× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্রাট আলেক্সান্ডারের শহর আলেক্সান্ড্রিয়া

ফাতিমা জাহান

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৪ ১৩:৫৯ পিএম

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৪ ১৪:০১ পিএম

আলেক্সান্ড্রিয়া শহর

আলেক্সান্ড্রিয়া শহর

ট্যাক্সিতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ভোরে কায়রো থেকে রওনা হতে হয়েছে। গন্তব্য আলেক্সান্ড্রিয়া, তিন ঘণ্টার পথ। কায়রো শহরে দেখে এসেছি ধু-ধু সোনালি মরুভূমি, যার কোনো আদি অন্ত নেই। ভেবেছিলাম মরুভূমির দেশ, তাই সব জায়গায় একই দৃশ্য দেখতে পাব। কিন্তু ঘুমের অতলে ডুব দিতে দিতে কীভাবে যেন এক সবুজ ক্ষেত, সবুজ উদ্যান দেখতে পেলাম। এ নিশ্চয়ই স্বপ্ন হবে। আবার চোখ খুললাম, এত সবুজ যেন হারিয়ে না যায়। তাই চট করে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। কিন্তু আমি তো জেগে আছি। তাই সাহস করে চোখ খুলেই ফেললাম। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ফসল ও সবজির সবুজ ক্ষেত। এর মাঝে হঠাৎ দুয়েকটা সোনালি রঙের মাটির তৈরি বাড়ি। আমার ঘোর কাটে না, কারণ এ জায়গাটা আমার খুব পরিচিত। যেন এখানে আমি কখনও বসবাস করেছি, ছুটে বেরিয়েছি এই সবুজ যবের ক্ষেতে। এখানেই ছিল আমার ঘর। আমি কি আগের জন্মের কথা মনে করতে পারছি, না-পরের জন্মের। নাকি এই সুজলা-সুফলা ক্ষেত দেখে বাংলাদেশের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছি।

হাইওয়ে ধরে গাড়ি শা শা করে ছুটছে। এখানে, এই গ্রামে গাড়ি থামানো যাবে না। চালকের নাম মুহাম্মদ। অবশ্য এদেশে প্রায় সবার নাম হয় আহামদ অথবা মুহাম্মদ। সান্ত্বনার সুরে মুহাম্মদ বলল, ‘কায়রো ফেরার পথে তোমাকে এ গ্রামের সফর করিয়ে আনব।’ আগে জানলে আমি অবশ্যই এ গ্রামে থাকার ব্যবস্থা করে আসতাম। অবশ্য এখনও সে সুযোগ আছে।

আলেক্সান্ডার দা গ্রেট বা সম্রাট আলেক্সান্ডারের প্রিয় শহর ছিল মিসরের আলেক্সান্ড্রিয়া। তার নামানুসারেই এ শহরের নামকরণ করেন তিনি। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ সালে সম্রাট আলেক্সান্ডার এ শহর গড়ে তোলেন। শহরটি তার এত প্রিয় ছিল যে, বলে গিয়েছিলেন মৃত্যুর পর তাকে যেন এখানেই সমাহিত করা হয়। ব্যাবিলনে তার অকালমৃত্যু হলে প্রথমে ব্যাবিলনে সমাহিত করা হয়। পরে তার মৃতদেহ সেখান থেকে তুলে এনে আলেক্সান্ড্রিয়ায় পুনরায় সমাহিত করা হয়। তবে আমি তার সমাধি দেখার ইচ্ছে পোষণ করলেও দেখাতে পাব না। কারণ সে সমাধির কোনো চিহ্ন এখন আর অবশিষ্ট নেই। ধারণা করা হয়, কয়েকবার ভূমিকম্পের কবলে পড়ে আলেক্সান্ড্রিয়া শহর আর সে কারণে তার সমাধি ভূমধ্যসাগরে তলিয়ে গেছে। তার নির্মিত বাতিঘর যা ছিল আলেক্সান্ড্রিয়া শহরের আইকন বা প্রতীক। তাও ভূমিকম্প ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে গেছে। 

