মৃত্যু শতবার্ষিকী
ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৪ ০৯:০৬ এএম
আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪ ১০:৫৫ এএম
চেক কথাসাহিত্যিক ফ্রান্ৎস কাফকার মৃত্যুর শতবর্ষ ছিল গত ৩ জুন। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী এই লেখকের অধিকাংশ লেখায় ফুটে উঠেছে শারীরিক ও মানসিক নিষ্ঠুরতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ, দ্বন্দ্ব, আতঙ্ক এবং আমলাতন্ত্রের গোলকধাঁধা; যা আমাদের কাছে এখনও প্রাসঙ্গিক। কাফকায়েস্ক শব্দটির ঘোরে আজও মত্ত গোটা পৃথিবী। তার লেখা প্রতিটি শব্দ একেকটি ফুল হয়ে সৌরভ ছড়াচ্ছে...
প্রাহা কাফকার শহর। কাফকার পারিবারিক বাড়িতে গিয়েছি, নতুন, আধুনিক কাফকা জাদুঘরেও গিয়েছি। কিন্তু তার সমাধি যে প্রাহা শহরেই তা জানা ছিল না। কাফকা মারা গেছেন ভিয়েনার কাছে কিয়েলিঙে। তার সমাধি সেখানে, এ রকম একটি ধারণা মনের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে ছিল।
ঘটনাক্রমে অনেকবার প্রাহা যাওয়া পড়েছে। তবে ২০০৫ সালে প্রাহা গিয়েছিলাম বেড়াতে, সপরিবার। অনেক দিন ছিলাম। শহরের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। ফটো তুলেছি। নানা রকম রেস্টুরেন্টে খেয়েছি। বিদেশে বেড়াতে গেলে সারা দিনের জন্য সাবওয়ে, মেট্রো বা ট্রামের টিকিট কিনে ঘোরা সময় কাটানোর একটি উৎকৃষ্ট উপায়; ঘোরাও হয়, বিশ্রামও হয়। সে রকমই একদিন উইনসেলাস স্কোয়ারে দুপুরের খাওয়ার পর কিছুটা এদিক-সেদিক ঘুরে ২৬ নম্বর ট্রামে চড়ে বসেছি। ২৬ নম্বর ট্রামের লাস্ট স্টপেজে নেমে খানিকটা হাঁটাহাঁটি করতেই চোখে পড়ল একটি সমাধিক্ষেত্র। ইহুদিদের সমাধিক্ষেত্রে কখনও যাওয়া হয়নি। সূর্যাস্তের দেরি আছে। ঢুকে পড়ি।
চেক কথাসাহিত্যিক ফ্রান্ৎস কাফকার সমাধিরে সামনে লেখক: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রধান ফটক পার হতেই ধর্মানুরাগী ইহুদিদের পরিধেয় ক্ষুদ্র একটি টুপি (কিপাহ) হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো। এক এক করে সারিবদ্ধ কবর দেখে যাচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়ল একটি সমাধিস্তম্ভের পাদদেশে বেশ কয়েকটি বিশুষ্ক পুষ্পস্তবক প্রিয়জনদের মমতার স্বাক্ষর বহন করছে। লক্ষ করে চমকে উঠে দেখি এটি কাফকার সমাধি। সমাধিস্তম্ভে লেখা ড. ফ্রান্ৎস কাফকা (১৮৮৩-১৯২৪)। নিচে হিব্রু ভাষায় আরও কিছু লেখা যার পাঠোদ্ধার আমার দ্বারা সম্ভব ছিল না। তার বাবা হ্যারম্যান কাফকার (১৮৫৪-১৯৩১) কবরও সেখানে। কদিন আগে (৩ জুলাই) ছিল কাফকার জন্মবার্ষিকী। হতে পারে সে উপলক্ষেই ভক্তরা পুষ্পস্তবক দিয়ে ভালোবাসা জানিয়ে গেছেন।
মানুষের সমাধি কেবলই স্মৃতিফলক নয়, এটি বর্তমান ও অতীতের মধ্যকার অনস্বীকার্য সেতু। কাফকার সমাধিস্থলে দাঁড়িয়ে মন বিষণ্ন হলো। হারম্যান সাহেবের এ ছেলেটির জীবন সুখের হয়নি। মৃত্যুর পর তিনি যশস্বী হয়েছেন। বলা হয়, ফ্রান্ৎস কাফকা বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বেশি প্রভাববিস্তারী লেখক। চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাহা (বা প্রাগ) ‘কাফকার শহর’ বলে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। কিন্তু আশৈশব তার জীবন কেটেছে নিদারুণ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায়। এ যন্ত্রণার সূত্রপাত হয়েছিল শৈশবেই। বাবা হারম্যান কাফকা সে খবর রাখতেন না। কাফকার মনে হতো নিজ পরিবারে তিনি একজন বিদেশি অতিথিও নন, বরং অনাকাঙ্ক্ষিত এক আগন্তুক। এ রকম মানসিক কষ্টের মধ্যে নির্মম যক্ষ্মার কবলে পড়ে তার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কাশতে কাশতে তার মনে হতো মরে গেলে বেঁচে যান।
তখন প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। একদিন বাবা ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, তুমি আমাকে এত ভয় পাও কেন বলো তো?’
বাবার ভয়ে সদাতটস্থ কাফকা এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। কয়েক মাস পর নভেম্বরের (১৯১৯) এক সন্ধ্যায় মাথায় ভূত চাপলে কাফকা তার বাবাকে উদ্দেশ করে এ প্রশ্নের জবাব লিখতে বসে গেলেন। লিখতে লিখতে এক-বাক্য প্রশ্নটির জবাব দীর্ঘ, অনেক দীর্ঘ হয়ে গেল। প্রাহা শহরে অবস্থিত কাফকা মিউজিয়ামে দেখেছি ১৯২২-এ মৃত্যুশয্যা থেকে ছুটি চেয়ে কর্মস্থল ইন্স্যুরেন্স অফিসে দরখাস্ত করতে কাফকা ফুলস্ক্যাপ কাগজের আড়াই পাতা খরচ করেছিলেন। চিঠির মাধ্যমে বাবার প্রশ্নের উত্তর লিখতে লিখতে কাফকা ছোটোখাটো একটি বই লিখে ফেললেন। ইংরেজি অনুবাদে ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বইটির নাম ‘লেটার টু ফাদার’ (বাবাকে লেখা পত্র)। ছাপার মাপে বইটির দৈর্ঘ্য ৭২ পৃষ্ঠা। চিঠি লিখতে কাফকা পারঙ্গম ছিলেন বটে। শত শত পত্রে তার প্রণয়াকুল হৃদয়ের আবেগ অভিব্যক্ত করে নির্মাণ করে গেছেন অনিন্দ্য শব্দপ্রাসাদ; যা তার মৃত্যুর পর উদ্ধার হয়েছে।
দীর্ঘ পত্রটি বাবার হাতে পৌঁছানের জন্য কাফকা মাকে দিয়েছিলেন। মা সেটি বদমেজাজি স্বামী হারম্যান কাফকার হাতে দেওয়ার সাহস সংগ্রহ করে উঠতে পারেননি। কথিত আছে, জীবদ্দশায় কাফকা তার ৯০ শতাংশ রচনা স্বহস্তে বিনষ্ট করেছেন। ঘনিষ্ঠ বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে গিয়েছিলেন অপ্রকাশিত রচনা, চিঠিপত্র, দিনপঞ্জি, আঁকাজোকা সবকিছু মৃত্যুর পর নষ্ট করে ফেলবার জন্য। এহেন অনুরোধ করা সহজ হতে পারে, কিন্তু রক্ষা করা কঠিন। ম্যাক্স ব্রডও এ অনুরোধ রক্ষা করতে পারেননি। তিনি কাফকার রচনাবলি প্রকাশ করার সুব্যবস্থা করেছিলেন। ঔপন্যাসিক মাসরুর আরেফিন কাফকা-সমগ্র বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন বিস্ময়কর দক্ষতার সঙ্গে। বাবাকে লেখা পত্র শুরু হয়েছে এভাবে :
প্রিয়তম বাবা,
কিছুদিন আগে আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন আমি আপনাকে এত ভয় পাই কেন? এ প্রশ্নের উত্তর সহসা আমার মুখে আসেনি, অংশত আপনারই ভয়ে, অংশত এহেন ভয়ের কারণ এমনই বিস্তীর্ণ যা বাক্যবন্দি করা আমার সাধ্যাতীত। এ চিঠিতে আমি আপনার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে কার্যত জবাবটি পরিপূর্ণ হবে না, কারণ লিখতে বসেও অন্তর্গত ভয় ও ত্রাস কলমের গতি রুদ্ধ করে দিচ্ছে; আর বিষয়টির পরিধি এতই ব্যাপক যে তা আমার স্মৃতি আর বোধশক্তির অতীত।...
সন্দেহ নেই হারম্যান কাফকার পর্বতসমান ব্যক্তিত্ব, সফলতা, দম্ভ এবং ক্রমাগত ভর্ৎসনা ফ্রান্ৎস কাফকার কিশোর অবচেতনায় অনপনেয় ছাপ মুদ্রিত করে দিয়েছিল। শৈশবে পিতৃভয়ে সদাতটস্থ কাফকা যৌবনেও বাবাকে কাছের মানুষ মনে করতে পারেননি। ৭২ পৃষ্ঠার এ দীর্ঘ চিঠিতে বাবা-ছেলের এ যোজন পরিমাণ দূরত্বের সবিশদ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ রয়েছে। তার ট্রায়াল মানুষের ওপর মানুষের ক্ষমতা প্রয়োগের অনন্য দলিল।
কাফকার অনুরাগী পাঠক পুস্তকাকারে প্রকাশিত এ পত্র পাঠে আগ্রহী হবেন আশ্চর্য কী! দৃশ্যত এটি বাবাবরাবর ছেলের ব্যক্তিগত ও অকপট একখানি চিঠি। বললে অন্যায্য হবে না যে, বাবাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কাফকা শৈশব-কৈশোর-যৌবনের অবদমিত যন্ত্রণার পূর্ণ প্রতিশোধ নিয়েছেন। একপর্যায়ে কাফকা কর্তৃত্বপরায়ণ বাবা হারম্যান কাফকাকে ‘শস্যখেকো পোকা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন; যা দংশনে দংশনে শস্যকে নীরক্ত করে ফেলে।
স্মরণ করা যেতে পারে যে, কাফকার দ্য জাজমেন্ট নামীয় গল্পটির কেন্দ্রেও রয়েছে বাবা-ছেলের অসম দ্বন্দ্ব। কাফকা তার বাবাকে বীরোচিত ‘খাঁটি কাফকা’ এবং নিজেকে ‘রোগাপটকা, দুর্বল, তুচ্ছ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সর্বত্র এ প্রতিতুলনা চিঠিটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এ চিঠিতে বাবা-ছেলের দূরত্বের জন্য কাফকা বাবাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালেও নিজেকেও যথেষ্ট দুষেছেন। তিনি ভীরু ছিলেন বলেই গোঁয়ার হয়েছিলেন। বদরাগী বাবার মেজাজ খারাপ করে দেওয়ার সুযোগ পেলে হেলায় নষ্ট করতেন না। তবে তার শেষ কথা, ‘বাবা একটু সহৃদয়, একটু মমতাময় হলে তাদের সম্পর্ক উষ্ণ ও স্বাভাবিক হতে পারত।’
কাফকা কেমন মানুষ ছিলেন সে সম্পর্কে নানা মুনির নানা মত। যাদের মধ্যে রয়েছেন মনোচিকিৎসক ও মনস্তত্ত্ববিদ। তার মানসিক গঠন নিয়ে রয়েছে অনেক বিশ্লেষণ। তার রচনা নানাভাবে পাঠ করা যায়। তার ঘনিষ্ঠতম ম্যাক্স ব্রডও নাকি জীবনী লিখতে গিয়ে সঠিক চরিত্রায়ণ করতে পারেননি। ঘোড়ায় চড়তে, নৌকা বাইতে, সাঁতরাতে ভালোবাসতেন কাফকা। প্রাহা শহরের নানা ঘটনা-অঘটনায় পুলকিত হয়ে তিনি অনাবিল হাসিতে ভেঙে পড়তেন। কাফকা শুঁড়িখানায় যেতেন। কাফেতে যেতেন। জম্পেশ আড্ডায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতেন। একাধিকবার প্রেমে পড়েছিলেন। লিখেছেন আবেগমথিত দীর্ঘ দীর্ঘ চিঠি। সামরিকতন্ত্র বিরোধী ছিলেন। রাজনীতিঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার লেখার মধ্যে সবল আর দুর্বলের সংকুল বৈরিতা পরিস্ফুট।
দ্য ট্রায়াল গল্পের নায়ক যেন অসহায় কাফকারই প্রতিবিম্ব। দীর্ঘ ছয় বছর তীব্র রোগযন্ত্রণায় কষ্ট পেয়ে ১৯২৪ সালে কাফকার জীবনাবসান হয়। তখন তার বয়স মাত্র ৪১। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের অভিজ্ঞতার জন্য তিনি দীর্ঘকাল বেঁচে থাকেননি।
ইতোমধ্যে ১০০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কাফকা আদৌ সহজবোধ্য কোনো লেখক নন অথচ সারা বিশ্বের সাহিত্যরসিক মানুষের কাছে কাফকাপাঠ আবশ্যিক হয়ে উঠেছে। তিনি কথাসাহিত্যে নতুন ঘরানার পথিকৃৎ। কথায় কথায় আমরা তার লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিই না বটে, কিন্তু আধুনিক কথাসাহিত্য প্রসঙ্গে তার নামোচ্চারণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেটে ‘কাফকার ট্রায়াল’ লিখে অনুসন্ধান করলে সাড়ে ৫ লাখ পৃষ্ঠার হদিস পাওয়া যায়। কেবল ‘ফ্রান্ৎস কাফকা’ লিখে অনুসন্ধান করলে প্রায় ৭ লাখ পৃষ্ঠার ঠিকানা পাওয়া যায়। পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে ফ্রান্ৎস কাফকা এখনও একজন আধুনিক লেখক। মৃত্যুশতবর্ষে সারা পৃথিবীতে ফ্রান্ৎস কাফকাকে স্মরণ করা হচ্ছে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। অদ্ভুত হলেও সত্য, কেবল টিকটক নির্মাতারা প্রায় ৭ কোটি ভিডিও বানিয়ে ইন্টারনেটে ছেড়েছেন। এগুলো দেখা হয়েছে ২০০ কোটি বার। বললে অত্যুক্তি হবে না যে, ১৯২৪ সালে ৪১ বছর বয়সে অকালমৃত্যুর পর ধীরে ধীরে কাফকাকে নিয়ে বিশ্বব্যাপী এক ব্যাখ্যাতীত অভিভূতির সৃষ্টি হয়েছে।
ফ্রান্ৎস কাফকা স্বীয় যন্ত্রণা, অন্তর্গত ভয়ভীতি, অসহায়ত্ব ও আত্মার ক্রন্দনের কথা বলে যেতে পেরেছেন। কিন্তু প্রকৃত পৃথিবীতে লাখো-কোটি মানুষ আছে যাদের জীবনযন্ত্রণা চির-অব্যক্ত থেকে যায়। তাদের ‘মেটামোরফোসিস’-এর গ্রেগর সামসার মতো চিতপটাং তেলাপোকা হয়ে নিঃশব্দে কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এসব অসহায়, কষ্টলাঞ্ছিত মানুষের জন্য আমাদের পুষ্পস্তবক নিবেদন ছাড়া কীইবা করার আছে? ২০০৮ সালে শেষবার কাফকার সমাধিতে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছিল। সেবার জন্মদিনের অনুষঙ্গ ছিল না। তবু গভীর মমতামিশ্রিত একটি শ্বেতশুভ্র পুষ্পস্তবক রেখে এসেছিলাম সমাধিপ্রস্তরের পাদদেশে।