মিনার মনসুর
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ১০:১৭ এএম
নির্মলেন্দু গুণকে আমরা বলতাম তমসাচ্ছন্ন পঁচাত্তরের আগুন। গুণভক্ত পাঠকরা তার ভেতরের বারুদের খবর আগে থেকেই জানতেন। জানতেন তার বোহেমিয়ান বেপরোয়া জীবনের পিলে চমকানো নানা তথ্য। গুণের অবয়বে, চলনে-বলনেও ছিল তার তীব্র বহিঃপ্রকাশ। আমরা তাকে গুণদা বলে ডাকতাম। আর তিনি সেটাকে কিঞ্চিৎ বদলে দিয়ে বলতেন, ‘গুণডা’! তার পরিহাসপ্রিয়তার বিষয়টিও সর্বজনবিদিত। আমার মনে আছে, আশির দশকের শেষের দিকে আমি একবার গুণদাকে বিশিষ্ট স্থপতি আলমগীর কবীরের আমন্ত্রণে তার বাসায় নিয়ে যাই। কবীর ভাইয়ের কন্যা নন্দিনী তখন ছোট। নির্মলদা তাকে দেখামাত্র জিজ্ঞেস করেন, ‘বলো তো আমি কে?’ নন্দিনী তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়, ‘তুমি কবি’। নির্মলদা হা হা করে হেসে বললেন, ‘হয়নি। কবির নাম বলতে হবে?’ নন্দিনী একটুও দ্বিধা না করে বলে, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। নির্মলদা গম্ভীরকণ্ঠে বলেন, ‘তুমি অর্ধেক নম্বর পাবে। সঠিক উত্তরটি হলোÑযুবক রবীন্দ্রনাথ!’ চটপটে নন্দিনী এবার খানিকটা নার্ভাস হয়ে চুপ করে গেল। নির্মলদা প্রবল অট্টহাসির সঙ্গে তাকে বললেন, ‘শোনো, আসল রবীন্দ্রনাথের দাঁড়ি সাদা আর আমারটা কালো। সেজন্যই আমি যুবক রবীন্দ্রনাথ!’
এই-ই হলেন নির্মলেন্দু গুণ। কবিশাসিত ষাটের দশকে তিনি ছিলেন এক মুকুটহীন যুবরাজ। তাকে দেখামাত্র আবালবৃদ্ধবনিতা বুঝে যেতেন, তিনি কবি। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে কবির যে-প্রতিকৃতিটি আঁকা আছে তার পূর্বপুরুষ যদি রবীন্দ্রনাথ হন, উত্তরপুরুষ নিঃসন্দেহে নির্মলেন্দু গুণ। তার ভেতরে যে বারুদ আছে সেটা ষাটের দশকেÑতার কাব্যযাত্রার সূচনালগ্নেইÑচাউর হয়ে গিয়েছিল। তবে সেই বারুদ যে কাকে কখন কীভাবে পোড়াবে অনুমান করাও ছিল কঠিন। বরং যে-জীবন তিনি যাপন করেছেন তাতে এমন শঙ্কাও আমাদের মনে জাগত যে তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু আবুল হাসানের মতো তিনিও হয়তো নিজেকেই জ্বলিয়ে-পুড়িয়ে ভস্ম করে দেবেন। আমরা তাকে নিয়ে সদা উৎকণ্ঠিত থাকতাম। আমার খুব ভালো লাগছে যে সব শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে নির্মলদা আশিতে পা রাখতে যাচ্ছেন। বাঙালির গড় আয়ু যতদূর জানি, ৭২ বছর। অন্য সব ক্ষেত্রের মতো এ ক্ষেত্রেও তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন।
দুই.
বাঙালির আরেকটি বড় সৌভাগ্য হলো, নির্মলদা বুকে যে বিপুল বারুদ নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন তা তাদের কাজে লেগে গেল পঁচাত্তরে। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছর পর পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টে যে ভয়াল অন্ধকার নেমে এসেছিল সদ্যস্বাধীন এ জনপদের আকাশজুড়ে, সমকালীন ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। অনেক সময় অনিবার্যভাবে কারবালার প্রসঙ্গ এসে যায়। কিন্তু সেখানেও নিরপরাধ নারী-শিশুদের ওপর এমন পৈশাচিক বর্বরতার নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। আমাদের স্মৃতির ক্যানভাসজুড়ে সিরাজুদ্দৌলা ও মীরজাফরের যে-ছবিটি স্থায়ীভাবে মুদ্রিত হয়ে আছে, পঁচাত্তরে আমরা যেন তারই পুনরাবৃত্তি হতে দেখলাম। নারকীয় সেই অন্ধকারে আমাদের অতি চেনা মুখগুলোও দ্রুত বদলে গেল। বদলে গেল তাদের পোশাক। লাখ লাখ মানুষ রক্ত দিয়ে ধর্মের মুখোশাবৃত যে পাকিস্তানি দানবকে এ দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সিন্দবাদের দৈত্যের মতো সেটি আবার চেপে বসল পুরো জাতির ঘাড়ে। চলনে-বলনে পাকিস্তানি হওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল বাঙালির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, সে কাফেলায় বঙ্গবন্ধুর স্নেহ-আশীর্বাদ ধন্য অনেক কুলাঙ্গারও ছিল। পিছিয়ে ছিলেন না আমাদের কবি-লেখক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-সুশীলরাও।
অন্ধকারে যখন আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল ঠিক তখনই আমরা বিস্ফোরিত বারুদের প্রবল গর্জন শুনতে পাই। হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে কেঁপে ওঠে সব অন্ধকার। আমরা তখন একেবারেই তরুণ। ক্রোধে-হতাশায় ছটফট করছি। মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে যে-দেশে দুনিয়াকাঁপানো একটি মুক্তিযুদ্ধ হয়ে গেছে, সে-দেশে যাঁর নামে এ মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, জীবন উৎসর্গ করেছে লাখ লাখ মানুষ; সর্বোপরি যিনি এ জাতিরাষ্ট্রের পিতা ও স্থপতি তাঁকেই সপরিবার নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। অথচ মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র গর্জন করে ওঠেনি। তখন যারা মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতা ছিলেন তাদের রণহুংকারে প্রতিবাদে-প্রতিরোধে প্রকম্পিত হয়নি বাংলার আকাশ-বাতাস। এ যেন আরেকটি পলাশীর প্রান্তর! কিছুতেই এ অবস্থা মেনে নিতে পারছিলাম না আমরা। একাত্তরে খুব ছোট ছিলাম তাই অস্ত্রহাতে যুদ্ধে যেতে পারিনি। ভেবেছিলাম এবার যুদ্ধে যাব। কিন্তু সকলই গরল ভেল!
ঠিক তখনই আলোর তীব্র ঝলকানি এসে লাগে আমাদের চোখে-মুখে-চেতনায়। সে আলোর উৎস খুঁজতে গিয়ে আমরা আবিষ্কার করি অন্য এক নির্মলেন্দু গুণকে। অগ্নিযুগের প্রীতিলতা-সূর্যসেনের মতো তিনি তার ভেতরে জমে থাকা বারুদের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছেন বাংলা একাডেমি চত্বরে। যত দূর মনে পড়ে, সময়টা ছিল ১৯৭৭ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। কবিতাপাঠের আসরে নির্মলেন্দু গুণ তার অতুলনীয় উচ্চারণে পাঠ করলেন পঁচাত্তর-পরবর্তী জাগরণের ইতিহাসের অসামান্য সেই কবিতাটি যার শিরোনাম ছিল, ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’। এ অপরাধে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আটকে রাখা হয়েছিল শাহবাগ থানায়। সেদিন ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন রক্তলোলুপ খুনিদের আক্রোশ থেকে। তবে পরে আমরা শুনেছি আলামত নষ্ট করার জন্য নির্মলদা নিউজপ্রিন্ট কাগজে হাতে লেখা কবিতাটি চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছিলেন।
সেদিনের একজন দ্রোহী তরুণ হিসেবে আজ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, সহস্র বন্দুকের গর্জনের চেয়ে অধিক শক্তিশালী ছিল তার এ কবিতার অন্তর্গত শক্তি ও প্রভাব। অস্ত্র হাতে নিতে না পেরে আমরা যারা ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছিলাম ব্যাখ্যাতীত এক হতাশায়, এ কবিতা আমাদের কেবল পুনরুজ্জীবিতই করেনি, দেখিয়ে দিয়েছিল প্রতিবাদের পথও। মূলত এ কবিতার সঞ্জীবনী মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে আমরা অস্ত্রের পরিবর্তে কলম হাতে তুলে নিই। শুরু হয় শোক শক্তিতে পরিণত করার অদম্য অপ্রতিরোধ্য এক অভিযাত্রা। তারই অংশ হিসেবে ১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার তৃতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে আমরা প্রকাশ করি ‘এপিটাফ’ নামে একটি স্মরণিকা, যা এখন প্রতিবাদী ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সংকলনটির প্রচ্ছদে ছিল বঙ্গবন্ধুর ছবি ও বাণী। পরের বছর, ১৯৭৯ সালে, বঙ্গবন্ধুর চতুর্থ শাহাদাতবার্ষিকীতে আমাদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় জাতির পিতাকে নিয়ে প্রথম স্মারকগ্রন্থ ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’। ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ২০২০ সালে গ্রন্থটি পুনর্মুদ্রণ করেছে বাংলা একাডেমি। ১৯৮০ সালে জাতির পিতার পঞ্চম শাহাদাতবার্ষিকীতে আমরা প্রকাশ করি ‘আবার যুদ্ধে যাব’ শিরোনামে একটি বিশেষ বুলেটিন। এতে পঁচাত্তরের ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দেশের নানা পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের স্বাক্ষরসংবলিত বলিষ্ঠ বক্তব্য তুলে ধরা হয়। ১৯৮২ সালে আমরা প্রকাশ করি বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত মহাদেব সাহার কাব্যগ্রন্থ ‘তোমার পায়ের শব্দ’। আর ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গকৃত আমার প্রথম কবিতার বই ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বইটি বাজেয়াপ্ত করে সামরিক জান্তা। হামলা-মামলার কারণে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে আমার জীবন।
তিন.
কিন্তু আমরা থামিনি। থামেনি শোক শক্তিতে পরিণত করার সম্মিলিত অভিযাত্রা। বরং তা ক্রমে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। একুশের প্রভাতে বাংলা একাডেমি চত্বরে শব্দ দিয়ে নির্মলেন্দু গুণ যে আলো প্রজ্বালিত করেছিলেন, তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচকানাচে। এখানে বলা প্রয়োজন, পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে যেমন আমাদের জীবন বাজি রেখে লড়তে হয়েছে দশকের পর দশক, একইভাবে দীর্ঘ সময় ধরে লড়াই করতে হয়েছে স্বদেশি ঘাতকচক্রের বিরুদ্ধেও। এ শত্রুরা ছিল আরও ভয়ংকর; কেননা পাকিস্তানি বিজাতীয় শত্রুদের সহজেই চেনা যেত, কিন্তু দ্রুত রঙবদলকারী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কুচক্রী মহলের আজ্ঞাবহ স্বদেশি শিখণ্ডীদের আজও যথাযথভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আমার বলতে দ্বিধা নেই, অন্ধকারের সঙ্গে আলোর এই যে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী লড়াই তার প্রতিটি মাইলফলকে নির্মলেন্দু গুণের কবিতা আমাদের সঙ্গী হয়েছে। জুগিয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী সাহস। তার লেখা সবকটি কবিতা এখানে উদ্ধৃত করা গেলে ভালো হতো। কিন্তু পরিসরের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে অজস্রবার পঠিত তার কয়েকটি কবিতার শিরোনাম তুলে ধরছি : ‘সেই রাত্রির কল্পকাহিনী’, ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’, ‘মুজিব মানে মুক্তি’ প্রভৃতি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ ধরনের বহু কবিতা তিনি লিখেছেন ঘাতকশাসিত বাংলাদেশে, যা মুহুর্মুহু উচ্চারিত হতো মিছিলে-সমাবেশে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, পঁচাত্তরের সেই তমসাচ্ছন্ন দিনগুলোয় ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ কবিতাটির শত শত কপি মুদ্রিত করে লিফলেটের মতো আমরা বিতরণ করেছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়।
অতএব, যে যা-ই বলুন না কেন, বঙ্গবন্ধু-হত্যাপরবর্তী মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধযুদ্ধের একজন সামান্য সৈনিক হিসেবে আমি জানি জাতির ক্রান্তিকালে এসব কবিতা এবং তার রচয়িতা নির্মলেন্দু গুণের ভূমিকা কী বিপুল, কী গভীর। একাত্তর ও পঁচাত্তরের ঘাতকদের তাণ্ডবে সম্পূর্ণভাবে রাহুগ্রস্ত একটি দেশ যে আজ রাহুমুক্ত হয়ে স্বমহিমায় বিশ্বজুড়ে বহুমাত্রিক আলো ছড়াচ্ছে, তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যেসব অকুতোভয় শব্দসৈনিকের নাম জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে থাকবে যুগ যুগ ধরে তার মধ্যে নিঃসন্দেহে কবি নির্মলেন্দু গুণ অগ্রগণ্য। কবিতার শবব্যবচ্ছেদ করে যারা কাউকে মাথায় তোলেন কিংবা খারিজ করে দেন কলমের খোঁচায়, তাদের উদ্দেশে শতবর্ষ আগে কাজী নজরুল ইসলাম যা লিখে গেছেন সবিনয়ে তা-ই নিবেদন করছি-
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
[আমার কৈফিয়ৎ/সর্বহারা (১৯২৬)]