× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঈদস্মৃতি

ইয়া ঢিসুমা ঢিসুমা...

সাদাত হোসাইন

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৪ ০৯:৫৯ এএম

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪ ২০:১০ পিএম

প্রচ্ছদ : হাসুরা আকতার রুমকি

প্রচ্ছদ : হাসুরা আকতার রুমকি

সবুজের লুঙ্গির কোঁচড়ে ভাঁজ করা ২ টাকা, ৫ টাকার নোট। আমি তৃষ্ণার্ত চোখে তাকাই। সবুজ আমার চোখের ভাষা বোঝে। আমার কাছে টাকা নেই, ওর আছে। এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। সে দুর্বলতা বুঝে জুতসই আঘাত করে। ভাঁজ করা টাকাগুলো তৃতীয় বারের মতো গুনতে গুনতে বলে, ‘কী রে, ঈদের তো আর দিন বেশি বাকি নাই। কয় টাকা খরচ করবি?’

কীসের টাকা?’ না বোঝার ভান করি।

আরে ব্যাটা, ঈদের দিনে কী কী কিনবি, কী কী খাইবি সেইটা।

তুই কী কিনবি?’ সবুজের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করি।

পিস্তল, ৩ টেকার বারুদ, লাল চশমা, একখান ঘড়ি আর লগে একখান বাঁশি। তারপর চোর-পুলিশ খেলব। আমি হইলাম পুলিশ আর তুই হইবি চোর।

ক্যান? আমি চোর ক্যান?’

তুই ভাবছস আমি জানি না?’

কী জানিস?’

আমি জানি, তোর মায়ে তোরে টেকা দিতে পারব না বলে হে হে করে হাসে সবুজ। ‘তুই তো ঈদের কিছু কিনতেও পারবি না। এজন্য চোর-পুলিশ খেলায় আমি পুলিশ, তুই চোর। চোখে চশমা, হাতে ঘড়ি আর পিস্তল নিয়া তোরে ধাওয়া করব আর তুই পলাবি। মাঝে মইধ্যে আমি বাঁশিতে পুলিশের মতোন হুইস্যাল দিমু, পুউউউপ... পুউউউপ... তুই দৌড়াবি। অনেক মজা এই খেলায়।

খেলাতে যতই মজা হোক, চোর হতে কে চায়? আমিও চোর হতে চাই না। বরং রঙিন চশমা-ঘড়ি পরে, বাঁশিতে হুইস্যাল দিয়ে, পিস্তল হাতে পুলিশ হতে চাই। ব্যাপারটার মধ্যে একটা আলাদা ব্যাপার আছে। ভাবতেই আমার গলার রগ খানিকটা ফুলে ওঠে।

আহা!

সমস্যা হচ্ছে, ওই রঙিন চশমা, ঘড়ি, পিস্তল, বাঁশি কতটুকু আমার কেনা হবে এ নিয়ে আমি সন্দিহান। আব্বা ঢাকা থেকে আসেন ঈদের আগের দিন রাতে, কিংবা ঈদের দিন ভোরে। এসেই আমাদের দুই ভাইকে কোলে বসিয়ে নিয়ে এ কথা-সে কথার পর যা বলেন, তা হলোÑশোনো আব্বারা, এবারের ঈদ আমাদের জন্য না। আমরা ঈদ করব আগামী বছর। ধুমধাম কইরা ঈদ করব। ঠিক আছে বড় আব্বা?’

বড় আব্বা মানে আমি। আমাকে জিজ্ঞেস করার শানে নজুল হলো, আমি যা বলব, ছোটটাও অবিকল একই কথা বলবে। প্রতি বছরই এ একই খেলা চলে। আব্বা হয়তো কোনোমতে আমাদের একটা জামা কিনে দেন। কিন্তু তারপর আর কোনো চাওয়াপাওয়ার বালাই নেই। রঙিন চশমা, ঘড়ি, পিস্তল, বাঁশি কিছুই না।

আমি প্রতি বছর মাথা নেড়ে বলি, ‘জি আচ্ছা।


ছোটটাও অবিকল আমার মতো মাথা নেড়ে বলে, ‘জি আচ্ছা।


অমন অবলীলায় আমার ‘জি আচ্ছা বলার কারণ আমার মা। আমার মা পতিব্রতা স্ত্রী। স্বামী-অন্তঃপ্রাণ। তিনি সব সময় আমাদের কানে ফিসফিস করে মন্ত্র জপেন, ‘বাবা কষ্ট পাইব এমন কিছু বলতে নাই বাজান। বাবার দেওনের ক্ষমতা নাই এমন কিছু যদি তোমরা তার কাছে চাও, তখন কী হইব? তখন সেই জিনিস না দিতে পাইরা তোমাগো আব্বা কষ্ট পাইব না? তারে কি তোমরা কষ্ট দিবা?’

আমি মাথা নেড়ে বলি, ‘না আম্মা।

আমার ছোটটাও আমার মতো ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে মাথা নেড়ে বলে ‘না আম্মা।

আম্মা আমাদের দুই ভাইকে বুকে চেপে ধরে রাখেন। কপালে চুমু খান।

আম্মা তখন বুকে আরও একটা জিনিস চেপে ধরে রাখেন, তার নাম কষ্ট। কিন্তু সেই কষ্ট আমরা দেখি না।

ঈদের কুড়ি দিন আগে থেকে দিন গোনা শুরু হয়Ñউনিশ, আঠারো, সতেরো। একেকটা দিন যেন কয়েক মাস। শেষই হতে চায় না। অথচ ঈদের দিনটাই চড়ুই পাখির মতো এক লহমায় ফুড়ুত করে উড়ে চলে যায়!

সবুজের লুঙ্গির কোঁচড়ে টাকার ভাঁজটা আরও খানিকটা মোটা হয়। আমি তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থেকে শুকনো গলায় বলি, ‘ঈদে হাবিজাবি জিনিস কেনন ভালো না। আম্মায় বলছে টাকাপয়সা অপচয় করন ঠিক না। আর বাঁশিতে ফুঁ দিলেতো মাইনষের ডিস্টাবও হয়।

সবুজ ওস্তাদ ছেলে। এসব ওর জানা। আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসে। তারপর বলে, ‘নাইরকেল পাতা দিয়া তোর আম্মায় যখন বাঁশি বানাই দেয়, তখন হেই বাঁশির শব্দে মাইনষের ডিস্টাব হয় না চান্দু? আমার লগে গুল মারবি না। তোরে টেকা দিবো না, তোর আম্মার কাছে ট্যাকা নাই, সেইটা কস না ক্যা? যা ভাগ!’

আমি ভাগি। ভেগে যাই।

বাকি কদিন আর সবুজের মুখোমুখি হই না। মনে মনে আল্লাহকে ডাকি। আল্লাহ, আব্বা যেন এইবার ঈদে আমাকে কিছু বাড়তি টাকা দেন। আমি সবুজকে আগেভাগে কিছুই বলব না। কিন্তু ওর মতো চশমা, ঘড়ি, পিস্তল, বাঁশি সব কিনে পুলিশ সেজে ওর মুখোমুখি হব। তারপর খেলা হবে। সেই খেলায় চোর থাকবে না, থাকবে শুধু পুলিশ।

পুলিশ-পুলিশ খেলা।

কিন্তু আব্বার কাছ থেকে এটা পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য। সম্ভাবনা একটা আছে, যদি মামা আসেন তাহলে। আর তা না হলে...

আমি আর ভাবতে পারি না। বুকের ভেতর কেমন করে। গলার ভেতর শক্তমতোন কী একটা দলা বেঁধে ওঠে! কিন্তু আমি কাঁদতে চাই না। আমি দিন গুনি। ইশ, আর মাত্র চারটে দিন! তিনটে দিন। দুইটে দিন।

কাল ঈদ! কাল!

ঈদের দিন সকাল। আব্বা এখনও আসেননি। একটার পর একটা লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে। আমি উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকিয়ে আছি। প্রতিটি মুহূর্তে ঘড়ির কাঁটা যেন বুকের ভেতর টিকটিক বয়ে যায়। প্রতিটি সেকেন্ড। পাশের বাড়ির মোহসিন কাকা বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় চিৎকার করে ডেকে বললেন, ‘ওই, তোর আব্বায় যেই লঞ্চে উঠছিল, সেইটা চরে ঠেকে গেছে। নদীতে জোয়ার না আসন পর্যন্ত লঞ্চ বাইর হইতে পারব না। বাড়ি আসতে আসতে রাইত হইব।

আমি হতভম্বের মতোন তাকিয়ে থাকি। আমার ছোটটাও। সে গুটিগুটি পায়ে এসে আমার পাশে দাঁড়ায়। তারপর বলে, ‘ভাইয়া, নতুন জামা?’

আমার হঠাৎ নতুন জামার কথা মনে পড়ে। রঙিন চশমা, ঘড়ি, বাঁশি, পিস্তলের ঘোরে আমি জামার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।

আমি ওর কথার কোনো জবাব দিই না। আম্মার দিকে তাকাই। আম্মা কেমন অদ্ভুতভাবে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসার চেষ্টা করেন। কিংবা কান্না চাপার চেষ্টা। তারপর বলেন, ‘চিন্তা কইরো না, তোমার আব্বা চইলা আসব, নতুন জামা নিয়া আসব।

ছোট ভাইটা আম্মার কোলের কাছে গিয়ে বলল, ‘ঈদের নামাজের পরে আসব আম্মা? রাইতের বেলা আসব? তখন আমি জামা দিয়া কী করব?’

এ কথার উত্তরে আম্মা কিছু বলেন না। শাড়ির আঁচলে চোখ লুকান। আমাদের চোখ থেকে পালিয়ে বেড়ান। যেন আমরা পুলিশ আর আম্মা চোর। যেন এখানেও চোর-পুলিশ খেলা চলছে। সবুজ আর আমার মতো। ওখানে সবুজ পুলিশ, আমি চোর। আর এখানে আমি পুলিশ, আম্মা চোর।

আসলে জগৎটাই এমন। এখানে সারাক্ষণ এই চোর-পুলিশ খেলা চলতে থাকে। লুকোচুরি খেলা। সময় আর অবস্থাভেদে এখানে আমরা সবাই চোর কিংবা পুলিশ।


লেখক : কথাসাহিত্যিক



শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা