× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিরালা

আজাদুর রহমান

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৪ ০৮:৪৭ এএম

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৪ ১০:৫৭ এএম

নিরালা

পানি খেতে গিয়ে নিরালা টের পেল, সে বড় তাড়াহুড়া করছে। কী আশ্চর্য! ব্যাপারটাকে আমলে পর্যন্ত নিতে পারেনি সে এত দিন। এবার ভালো মতেই খেয়াল হচ্ছে- মাস কয়েক হলো এক টানে এক গ্লাস পানি কখনও শেষ করতে পারেনি সে। যেটুকুবা খেয়েছে তাও খুব দ্রুত, অনেক সময় নাকে পানি উঠে গেছে। তার মানে পানি কম খাওয়ার কারণেই কি দিনের পর দিন প্রস্রাব হলুদ হয়ে যাচ্ছে। শরীর কষা হলে বাবা বলতেন- মেয়েকে বেশি করে শাকসবজি আর পানি খাওয়াও। বাবা চলে গেছেন। এখন আর কে বলবে! শুধু পানি খাওয়া নয়, সবকিছুতেই খুব তাড়াহুড়া করে ফেলেছে নিরালা। হবেই না কেন, মাস কয়েক ধরে ভেতরে ভেতরে সে তো আর কম অসহায় আর অস্থির হয়ে পড়েনি! অবচেতনেই মনে ভয় ভয় ভাব ঢুকে গেছে। ক্রমে ক্রমে যেন বেঁচে থাকাটাই এক রকম অর্থহীন হয়ে গেছে। হারুনুর রশিদের মৃত্যুর খবরটা কানে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু তছনছ হতে শুরু করেছিল। মুহূর্তে নিরালার মনে হয়েছিল, তার বুকের মধ্যে থেকে ঝুলন্ত কোনো এক পাথর বুঝি ধপাস করে হৃদয়টাকে শূন্য করে দিয়ে খুলে পড়ল। ফাঁকা হৃদয় নিয়েই চিৎকার দিয়ে উঠতে চেয়েছিল সে, কিন্তু কথাগুলো গলা পর্যন্ত ওঠার পর আর বাতাস পায়নি। ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় সে কেবল বলতে পেরেছিল, ‘না না এ হয় না, হারুন।’ তারপর সামান্য দম টানতেই ওর মনে হলো, কীসের দাবিতে সে এত শোকের অধিকার করছে? হারুন ওর কে! হারুন কী ওর মনের মানুষ! হয়তো তাই, কিন্তু হারুন কি জানতে পেরেছিল। নিরালা নামের মেয়েটি কী গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছিল তাকে। সবকিছু ঠিকঠাক মতন ঠিক জায়গায় বুঝি পৌঁছে দেওয়া যায় না। সময় থাকে না, অথবা সময়ের আগেই গন্তব্য বিলীন হয়ে যায়। নিরালার বেলায় অন্তত তাই হলো।
এক নিমিষে নেমে আসা গাঢ় অন্ধকারে নিরালা ঠিক কত দিন নিভে ছিল, মনে নেই। তবে ওর জন্য দিন থেমে থাকেনি। হয়তো পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বসা শোকও একসময় ক্লান্ত পায়ে নামতে শুরু করে। কিন্তু ক্ষতগুলো! সবকিছু থেমে গেলেও ক্ষতগুলো সহজে মরে না। শোকের ক্ষতগুলো পুরোপুরি শুকোবার আগেই নিরালার আচমকাই মনে হলো, ওর সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে অথচ খাঁচাবন্দি নিরালার অনেক কিছু করার বাকি। একটা জবরদস্ত অস্থিরতা আনমনেই ওর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। একসঙ্গে সাত-আট রকমের কাজ আর বাড়তি চিন্তা হাতে নিতে শুরু করল সে। যে করেই হোক, সবগুলোতেই অ্যাটেন্ড করতে হবে। অস্থির কল্পনার মধ্যে নিরানন্দে অনিচ্ছায় বোঝা টেনে বেড়াতে লাগল নিরালা।
হাজারটা কাজের পীড়ন থাকলে মানুষ হয়তো মনের অজান্তেই ধৈর্যহীন হয়ে পড়ে। ভাত খেতে গেলেও নিরালার অস্থিরতা আর উত্তেজনা কাজ করে। খামোখাই মনে হয়, ভাত খেতে প্রচুর সময় চলে যাচ্ছে, নাকে-মুখে ভাত দিতে থাকে সে। খাওয়াটা তখন গৌণ হয়ে যায়। মনে তাড়াহুড়া হলেও শরীরের কিছু যায়-আসে না। শরীরের নিজস্ব শিডিউল আছে, শরীর চলে কোটামাফিক। চিবানো, গেলা আর গলা বেয়ে নামার জন্য উপযুক্ত সময় না দিলে শরীরও বেঁকে বসে, বিগড়ে যায়। কোথাও কোথাও লক মতন হয়ে যায়। হিক্কা ওঠে, গলায় ভাত আটকে যায়। শুধু কি তাই, একটু পরপর অযথাই পাতলা পায়খানা হবে। পরিমাণে অল্প কিন্তু বারবার হবে। ভাবটা কিছুটা ডায়রিয়ার মতো হলেও ডাক্তারি ভাষায় এটাকে ঠিক ডায়রিয়া বলে না, বলে আইবিএস। জীবাণু নয়, স্রেফ মানুষিক উত্তেজনার ফলাফল। কোনো কিছু নিয়ে বেশি রকম অস্থিরতার মধ্যে পড়লেই নিরালার এই সমস্যা হয়। কলেজে থাকতে পরীক্ষার আগে একবার এ রকম হয়েছিল। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে কম করে হলেও তিনবার টয়লেটে যেতে হতো ওকে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আর তেমন কিছু হয়নি। ভার্সিটির লাইফটা আসলে এত বেশি ঝলমলে আর স্বাধীন গোছের ছিল যে, অন্যদিকে গভীর করে ভাবার তেমন সুযোগ-ই পায়নি নিরালা। অস্থিরতা অথবা বিষণ্নতার বদলে ছিল আনন্দময় গতি।
নিরালা বরাবরই অন্যরকম ছিল। ছেলেমেয়ের পার্থক্য করত না। ও এমনভাবে সবার সঙ্গে সহজ হয়ে মিশতে পারত যে, ওর প্রতি কেউ আলাদা করে দুর্বল চোখে তাকাবার পরিস্থিতি খুঁজে পেত না। নিরালা ফর্সা নয়, গায়ের রঙ চাপা, চাপা রঙ নিয়েও যে অসামান্য সুন্দরী হওয়া যায় তা নিরালাকে না দেখলে অনুমান করা কঠিনই বটে। কাটিং বলে কাটা কাটা প্রতিমাসম যে ছবিটা ফুটে ওঠে পুরুষের কল্পনার রাজ্যে তার পুরোটাই যেন বিধাতা ভরে দিয়েছিলেন ওর মধ্যে। ওর ভ্রমরকালো চোখের দিকে তাকালে আর যাই হোক, মায়া পড়ে যায়। এ রকম মায়াবতী চেহারার তরুণীকে নিয়ে মোলায়েম আর নিষ্পাপ প্রেম ছাড়া সহসা অন্যকিছু ভাবা যায় না। যারা ওর সম্পর্কে জানে না, তারাই কমবেশি মনে মনে ওকে নিয়ে কল্পনায় চলে গেছে। অথচ নিরালার ভেতরে-বাইরে তরলতার কিছু নেই, ও যেন প্রকৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠা সুগন্ধিময় কোনো হাসনাহেনা। ও অমন ছিল না। ক্লাস এইটে পড়ার সময় এক কিশোরকে আচমকাই ওর খুব ভালো লেগেছিল। মনে মনে প্রেমেও পড়েছিল নিরালা। কিন্তু ছেলেটার বাবা এক দিন বদলি হয়ে গেল। ছেলেটা এমন লাজুক ছিল যে, মুখ ফুটে সামান্য কথাটাও বলতে পারেনি। আর নিরালার তো বলবার কথা নয়। কতই আর বয়স পনেরো-ষোলো, বলার মতো সাহস পরিস্থিতি কিছুই ছিল না তখন। ছেলেটা চলে যাওয়ার পর নিরালার প্রায় দম বন্ধ মতন অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। কোনোকিছুই ভালো লাগত না। পড়াশোনাটাও মনে ধরত না। বই খুললেই খালি ছেলেটার ছবি ভেসে উঠত। একটা পুরুষ বালক হেঁটে যেত ওর কষিটানা খাতার মধ্যে। ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল নিরালা। কিন্তু ক্লাস এইটে বৃত্তি তো দূরের কথা, উল্টো ভীষণ রকম জ্বরে পড়ল সে। কোনোমতে পাস মার্ক নিয়ে ক্লাস নাইনে চলে গিয়েছিল সে। পাড়ার অন্য সবার মতো শিক্ষকরাও হতবাক হয়ে গিয়েছিল। একমাত্র বাবাই হয়তো বিশ্বাস করতে পেরেছিলেন। বাবার কথা আলাদা, নিরালার সব বাবা বুঝতে পারতেন। কোনো এক সন্ধ্যায় মাথায় হাত রেখে তিনি বলেছিলেন- মা, দুঃখ খুব সামান্য জিনিস, এত হালকা আর ফালতু যে ঘুরে ঘুরে বারবার আসে। দুঃখকে পাত্তা দিলে তুমি কেবল দুঃখ নামক পাথরের নিচেই পড়ে থাকবে। দুঃখকে আলিঙ্গন করে ডুবে থাকার কিছু নেই, বরং দুঃখ সঙ্গে আছে ভেবেই এগিয়ে যেতে হয় আনন্দের দিকে। এই দেখো, আমি এই বয়সেও এই রোগাক্রান্ত শরীরটাকে বয়ে বেড়াচ্ছি। শরীর টানতে আমারও ভালো লাগে না। মন চায় ভারী শরীরটাকে কোথাও ফেলে দিয়ে পাখির মতো উড়ে বেড়াই। কিন্তু কেউ এটাকে সম্ভব করতে পারেনি। যা পারা যায় তা হলো, এটাকে গৌণ ভাবতে হবে এবং সম্মুখের আনন্দ পানে ছুটে যেতে হবে। বাবা একটানা কথাগুলো বলতে বলতে আরও নিবিড় হয়ে এসেছিলেন বোধহয়। বাবার চোখে পানি ছিল না, কিন্তু নিরালা বাবার মুখটাকে পড়তে পারত। বাবা হয়তো কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন, পারলেন না, ঠোঁটগুলো কেঁপে ওঠার আগেই নিরালার মুখকে অগ্রাহ্য করে তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন, তারপর একটু থামলেন, মুখ না ফিরিয়েই বললেনÑ জানিস এখনও কেন বেঁচে আছি, বুড়ো শরীরটাকে টেনে বেড়াচ্ছি, তুই এক দিন বড় হবি, তোর আলোতে আমি হেঁটে হেঁটে মরে যাব…। বাবাকে হয়তো নিরালা এবার কিছু একটা বলতে পারত। কিন্তু পারল না। বাবা দরজার ওপারে চলে গেলেন। বাবার সঙ্গে নিরালার এই আপাত আর দৃশ্যত একটা ব্যবধান থাকলেও নিরালার কাছে তার বাবাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে সে সব রকমের আবেদন করতে পারে। মনে আছে, সেদিনের সেই সন্ধ্যায় কান্নামিশ্রিত এক অন্যরকমের নরম আর ভালো লাগার স্বাদ নিরালার গলা বেয়ে উঠে এসেছিল। মনে হয়েছিল, আর কিছু নয়, শুধু বাবার জন্যই ওকে বড় হতে হবে। যেনতেন বড় নয়, আলোকিত করার মতো বড় হতে হবে। এরপর আর কোনো কিছুকেই কোনো কিছু বলে মনে হতো না…।
মুখকে মনে রাখতে হয়। দীর্ঘদিন কোনো মুখের ওপর স্টাডি না থাকলে এক কালের চেনাশোনা মুখও বোধহয় সচেতন মন থেকে ঝাপসা হতে হতে একসময় ক্ষয়ে যাওয়া পয়সার মতো অচল আর অবয়বহীন হয়ে পড়ে। তখন শতচেষ্টা করেও ছেঁড়া ছেঁড়া দৃশ্যগুলো জোড়া দিয়ে সেই আগের মুখটাকে আর ফেরানো যায় না। সেই বালকটিও হয়তো সেই নিয়মে সুদূরে কোথাও কোনো এক অরণ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিল। নিরালা মন ঠিক করে ফেলেছিল। তাই তো একের পর এক ভালো রেজাল্ট করতে লাগল সে। তারপর এক দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো একটা সাবজেক্টে চান্সও পেয়ে গেল। কিন্তু জীবন! সে তো স্রোতের মতো একটানা একভাবে চলে না! জীবন নিয়ম মানে না, যেকোনো সময়-ই সে পথ পাল্টাতে পারে, কাঁচের মতো ভেঙে খান খান হয়ে যেতে পারে।
নিরালা হয়তো ভুল ভেবেছিল, হয়তো ভেবেছিল সময় তাকে ঠিকমতো বয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু সময় যেন এক রাতে বেরহম হয়ে পড়ল। বাবার স্ট্রোক হলো। ডাক্তার ডাকার সময় পর্যন্ত পেল না নিরালারা। তার আগেই নিরালার ভাবনার জগৎটাকে ভেঙেচুড়ে তছনছ করে স্বপ্নের মহাজন নিভে গেলেন।অন্ধকারে হঠাৎ নিচু সিঁড়িতে পা পড়লে যেমন একটা আচমকা প্রতিবন্ধী অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়, তেমন বোকাসোকা আর ফালতু এক শূন্যতায় ভরে গেল নিরালার চারপাশ। পরের এক মাস ঠিক কোথাও যাওয়ার আর কোনো উৎসাহ খুঁজে পেল না সে। ওর কাছে মনে হলোÑ পৃথিবীটা আসলে শোকের মিছিল। এখানে অনবরত কেবলর দুঃখের মাতম চলে। নিরালা ঠিক করলÑ সে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে না। পড়াশোনা করে কী হবে, বড়জোর একটা ভালো চাকরি, সুযোগ বুঝে ভালো পাত্র অথবা ক্লাসমেট কোনো একজনকেই হয়তো গোছাতে হবেÑ এর বেশি কিছু নয়তো! এত সব পাওনা সে যেন চোখের সামনে পরিষ্কার ছায়াছবির মতো দেখতে পেল। অন্য সময় হলে কী হতো কে জানে। সেই মুহূর্তে ঠিক তথাকথিত এসব গাঁটবাঁধা সুযোগকে গ্রহণ করার পেছনে বড় বেশি ক্ষুদ্রতাকে দেখতে পেল ও। তা ছাড়া চাকরি-বাকরি, ভালো হাজব্যান্ড কিংবা সুখের জন্য হাবিজাবি আরও যা যা লাগে ইত্যাদি কাকে দেখাবে সে! আলো হাতে নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে কার কাছে ছুটে যাবে সে! কে হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নেবে তাকে, ছুটে এসে বলবেÑ আলো, আমার সব আজ আলো। যিনি আলো আনতে বলেছিলেন, তিনি তো আকাশের হাজার আলোর মধ্যে গিয়ে মুখ লুকিয়েছেন। তাইতো আজ আর নিরালার আলোর দরকার নেই। ভাবতে ভাবতে বাবার মুখটা ভর সন্ধ্যায় ঝাপসা হয়ে আসে।
দিন যায়, মাস যায়, তার পর এক দিন হঠাৎ সংসারের নরম জায়গাগুলো কেঁপে কেঁপে ওঠে। দুর্বল হয়ে পড়ে চারধার। শুধু তো ঘর নয়, নিরালা ছাড়াও ঘরে আরও মুখ আছে, হা মুখ। তাদের সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, আরাম-আয়েশ আছে। যত দিন শরীর চলে হাত-পা-মাথা চালাতে হবে। আর ঠিকমতো চালাতে না পারলে একত্রে মুখ থুবড়ে পড়তে হবে, তখন যে কেউ এগিয়ে আসবে করুণা হাতে করে সুযোগ নেবে। হয়তো দুর্বল মুহূর্তে মেয়েমানুষ ভেবে গায়ে পড়ে কাছে নিতে চাইবে। তখন! মেয়ে হয়ে জন্মে কিছুটা হলেও নিরালা বুঝেছে বাবাহীন, অভিভাবকহীন একজন সোমত্ত মেয়ের কত রকমের সামাজিক ঝক্কি সহ্য করে চলতে হয়।
সে যাই হোক, এখনই কিছু একটা করা দরকার। কিছু করতে গেলে পথে নামতে হবে। চাকরি খুঁজতে নেমে রীতিমতো সাঁতার কাটার মতো হাঁফাতে লাগল নিরালা। পায়ের নিচ থেকে নরম ঘাস টেনে নিয়ে ঘাসের বদলে পাথর বসিয়ে দিলে বোঝা যায় ঘাসের মহত্ত্ব। নিরালাকে অবশ্য বেশি দিন বাস্তবতার নির্মম পথে হাঁটতে হলো না। কেমন কেমন করে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে গেল ও। ভালো বেতন। ট্যুর আছে। উপরন্তু কোম্পানির লাভের সঙ্গে বাড়তি বোনাস সুবিধা আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো এখানে পরিবেশটাই সহজ আর বারোয়ারি। লোকজনের সঙ্গে কথা বলা যায়, মতামত চাওয়া যায়। ফলে অল্প দিনেই জীবনে যেন ক্রমেই দ্যুতি ফিরে আসছিল। ভেতরে ভেতরে অবশ্য নিরালার একটা ইচ্ছা ছিল, জীবনটাকে সে মর্জিমতো স্বাধীনভাবে ব্যয় করবে। কাঁটাছেঁড়া তো কম হয়নি। যাই হোক, সে কাউকে বিয়ে করে জীবনকে আটকানোর মানে নেই! অথচ এক দিন হারুনুর রশিদ নামের এক ছেলে সবকিছু তছনছ করে দিল। বদলি হয়ে এসেছিল সে। হারুন নয়, নিরালা যেন সাক্ষাৎ সেই কিশোরকেই দেখতে পেল। এক দিন যে কিশোর ওর কষিটানা খাতার পাতা বরাবর হেঁটে যেত। কিন্তু এ তো সেই কিশোর নয়, মুখের ওপর সেই মুখ তুলে বালকের আদলে গড়ে ওঠা হারুনুর রশিদ। তারপর বলতে গেলে অবচেতনেই হারুনুর রশিদ নামের যুবকটি নিরালার মন জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং ক্রমেই যেন চারপাশের সবকিছু নিজ থেকেই অনুকূলে নেমে এসেছিল। মাসখানেকের মধ্যেই যার পর নেই ভালো বন্ধু হয়ে গিয়েছিল ওরা। হয়তো মুখ ফুটে ভালোবাসার কথাটাও এক দিন বলা হয়ে যেত। কিন্তু সব সকাল এক রকম হয় না। কোনো কোনো সকাল চরম অন্ধকারাচ্ছন্ন আর নিষ্ঠুর দানবের মতো হয়ে হাজির হয় চোখের সামনে। সেদিনের সকালটাও সে রকম জমদূত হয়ে এসেছিল বোধহয়। বজ্রাহতের মতো নিরালাসহ অনেকেই শুনেছিলÑ গত রাতে সড়ক দুর্ঘটনায় হারুনুর রশিদ মারা গেছেন। নিরালা যেন শূন্য শহরে মুহূর্তে পাগলের মতো ছুটে গিয়েছিল স্পটে। ততক্ষণে হারুনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। অবশেষে ছড়িয়ে থাকা রক্তের দাগ ছাড়া কিছুই আর দেখতে পায়নি সে। দৃশ্যটাকে চোখে নিয়ে সে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। আর তখনি বৃষ্টি শুরু হলো। নিরালার কান্নার মতোই বৃষ্টি সেদিন, প্রথমে টুপটুপ তারপর অঝোরধারায়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা