× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বর্ষামঙ্গল

গহন ঘন স্মৃতিহন্তা

ইমতিয়ার শামীম

প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১০:৪৩ এএম

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪ ১১:৩৯ এএম

চিত্রকর্ম : হামিদুজ্জামান খান

চিত্রকর্ম : হামিদুজ্জামান খান

খুব ভোরে, ঘুম-ভাঙা ঘুমের ঘোরে, তুমি কি টের পেয়েছিলে বৃষ্টিরা অঙ্কুর মেলছে? তারও আগে, যেনবা হঠাৎ করেই অঙ্কুর মেলেছিল একরাশ মেঘ; কিন্তু সেই মেঘাঙ্কুরও দেখতে পাওনি তুমি। দেখতে পাওনি, নেমে আসছে এমন অন্ধকার, যেমন শিহরণ তোলা আনন্দজাগানিয়া অন্ধকারের দেখা পায় মানুষ কেবল তার ফেলে আসা শৈশবে, ভুলে যাওয়া শৈশবে; আর সেই ভুলে যাওয়া, মনে পড়তে গিয়েও মনে না পড়া অন্ধকারের দ্যোতনায় কোথা থেকে যেন কেবল ভেসে আসতে থাকে লতাজির কণ্ঠ, ‘বাদল কালো ঘিরল গো, সব নাও তীরে এসে ভিড়ল গো...’। টের পাওনি তুমি বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে শীতল হয়ে পড়ছে এই পৃথিবী ও বৃক্ষের নিজস্ব হৃদয়। দিঘি, বিল, নদী সবকিছুই আজ উথালপাতাল-তবু তুমি টের পাওনি, কী যেন হারিয়ে গেছে। টের পাওনি শ্যাওলারঙা দেয়াল জাগছে তোমার অন্তর্লীন জগতে।

অথবা তুমি আলাদা হয়ে পড়ছো আশপাশের সবকিছু থেকে। কেননা তুমি টের পাচ্ছো বৃষ্টিরা অঙ্কুর মেলেছিল, অঙ্কুর মেলেছিল মেঘদল; আর এখন তারা ডানা মেলছে। ডানা মেলে উড়তে উড়তে বাতাসের শোঁ শোঁ গর্জনের সঙ্গে লীন হয়ে যেন সমুদ্রকেই নিয়ে আসছে তোমার কাছে। 

আর সেই সমুদ্রকে বুকে তুলে নিতে নিতে তুমি হঠাৎ করেই বুঝে নাওÑ সমুদ্রেরও মৃত্যু ঘটতে পারে, কিংবা মানুষের মতোই কী এক উদাসীনতা জেগে উঠতে পারে তার মধ্যে। নিজেকে সে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিতে পারে। মানুষ যেমন মানুষ থেকে দূরে সরে যায়, দূরে সরে যেতে পারে খুব নীরবে, ঠিক তেমনি সেও পারে দূরে সরে যেতে। যেমন পেরেছিল তোমার এই চারপাশের ভূখণ্ডে, নদীবৃত্তে, খাল-বিল খানাখন্দে ছড়িয়ে থাকা সেই অপার সাগর। ধীরে ধীরে, হয়তো অভিমানে, হয়তো ক্রোধে, হয়তো ত্রাসে, অপমান আর ম্রিয়মাণতা নিয়ে সে ধীরে ধীরে চলে গিয়েছিল ক্রমাগত দক্ষিণের দিকে। 


ট্রেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তুমি কেঁপে উঠেছিলে; না, দিনের শুরুতেই শুরু হওয়া টিপটিপ বৃষ্টির আঘ্রাণ মেশানো বাতাসে নয়, সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়ানো বর্ষণমন্দ্রিত নীরব আলোর হাতছানিতেও নয়। তুমি কাঁপছিলে বিস্তৃত এক জলরাশির সামনে দাঁড়িয়ে। কোনো এক অনন্তলোকের দিকে চলে গেছে সেই জলরাশি, কেউ জানে না। ট্রেনের জানালা-দরজা থেকে পলকের মধ্যে ফেলে আসা প্রেক্ষাপটকে হৃদয়ে পুরে নিতে নিতে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়, বড় বিপন্ন মনে হয়। 

মনে হয়, এই জলস্রোতে ওই যে পলকা নৌকা আর ডিঙি নাওকে ওরা বেয়ে চলেছে পাড়ের দিকেÑওদের আমি কোনোদিনই চিনব না, জানব না; এই যে মানকচুর বিশাল পাতা মাথার ওপর ধরে রেললাইনের পাশের মেঠোপথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছে একটি মানুষÑওকে আমি কোনোদিনই জানতে পারব না; ওই যে কিশোরী, কেন কে জানে কোচরভর্তি পদ্মপাতা নিয়ে হেঁটে চলেছে আপন মনে, তার সঙ্গে আমার কোনোদিনই কথা বলা হবে না!

কী যে এক বিষণ্ন বিস্ময়ে মোড়ানো এই পৃথিবী, কী যে রুদ্র অস্থিরতায় মোড়ানো এই পৃথিবী, মাথাটিকে নত করে প্রিয়জনের বুকে রাখার কী যে আনন্দে মোড়ানো পৃথিবী,Ñ এখানে তুমি কেন এলে? কেনই-বা তোমার চোখের সামনে ধেয়ে ধেয়ে আসছে এই অপার জলরাশিÑসমুদ্রের মতো নীরব, সাগরের মতো অরব! তার বুকে কখনও টপ টপ করে ঝরছে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা, কখনও-বা এত মিহি বৃষ্টির তীর যে বুঝে ওঠার আগেই তা মিলিয়ে যাচ্ছে জলের তলে। 

তখনও সাগর দেখনি তুমি; কিন্তু সাগরের ছবি তো দেখেছ। সাগরের নীল জল নেই এখানে, আছে শুভ্র রুপালি জল। সেই জল খেলা করে চলেছে তোমার চোখের সমুখ দিয়ে। একের পর এক স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছ তুমিÑলাহিড়ী মোহনপুর, দিলপাশার, শরৎনগর, বড়াল ব্রিজ, চাটমোহরÑমানুষও যেন আজ এই বরষায় বড় মৌনমুখী, ফেরিওয়ালার কণ্ঠ থেকেও বেরুতে চাইছে না কোনো আবাহন। যতটুকু বেরুচ্ছে, তাও যেন মিলিয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির শরীরের মধ্যে। স্টেশনে পৌঁছানোর আগে অনেক অনেক অনিচ্ছা নিয়ে হুইশেল দিচ্ছে ট্রেন, কু-উ-উ... আর সেই হুইশেল শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে, এই রেল যদি না আসত, আর এলেও যদি ছুঁয়ে না যেত এখানকার এই ভূ-জমিন, দুইভাগে যদি ভাগ না করত সমুদ্রের এই সন্তানকে, তা হলে এই চলনবিল না জানি আরও কত দিগন্তপ্লাবী জলের আধার হতো! সারা সিরাজগঞ্জ রেলপথ বসল, চলনবিলও ভাগ হয়ে গেল অজান্তে, রেললাইনের কেবল উত্তর আর পশ্চিমাংশটুকুই হয়ে উঠল চলনবিলের। অথচ বনলতা সেনের সেই নাটোরের কেবল লালপুর থানাটুকু বাদে বলতে গেলে পুরো অঞ্চলই তো ছিল এই সমুদ্রসন্তানের কত আপনার! সমুদ্র তার সন্তানের জন্যে ছেড়ে রেখে গেল সমস্ত সম্পদ, যেমন চলে গিয়েছিল শশী ডাক্তারের বাবা তার সন্তানের জন্যে তীর্থে থেকে ফিরে এসে বুঝে নেবে এমত গুপ্ত মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু এ কেমন বিল, যার জলরাশি ছুটছে তো ছুটছেই নদীর মতো! কখনও তার জলরাশি গুমরে উঠছে ছাই-অঞ্জন মেখে, কখনও-বা তা প্রবল স্রোত থাকার পরও রুপালি অঞ্জন মেখে কেমন শান্ত, নীরব আর সমাহিত! 

কিন্তু এখন বর্ষা এসে গেছে, এখন চলনবিলও কেমন বিদ্রোহী! আত্রাই, বড়াল, নন্দকুজা, গুমানী, বেশানী, ভদ্রাবতী, করতোয়াÑ কত না নদীকে বুকে তুলে নিয়ে সর্বক্ষণ শান্ত সর্বনাশের হাসি হেসে চলেছে সে! আর কোনো নদীরই-বা কি অত সাহস আছে সে ডাককে উপেক্ষা করে নেচে ধেয়ে বেরিয়ে যাবে অন্য কোনো দিগন্তের দিকে! না হোক সমুদ্র, সমুদ্রেরই তো এই সন্তান, অথবা এ-ও তো বোধ হয় বলা চলে, মৃত এক সমুদ্রের প্রেতাত্মা সেÑ বড় ভয় তাই তাকে ঘিরে। দেখ, অলসভঙ্গিতে এক পাখিওয়ালা দাঁড়িয়ে আছে তোমার পাশেই, নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দূরের বিলের দিকে, বিলের মধ্যে প্রায় ডুবন্ত এক দ্বীপবাড়ির কোণে বেড়ে ওঠা পাকুড় গাছের দিকে, তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার চোখগুলো হয়ে উঠছে প্রমথনাথ বিশীর দু’চোখ। আর সেই চোখ বুভুক্ষের মতো চলনবিলকে দেখতে দেখতে বলে উঠছে, “সম্মুখে যতদূর দেখা যায় বিলের অবারিত উদারতা, চোখের দৃষ্টি কোথাও বাধা পায় না, ছুটতে ছুটতে অবশেষে ধোঁয়া, কুয়াশা আর মেঘ মিলিয়ে যেখানে দিগন্তের মতো রচনা করেছে; সেখানে গিয়ে আপনি বাধা পায়।”

এখন সেদিনের সেই বর্ষার দিন থেকে হাঁটতে হাঁটতে আজ এত দূরের এক বর্ষার দিনে এসে মনে কি হয় না তোমার, কী ভীষণ বিশ্বাসঘাতক আজকের এই তুমি? মনে কি হয় না, সেই বর্ষণমুখর দিনে ট্রেনে যেতে যেতে প্রতিজ্ঞা করেছিলে তুমি, প্রতি বর্ষায় অন্তত একবার আসবে তুমি এই ভুঁইয়ে, এই নদীতেÑ ভাসবে গহনার নৌকায় কিংবা ডিঙাতে করে! আহা, কত সহজেই না বয়স মানুষকে বাধ্য করে নির্বিকার এক বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠতে!

এখন দিনগুলো বিশ্বাসঘাতকতার। এখন দিনগুলো বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠবার। কেউ কি এখনও শোনে দুপুরের বৃষ্টিতে সুদূরের আকুলতা নিয়ে বেতার বাংলার অনুরোধের আসরে ‘বড় দেরিতে তুমি বুঝলে/কেউ নিজেকে ছাড়া ভাবে না?’ সাতদিনের ‘গাতরে’ ক্ষুধার্ত হয়ে কেউ কি আর এসে দাঁড়ায় ঘরের দুয়ারে? বসবাসের ঘর থেকে আলাদা করে ফেলা উঠানটুকু পেরিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে মুড়িভাজা নিয়ে ফেরার সময় কেউ কি এখনও আছাড় খায় হঠাৎ করে? দিনগুলো কেটে যায় পেছনের মৃত চর বিনা, বৃষ্টি নামলেও আর কান্নার দল জমে ওঠে না। তোমার আর ফিরে চাওয়া হয় না সেই সমুদ্রসন্তানের দিকে, ইচ্ছে হয় না লাশ হয়ে সেই সমুদ্রসন্তানের বুকে ভেসে যেতে। এখনও কি হঠাৎ ঝুপ করে ঘর থেকে তৈরা জাল নিয়ে দৌড়ে কেউ চলে যায় জলাভূমির ধারে? দু’চারবার জাল ছড়িয়ে যে কয়টা মাছ পাওয়া যায়, তাই নিয়ে দৌড়ে ঘরে ফেরে চকমকে চোখমুখ নিয়ে? এখনও কি কেউ খোড়া জাল পাতে, এই সুযোগে দু’চারটা মাছ বেশি মেরে বাজারে নিয়ে বিক্রি করবে বলে? বারান্দায় বসে বসে দড়ি পাকায় উরুর ওপর টাইকরাশটা রেখে? দেখ, খনা এখন হাসতে হাসতে বলছে তোমাকে, ‘হেসে চাকি বসে পাটে, শস্য সেবারে হয় না মোটে।’ আহা, কেমন শস্যহীন, নিষ্ফলা কৃষক তুমিÑএই যে টিপটিপ করে বৃষ্টি নামছে আকাশ থেকে, ঝরঝরিয়ে বৃষ্টি নামছে কোন সে পৃথিবী থেকেÑকিন্তু তোমার আর সময় নেই এক দিনের জন্য হলেও সেই শান্ত নির্জন বর্ষণমুখর ছনের ঘরে, ছাউনিবিহীন স্টেশনগুলোর কোনো একটিতে গিয়ে দাঁড়াবার। ফিরে আসব, বারবার ফিরে আসব আমিÑ প্রতিবছরÑ সত্যের মতো মধুর মিথ্যা বলতে বলতে তুমি হেঁটে যাচ্ছ উল্টো ডাঙার দিকে। হেঁটে যেতে যেতে একদিন মৃত্যু ঘটবে তোমার। আর তোমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঘটবে সেই দিনের সেই ক্ষণের, যেই ক্ষণে সলপ গাঁয়ে ঘুরতে আসা কোনো এক কিশোরী আকাশভাঙা বিশ্বজোড়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বিহ্বল কণ্ঠে গেয়ে উঠেছিল, ‘এখানে বৃষ্টি ঝরে রিমঝিম শ্রাবণের সেতারে/কুমারী নদীর বুক কেঁপে ওঠে প্রণয়ের জোয়ারে/ যদি কখনও দেখতে সাধ হয় আমার মনের এ চঞ্চলতা/ তবে বরষার কোনও নদী দেখে নিও।’ এই আষাঢ়ে, এই শ্রাবণে সূর্য এখন হাসতে হাসতে ডুবে যাচ্ছে দিগন্তের হৃদয়ে, পৃথিবীর কোথাও আর কী করে থাকে সেই কিশোরীর গান গেয়ে ওঠার স্মৃতি, কী করেই থাকে সেই কিশোরের কোন্ এক বর্ষায় জ্যোৎস্নাঢালা এক সুমধুর কণ্ঠস্বর শোনার স্মৃতি। হা রে রে রে রে করে এখন আর সান্ন্যালদের পেলেপুষে রাখা ডাকাতের দল ছুটে আসে না বৃষ্টি-বর্ষার সুযোগে গয়নার নাও নিয়ে চলনবিল বেয়ে, তবু লুট হয়ে যায় কোনখানে যে শৈশবের ঐশ্বর্যে সাজানো আপন ভুবন, কী যে এক বিষবৃক্ষ বেড়ে উঠেছে তরতরিয়ে নিজেরই হৃদয়ে, সে আর সুযোগ দেয় না তোমাকে বর্ষা-বৃষ্টির বুকে মুখ গুঁজে নির্ভার  হয়ে ঘুমাতে।  


ই-মেইল : [email protected]

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা