× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বর্ষামঙ্গল

বৃষ্টিভেজা সবুজ জামার গল্প

শামীম আজাদ

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১০:৪৫ এএম

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১১:৩৮ এএম

বৃষ্টিভেজা সবুজ জামার গল্প

সেদিন নদীতে ছিল না কোনো লালডিঙা, মোহনায় কোনো পানসি। সমাজ স্রোতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক কিশোরী সেই প্রথম বর্ষার বৈঠাতেই নদী পাড়ি দিয়েছিল। প্রথমে সে গল্পটিই বলি। সে ছিল আষাঢ়ের এক দমধরা বিকেল। বাংলাদেশের ছোট্ট এক মহকুমা শহর জামালপুর। ঘটনাটি অন্তত ৬০ বছর আগের তো হবেই। আমাদের ঢেউটিন ছাদের বিলেতি বাংলো টাইপের বাড়ির বারান্দার নীল অপরাজিতার পাশেই আম্মা আব্বা চা পানে ছিলেন। এমন সময় শুরু হয়ে গেল হাওয়ার হুজ্জতি। দেখি সামনের হিমসাগর আমগাছ এমন ভাবে গা ঝাড়া দিচ্ছে যেন উড়াল দেবে। অপরাজিতার মাচা মাড়িয়ে ঢেউটিন কড়মড়িয়ে উঠতে না উঠতেই দেখি খয়েরি মাটির উঠোনে লাফাচ্ছে ছোট ছোট শাদা তাল মিছরির বল। শিলাবৃষ্টি! প্রবেশ পথের বেড়া, আমগাছের বাহুতে বসা অর্কিড থির থির করে কাঁপছে। বাঁশের বেড়া ভেঙে ওদিক থেকে আসছে ধাঙড় বাড়ির শিশু-কিশোরদের উল্লাস। গুমোটের পর আনন্দের গ্রাম খুলে গেছে। 

সবাই শিল কুড়াতে ছুটেছে। আমার ছোট ভাই শোয়েব মগ, বাটি হাতে গায়ের জামা খুলছে। আমি একটি সিনথেটিক সবুজ জামা গায়ে জানালার শিকের ফাঁকে মুখটুকু গলিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সে জামার ভেতর আমার হৃৎপিণ্ড জোরে জোরে শব্দ করছে। আমি তা ঢেকে ফেলতে বাতাস ভেদ করে গুলির মতো ছুটে যাওয়া ভাইটিরে চিৎকার দিয়ে বলি, শুবুরে... হিল জমলেই মগ দিয়া যাইস। আমি চিনি দিয়া আসক্রিম বানাইমু।

শিল গুঁড়ো করে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আইসক্রিমের কথা বলতে বলতে আমার চোখজোড়া জীবনান্দের ম্লান বেতফল হয়ে যায়। কী হয়েছে আমার! ক’দিন আগেই না পাথালিয়ার জামতলা পর্যন্ত মনতাজ ভাইয়ের সাইকেল চালিয়েছি! আর মাত্র এক সপ্তাহ আগে হঠাৎ করে আমার গা থেকে এক থোকা কৃষ্ণচূড়া ঝরে পড়েছিল মেঝেতে, তাতেই আমি নারী হয়ে গেলাম? চোখ ভিজে আসে। কিন্তু সে জল ক্রিস্টাল বল হয়ে মাটিতে পড়ার আগেই আমার বাবা-মা তা ধরে ফেলেন। টের পাই আমার পিঠে আব্বার হাত, পাশে আম্মার ইশারা! একি!

- তুইও যা... দৌড় দে শামীম... ফ্রক ভিজলেও কুন্তা অইতো নায়। 

আমার মনের সমস্ত রোগজীবাণু বাষ্প হয়ে গেল। আমি প্রজাপতি হয়ে নির্বাচিত ফুলের মধু নিতে অনুজের পেছনে পেছনে ছুট দিলাম। বেড়া পেরিয়ে এক দৌড়ে বকুলতলায়। সেদিকে গিয়ে দেখি ভাইয়াও ঘাসে গড়াচ্ছে। পুরো মাঠ বকুলের পাকা ফল আর মেঘের ক্রিস্টালে ভরে গেছে। উদোম আকাশের গা থেকে বেরুচ্ছে এক আশ্চর্য বিভা। ঘন সন্ধ্যায় জোৎস্না নেমে এসেছে। আলো হয়ে গেছে আমাদের কিশোর-কিশোরীদের গলা হাত পা। বাংলাদেশের বর্ষায় এমন হয়। ভিজে সপসপে সবুজ ফ্রকটা জাপটে ধরছে। কানে বাজছে বেনুদার সেতার ও সারেঙ্গি। মোখলেস স্যার কি এখন তার হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছেন? আমার বন্ধু মন্টি কি ওদের কাঠের দোতলায় কয়েদ? তার ম্লান বেতফল জোড়া খুলে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছে? হায়রে আমাদের সদ্যপ্রাপ্ত নারীত্ব! সে কী দেয় আর কী কী হরণ করে তা হয়তো অধিকাংশ মানুষের উপলব্ধিতেই নেই। 

শিল কুড়োতে কুড়োতে হাত অবশ হয়ে গেলে ভাইবোন ফিরি। গামছার গেরোতে চুলগুলো আটকে দেখি সাপটানো জামাটা কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না। তখন আম্মা নিয়ে এলেন কাঁচি। ওঁরা দু’জন মিলে ভিজে জামা কেটে ভেতর থেকে আমাকে বের করে গা থেকে খসিয়ে দিয়েছিলেন খোসা। সেই ছিল আমার প্রথম লাইসেন্স। 

এতটুকু লিখেই বুঝি রেডিয়েটারের সুতানলি উষ্ণতা এঁকেবেঁকে নিদ্রাক্লান্ত সারা বাড়ির সব শীত বাহুবন্দি করে ফেলেছে। ঠান্ডা লাগছেই না। এমনিতেও বিলেতের এপ্রিলে শীতের মতো শীত থাকে না। আমি গা থেকে রোব খুলে ফেলি। পরতে পরতে রাতপ্রহরের পালক খসে যাচ্ছে। হঠাৎ, জানালার শাদা ঝালরের ঝরকা থেকে ছুটে আসা বিচ্ছুরিত আলোর ব্লেড আমার রগ কেটে দিল। লেখা রেখে চমকে উঠে দাঁড়িয়েই বুঝি কাচ বেয়ে গলে যাচ্ছে বাংলাদেশের আষাঢ়। জানালার কাচে আটকে যাচ্ছে হ্যালোজেন রঙা চিরহরিৎ মাউন্টেন এ্যাশ গাছের বৃন্তচ্যুত পাতারা। চোখের গলুই দিয়ে দেখি জল-পারদের ফোঁটা গলে পড়ছে যেন জ্যাকসন পোলকের গলা রঙ। যেন পেয়েছে কোনো জরুরি পরোয়ানা। এই ভিজে রাত্রির দুপুরে? মনে পড়ে বৃষ্টিভেজা সেই সবুজ সিল্কের জামার কথা। সঙ্গে সঙ্গে জলস্রোতের সমান গতিতে ওপরতলার সিঁড়িগুলো থেকে পিছলে নেমে যাই নিচে ল্যান্ডিংয়ের ভিক্টোরিয়ান ট্যাপেস্ট্রির সামনে। ফয়ারের আয়নায় দেখি, আরে গায়ে তো শুধু লো কাট হাতাকাটা ঘুমোবার জামা! তো কী! এভাবেই জলকুঞ্জে যাব। এপ্রিল শাওয়ারের এ’রাতে এসেক্সের পাখি, পশু ও কবি ছাড়া আর কারো জেগে থাকার কথা না। আর এরা তো মানুষ না।

রান্নাঘর পেরিয়ে বাগানে যেতে যেতে মনে হলো পৃথিবীর তাবৎ রান্নাঘরে কলিজা ভুনা ও স্বাস্থ্যকর সালাদের শ্মশান হয়। তবে এখানে চায়েরও সুব্যবস্থা আছে। এ-কথা মনে হতেই দ্রুত সেখান থেকে লাফিয়ে পড়ি জল থই থই কংক্রিটে। লাল লাল টালি বেয়ে জল নেমে আসছে যেন মাধবকুণ্ড। আমি উঠে যাই ঘাসব্লেডের চুড়োয় আর ফালা হয়ে যাই। আমার দেহজমিনের ফাটা আঁক গলিয়ে বৃষ্টির মধু গড়ায়। চুলে বিলি কাটে। বিগত বর্ষাস্মৃতিগুলো প্যাঁচওয়ার্কের বিশাল এক এক জল-শামিয়ানা হয়ে যায়। এখন নিশ্চয়ই ভিজছে শো শেষ করা রয়্যাল অ্যালবার্ট হল ও ভ্যাঙ্গগের প্রিয় অ্যাম্বব্যাঙ্কমেন্ট ব্রিজ, কভেন্ট গার্ডেনে ভিজছে পোয়েট্রি ক্যাফে, ভিজছে ট্রেনহীন আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন। নাকি না। কতদিন শুনেছি ব্রিকলেনে বৃষ্টি হলেও ব্রিস্টলে হচ্ছে না। চোখের দূরত্বেই দেখেছি এদিকে তুষার বৃষ্টি আর ওইদূরে অন্যদিকে জল ঝিরিঝিরি। 

সবাই বলে বিলেতে বারো মাসই নানান পদের বৃষ্টি হতে থাকে। ঝিরঝিরে বরফ সুচের মতো ঘা দেওয়া বৃষ্টি, তুষারের মতো পেলব বৃষ্টি, থেমে থেমে রোদেলা বৃষ্টি, দেশের মতো মুষলধারে বৃষ্টি এবং এই ‘এপ্রিল শাওয়ার’। একে বলা হয়, উষ্ণ বৃষ্টিপাত। এ-সময় শৈত্য আবহাওয়া নয় বলেই হয়তো। তাই এটাই জলে ভিজবার মোক্ষম সময়। এর স্বাদই রুপালি। 

ঘাসের ওপর আধশোয়া হতেই লন মোয়ারে সদ্যকাটা ঘাসের জরায়ুজ গন্ধ পাই। মগজ কোষ বলে ওঠে প্রসারিত দুই বাহুকে প্রপেলার করে ঘোরো। বয়স ভেসে যায় বন্যায়। চুল থেকে ছিটকে ছিটকে জলরেণু ছড়িয়ে পড়ট্যাঁ থাকে। পাশের বাড়ির ছাদের নিচে বসে থাকা বিড়ালের বিস্মিত চোখে ফসফরাস জ্বলে। ত্বক কুঁচকে শতবর্ষী গাছের বাকল না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত ভিজতেই থাকি। ভেজে গোলাপ, হাইড্রেঞ্জা, পায়ের নিচে অঙ্কুরিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা পালংশাকের বীজ। হঠাৎ আবার বিজলি চমকায়। স্মৃতির দুধ ধান আল চিড়ে মগজের কোষে নেয় ঠাঁই। আমি উঠি, মৃত্তিকা ওঠে, প্রপিতামহীও বলিতে চান তাহার কাহিনী!কী? 

বাহু বেয়ে নেমে যায় ক্লান্তির কোরক। পিচ্ছিল নদীতীরে ওঠার মতো সতর্ক পা রাখি আমার শাদা প্লাস্টিক রান্নাঘরে। কেটলিতে কফি জল চাপিয়ে পা টিপে টিপে পোশাক বদলাই। আজ এই মাঝ রাতেই শাড়ি পড়ব। ওপরে পাশের ঘরে পোশাক নিতে গিয়ে হাতে উঠে আসে লম্বা একটা ম্যাক্সি। আর ওই জলশামিয়ানা স্মৃতির এক খণ্ডের কথা মনে করে হাসি পেয়ে যায়।

ক’বছর আগে, বুজান বেঁচে থাকার কালে লন্ডন থেকে ঢাকা নেমে আমরা দুবোন সোজা মৌলভীবাজার চলে গেছিলাম। গাড়িতে করে দাদাবাড়ি পৌঁছতে না পৌঁছতেই আকাশ ফুটো হয়ে সেখান থেকে স্বচ্ছ মিছরির টুকরো টুপ টুপ করে পড়তে শুরু করে দিল। পুকুরের জলে হাত ডুবিয়ে দেখি ভিক্টোরিয়ান স্পঞ্জ কেকের মতো তারও আছে তিন স্তর। উষ্ণ, নাতি উষ্ণ আর শীতল। মাঝের স্তরের ক্রিমের জন্য আমি উন্মাদ হয়ে যাই। হায়রে, বাড়ির কারো জামাই আমার গাইয়ে লাগে না। চাচাতো বোন বলে, আমার এই বোরখাটা তো ম্যক্সির লাখান।

দে তাই দে! 

তারপর ঝুপ! আড় গ্রাম্য মেয়ের মতো বৃষ্টি পড়া পুকুরে অবাধ সাঁতার। কানের কাছ দিয়ে বড়ই পাতা আর বেগুনি হায়াসিন্থ ভেসে যায়। বেগুনি ফুলের প্রতিসরণে জলের নিচেও কী আশ্চর্য টার্নারের ছবির মতো গুহা দেখা যায়। গুহা থেকে খোয়াজ খিজিরের শিকল, হুমায়ূনের দেবীর মতো আমার পা জড়িয়ে রাখে। আমি টঙ্গীদাদার শৈশবে শেখানো এক দোয়া পড়ে ছুটে উপড়ে উঠে এসে দেখি পাড়ে মাথলার মতো কচুপাতাটির নিচে বসে আছে একাকী এক ব্যাঙ। তার চক্ষুদ্বয়ে চকচক করছে বৃষ্টির মার্বেল। পাড়ে বুনো কচুগাছের শিকড়ে কেচমা কেচমা কচু ঝুলে আছে। দেখি উত্তর পাড়ের বয়স্ক বকুলের সিল্কের বাবড়িগুলোর নেই। সূর্য নরম ও পাকা পিচফল হয়ে গেলে আবার গাড়িতে উঠি। 

শাড়ি পরে শেষ রাতে পিজি টিপসের ছাইয়ের বস্তা ভেজানো কাপ হাতে রেজওয়ানা বন্যা ও বাগেশ্রী বাজাই। আমার সঙ্গে জেগে ঝিরিঝিরি ভোর হতে দেখে এসক্সের পতঙ্গ ও পাখি। কিন্তু আমরা কি মানুষ?

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা