টেরও সীমা থাকে না। তবে খুব বেশি বর্ষা হলে প্রচুর পরিমাণে মাছ মেলে। হরেক রকম মাছ। আমরা সিংড়ায় মাছ দেখেছি। কী মাছের বাহার সেখানে!
গ্রামে খুব বেশি সময় থাকিনি। তাই বৃষ্টির দিনের কথা খুব একটা মনে পড়ে না। বাবা তখন মানিকগঞ্জের শিবালয় থানায়। তেওতা জমিদার বাড়িতে স্কুল। একসঙ্গে হাই স্কুল ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাইমারিতে পড়ি। অনেক পুরোনো সেই স্কুলভবন। বর্ষার সময় আমরা ছাত্ররা ছোট একটা ডিঙি নৌকায় চড়ে স্কুলে যেতাম। নৌকার মাঝি ছিলেন মাসোহারা। পারাপারের জন্য তাকে মাস ভিত্তিতে টাকা দেওয়া হতো। মাঝি নৌকা ঘুরিয়ে যমুনা নদীর কিনার দিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। বর্ষায় উত্তাল যমুনা আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করত। আমরা ছোটরা ভয়ে জড়সড় হয়ে গুটিয়ে থাকতাম। যমুনার ভয়াল রূপ দেখেছি। বৃষ্টি নামলে তুফান উঠত নদীতে। পাড়ে আছড়ে পড়ত বিশাল বিশাল ঢেউ। পানির কী গর্জন! নদীতে জলের ঘূর্ণিতে পড়ে এই বুঝি নৌকা ডুবে যাবে। পানি পাক খেলত। সাঁ সাঁ শব্দ। ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। নৌকার মাঝি দক্ষ হাতে নৌকা কিনারে নিয়ে যেতেন। ফিরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতাম। এই বুঝি ডুবতে ডুবতে বেঁচে গেছি। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে কত রকম ঘটনাই তো ঘটেছে। কখনও কখনও প্রবল বর্ষণ দেখে মনে হতো আকাশ বুঝি ফুটো হয়ে গেছে। জমিদারবাড়ির সেই পুরোনো স্কুলঘরের ছাদ চুয়ে ক্লাসরুমে বৃষ্টির পানি পড়ত। তখন স্কুল ছুটি হয়ে যেত। আমরা বই-খাতা গুছিয়ে হইহুল্লোড় করে বাড়ি ফিরতাম। কতই না মধুর ছিল স্মৃতির খেরোখাতার সেই দিনগুলো।
শ্রুতিলিখন : হাসনাত মোবারক