নির্মলেন্দু গুণ
মুহম্মদ রাসেল হাসান
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৪ ১০:০৬ এএম
নির্মলেন্দু গুণ- জন্ম ২১ জুন ১৯৪৫। প্রতিকৃতি : জয়ন্ত সরকার
ধানসিড়ি : আপনি আশিতে পা দিলেন। এটা ভাবতেই প্রথমে রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। অর্থাৎ কবি নির্মলেন্দু গুণ বয়সে রবীন্দ্রনাথকে ছুঁলেন।
নির্মলেন্দু গুণ : হা হা হা। তার শেষ বছরটা স্পর্শ করব আর কি।
ধানসিড়ি : কিছু ভিডিওচিত্রে রবীন্দ্রনাথকে দেখি, আপনার বয়সে তিনি সোজা হয়ে হাঁটতে পারতেন না। কিন্তু আপনি এখনও সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন।
নির্মলেন্দু গুণ : হ্যাঁ। তিনি অনেকটা বেঁকে গিয়েছিলেন। তখন চিকিৎসাব্যবস্থা তো অত উন্নত ছিল না। ফলে তিনি একটা ছোট অপারেশনের জন্য মারা গেলেন। আর আমি এত বড় অপারেশন করেও বেঁচে গেলাম।
ধানসিড়ি : হ্যাঁ। এজন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কী বলেন?
নির্মলেন্দু গুণ : তা তো দিতেই হবে। একসময় আমাদের গড় আয়ু ছিল ৪২ আর এখন ৭২ বছর। কবি রজনীকান্ত সেন তো মাত্র ৪৫ বছর বেঁচেছিলেন।
ধানসিড়ি : রবীন্দ্রনাথ তো জন্মদিন পালনের বিরোধী ছিলেন না। আপনি বিরোধী কেন?
নির্মলেন্দু গুণ : রবীন্দ্রনাথ জন্মদিন পালনের বিরোধী ছিলেন না। কিন্তু তিনি এক পত্রে লিখেছেন, ‘আমার জন্মদিন প্রতি বছর তোমাদের কাছে নিয়ে যাচ্ছে উৎসব-আমাকে এনে দিচ্ছে ক্লান্তির ডালিতে নতুন বোঝা।’ এই যে ‘ক্লান্তির ডালিতে নতুন বোঝা’-এ কথাটা আমার খুব সত্য মনে হয়েছে। আমি ১০ বছর আগেও জন্মদিন পালনে আগ্রহী ছিলাম। দিনটিকে বিশেষ মনে করতাম। কিন্তু এখন আমি এটাকে স্নায়বিক চাপ মনে করি। আমি জন্মদিন পালনের মস্তিষ্কের চাপ থেকে মুক্ত থাকতে চাই। এখন আমার জন্মদিন নিয়ে ভাবনা নাই। আমি নির্ভার। বঙ্গবন্ধুর মতো বলতে পারো। জন্মদিন পালন করা মূলত শিশুদের কাজ।
ধানসিড়ি : ঠিক আছে। জন্মদিন প্রসঙ্গ বাদ দিলাম। অন্য বিষয়ে ফিরি তাহলে। আচ্ছা, অভিজ্ঞতা আর জ্ঞানকে কীভাবে দেখেন?
নির্মলেন্দু গুণ : অভিজ্ঞতা হলো দৃশ্যমান। কিন্তু জ্ঞান অদৃশ্য। যেমন আমাদের কথা হচ্ছে। এটা একটা পরস্পরের অভিজ্ঞতা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছেন তাদের বিশাল একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে, আবার যারা বিরোধিতা করেছেন, সেটাও এক ধরনের অভিজ্ঞতা। এটা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। তবে অভিজ্ঞতা আসে প্রত্যক্ষ থেকে আর কি। জ্ঞান তো অদৃশ্য। অভিজ্ঞতাও অনেক কাজে লাগে।
ধানসিড়ি : আপনার কাছে কোনটা শক্তিশালী মনে হয়?
নির্মলেন্দু গুণ : জ্ঞানই শক্তিশালী।
ধানসিড়ি : ফেসবুকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হওয়া আপনার ‘I love you’ উপন্যাসটি তো পাঠক লুফে নিচ্ছে। এর চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানার আমার ব্যাপক কৌতূহল।
নির্মলেন্দু গুণ : হা হা হা। লিখতে লিখতে কখনও আমার চোখে জল এসে গেছে। আমার তো কোনো কাজকর্ম নাই। যখন ইচ্ছে আনন্দের কথা, বেদনার কথা লিখছি।
ধানসিড়ি : হা হা হা। কিন্তু মনা পাগলার কথা এত জীবন্ত যে সন্দেহের সুযোগই পাইনি।
নির্মলেন্দু গুণ : হা হা হা। আগে রেলগাড়িতে, লঞ্চে, যানবাহনে ভিক্ষুকরাও গান গাইত। এখন তো ভিক্ষাবৃত্তি অনেক কমে গেছে। আর আগের আবহও নাই। এ উপন্যাসটা লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আরেকটা তথ্য পেলাম। বাঘাবাড়িতে গোচারণভূমির জন্য রবীন্দ্রনাথ ২০০ বিঘা জমির খাজনা মওকুফ করে দিয়েছিলেন।
ধানসিড়ি : বাঃ।
নির্মলেন্দু গুণ : আর কৃষকদের জন্য মিল্কভিটা কারখানাও তো তার প্রতিষ্ঠা করা। এটা জানানোর জন্য লেখায় আহসানের মাধ্যমে মিল্কভিটাও নিয়ে এলাম। তিনি কৃষকদের কথা ভেবে একটা কৃষি খামার গড়ে তুলেছিলেন। তাদের জন্য বিদেশ থেকে তিনি গরুও আমদানি করতেন। আর জমিদারদের কবল থেকে সহজ-সরল কৃষকদের বাঁচাতে স্বল্পসুদে ক্ষুদ্রঋণের কথা মাথায় রেখে ১৮৯৪ সালে শিলাইদহে প্রথম কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে ১৯০৪ সালের দিকে তিনি সমবায় ব্যাংকও স্থাপন করেছিলেন।
ধানসিড়ি : আচ্ছা, বিভিন্ন ভ্রমণে আপনার দোভাষীদের কথা আমার কেন যেন খুব মনে পড়ে। লেনার কথা ভুলতেই পারি না। আসলে শুধু চলাফেরায় নয়, পড়ার মধ্য দিয়েও যে কত চরিত্র আপন হয়ে ওঠে! দেখার চেয়ে পড়া কম শক্তিশালী না!
নির্মলেন্দু গুণ : সেটা তো সব চরিত্রের ক্ষেত্রেই। তুমি শুধু আমার কথা কেন বলছো। তুমি যদি দস্তয়েভস্কির লেখা পড়ো, রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি পড়ো-একই তো।
ধানসিড়ি : আচ্ছা, ২৮তম পর্বে (I love you) মৈত্রেয়ী রায়ের একটা ছবি দিয়েছেন। উনার আর কোনো ছবি নাই? এটা তো ঝাপসা।
নির্মলেন্দু গুণ : আছে। আমার কাছে আছে। কাউকে দেখাতে চাই না আর কি। ওই ছবিটা ওর The Queen Who Ruled A Map For A Kingdom বইয়ের কভারে ছিল। ইন্টারনেট থেকে নিয়েছি। ওর পারমিশন ছাড়াই নিয়েছি।
ধানসিড়ি : তিনি এখনও বেঁচে আছেন কি?
নির্মলেন্দু গুণ : হ্যাঁ। অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ নাই। ২০০৮ সালে একবার দেখা করেছিল।
ধানসিড়ি : তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন নিশ্চয়ই? করলে তার সঙ্গে অবশ্যই আপনি যুক্ত আছেন? আপনার লেখা কি তিনি পড়ছেন?
নির্মলেন্দু গুণ : হ্যাঁ ব্যবহার করে। আমি ওকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি। অ্যাকসেপ্ট করেনি। লেখাও পাঠিয়েছি। পড়ছে কি না জানি না। ওর এক আত্মীয় কলকাতায় থাকে। তার সঙ্গে কথা হয়। তাকে দিয়েছি। তিনি পড়ছেন।
ধানসিড়ি : আচ্ছা। আপনি তো এখন চাপের মধ্যে। রোজই নতুন পর্ব লিখতে হয়।
নির্মলেন্দু গুণ : হা হা হা। আমি তো ফেসবুকে লিখি। আমি ৪০ বছর ধরে কাগজে লিখি না। আগে আমার একটা ল্যাপটপ ছিল। ল্যাপটপে লিখতাম। ফেসবুক আসার পর এখানেই লিখি।
ধানসিড়ি : আপনার ফেসবুকের বাংলা পারিভাষিক শব্দটা আমি খুব ব্যবহার করি। আমার দেখাদেখি আরও কজন করছেন।
নির্মলেন্দু গুণ : হ্যাঁ, ‘মুখপঞ্জি’। শব্দটা আমার কাছে যথার্থই মনে হয়।
ধানসিড়ি : ‘মুঠোফোন’ শব্দটা তো ব্যাপক প্রচলিত হয়ে গেল।
নির্মলেন্দু গুণ : কলকাতার লোকেরাও করে। আজ অনেক কথা হলো। অন্য আরেক দিন আড্ডা হবে।
ধানসিড়ি : ধন্যবাদ। তাহলে আজ এখানে শেষ করছি।
নির্মলেন্দু গুণ : তোমাকে স্নেহ।