অনিরুদ্ধ আলম
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৪ ১৫:১৫ পিএম
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’র বিষয়বৈচিত্র্য এবং কবিতার নানান আঙ্গিকগত উপস্থাপনা আমাকে অভিভূত করেছে।
ব্যতিক্রম ধারার কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল বাংলাদেশের কবিতা অঙ্গনে একটি উজ্জ্বল নাম। কবিতা নিয়ে নিত্যনতুন পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য তিনি পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত। এ কারণে যখন তার নতুন কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়, তা নিয়ে কবিতা অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য আগ্রহের সৃষ্টি হয়।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের মাত্র আড়াই ফর্মার ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’! নামের ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটি কী ধরনের কাব্যগ্রন্থ। তবে নামকরণে ‘শ্রেষ্ঠ’ শব্দ যুক্ত হলেও এটি একটি স্বতন্ত্র কাব্যগ্রন্থ। প্রশ্নটা খুবই স্বাভাবিকÑএত স্বল্পপরিসরে ছোট্ট একটি মিনি বই কীভাবে ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’ হয়?
যদিও কবির ভাষ্য, যে অর্থে ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বিবেচনা করা হয়; সেই বিচারে গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো তা নয়। তবে অবশ্যই সেরা কবিতা। আরও জানা গেছে, সেপ্টেম্বর ২০২২ থেকে নভেম্বর ২০২২- এ তিন মাসের লেখা ৩৬টি কবিতা। ফলে একটি বিভ্রান্তি থাকলেও প্রতিটি কবিতা আলাদাভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল নিয়মিত লেখেন এবং তিনি প্রচুর কবিতা লিখেছেন। সে ধারা এখনও অব্যাহত আছে। এ দিক বিবেচনা করলে তার ভালো কবিতার সংখ্যাও অনেক। শ্রেষ্ঠকবিতা হিসেবে এখানে মাত্র ৩৬টি কবিতা স্থান পেয়েছে। খুব সম্ভবত বেহুলা বাংলা কবিতা নির্বাচনের নীতিমালায় প্রকাশিত গ্রন্থটি।
তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, নির্বাচিত কবিতাগুলো অবশ্যই অবশ্যই শ্রেষ্ঠকবিতার মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’র অনেক কবিতাই আমার পড়া ছিল না। এ সংকলনের অসিলায় ভিন্নস্বাদের একগুচ্ছ ভালো কবিতা পড়ার সুযোগ ঘটল।
আমার মতে এ বইয়ের যে কটি কবিতা অবধারিতভাবে পাঠকমহলের নিরঙ্কুশ মন জয় করবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑবাবার চিঠি, উঠোনে দুটি চাঁদ, নকশিকাঁথা, একটি দৃশ্যে একাধিক চিত্র, রাষ্ট্র, কাঠগড়ায় কবিতা, এর চেয়ে কম ভালোবাসা যায় না, বসন্ত প্রায় শেষ…।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’ পড়লে তার কাব্যপ্রবণতা, লেখার অনন্য শৈলী, এবং সামগ্রিক জীবনবোধ সম্পর্কে একটি বিরল ধারণা পাওয়া সম্ভব। বিচিত্র বিষয়, বহুমুখী চিন্তা এবং চিত্রকল্প নিয়ে কবির বিচরণ বেশ লক্ষণীয়; যা বর্তমানের কবিদের মাঝে খুব-একটা দেখা যায় না। এর জন্য যে পরিমাণ নিষ্ঠা, ভাবনা, সাহসিকতা এবং মগ্নতার প্রয়োজন, তার উপস্থিতি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের কবিতায় প্রচণ্ডভাবেই আছে।
তিনি শুধু গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নিয়ে ক্ষান্ত থাকেননি। তার কবিতায় নির্দ্বিধায় উঠে এসেছে যান্ত্রিক এবং সখ্যায়ন-যুগের জীবনবাস্তবতা, এর উত্থানপতন এবং সুন্দর সম্ভাবনার ইঙ্গিত। সেই সঙ্গে বহুমাত্রিক বিষয় এবং বৈচিত্র্য!
‘লাবণ্য দাশের চেয়ে বনলতা সেন জনপ্রিয়,
তাহলে আমরা কি জলের বদলে রাকীবের সাথে ভদকা খাবো?
[-উঠোনে দুটি চাঁদ]
নীরব অশ্রুজলে লেখাপত্র পড়তে-পড়তে ঘুমিয়ে পড়তাম,
স্বপ্ন দেখতাম –
মুক্তিযোদ্ধা বাবার হাত ধরে স্বাধীনতা আনতে যাচ্ছি।
তাঁর কাঁধে চড়ে নদী পার হচ্ছি, ওপারে যাচ্ছি।
[-বাবার চিঠি]
এবং–
একটি ফুলের নাম–রূপনা চাকমা,
আরেকটি ফুলের নাম–সাবিনা খাতুন
অন্য ফুলটির নাম–মারিয়া মান্দা,
এবং আরো আছে–কৃষ্ণা রাণী সরকার।
ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফে;
বাংলার বাগানে।
[-নকশিকাঁথা]
ওপরের কবিতা অংশগুলো প্রমাণ করে কবি কত গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন দেশ, দেশের ঐতিহ্য। কবিতার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এক অপূর্ব আত্মিক ব্যাকুলতা। যে ব্যাকুলতা পুঁজি করে তিনি পাড়ি জমিয়েছেন চিরন্তন আন্তর্জাতিকতার সন্ধানে।
নেদারল্যান্ডে যাবার পর বুকের ভেতর হুহু করে উঠল নেত্রকোণা,
পাবে বসে বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে মনে পড়ল সেই গ্রামীণ সন্ধ্যা;
বিরিশিরির গারো পাহাড়ি মহুয়ার রস,
মনে পড়ল অথবা ভুলে গেছি–কচ্ছপের মাংসের স্বাদের সাথে মিশে থাকা
দেউলী উৎসবে হাজংদের ‘নাসেক, নাসেক’ নাচো নাচো গান।
[-নেত্রকোণা]
কিংবা–
ভাতের থালার কোনায় একটু নুন
বাংলা সংস্কৃতি ছাড়া আর কোথাও নেই,
কিন্তু নতুন জামা পরার পর চিমটি দেয়ার সংস্কৃতি
আফ্রিকাতে আছে, রাশিয়াতেও।
[-নুন]
‘নেত্রকোণা’ আর ‘নুন’ কবিতা দুটির প্রসঙ্গ ধরে বলা যায়, জাতীয় মূল্যবোধ আন্তর্জাতিকতার আলোকে দেখার সময় এসেছে। এ যুগ হলো গ্লোবাল ভিলেজভিত্তিক দর্শনের যুগ। তাই আমাদের নিজস্ব চাহিদা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং টানাপড়েন অবশ্যই বিশ্ব প্রেক্ষাপটের সঙ্গে পেরে ওঠার মতো হতে হবে। এর জন্য আমাদের যে পরিমাণ দূরদর্শী এবং সচেতন হওয়া দরকার, তা অর্জনের উদ্দেশ্যে আমাদের যথেষ্ট উদ্যোগী হওয়া এখন সময়ের চাহিদা।
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’ পড়লে এ অনুভূতিটা সহজেই মনে উঁকি দেয়–কবিতা জীবনকে ভালোভাবে এবং অবশ্যই গভীরভাবে উপলব্ধি করার একটি গুরুত্বপূর্ণমাধ্যম। বর্ণিল চিত্রকল্প, মেদহীন উপমার ব্যবহার এবং সাবলীল বিশ্বাস ‘শ্রেষ্ঠকবিতার’ কবিতাগুলো করেছে আপাদমস্তক মুগ্ধকর এবং যথোপযুক্ত শৈল্পিক। একবার পাঠক কোনো একটি কবিতা পড়তে শুরু করলে, তা তাকে কবিতার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছানোর তাড়না জুগিয়েই যাবে। আর এখানেই একজন কবিতা লেখকের মূল সাফল্য।
জীবনযাপনে স্নিগ্ধতা কামনা যেমন সত্য, তেমন সত্য জীবনচক্রে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন কর্কশতা। এ কর্কশতার কথা কবিরা সহজে তাদের কবিতায় বলতে চান না। কিন্তু এও বাস্তব জীবনের একটি গ্রাহ্য দিক। ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’ বইটিতে এরই সুন্দর উপস্থাপনা দেখতে পাই। জীবনের ঋণাত্মক দিকগুলোও কবিতার সুন্দর উপস্থাপন হতে পারে।
‘মৃত কবিতা’কবিতায় সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল তারই সুন্দর ইঙ্গিত দিয়েছেন–
‘ঘুমখোর নিশিরাত।
মৃত কবিতা। অন্ধকারে ছন্দ পচনের গন্ধ নেই।
মৃত কবিতা কি চন্দন কাঠ?
ছড়াচ্ছে সুগন্ধি!
সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের ‘শ্রেষ্ঠকবিতা’র বিষয়বৈচিত্র্য এবং কবিতার নানান আঙ্গিকগত উপস্থাপনা আমাকে অভিভূত করেছে।