প্রিয় শহর বলে এ শহরকে সম্রাট আলেক্সান্ডার যত্ন করে সাজাতে চেয়েছিলেন। অনেক ইতিহাসবিদ তাই এ শহরকে বলেন ‘ব্রাইড অব মেডিটেরিনিয়ান’ বা ‘ভূমধ্যের বধূ’। আলেক্সান্ডারের মৃত্যুর পরও বহু বছর অবধি এ শহরটির মাথায় মিসরের রাজধানীর মুকুট শোভা পেয়েছিল।

আরও একটি কারণে আলেক্সান্ড্রিয়া শহরের নাম সবার মুখে মুখে তা হলো রানী ক্লিওপেট্রাও এ শহর শাসন করেছিলেন প্রায় কুড়ি বছর এবং টলেমি রাজবংশের রাজকন্যা ক্লিওপেট্রাই ছিলেন মিসরের শেষ স্বাধীন রানী বা ফারাও বা ফেরাউন (খ্রিস্টপূর্ব ৫১-৩০)। সে আমলে দেশের রাজা বা শাসককে বলা হতো ফারাও বা ফেরাউন। ক্লিওপেট্রা যেমন বিখ্যাত ছিলেন আগুনের মতো রূপের জন্য, তেমনই বিখ্যাত ছিলেন অন্য একটি কারণে। রাজ্য পরিচালনায় দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে রানী থাকাকালীন তিনি প্রেমঘটিত সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বেশ কয়েকজন সম্রাটের সঙ্গে, কেউ কেউ বলেন এটি তার রাজনৈতিক চাল ছিল। সে হিসেবে জুলিয়াস সিজার আর ক্লিওপেট্রার নাম ইতিহাসের পাতায় আসে বারবার। ক্লিওপেট্রার সর্বশেষ প্রেম হয় রোমান সেনাপতি মার্ক অ্যান্টনিও-এর সঙ্গে। বলা হয়ে থাকে ক্লিওপেট্রা ও মার্ক অ্যান্টনিওর প্রেম এতই গভীর ছিল যে কাছাকাছি সময়ে তাদের মৃত্যু ঘটেছিল এবং মৃত্যুর পর তাদের পাশাপাশি সমাহিত করা হয়েছিল। কিন্তু যেভাবে আলেক্সান্ডার দা গ্রেটের সমাধি হারিয়ে গেছে, তেমনি এদের সমাধিও সমুদ্রের কোলে নিজেদের স্থান করে নিয়েছে। 

আলেক্সান্ড্রিয়া শহরে পৌঁছে আমি বিস্মিত! কায়রো যেমন দেখে এসেছি মোটেও তেমন নয়। আধুনিক, যা চকচকে দালানকোঠায় সুসজ্জিত এক নগরী। কোথাও ধুলোমলিনতা নেই, মানুষগুলোও বেশ প্রাণবন্ত এবং আন্তরিক। এদের মুখ দেখেই মনে হচ্ছে এ এক আনন্দ নগরী।

আমি প্রথমে যাব এখানকার লাইব্রেরি বা ‘বিব্লিওঠেকা’ তে। স্থানীয় ভাষায় পাঠাগারকে বলা হয় বিব্লিওঠেকা। আলেক্সান্ড্রিয়া বিব্লিওঠেকা ছিল সেসময়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাঠাগার। সম্রাট আলেক্সান্ডার মৃত্যুর আগে একটি পাঠাগার নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মাত্র ৩৩ বছর বয়সে তার অকালমৃত্যু হলে অনেকগুলো অসম্পূর্ণ কাজের মধ্যে পাঠাগারটিও তালিকায় রয়ে যায়। সম্রাট আলেক্সান্ডারের পর ক্ষমতায় আসেন টলেমি (১), কিন্তু তিনিও পাঠাগারের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই গত হন। এরপর টলেমি (১)-এর পুত্র টলেমি (২) মিসরের শাসনভার নিজ হাতে তুলে নিলে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্বে ২৯০ সালে এই পাঠাগারটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। তখন লম্বা লম্বা প্যাপিরাস পাতায় লিখে সেটাকে গোল করে গুটিয়ে বই হিসেবে সংরক্ষণ করা হতো, একে বলা হতো স্ক্রল। এ রকম প্রায় ৭ লাখ ক্রল ছিল এই পাঠাগারের সংগ্রহে। সে সময়ের হিসেবে এ পাঠাগারে প্রায় এক লাখ বইয়ের স্থান হয়েছিল। 

আলেক্সান্ড্রিয়ার একটি পুরোনো স্থাপনার সামনে লেখক

টলেমি রাজবংশের সব সম্রাটই জ্ঞানবিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছিলেন। এই পাঠাগারে বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য, ধর্ম ইত্যাদি সব ধরনের বই সংগৃহীত ছিল। অন্যান্য সাম্রাজ্য থেকেও বই আনা হতো বা এনে তার কপি বা নকল রেখে বই ফেরত দেওয়া হতো। 

পাঠাগারটি প্রথম ক্ষতিগ্রস্ত হয় সম্রাট জুলিয়াস সিজারের মিসর আক্রমণের সময়। আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর তা পুনর্নির্মিত হয়। এরপর আরও কয়েকবার আগুনের লেলিহান শিখায় গ্রাস হয় পাঠাগারের অমূল্য রতন বইগুলো। এভাবেই হারিয়ে গেছে লাখ লাখ বহু মূল্যবান পুস্তক। 

এখন যে গোলাকার ছাইরঙা ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে, তা পাঠাগারের আধুনিক সংস্করণ। এর উল্টো দিক থেকে ঝাপটা দিচ্ছে গাঢ নীল ভূমধ্যসাগরের ঠান্ডা হাওয়া। ভবনের সামনের দিকে গোলাকার হলেও পেছনে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। অদ্ভুত এক স্থাপত্যশিল্প। ভেতরে প্রবেশ করে বুঝলাম কেন এই পাঠাগারের ছাদ ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। পাঠাগারটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে একদম ওপরতলায় দাঁড়িয়ে নিচের সবগুলো তলা দেখা যায়। এমনকি নিচের তলাগুলোর প্রান্তে দাঁড়ালেও ওপরের বা এর নিচের তলা দেখা যায়। ১১তলা এই ভবনের প্রত্যেক তলায় ছাদ আছে ঠিকই, কিন্তু বাইরে ছাড়া মাঝে কোনো দেয়াল নেই। বইয়ের শেলফগুলো সামনে-পেছনে সারি সারি, সুসজ্জিত। ওপরতলা থেকে দেখা যায় কোথায় বসে পাঠক বই পড়ছেন। পাঠকের বসার জায়গা অবশ্য শেলফ এলাকার বাইরে। প্রায় আশি লাখ বইয়ের মাঝে প্রায় সব ভাষার সব ধরনের বই খুঁজে পাওয়া যাবে। আমি সময় নষ্ট না করে চারতলার একজন লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম বাংলা সাহিত্যের বই বা বাংলা বই কোথায় পাওয়া যাবে। তিনি আমাকে আটতলায় যেতে বললেন। আটতলায় গিয়ে খানিক খুঁজেই পেয়ে গেলাম বাংলা সাহিত্যের শেলফ। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেকগুলো বই ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, আরবি ইত্যাদি ভাষায় অনুবাদ করা আছে। বাংলা বই নেই, তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনূদিত তাসলিমা নাসরিনের কিছু বইও এ শেলফে শোভা পাচ্ছে।

এত বিশাল লাইব্রেরির সবগুলো তলা ঘুরে ঘুরে দেখতে হলে এক সপ্তাহের মতো সময় লাগবে। আমার হাতে আছে মাত্র আজকের দিনটি। এর মধ্যে অন্যান্য জায়গায়ও যেতে হবে। দৌড়ে দৌড়ে যতখানি পারা যায় দেখে নিলাম। পাঠাগারের বিশাল একটা অংশে আছে নিজস্ব অডিটোরিয়াম ও আর্ট গ্যালারি। অডিটোরিয়ামে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক বা সিনেমা দেখানো হয়।

আর্ট গ্যালারিতে বেশ কয়েকটি কক্ষে আলাদা আলাদা চিত্র ও ভাস্কর্য প্রদর্শনী চলছে এখন। মিসরের স্থানীয় ভাষা আরবি, সংস্কৃতিতে আরব প্রভাব যথেষ্ট। তারপরও শিল্পসাহিত্য, পুরাকীর্তির প্রতি আগ্রহ ও যত্ন দেখে আনন্দিত হলাম।

এর পরের গন্তব্য সিটাডেল অব কায়েত বাই। ১৪৭৮ সালে তখনকার শাসক কায়েত বাই বা কায়েতবে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। পাঠাগার থেকেও দুর্গটি দেখা যায়। আরও দেখা যায় নীল রঙের সাগরের তীর গোলাকার হয়ে কীভাবে চলে গেছে সামনের দিকে। এত মোহময় নীল যে মনে হয় তাকিয়ে দেখেই দিন পার করে দেওয়া যাবে। এখানে অবশ্যই দিন পার করার ইচ্ছা আছে, তবে আগে কায়েতবে দুর্গ দেখে আসি।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমি দাঁড়িয়ে আছি কায়েতবে দুর্গের সামনে। সোনালি রঙের বড় বড় পাথরে নির্মিত দুর্গটির সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো সম্রাট আলেক্সান্ডারের তৈরি বাতিঘরের অবশিষ্টাংশ কিছু পাথর এই দুর্গের ভিত্তি হিসেবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। সম্রাট আলেক্সান্ডার বা তার সমাধি নেই, নেই বাতিঘর, তবুও এই মজবুত পাথর দেখে কালের সাক্ষীকে ছুঁয়ে দেখেও এক ধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করতে পারছি।

কায়েতবে দুর্গ দেখতে খুবই সাধারণ, চারকোনা আকারের ভবন। বাইরে অনেকখানি জায়গাজুড়ে দেয়াল করে দেওয়া, যাতে শত্রু সহজেই ঢুকে যেতে না পারে। পুরো দেয়ালের ওপর ছাদের মতো অংশে সৈন্যরা থাকত পাহারায়। ভেতরের আঙিনায় বেশ কিছু খেজুরগাছ আর সবুজ ঘাস ছেয়ে আছে। আঙিনার মাঝখানে একটা কামান রাখা। আশপাশের প্রায় সব স্থানীয় ট্যুরিস্ট কামানের কাছে গিয়ে ছবি তুলছেন। 

দুর্গে প্রবেশের একটি মাত্র দরজা, বেশ উঁচু ওপরের দিকে মিহরাবের আকার। সামনের দিকে আর কোনো দরজা নেই; তবে ছোট ছোট অনেক জানালা আছে, যা দূর থেকে বোঝা যায় না। ভেতরে প্রথমেই একটি বিশাল কক্ষ, কক্ষের ঠিক মাঝখানে মেঝেতে সাদা, নীল মোজাইক দিয়ে নকশা করা। মোজাইকের নকশার ওপর দাঁড়িয়ে ওপরের দিকে একেবারে তিনতলার ছাদ দেখা যায়। ওপরে দোতলা, তিনতলা এই নকশা ঘিরে গোলাকার বারান্দায় ঘেরা। নিচতলায় ডানে বাঁয়ে আরও কয়েকটি কক্ষ রয়েছে। একসময় ভূগর্ভস্থ কক্ষও ছিল। দোতলার ভেতরে মাঝখানে বারান্দা গোল হয়ে চারদিকের কক্ষ দেখিয়ে দিয়েছে। বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে নিচে উঁকি দিলে নীচতলার মেঝের মোজাইকের নকশা দেখা যায়। এই বারান্দার মতো জায়গা সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য করা হয়নি। শত্রু হঠাৎ দুর্গ আক্রমণ করলে দোতলা বা তিনতলা থেকে গরম তেল ঢেলে তাদের প্রতিহত করার জন্য এর সৃষ্টি। শত্রুর আক্রমণ ঠেকানোর এটি একটি প্রাচীন পদ্ধতি। আমি দোতলার সমুদ্রের দিকের কক্ষে চলে গেলাম। প্রতিটি কক্ষেই ছোট ছোট জানালা আছে আর জানালা গলে ছলকে উঠছে নীলসাগর। মূলত এই দুর্গটি নির্মাণ করা হয়েছিল সমুদ্রপথে আগত শত্রুপক্ষকে ঠেকানোর জন্য। তিনতলার কক্ষগুলোও দোতলার মতোই। এখানেও ভেতরের গোল বারান্দা গিয়ে ঠেকেছে নিচতলার মোজাইক মেঝেতে। মেঝের সামান্য অংশের অসামান্য মোজাইক ছাড়া সব দুর্গে আমি আর কোনো বাহুল্য দেখলাম না। 

তিনতলার ওপর ছাদ। ছাদ এখন স্থানীয় ছেলেমেয়েদের দখলে। খুব হাওয়া দিচ্ছে আর ওপাশ থেকে নীলসাগর বলছে, ‘এসো এখানে হারিয়ে যাও, এখানে হারালে আবার নিজেকে খুঁজে পাবে।’ 

আমি পারলে ছাদ থেকেই সাগরের দিকে স্পাইডারম্যান বা সুপারম্যান হয়ে ওড়ে নিচে নেমে যাই। কিন্তু সাগরের হাত ধরে হেঁটে যাওয়ার কথা তো বিকালে। এখনও আরও কত কিছু দেখার বাকি আছে! 

জেলেদের গ্রাম থেকে সম্রাট আলেক্সান্ডার নির্মাণ করেন রাজধানী আলেক্সান্ড্রিয়া। এরপর গ্রিক, রোমান, বাইজেন্টাইন, আরব শাসকরা শাসন করেছিলেন মিসর। গ্রিক শাসনের অবসান হলে রোমানদের দখলে চলে যায় মিসরের সোনার চাবি। আলেক্সান্ড্রিয়ায় রোমানদের নির্মিত অ্যাম্ফিথিয়েটার হলো মিসরের একমাত্র অ্যাম্ফিথিয়েটার। আনুমানিক দ্বিতীয় শতকে নির্মাণ করা হয় এই অ্যাম্ফিথিয়েটার। কায়েতবে দুর্গ থেকে বেরিয়ে আমি দেখতে গেলাম রোমানদের আমলে নির্মিত অ্যাম্ফিথিয়েটার। খুব বেশি দূরে নয়। এ শহরকে আগলে আছে ভূমধ্যসাগর। যেখানেই যাই সেদিকেই গাঢ় নীল দৃষ্টি মেলে চেয়ে রয়, পাহারা দেয় যেন চোখের আড়াল হলেই কী যেন হারিয়ে যাবে। 

রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারটি আকারে মাঝারি। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য নির্মিত অর্ধচন্দ্রাকৃতি সিঁড়ির ধাপে ধাপে নির্মিত এই অডিটোরিয়ামটি সাদা ও ধূসর মার্বেল পাথর দিয়ে তৈরি। সেসময় অডিটোরিয়াম ও সামনের মঞ্চ এমনভাবে নির্মাণ করা হতো যেন অনুষ্ঠান চলাকালে শিল্পীকে শেষের ধাপে বসে থাকা দর্শকও শুনতে পেতেন। সেসময়কার প্রযুক্তিও ছিল তুলনাহীন। 

আমি আবার ফিরে গেলাম সমুদ্রের কাছে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। সকাল থেকে কিছুই খাইনি। মিসরে আসার পর থেকে বলতে গেলে একটা খাবারই আমি নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে খেয়ে যাচ্ছি। খাবারটির নাম কোশারি, আমার অন্যতম প্রিয় খাবার। পরতে পরতে বিস্ময়কর এক খাবার কোশারি। ভাত, ম্যাকারনি, ডাবলি ডাল ইত্যাদি আলাদা সেদ্ধ করে প্লেটে কয়েক পরতে সাজানো হয়। প্রথমে ভাতের পরত, তার পর ম্যাকারনি, ডাল। তারপর সদ্য তৈরি গরম গরম টমেটো সস ঢেলে দেওয়া হয় এর ওপর। সবশেষে পিঁয়াজ বেরেস্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এককথায় এটি অনেকগুলো জান্নাতের খাবারের একটি।

আমি নিশ্চিত আলেক্সান্ড্রিয়া আমাকে কোশারি পরিবেশনে কখনোই নিরাশ করবে না। সমুদ্রের ধারে এক রেস্তোরাঁয় বসে কোশারি আর লাইম জুস খেতে খেতে মনে হলো, এ রকম যাত্রা মনের মাঝে আরও যাত্রা করার, যাত্রায় থাকার, যাত্রা শুরুর আশা জাগায়। আর ওপাশ থেকে ভূমধ্যসাগরও আমার চোখে তার নীল চোখ রেখে বলছে, ‘আরও যাত্রা তুমি আমার হাত ধরে ঠিক দেখ অনায়াসে পার করে দেবে। শুরু করবে সে যাত্রা?’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা