ধ্রুব এষ
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ১০:২৯ এএম
১৯৮৫ সালে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে নির্মলেন্দু গুণ ও শিশু মৃত্তিকা গুণ। ছবি : নাসির আলী মামুন
বাপ কন্যা হাঁটছেন।
দেখে বইতে আঁকা ছবি মনে হতো।
রাশিয়ার প্রগতি কি রাদুগা প্রকাশনের বইয়ের ইলাস্ট্রেশন।
বাপ লম্বা, কন্যা এইটুক-বাপের হাতের আঙুল ধরে হাঁটছেন।
বহুবছর আগের কিছু পড়ন্ত বিকালে নিউমার্কেটে জন্ম হতো এ দৃশ্যের, পুনর্জন্ম হতো নিউমার্কেটের বইয়ের দোকান অংশে। আমাদের হোস্টেল সন্নিকটে। শহীদ শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাস। কোনো কোনো বিকালে আমরা পাত পেড়ে বসতাম নিউমার্কেটের তৎকালীন ‘উদার’ চাতালে। আড্ডা পাওয়ারড বাই হামিদ ভাইয়ের চা। সে সময় একাধিকবার দেখা এ দৃশ্য, কন্যা অনেক কিছু বলছেন, বাপ শুনছেন-আকাশে চোখ উড়িয়ে হাঁটছেন।
এ বাপকন্যা যথাক্রমে নির্মলেন্দু গুণ, মৃত্তিকা গুণ।
দুই.
মুতাসিম ভাই, মউজদীন ভাই, মিন্টু মামা, মানিকদাÑএরা আমাদের শহরের কবি। বিগত শতকের কবিতা করোজ্জ্বল সত্তর-আশির দশকের কথা বলছি। বাসস্ট্যান্ডের নাসিমা প্রিন্টিং প্রেসে আড্ডা দিতেন আমাদের শহরের কবিরা। বামপন্থি তাত্ত্বক জাহিরুল ভাইয়ের প্রেস। আমরা কীভাবে সেই কবিতাঘোর আড্ডায় প্রবেশাধিকার পেয়েছিলাম মনে নেই। কত কী শুনতাম। ...মউজদীন ভাই ঢাকা গিয়েছিলেন। পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিংয়ে গিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে দেখা করেছেন। কবি নেত্রকোণার বারহাট্টার মানুষ। আমাদের শহরে তার আত্মীয় আছে। বাসস্ট্যান্ডের নূপুরটুপুর।
নূপুর মামা টুপুর মামা। তাদের মামা কবি নির্মলেন্দু গুণ। আমার তবে দাদা।
কিছুদিন পরে দাদার প্রথম বই ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ দেখি, কবিতা পড়ি।
কবি মিন্টু মামা মৃদুলের ভাই। মিন্টু মামার বইয়ের আলমারিতে ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ ছিল। মৃদুল আবৃত্তি করত। শহীদ মিনারে এক একুশের সন্ধ্যায় ‘হুলিয়া’ আবৃত্তি করেছিল :
আমি যখন বাড়িতে পৌঁছলুম তখন দুপুর...
তিন.
সমাজমাধ্যম ছিল না, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসানের খবর মফস্বলের চায়ের দোকানে বা ধানক্ষেতের আলপাড়ে বসে আমরা কীভাবে পেয়ে যেতাম তখন? ‘রেডিও’তে শুনতাম। সেই এক ‘রেডিও’-সর্বব্যাপী ছিল। আমরা জানতাম নির্মলেন্দু গুণ শহীদুল্লাহ্ হলে ছিলেন দুই দিন, আমরা জানতাম নির্মলেন্দু গুণ ট্রেনের বগিতে ছিলেন এক দিন। আর তাদের যৌথ উদ্বাস্তু জীবন, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসানের, আমাদের টানতÑআমাদের যারা কবি হতে চেয়েছিল, যারা কবি হতে চায়নি। দুই কবি সেই যুগেই ‘ভাইরাল’ কলেজের ক্যান্টিন, আলপাড়ে, চায়ের দোকানে। তবে রাজিয়ার রঙের রাজহাঁস দেখার বোধ তখনও আমাদের হয় নাই।
চার.
অধুনালুপ্ত ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ ম্যাগাজিনের সম্ভবত এক ঈদসংখ্যায় আমি একটা ‘ক্লেরিহিউ’ লিখেছিলাম :
নুন আনতে পানতা ফুরায়
পানতা আনতে নুন,
না ফুরানোর পদ্য লিখেন
নির্মলেন্দু গুণ।
বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ বানাই। কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে আমার একদিন দেখা হয়ে যাবেই। সেটা প্রথম সম্ভব হয়েছিল ১৯৮৮ কি ’৮৯ খ্রিস্টাব্দে। কবি তখন তার জীবন পলাশী ব্যারাকে উদ্যাপন করছেন। নালানর্দমা পার হয়ে সেই একচালা কবিনিবাস। শীতকাল ছিল। সকাল ছিল। টেলিভিশনে ক্রিকেট খেলা চলছিল। কবি দেখছিলেন।
উদ্যাপন। আমরা কেউ টেনেটুনে, কেউ কায়ক্লেশে জীবন কাটাই, একমাত্র গুণদাকে দেখলাম উদ্যাপন করেন জীবন।
পাঁচ.
২১ জুন, ২০২৪।
নির্মলেন্দু গুণ, ৮০ বছর।
প্রণাম কবি নির্মলেন্দু গুণ।
জয় গুণদা।