× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তরুণ, তারুণিকতায় ঝলমলে

দাউদ হায়দার

প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ১০:৩৮ এএম

নির্মলেন্দু গ‍ুণ- জন্ম ২১ জুন ১৯৪৫। প্রতিকৃতি : জয়ন্ত সরকার

নির্মলেন্দু গ‍ুণ- জন্ম ২১ জুন ১৯৪৫। প্রতিকৃতি : জয়ন্ত সরকার

কানে ভাসছে, ‘আমার চেয়ে লম্বা। লম্বা, লম্বা কবিতা লেখে। আমি বয়সে বড়ো, ছোট কবিতা লিখি।’ বললেন আবু কায়সার। হাসাহাসি। সম্পাদকীয় ঘরে। সম্পাদক আল মাহমুদ। ঘরে আরও কয়েকজন। মেজর জলিল, আবদুল আউয়াল (আদমজী জুট মিলের কর্তা) এবং আ স ম আবদুর রব।

বিচিত্রায় কাজ করতুম। বেতন দেড়শ টাকা। যথেষ্ট। পড়তুম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে। দ্বিতীয় বর্ষে। ছাত্ররাজনীতির হাতেখড়ি ছাত্র ইউনিয়নে। সিদ্ধেশ্বরী হাই স্কুলে। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম দুই দিন মার্কসিজম কী, শুনিয়েছেন (স্কুল ছুটির পরে, স্কুলের একটি ফাঁকা ক্লাসঘরে)। বিপ্লবে উদ্বুদ্ধ হচ্ছি। ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়ে আরেকটু পেকেছি। কলেজে ভর্তির আগে সংবাদ-এর ‘খেলাঘর’-এ নিয়মিত যোগদান। সেই সুবাদে ভাইয়া (বজলুর রহমান)-র সঙ্গে পরিচয়।


তখন দৈনিক পত্রিকায় (ছিল পাঁচটি। ইত্তেফাক, আজাদ, দৈনিক পাকিস্তান, সংবাদ, পয়গাম) ছোটদের জন্য আলাদা পৃষ্ঠা। সপ্তাহে একদিন। ছড়া লিখতুম। বেশিরভাগই অপ্রকাশিত। সম্পাদককে জিজ্ঞেস করলে, ‘ফেলে দিয়েছি।’

সম্পাদকের উপদেশ : ‘গদ্য মকশো করো।’ ইত্যাদি। পাক জমহুরিয়াত-এর ঈদসংখ্যায় পদ্য পাঠালুম। ছাপা হলো। সম্মানি কুড়ি টাকা। মায়ের জন্য শাড়ি কিনলুম, দাম পনেরো টাকা। পাকিস্তান-আমলের কথা বলছি।


আল মাহমুদের সঙ্গে দেখা। প্রেস ক্লাবে। বললেন, ‘অফিসে এসো।’ সপ্তাহখানেক পরে হাজির। প্রথম কথা : ‘বিচিত্রায় কয় টাকা দেয়? তোমাদের মতো ইয়াংকে প্রয়োজন। যোগ দাও। মাসে তিনশ টাকা।’

বড়ো কবি, উপরন্তু সম্পাদক। বিচিত্রা ছেড়ে গণকণ্ঠ-এ। কবি আবু কায়সার-এর সহকারী (আবু কায়সার সাহিত্য সম্পাদক এবং উপসম্পাদকীয় লেখেন)।

চার মাস কাজ করে এক পয়সাও পাইনি, ‘কাল এসো।’


প্রেস ক্লাবে সদস্য হয়েছি। সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। মূল্যহীন। পাত্তাও দেয় না কেউ। মূল উদ্দেশ্য এক টাকায় প্লেট ভর্তি খাবার। এক চামচ ডাল। সামান্য তরকারি। ঝোল আছে, মাংস নেই।

বড়ো বড়ো সাংবাদিকদের কী-একটা মিটিং ছিল। ঢুকছি (খাবার খেতে) ভাইয়ার (বজলুর রহমান) সঙ্গে দেখা। বললেন, ‘কাল অফিসে এসো।’ গেলুম। ধমকের কণ্ঠ। ‘ছাত্র ইউনিয়ন করো, জাসদের গাড্ডায় হাজির? গণকণ্ঠে কত বেতন? সংবাদ-এ যোগ দাও। সাহিত্য সম্পাদক। বেতন ছয়শ টাকা। আকাশ থেকে না পড়লেও মাথা ওলটপালট। হাত-পা ভাঙেনি।


ঠিক করলুম, তরুণ লেখক-লেখিকাকে পয়লা প্রাধান্য। বিশেষ সংখ্যায় নামীদের।

সম্পাদকীয় বিভাগে বহুমান্য রণেশ দাশগুপ্ত। নিউজ এডিটর সন্তোষ গুপ্ত। ‘বিশ্বশান্তি’র আলী আকসাদ মাঝেমধ্যে এসে গল্প করেন। শুনি, তিনিও সম্পাদকীয় বিভাগে। এক দিনও লিখতে দেখিনি। আছেন জীবন ভৌমিক। আছেন নির্মলেন্দু গ‍ুণ। ফুর্তি হলো। নির্মলেন্দু পূর্বপরিচিত। বলি : গ‍ুণদা।

‘নির্মলেন্দুর সঙ্গে কবে পরিচয়?’ শান্তিনিকেতনে প্রশ্ন করেছিলেন নির্মলেন্দুরই জ্ঞাতি মণীন্দ্র গ‍ুণ। বলি : দিনক্ষণ-মাস মনে নেই। দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত ওঁর ‘হুলিয়া’ পড়ে আন্দোলিত। প্রবীণ-মধ্যবয়স্ক-তরুণ কবিকুলের স্বপ্নভঙ্গ। গল্পচ্ছলে এ রকম কবিতাও লেখা যায়। ঢাকার নিউমার্কেটে ওঁকে প্রথম দেখেছি। পরে ঘনিষ্ঠ। নানা আড্ডায়। সহকর্মী ছিলেন দৈনিক সংবাদে-এ।


ঢাকা নিউমার্কেটে ‘নলেজ হোম’ বইয়ের দোকান (পরে প্রকাশন) মোনিকা রেস্তোরাঁয় বিকেলসন্ধেয় নিয়মিত আড্ডা।

মোনিকার এক কর্মী কবিতা লেখেন, আবুল হাসান (আসল নাম আবুল হোসেন মিয়া) তার কবিতা ছেপে দেবেন কোনো পত্রিকায়, এই আশ্বাস দিয়ে বিনে পয়সায় খাওয়ার সংবাদ চাউর। শোনা কথা : কবি-কর্মী রফিককে বাগড়া দেন নির্মলেন্দু।


নির্মলেন্দু গ‍ুণ দুই সত্তার। দুই রকম। ভিন্ন জাত। বলেন, ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’। প্রেমাংশুর রক্ত চান। লেখেন, চাষাভূষার কাব্য। দুই সত্তায় দুই ধাতের।

নির্মলেন্দুর গল্প নিয়ে খুব উচ্চবাচ্য শুনিনি কখনও। ‘আপনদলের মানুষ’ নামে কাহিনীর বিন্যাস চমকপ্রদ। খুব বেশি লেখেননি গল্প। পাঠকপ্রিয় নন। ঠিক যে, কাহিনী যতই মজবুত হোক, গদ্য পোক্ত নয়। মূলত তিনি কবি। এবং আপাদমস্তক। ওঁর আত্মজীবনী পড়ে গদ্যের বাছবিচার না করে সুরজিৎ দাশগুপ্ত উচ্ছ্বসিত। লিখেওছেন। লেখা পড়ে নির্মলেন্দু বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় সুরজিতের বাড়িতে। সুরজিতের মুখেই শুনেছি।


গত শতকের ষাট দশকের দুই কবি আবুল হাসান, নির্মলেন্দুকে নিয়ে বহুগল্প। কিন্তু নির্মলেন্দুই মিথ-এ পরিণত।

অনুজ জাহিদ হায়দারের মুখে একটি গল্প শুনেছি। তিনি শুনেছেন অন্যের মুখে। সেই অন্য আবার আরেকজনের মুখে। অর্থাৎ গল্পের শাখাপ্রশাখা। ডালপালা।

একজন মানুষ যখন মিথ হয়ে যায়, তার উৎস খোঁজা আহাম্মকি।


গল্প নিম্নলিখিত-

নির্মলেন্দু ট্রেনে আসছিলেন, চট্টগ্রাম না কোত্থেকে।

ট্রেনে গাদাগাদি যাত্রী। এক কামরায় সব জায়গা ছাত্র-ছাত্রীর দখলে। নির্মলেন্দু বসার জায়গা পাচ্ছেন না। ঠায় দাঁড়িয়ে। দুই ছাত্রীর দয়া, ‘হুজুরকে জায়গা দাও।’ কেন? হুজুরের পরনে লম্বা পাঞ্জাবি। মুখে বিশাল দাড়ি। মাথায় টুপি। গায়ে চাদর।

এক ছাত্র কৌতূহলী। ‘হুজুর, আপনার দাড়ি দুই ঠোঁট ছাড়িয়ে, পানি খান কী করে? দাড়িতে পানি লাগলে মখরুক।’ নির্মলেন্দু : পানি খাই না। খাই শরাব।

গত বছর কলকাতায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে আমন্ত্রিত হই। উপলক্ষ বক্তৃতা। বাংলা এবং তুলনামূলক সাহিত্যে বাংলা পাঠ্যসূচিতে নির্মলেন্দুর কবিতা।

বাংলা বিভাগের এক ছাত্রী নির্মলেন্দুর ‘নাম দিয়েছি ভালোবাসা’ বই না দেখে মুখস্থ শোনান। বিস্ময় মানি।


ষাট ও সত্তর দশকে (গত শতাব্দীতে) কেউ কেউ পরাবাস্তব কবিতা লিখেছেন। ধোপে টেকেনি। টিকবেও না। নির্মলেন্দু জানেন মানুষের সামগ্রিক বহুলতার দিকই প্রথম।

আত্মিকতার সঙ্গে সাধারণ মাটিমানুষের জীবন-কথকতা পয়লা।

‘তার আগে চাই সমাজতন্ত্র’, ‘বিসর্জনের আগে দুর্গার প্রতি’, ‘আমাকে কী মাল্য দেবে দাও’, ‘উল্লেখযোগ্য স্মৃতি’ কেন বারবার পড়তে হয়।


স্মরণ করছি স্মৃতি

দৈনিক সংবাদ-এ সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্বে মশগুল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। ছাত্র ইউনিয়নের কাজেও। ভালো লেখা (গদ্য, প্রবন্ধ) সংগ্রহে প্রাণান্তকর। নির্মলেন্দুকে বললুম, ‘কবিতা চাই।’ জবাব : ‘টাকা দেবে?’

বজলুর রহমান বলেছেন, ‘সংবাদ-এ যারা যুক্ত, তাদের লেখা টাকা-ছাড়া।’ নির্মলেন্দু ব্যাজার।

নির্মলেন্দু সংবাদ-এ এডিটোরিয়ালে। উপসম্পাদকীয় লেখেন।

দুই সপ্তাহের জন্য কলকাতায়, শান্তিনিকেতনে গিয়েছি কাজে। ফিরে এসে শুনলুম, রণেশদার (রণেশ দাশগুপ্ত) সঙ্গে নির্মলেন্দুর কী-সব ঝামেলা হয়েছে। রণেশদা সংবাদ ছেড়ে গেছেন। নির্মলেন্দুকে জিজ্ঞেস করলে, ‘রণেশদাকে জিজ্ঞেস করো।’


জীবন ভৌমিক (সম্পাদকীয় বিভাগে। উপসম্পাদকীয় লেখেন) বললেন, ‘রণেশদাকে অপমানিত করেছেন।’

নির্মলেন্দুকে জিজ্ঞেস করলে মৌনী।

জানতুম না, নবাবপুর রোডে ‘শান্তি হোটেল’-এর হদিস।

নির্মলেন্দু বললেন, ‘চলো।’ দুপুরের লাঞ্চ। বংশাল রোড থেকে দূরে নয়। গেলুম। শান্তি হোটেল মূলত ‘হিন্দু’ হোটেল। ‘হোটেল’? হোটেল মানে অন্য কিছু। থাকা-খাওয়ার।

শান্তি হোটেলে দুপুরে জমজমাট লাঞ্চ। নির্মলেন্দু নিয়ে গেলেন। মেঝেয় বসে পিঁড়িতে পাত-পেতে খাওয়া। ডাল ফ্রি। তরকারি, মাছ, ভাত, চাটনি তিন টাকা।

অফিস থেকে নিত্যদিন যাওয়া। নির্মলেন্দু বললেন, ‘আমি আজ খাওয়ালাম, কাল তুমি।’


প্রত্যেকদিন খাওয়া নয়। মনু ভাই (সম্পাদক আহমেদুল কবির) যেদিন অফিসে, বাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে নানাপদের খাওয়া আসে। ভাগ পাই।

নির্মলেন্দুর কথা, ‘শান্তি হোটেলে খাওয়াই ভালো।’

নির্মলেন্দু বললেন, ‘চলো স্টেডিয়ামে। খাওয়াব। এক রেস্তোরাঁয় গিয়ে ‘মুনীর চৌধুরী আছে?’ মালিক ক্ষিপ্ত। অতঃপর ‘সরি।’ ‘হালিম আছে?’ (মুনীর চৌধুরীর কাজিনের নাম হালিম। অধ্যাপক লেখক)।


তরুণ, তারুণিকতায়, রবীন্দ্রনাথকেও বয়সে টেক্কা দিচ্ছেন ঝলমলে নির্মলেন্দু গ‍ুণ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা