ঈদস্মৃতি
জুয়েইরিযাহ মউ
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৪ ০৯:৪৬ এএম
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪ ১১:১০ এএম
প্রচ্ছদ : হাসুরা আকতার রুমকি
শৈশবে ঈদ আসত ট্রেনে চড়ে সিলেট যাওয়ার মাঝে, একটি একান্নবর্তী পরিবার পেটমোটা বাড়িজুড়ে এক হচ্ছে, এমন ঘন হয়ে আসা সময় ছিল ঈদ। রক্তভরা উঠোন আমার ভালো লাগেনি কোনো দিন, তার চেয়ে ভালো ছিল ঈদুল আজহার রাতে একটা গরু আর একটা খাসি বাড়িতে নিয়ে আসার সময়। একটা উৎসব এমন যেখানে আমরা ছুটে ছুটে যাচ্ছি আগল খোলা হাঁসের ছানাদের মতোন বারবার সেই পশুদের কাছে, যারা বিষণ্ন এক রাতের কিনারে দাঁড়িয়ে। যাদের চোখ কিনার বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানি দেখে আমরা বলতাম একে অন্যকে যে ‘গরুটা কাঁদছে’। মায়েরা বলতেন পশুরা বুঝে যায় তারা কোরবানি হতে যাচ্ছে, আমরা কল্পকাহিনী বানাতাম পশুদের ঘিরে। পশুদের পিঠে এঁকে দিতাম বোরাকের পাখা, তারা উড়ে উড়ে জান্নাতে যাবে এসব ভেবে বিষণ্নতাকে খুব করে দূরে ঠেলে দিতাম আমরা।
আর রান্নাঘর তখন ভেসে যাচ্ছে জ্বাল দেওয়া দুধের ঘ্রাণে। হবে পিঠা, দুধপুলি, নারকেল ভরে রাখা চন্দ্রপুলি ছেড়ে দেওয়া হবে ঘন হয়ে আসা ডেগচি ভরা দুধের পুকুরে। খাবি খাবে চাঁদ ঘন সাদাতে, ভিন্ন দুটি সাদা রঙের মিশে যাওয়া দেখতে দেখতে জিবে জল চলে আসবে আমাদের।
বের করা হবে নতুন তৈজসপত্র, নতুন মানে নতুন কেনা নয়। নতুন মানে তুলে রাখা কাপ-পিরিচ-প্লেট-বাটি এমনকি চামচটা, লবণ রাখার কৌটোটাও। এই আমাদের ঈদ। ঈদ মানে সমূহ নান্দনিকতা নিয়ে জেগে ওঠা একটা বাসা। উজ্জ্বল, উচ্ছ্ল, কলকল করে ওঠা। ঈদ মানে আরও ঘন আরও আরও ঘন হয়ে থাকা পরস্পরের। ঈদ মানে পরদিন কেবল আমরা নই, আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের সবাই মিলে আমাদের নানুবাসায় নেমন্তন্নে যাওয়া ভরদুপুরে। নানু ঘন ঝোলের কোরমা থেকে তুলে দিচ্ছেন দেশি মুরগির মাংস, আমরা গোল হয়ে টেবিলে বসে আছি ভাইবোনেরা, ভাইবোন মানে ভাইবোন, কাকাতো-মামাতো সবাই... আমরা তখনও জানিনি আপন বলতে একই উদরের ভাই ও বোনকে বোঝায়। আমাদের ‘আপন’-এর ধারণা একান্নবর্তী পরিবারে জেগে থাকে এমনতরভাবে যেন একই ছাদের তলায় যতজন বাস করা গেল ততজন সবাই।
তারপর একটা কোরবানির ঈদ আমাদের আনন্দ ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিয়ে গেল একদিন। কোরবানির জন্য আনা গরুটাকে ঘাস দিয়ে রেখে, আম্মু আর আমার সঙ্গে তুমুল গল্প সেরে ছাদে উঠে কাটা ঘুড়ির মতোন উড়তে উড়তে পড়ে গেলেন মেজো মামা। সেটুকু বেদনা গাঢ় নীল হয়ে আমাদের ঈদের গায়ে লেগে আছে এখনও। এ ইমেজ মাথায় রেখে আমি দেখি ছোট কাকা মাংস বাটছেন, গামলা গামলা মাংস আলগা করছেন ভাগে ভাগে। আর ছোট কাকারও ‘নেই’ হয়ে যাওয়া ঈদের গায়ে গভীর হয়ে জাপটে ধরে থাকে।
নয়তো বাকিটা শৈশবের দুধপুলি পিঠার মতোনই ছিল। চানরাতের মেহেদির মতোন আলতো করে হাতের ওপর এঁকে দেওয়া নকশা হয়ে ছিল। খোকা নিয়ে আসত চানরাতে নূপুর, বিছা, চুড়ি আর খেলনাপাতি, নকশা করে বানানো হতো পিঠা। আর আমরা ময়দাকে এঁটেল মাটি ভেবে গড়ে নিতাম পুতুল, গাড়ি-বাড়ি-বাক্সপাতি। রাতে আমাদের চোখ বুজতে মন চাইত না সেসব দিনে। মনে হতো যেন ঘুমোলেই ঈদের সকাল চুরি হয়ে যাবে, অবশ্য হতোও কোনো না কোনো ঈদে। ঘুম ভেঙে যদি দেখতাম নামাজ শেষে বাড়ি ফিরেছে বাবা-কাকারা, মন বিষণ্ন হয়ে যেত আচমকা।
এ রকম ছিল ঈদ, এখন যে খুব আনন্দহীন তা-ও নয়। তবে আমরা নস্টালজিক হতে ভালোবাসি বলে ঈদ মানেই শৈশবেরা ফিরে ফিরে আসে।

লেখক : কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা