রুমা মোদক
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০২৪ ০৯:০২ এএম
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৪ ১১:১১ এএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
তখন ঠিক দুপুর, খাঁখাঁ শূন্যতায় শুয়ে থাকা দুপুর। আলেয়া খাতুনের রাতের বিছানায় লেপ্টে থাকা শূন্যতার মতো নিস্তব্ধ দুপুর। নবীন মাধব সরকারি কলেজের নাইট গার্ড মো. আব্দুল কাইয়ুমের চোখ যখন অশ্রুতে টলমল করে, আলেয়া খাতুনের ভেতর থেকে তখন উথলে ওঠে বাঁধভাঙা হাসি। এই নিস্তব্ধতা ভেঙে সজোরে হাসা বেমানান। রান্নাঘরে কাঠকয়লার গনগনে আঁচে ঘামতে ঘামতে মুক্তধারার স্রোতের মতো বাঁধভাঙা হাসি সে আঁচল চাপা দিয়ে আটকায়। বিয়ের পর থেকে দাম্পত্যের এই কয় মাসে এত আনন্দ তার আর হয়নি কোনো দিন।
দরখাস্তটি টেবিলে রেখে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা কাইয়ুমের চেহারাটা দেখে প্রিন্সিপাল ঠিক আন্দাজ করতে পারেন না কাইয়ুম আসলে কী চায়। দরখাস্তে লেখা, নববিবাহিত হিসেবে আমার আবেদনখানি মানবিক দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি। কিন্তু আকুলতার বিন্দুমাত্র ছাপ তার চেহারায় নেই। তিনি একবার দরখাস্তের দিকে আরেকবার কাইয়ুমের চেহারার দিকে তাকিয়ে কাইয়ুমের ভেতরের ইচ্ছাটা পড়ে নিতে চান। ওর আবেদনটি খালি যে যৌক্তিক তাই নয়, মানবিকও বটে। নৈশপ্রহরী হিসেবে চাকরি করলেও নতুন বিবাহিত ছেলেটিকে অন্তত মাসখানেক নাইট ডিউটি থেকে ছুটি দেওয়াই উচিত। কিন্তু কাইয়ুম কেমন উদাসীন, যেন দিতে হয় বলেই দরখাস্তটি দিয়েছে, তার এমন নির্বিকার আচরণই তা প্রমাণ করে। প্রিন্সিপাল দ্বিধায় পড়ে জানতে চাইলেন, তুমি কি সত্যি নাইট ডিউটি থেকে কয়েক মাসের বিরতি নেবে কাইয়ুম? প্রিন্সিপালের এ প্রশ্নেও কাইয়ুম নির্লিপ্ত। বরং আরও উদাসীন হয়ে প্রিন্সিপালের সামনে থেকে চা ফুরিয়ে যাওয়া কাপটা সরিয়ে নিতে নিতে উত্তর দেয়, আপনের ইচ্ছা স্যার। পারলে দিয়েন, না পারলে কেমনে দেবেন।
কাইয়ুম বের হয়ে গেলে কাইয়ুমের পক্ষে তদবির করা শিক্ষক পরিষদের সেক্রেটারি আর অফিস স্টাফ একটু বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েন। দেখেন স্যার, কী করবেন। আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে নিজেদের গা বাঁচিয়ে দুজনই উঠে চলে যান।
প্রিন্সিপাল ভাইস প্রিন্সিপালকে ডেকে পাঠান। ভাইস প্রিন্সিপাল এলে দরখাস্তটি পড়তে দিয়ে তিনি পরামর্শ চান কাইয়ুমকে ছাড়া আর কাকে দিয়ে নাইট ডিউটি করানো সম্ভব। অন্তত মাসকয়েক। বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, আবার গুরুত্বপূর্ণও বটে।
ভাইস প্রিন্সিপাল এই কলেজে অনেক দিন। নতুন প্রিন্সিপালকে তিনি আগাপাশতলা ব্যাখ্যা করেন, কেন কাইয়ুমের দায়িত্ব অন্য কাউকে দিয়ে করানো কঠিন। কাইয়ুম এলাকার ছেলে। কেবল ছেলে নয়। একসময়ের পাড়া কাঁপানো বখাটে। এলাকায় যত চুরি-চামারি-ছিনতাই তার নেতৃত্বেই হতোÑ বিষয়টা ছিল দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। দুয়েকবার লোকজন ধরে পুলিশের কাছেও দিয়েছিল। ফিরে আবার সেই ওই একই অবস্থা। নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা কাইয়ুমের নেশার টাকা জোগাড় করা ছাড়া আর কোনো কাজ ছিল না।
তার মাস্টার রোলের চাকরিটা রাজস্ব খাতে যাওয়াতে হাঁফ ছেড়ে উঠেছে পুরো কলেজ। কলেজ প্রাঙ্গণটা শহর নয় ঠিক শহরতলিতে। ছিঁচকে চোরের উপদ্রবে কলের ট্যাপ, ইট-বালি কোনো কিছুই উন্মুক্ত কিংবা অনুন্মুক্ত কোনোভাবেই নিরাপদ রাখা মুশকিল ছিল। কত দিন জানালা ভেঙে ফ্যান, প্রজেক্টর নিয়ে গেছে! নাইট গার্ডের দায়িত্ব যাকেই দেওয়া হয়, মাসদুয়েকের বেশি কেউ টিকে না। ছিঁচকে চোরগুলো জং ধরা ছুরি দেখিয়ে ভেতরে ঢুকে এটা-ওটা নিয়ে যায়। থানায় জিডি করা ছাড়া বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেয়নি কেউ। তবে সবার টনক নড়ে গত বছর কলেজের সামনের বিরাট জেনারেটর চুরি হয়ে গেলে। কয়েক লাখ টাকার জেনারেটর পুরোদস্তুর ট্রাকে তুলে নিয়ে যাওয়াকে চুরি বললে ডাকাতির মান থাকে না। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সময় একটা ভাবনাই মাথায় ছিল, চোরকে পাহারায় দিলে কেমন হয় একবার দেখা যাক। নইলে এমন মার্কামারা ছেলেকে নৈশপ্রহরীর চাকরি দেওয়াটা বালখিল্যতার নামান্তর। অসহায় বাপ অনুরোধ করলে তার জন্য বরইয়ের বীজ গেলা যায়, কিন্তু আস্ত ঢেঁকি!
তখন সদ্য সূর্য মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে ফিরেছে কাইয়ুম। ওকে সুস্থ রাখতে হলে ব্যস্ত রাখতে হবে। ওর বাবা ভেসে যাওয়া শেষ কুটোটি ধরে রাখার মতো প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে আসেন ওকে। একটা কাজ না পেলে ছেলেটা আবার বিগড়ে যাবে। প্রিন্সিপাল তখন এলাকার স্থানীয় একটা ছেলে খুঁজছিলেন নাইট গার্ডের কাজটির জন্য। দুইয়ে-দুইয়ে চার প্রায় মিলবার উপক্রম। কিন্তু কাইয়ুমের নিকট অতীতের কুখ্যাতি তখনও বাতাসে উড়ছে। অনেকের অমতেই ছেলেটিকে কাজে নিলেন তিনি।
হতাশ করেনি কাইয়ুম। নেশা ছেড়ে পুরোদস্তুর চাকরিজীবী বনে যায় কয়েক মাসেই। তার কাজের নিষ্ঠায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তো বটে, তার জন্মদাতা বাপ পর্যন্ত অবাক। কলেজটাও নিরাপদ হয় ছিঁচকে চোরের হাত থেকে। কাইয়ুমের পর এলাকায় নেতৃত্ব দেওয়া বখাটেরা সব ওরই চ্যালা চামুণ্ডা। ভয়ে কিংবা সম্ভ্রমে কেউ কলেজের আশপাশে ঘেঁষে না।
অথচ ওর প্রয়োজনটাও জরুরি, প্রিন্সিপাল ভাবেন। ভাইস প্রিন্সিপালের জন্য চা নিয়ে কাইয়ুম ফিরে এলে প্রিন্সিপাল আবারও জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমার কি আসলেই নাইট ডিউটি বাতিল দরকার।’ নিরুদ্বেগ স্বরে কাইয়ুম বলে, ‘দেন স্যার, আপনের ইচ্ছা। না পারলে কেমনে দিবেন!’
ছুটি নামঞ্জুর হয়। ঠিক সন্ধ্যা নামার মুখে, মনে হয় নাম ধরে কেউ ডাকে। এশার আজানের পর টুপি পরা শেষ মানুষটি চলে গেলে টুপি খুলে কাইয়ুম কলেজের গার্ডরুমে বসে। রাতে ওর একাই ডিউটি, সারাটা রাত কাটাতে হয়। বিরক্ত লাগে না। বরং কী এক অবোধ্য মাদকের মতো নেশায় ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হতে থাকা রাত তার কাছে রঙিন হয়ে উঠতে থাকে কাছেধারে কোনো আকর্ষণের তীব্রতায়। ধরা যায় না, দেখা দেয় না তবু কী ভীষণ এর টান। কাউকে বলাও যায় না।
মোবাইলে নানান কিসিমের রিলস। কেউ নাচে, কেউ গান গায়, কেউ রান্না করে। সময় কোন দিকে যায় খেয়াল থাকে না। ঘড়ির দিকে তাকালে তবে হুঁশ ফেরে। দিব্যি কেটে যায় রাত। কখনোই সুদীর্ঘ কিংবা বিরক্তিকর মনে হয় না কাইয়ুমের।
এই নাইট ডিউটি বাতিলের জন্য বউটা রোজ হাউকাউ করে। বিয়ে করেছে দুই মাস। নতুন বউয়ের গন্ধ গা থেকে যায়নি এখনও। অথচ রোজকার মতো হাউকাউ শুরু হয়ে গেছে। লোকে শুনলে কী বলবে, ঘরে বাপ-মা আছে। রাতে বরের সঙ্গে শোওয়ার জন্য হাউকাউ করছে নতুন বউ!
বউয়ের হাউকাউ খুব একটা পাত্তা দেয় না কাইয়ুম। সরকারি চাকরি বলে কথা। গ্রামের হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া আলেয়া খাতুন কী করে বুঝবে সরকারি চাকরির মর্যাদা। তার ওপর স্বামীর পোস্টের নাম নৈশপ্রহরী। নৈশ মানে রাত, নৈশপ্রহরীকে কি রাতের বদলে দিনে পাহারা দেওয়ার জন্য রাখবে নাকি। আলেয়া খাতুন এসব বুঝতে রাজি নয়। না বুঝুক। তার কি। তার তো চাকরিটা করতেই হবে।
হাতের মোবাইলটা বেজে ওঠে, ওপাশে সাবিহা ম্যাডাম গান শুনতে পায়; তুই যে এত নিঠুর বন্ধু জানা ছিল না। জানা ছিল না রে বন্ধু জানা ছিল না। সাবিহা ম্যাডাম হাসতে হাসতে শেষ। এ কেমন গান কাইয়ুম! কাইয়ুমের কাছে এই ফোনকলটা কাঙ্ক্ষিত। কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে নতুন এই ডরমিটরিতে তিন-চারজন শিক্ষক থাকেন। মহিলা সাবিহা ম্যাডাম একাই। বরের পোস্টিং অন্য কলেজে। চেষ্টা করছে দুজন এক কলেজে যাওয়ার কিংবা আসার।
প্রায় রাতেই এটা-সেটা লাগে সাবিহা ম্যাডামের, কাইয়ুম আমার না বিস্কুট ফুরিয়ে গেছে। সকালে কী খেয়ে কলেজ যাব। কিংবা কাইয়ুম রাতে খাওয়ার তো কিছু নেই, এক হালি ডিম এনে দিবা? সেনিটারি ন্যাপকিনও প্রয়োজন হলো একবার। ফোন পেয়ে কাইয়ুম দৌড়ে যায়। বিস্কুট নিয়ে ফিরে এসে জানালার পর্দার বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখতে পায় সাবিহা ম্যাডামের ফিনফিনে নাইটির ভেতর বাদামি শরীর। স্যার, মানে সাবিহা ম্যাডামের হাসব্যান্ডের সাথে ভিডিওকলে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে সাবিহা ম্যাডাম। পায়ের ওপর পা তুলে শুয়ে শুয়ে কথা বলার ভঙ্গিতে গোলাপি রঙের প্যান্টি উঁকিঝুঁকি দেয়।
কপাল ভালো থাকলে মাঝেমধ্যে ভিডিওকলে স্যারকে দেখানো উন্নত বক্ষ জোড়াও চোখে পড়ে যায় কাইয়ুমের। এক অবাধ্য নেশায় কলিংবেল বাজানোর আগে মিনিট কয়েক চুপ করে দেখে কাইয়ুম। বেল বাজলে ওড়নায় গা ঢেকে জিনিসগুলো ভেতরে নেয় সাবিহা ম্যাডাম। মিষ্টি করে বলে, থ্যাংকস কাইয়ুম। কাইয়ুম সাবিহা ম্যাডামের চোখের দিকে তাকায় না। যদি কাইয়ুমের চোখের আগুন পড়ে ফেলে সাবিহা ম্যাডাম!
পরের সপ্তাহে রাতের ট্রেনে বর আসে সাবিহা ম্যাডামের। বাক্স পেটরা ওপরে তুলে দিতে গিয়ে কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতে ভোলে না কাইয়ুম। কিন্তু বর যে কয়েক দিন থাকে কাইয়ুমের তেমন ডাক পড়ে না। কাইয়ুম লক্ষ করে, বিস্কুট আটা, লবণ তেল নিয়ে সাবিহা ম্যাডামের বর ডরমেটরিতে ঢুকছে। এটিই তো ব্যাপার। তবু কী এক অজানা কারণে কাইয়ুমের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে থাকে।
সকালবেলা বাড়ি ফিরে বউয়ের রাগ দেখলে আরও দ্বিগুণ তেজে ফেটে পড়ে কাইয়ুম। নাইট গার্ডের চাকরি মানে সারা রাত জামাই বাইরে থাকা এটা জানলে আমি বিয়ে করতাম না, আলেয়া মুখ ঝামটা দেয়। কাইয়ুম তেজে জবাব দেয়, চাকরিখান না থাকলে তর বাপেও আমার কাছে তরে বিয়ে দিত না। বউয়ের উত্তপ্ত শরীরে মেজাজের উত্তাপ ঢেলে বেহুঁশ ঘুমায় কাইয়ুম। সারা দিন ঘুমিয়ে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় আবার পোশাক পরে তৈরি হলে আলেয়া আবার ক্ষেপে যায়। ঘরে আবার একচোট ঝগড়াঝাঁটি হলেও তোয়াক্কা না করে কলেজে চলে যায় কাইয়ুম।
সেদিন সন্ধ্যায় বের হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হঠাৎ সাবিহা ম্যাডামের ফোন। ম্যাডাম জানে, আধঘণ্টার মধ্যেই ডিউটিতে যাবে কাইয়ুম। কোনো দরকার থাকলে তখনোই বলতে পারেন। বলেনও। আজ হঠাৎ এ সময় ফোন পেয়ে বুকটা ধক করে ওঠে তার। ম্যাডাম বাথরুমে পড়ে গেছেন। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। পড়িমরি ছুটে যায় কাইয়ুম।
হাসপাতালে জানা যায়, ছয় সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা সাবিহার মিসক্যারেজ হয়েছে। রক্ত লাগবে দুই ব্যাগ। এলাকার মানুষ কাইয়ুম দ্রুতই জোগাড় করে ফেলে রক্ত। দিন-রাত এক করে ক্ষণে ফার্মেসি, ক্ষণে রেস্টুরেন্টের স্যুপ, ডাক্তার, নার্স নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে সে। তিন দিন পর সাবিহা ম্যাডামের বর এলে ছুটি মেলে তার। দুশ্চিন্তা আর দৌড়াদৌড়ি মিলিয়ে বড় ক্লান্ত লাগে নিজেকে। বাড়ি ফিরে একটা ফ্রেশ গোসল আর ঘুম, ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথ ধরে সে।
ততক্ষণে আলেয়া নিজেই গিয়ে হাজির হয় প্রিন্সিপালের কক্ষে, লাজ শরমের মাথা খেয়ে বলতে থাকে, ‘এ কুন দেশের চাকরি? দিন নাই রাইত নাই ডিউটি?’ আরও দু-তিনজন অধ্যাপকের সামনে প্রিন্সিপাল বিব্রত হন। আলেয়াকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বিষয়টি তিনি দ্রুত দেখবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
আলেয়া চলে গেলে তিনি কাইয়ুমের দরখাস্ত আনিয়ে তৎক্ষণাৎ বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন। কাইয়ুম তিন মাসের জন্য নাইট ডিউটি থেকে ছুটি পায়। রোস্টারে দিনের বেলা ডিউটি করবে সে।
বাড়িতে কাইয়ুমের নতুন বউয়ের সামনে মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে সারাক্ষণ। কতক্ষণ পরপর মোবাইল চেক করে সে। বউ অভিযোগ করে, ‘তোমার তো ঘরে মন নাই। কার ফোনের অপেক্ষা করো? সাবিহা ম্যাডামের?’ ‘চুপ কর’, বউকে ধমকে থামিয়ে দিয়ে মোবাইলের রিলসে মনোযোগ দেয় সে। কিন্তু সাবিহা ম্যাডামের কণ্ঠস্বর শোনার তৃষ্ণায় মনোযোগ ছুটে ছুটে যায়, এমনকি রাতে আলেয়াকে আদর করে উপগত হতে গেলেও সাবিহা ম্যাডামকে দেখে সে। উন্মত্ত ঘোরে আলেয়ার বুকে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে বারকয়েক ম্যাডাম ম্যাডাম বলে ডেকেও ফেলে। নতুন দাম্পত্যের রাত ঈর্ষা আর নিরানন্দে অসহনীয় হয়ে ওঠে।
সাবিহা ম্যাডামের চেহারাটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে পড়েছে। হবেই-বা না কেন। কী ধকলটাই গেল। বালতি বালতি রক্ত। একদিন ফলভর্তি ব্যাগটা ম্যাডামের হাতে দিয়ে, আপনে বেশি কইরা বেদানা, আঙুর খাবেন ম্যাডাম... পরামর্শ দেয় কাইয়ুম। কথার কথা নয়, ভেতরের উৎকণ্ঠা গোপন করতে পারে না। চায়ও না সে। আজীবনই দেখেছে অসুস্থ রোগীকে আঙুর, বেদানা খেতে। এই দুটোকেই সর্বোচ্চ পথ্য মনে হয় কাইয়ুমের।
দিনের বেলা অফিস করতে গিয়ে সাবিহা ম্যাডামের কাছে বারবার জানতে চায় সে, রাতে কোনো কিছু দরকার পড়ে কিনা। দরকার পড়লে যেন ফোন করতে কোনো দ্বিধা না করেন ম্যাডাম। ম্যাডাম আশ্বস্ত করেন, নিশ্চয়ই কোনো দরকারে তুমিই তো আমার ভরসা। প্রয়োজন হলে অবশ্যই ডাকব।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে ‘তুমিই তো আমার ভরসা’ কথাটা যে কত সুরে কান ছাপিয়ে হৃদয়-মনজুড়ে বাজতে থাকে কাইয়ুমের। অনেক দিন পর মনে যে আনন্দটা হয়, তার সাথে কেবল শৈশব-কৈশোরের ঈদের আনন্দের তুলনা চলে। কাইয়ুম অনেক দিন পর মনের আনন্দে জমিয়ে পরপর দুটো সিগারেট খায় মোড়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে।
তিন মাসের রোস্টার ডিউটিতে এক মাস যেতে না যেতেই হাঁফিয়ে উঠে কাইয়ুম প্রিন্সিপালের কাছে আবার নাইট ডিউটির আবেদন জানায়। প্রিন্সিপাল এবার ভীষণ ক্ষেপে যায়। তুমি আর তোমার বউ কি ফাজলামি পেয়েছ? করজোড়ে ক্ষমা চায় কাইয়ুম। এ রকম আর হবে না স্যার, নাইট ডিউটি কইরা অভ্যাস। রাইতে ঘুমই আসে না।
এক মাস পর আবার নাইট ডিউটিতে যোগদান করে কাইয়ুম। ঠিক পরদিন দুপুরে সাবিহা ম্যাডামের কলে ঘুম ভাঙলে আবারও বুকটা ধক করে ওঠে কাইয়ুমের। সাবিহা ম্যাডাম জানায়, সকালে নেটে বদলির অর্ডার এসেছে, এখন আমার আর তোমার দুলাভাইয়ের এক কলেজে পোস্টিং কাইয়ুম। খুব দ্রুত চলে যাওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে কয়েকজন লোক ঠিক করতে বলে সাবিহা ম্যাডাম। যেন জিনিসপত্রগুলো দ্রুত বেঁধেছেদে গুছিয়ে ফেলা যায়।